বিদেশী/জার্মান ভাষা শিখতে আগে প্রয়োজন বাংলা ভাষার গাঁথুনি

 

অল্প কিছুদিন আগের কথা। ও-লেভেল শেষ করে একটা ছেলে ডাডের ঢাকা অফিসে গেছে। উদ্দেশ্য জার্মানিতে ব্যাচেলর করতে কি কি দরকার সেটা সম্পর্কে জানা। ছেলেটি প্রকৌশলী হতে চায়, ডাডের অফিসার তাকে বললেন, তার এ-লেভেলে গণিত, রসায়ন এবং পদার্থবিদ্যা থাকতে হবে। ছেলেটি তার কথা মতন এই বিষয় গুলো নিয়ে এ-লেভেল শুরু করে দিল। একই সাথে সে জার্মান ভাষায় ভর্তি হল। তার স্বপ্নজার্মানিতে গাড়ির প্রকৌশলী হওয়া, যেকোনো মূল্যে সে তার লক্ষে পৌঁছাবেই।

এ-লেভেল পড়া শেষের দিকে, জার্মান ভাষাও বি-১ পর্যন্ত শেষ হয়ে গেছে এমন একটা সময়ে ছেলেটা জার্মানিতে আবেদন করা শুরু করল। আবেদন করার পর সে খুব দ্রুত উত্তর পেল। এত বেশি দ্রুত যে, সে নিজেও অবাক হয়ে গেল। প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জানানো হল, জার্মানিতে ব্যাচেলর করার জন্য সে উপযোগী নয়। কারণটা আর কিছু নয়, জার্মানিতে ব্যাচেলর করতে অন্তত একটা ভাষা (বাংলা বা ইংরেজি) নিয়ে পড়া থাকতে হবে।

ডাডের অফিসার ভদ্রলোক ভুল করে এই ব্যাপারটি খেয়াল করেননি। সাধারণত যারা বাংলা মিডিয়ামে পড়ে, তারা নিজের অজান্তেই এবং কিছুটা অনীহার সাথে বাংলা বা ইংরেজি পড়ে। ইংলিশ মিডিয়ামে এ-লেভেলে এটা নিতেই হবে এমন কোন কথা নেই!

ছেলেটা প্রচন্ড নাড়া খেয়ে গেল, ভুলটা তার ছিল না। কিন্তু অন্যের এই সামান্য ভুলের জন্য তাকে আবার নতুন করে বাংলা (বা অন্য একটি ভাষা) নিয়ে পড়তে হবে, এর জন্য খরচ হয়ে যাবে মূল্যবান অনেকটা সময়।

তবে আমার গল্পের মরাল ছিল এই যে, জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য সবচেয়ে আগে যে যোগ্যতাটি প্রয়োজন, সেটি হল একটি ভাষার উপর দক্ষতা থাকা। একটি ভাষার উপর নিপুণ দক্ষতা এবং বিশুদ্ধতা না থাকলে উচ্চশিক্ষাতে কোনভাবেই তাকে যোগ্য হিসেবে গণ্য করা হবে না। এই নিয়ম সম্ভবত আমেরিকা কানাডায় নেই। তবে জার্মানিতে এটা আবশ্যক।

আমাদের দেশের সিংহভাগ ছেলে মেয়ে বাংলিশে বাতচিত করে। অনেকের হিন্দির প্রতিও দুর্বলতা আছে বলে শোনা যায়। বিদেশী ভাষা শেখা খারাপ নয়, কিন্তু সেটা নিজের ভাষা বাদ দিয়ে নয়। অন্তত একটি ভাষাতে সবাইকেই সুনিপুণ হতে হবে। সেটা না হলে, প্রকৌশল হোক আর চিকিৎসা বিদ্যায় পড়া হোক, জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়তে হবে। যেকোনো নতুন বিদেশী ভাষা শিখতে আমরা সাধারণত জানা ভাষায় প্রথমে সেই বস্তু বা ঘটনাটিকে মনে মনে কল্পনা করি। পরের পর্বে সেই কথাগুলোকেই অবচেতন মন নতুন ভাষায় রূপান্তর করে। এখানে যদি মূল ভাষাতেই গলদ থেকে যায়, তাহলে অনুবাদের মান যে ভাল হবে না সেটা বলাই বাহুল্য।

একজন মানুষ একটি ভাষায় দক্ষ কিনা, এর প্রমাণ পাওয়া যায় তার নিত্য জীবনে সেই ভাষাটির প্রয়োগ এবং চর্চার মাধ্যমে। আমরা কথা বলার সময় যে পরিমাণ বিদেশী শব্দ ব্যবহার করি, সেখান থেকে প্রমাণিত হয় যে, অন্তত একটি ভাষাতে নিখুঁত ভাবে মনের ভাব প্রকাশের যোগ্যতা থেকে আমরা অনেকখানি পিছিয়ে।

জার্মান শেখার সময় আমাদের মনের ভেতর একটির বদলে দুইটি অনুবাদের মেশিন চলে। একবার বাংলা থেকে ইংরেজি, তারপর ইংরেজি থেকে জার্মান। এটা আমাদের ছেলেমেয়েদের জার্মান শেখার সবচেয়ে বড় প্রতিকূলতা। আমি নিজে এক সময় এই ডুয়েল প্রসেসিং এর কাজ করতাম, এবং নিজের অভিজ্ঞতা বলে এই কারণে অনেক জার্মান শব্দ জানলেও বলার ক্ষেত্রে ব্যাপক সমস্যা হত। সরাসরি বাংলাতে চিন্তা করে সেটাকে জার্মান করার অভ্যাস করলে জার্মানে কথা বলতে সুবিধে হয়। একই সাথে একটা প্রসেসর বন্ধ থাকায় মাথা ঠাণ্ডা থাকে।

তাহলে যেটা বলছিলাম, সবাই ভাল করে বাংলা শেখ। বেশি করে বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে বের করে প্রতিনিয়ত অনুশীলন কর। তার জন্য বাংলায় লেখাটার গুরুত্ব অতীব। যারা আজকে বাংলায় ভাল করে একটি বিষয় সাজিয়ে লিখতে পারছে না, তারা কোনদিনও ইংরেজিতে বা জার্মানে থিসিস বা পেপার লেখায় সফল হতে পারবে না। সামান্য এই ফেসবুকেই চ্যাট হোক, আর উচ্চশিক্ষার প্রশ্নই হোক, বাংলায় অনুশীলন করি। প্রিয়জনকে বাংলায় লিখি, ভালবাসি, বাংলায় ভালবাসি।

পাদটীকা~ সেই ছেলেটি হাল ছেড়ে দেয় নি। ভাষা নিয়ে আবার এ-লেভেলের পরিক্ষার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। আমার ধারণা ছিল ইংরেজি মাধ্যমের ছেলেমেয়েরা ভাল বাংলা পারে না। ছেলেটি আমার সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করে দিয়ে আমার সাথে ঘন্টার পর ঘণ্টা চমৎকার বাংলায় লিখে কথা বলল। একটা বানানও ভুল পেলাম না, শব্দচয়নে প্রায় কোন ইংরেজি শব্দই ব্যবহার করল না। যার ইচ্ছে আছে, সে ঠিক পারে! আমি নিজেও এখনও শিখছি, কেউ বাংলা প্রতিশব্দ পেলে ধরিয়ে দেবে, ধন্যবাদ।

আদনান সাদেক, ২০১৪

লেখকের কথা~ যারা জার্মান ভাষা শিখতে চায়, তাদের বলি~ ইংরেজিতে জার্মান শিক্ষার ফলাফল ভাল হয় না। বরং সরাসরি বাংলা থেকে জার্মান শেখার চেষ্টা কর। জানি সবাই বলবে, বাংলায় জার্মান শেখার ভাল বই নাই, সবই ইংরেজি ভাষায়। শেখা কিন্তু বই পড়ে হয় না, অন্তত ভাষা শিক্ষা তো নয়ই। আমরা নতুন ভাষা শেখার সময় মনে মনে কোন একটা ঘটনাকে মনের ভাষায় চিন্তা করি, তারপর সেটাকে বিদেশী ভাষায় রূপান্তর করি। এই মনের ভাষাটা যেন ইংরেজি বা বাংলিশ না হয়। এরজন্য সব সময় প্রয়োজন অন্তত একটি ভাষায় নিপুণ দক্ষতা এবং শব্দচয়নের ক্ষমতা।

মনের ভাষাকে পোক্ত করার একমাত্র উপায় অবচেতন মনকে একটা বিশেষ ভাষায় গড়ে তোলা। মাতৃভাষাই এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজতম উপায়। অবচেতন মনকে একটি ভাষায় গড়ে তোলার উপায় বাংলায় লেখার অভ্যাস করা, বাংলা লেখা বই পড়া ইত্যাদি।

অনেক বছর জার্মানিতে। টোফেলে একসময় রেকর্ড মার্ক পেয়েছিলাম, ইংরেজিটা একদম খারাপ পারি না। প্রাত্যহিক জীবনে একসময় শুধু ইংরেজি লিখতাম। কিন্তু জার্মান শিখতে গিয়ে অনেক বছর কথা বলতে গিয়ে আটকে গিয়েছি, অনেক শব্দ পারি তবুও জার্মান মুখ দিয়ে বের হয় না। কারণ মনে মনে সবসময় দুইবার অনুবাদ করতাম। একবার বাংলা থেকে ইংরেজিতে, পরে ইংরেজি থেকে জার্মান। একসময় আবার একই সমস্যায় পড়লাম যখন দেখলাম একটু একটু জার্মান বলতে শুরু করলাম। তখন দেখলাম ইংরেজি বলতে সমস্যা হচ্ছে।

এই ভুলটা যখন থেকে ধরতে পেরেছি, তখন থেকে বাংলায় লেখার অভ্যাস শুরু করছি। যতই বাংলা বেশি ভাল শিখছি, আমার মনে হয় জার্মান বলতে বা এমনকি ইংরেজি বলতে তত বেশি সুবিধে হয়। কারণটা আমার ধারণা মনের ভেতর প্রথম চিন্তাটা একটা ভাষায় শুদ্ধ করে ভাবার প্রবনতা।

এটা নিয়ে কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আছে কিনা জানা নেই, নিতান্তই আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং মতামত থেকে লেখা।

Print Friendly, PDF & Email

ফেসবুক মন্তব্যঃ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

  1. Is there any course we can do to become eligible to apply for bachelor in Germany? What is your suggestion?

     
  2. Pingback: জার্মান ভাষার অ… আ… ক… খ… (১) | বিসাগ (www.BSAAGweb.de)