কেন স্বপ্ন দেখতে হবে?

 

একদম ছোটকালে বিটিভিতে সায়েন্টিফিক/ টেকনোলজিক্যাল ডকুমেন্টারি দেখতাম। টয়োটা কার ও রোবট দেখে আমারও ইচ্ছা হত একদিন আমিও অটোমোবাইল/রোবটিক্স নিয়ে পড়বো। কিন্তু পারিবারিক বাঁধা আসে। বাবা ডাক্তার, বড় ভাইও ডাক্তারি পড়তে চান নাই। তাই আমাকেই পড়তে হবে মেডিকেলে। কিন্তু মেডিকেল আমি পড়বোই না, কারণ বায়োলজি আমার মোটেও ভাল লাগত না। এর থেকে ম্যাথস, ফিজিক্স ভাল লাগত খুব। কেমিস্ট্রিও কেমন জানি বিরক্ত লাগত প্রথম প্রথম। এইচএসসি তে চেয়েছিলাম ঢাকা বা চট্টগ্রামে এসে বড় কোন কলেজে পড়তে। ঢাকায় একটি কলেজে সুযোগ পেলাম। কিন্তু বাবা নারাজ। এত জলদি ঘরছাড়া করতে চান না। মাকে বললাম কোনভাবে বাবাকে রাজি করাও প্লিজ। কিন্তু তবুও বাবা রাজি নয়। ঢাকায় যে আমাদের কোন পরিচিত কেউ নেই! এই অজুহাতে ঢাকায় আর পড়া হলো না। পরে, চট্টগ্রামের একটি কলেজে সুযোগ আসল। চট্টগ্রামে তো আমার মামার বাসা। এখনতো আর কোন বাঁধা নেই পড়তে। আমি মৌলভীবাজার কলেজ থেকে ভর্তি বাতিল করে আমার সব ডকুমেন্টস্‌ তুলে নিয়ে এসেছি। চট্টগ্রামেও পাঠিয়ে দিলাম। মামা ভর্তি প্রক্রিয়া সামলালেন আমার অনুপস্থিতিতেই। রাতে চলে যাব চট্টগ্রাম, এই সময় বাবা এসে বললেন তুই মৌলভীবাজারেই পড়ালেখা কর! এত জলদি ঘড় ছেড়ে যাসনে। গুছানো ব্যাগ খুলে ফেললাম, বাসের টিকিট ফেরত দিলাম।

DLR1

এইচএসসি তে বায়োলজি রাখলাম ৪র্থ বিষয় হিসেবে। বাসার সাথে অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছিল এর জন্য। কিন্তু আমি আমার পছন্দে অনড়। এইচএসসি উত্তীর্ণ হয়ে ইন্জ্ঞিনিয়ারিং কোচিং করতে আসি ঢাকায়। প্রথম দিন বাবা সাথে করে নিয়ে গেলেন সবকিছু ব্যবস্থা করতে। পরে, বাসায় বিদায় নিলাম। রওয়ানা দিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। এক অজানার পথে। জানিনা ভবিষ্যতে কি আছে। চার বন্ধু এক রুমে উঠলাম। পড়ালেখা চাঙ্গে উঠল। নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সবসময় মনে হত খুব চাপের মধ্যে আছি। মফস্বলের পড়ার সাথে শহরের পড়ার অনেক তফাৎ লক্ষ্য করলাম। ভাবলাম কোথাও চান্স পাবো কিনা কে জানে!

চুয়েটে ভর্তি হলাম। ভর্তি প্রক্রিয়ায় অনেক জটিলতা হল আমার। আমার একটি কাগজ হারিয়ে গিয়েছিল অফিস থেকে। কিন্তু রেজিস্টার খাতায় আমার স্বাক্ষর করা ছিল বিধায় আমার ভর্তি আর বাতিল করেনি। ভর্তি কমিটি আমার বেপারে আলাদা মিটিং করে এবং লোকাল গার্ডিয়ানসহ আসতে বলে। মামাকে নিয়ে গেলাম। একজন সিনিয়র শিক্ষক আমাদেরকে বিভিন্নভাবে অপর্যদুস্ত করলেন, বললেন, আমাদের তোমার মত এরকম ইন্জ্ঞিনিয়ার দরকার নেই।  শুরু করলাম প্রথম বারের মত মা বাবা কে ছেড়ে বড় দৈর্ঘ্যের পড়ালেখা। মামার বাসায় থাকাতাম। মামা মামি দিদা আন্টির আদরে বাবা মার অভাব তেমন একটা অনুভব হয়নি। বাবা মাও আমাকে নিয়ে আর তেমন বেশি চিন্তা করেননি। মৌলভীবাজার তেমন যাওয়া হত না। বাবা মা চট্টগ্রামে আসতেন আমাকে দেখার জন্য।

চুয়েটে যন্ত্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হয়ে ভাবছিলাম, কেন ইইই তে পড়ার সুযোগ পেলাম না। ইন্জ্ঞিনিয়ারিং নিয়ে কোন ধারনাই ছিল না আমার। জানতাম শুধু, ভাল ইন্জ্ঞিনিয়ার মানেই ইইই। অটোমোবাইল/রোবোটিক্স মানেই ইইই। কিন্তু আস্তে আস্তে জানলাম যন্ত্রকৌশলেই আসলে অটোমোবাইল নিয়ে পড়া হয়। রোবোটিক্স নিয়ে গবেষণা হয়। আসতে আসতে যন্ত্রকৌশল নিয়ে পুলকিত হলাম। ভাবতে লাগলাম কবে ৪র্থ বর্ষে উঠবো, আর প্রজেক্ট নিয়ে গবেষণা করব। ২য় বর্ষে ইকোনমিক্স ক্লাসে একজন স্যার ড্রাম সিডার নিয়ে বহির্বিশ্বের গবেষণার কথা বললেন এবং আক্ষেপ করলেন কেন আমাদের দেশে এমন হয় না। স্বপ্ন দেখার শুরু হল। ক্লাসের এক বন্ধুকে নিয়ে এই বেপারে কথা বলতে গেলাম। সেই থেকে রোবোকন এর শুরু। চুয়েটে প্রথম বার। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক আগে থেকেই চলে আসছে এবং পত্রিকায় তাদের নিয়ে লেখা রিপোর্টগুলো পড়তাম আর ভাবতাম কবে শুরু হবে চুয়েটে।

অবশেষে শুরু করলাম। ২য় বর্ষের ছোট ছোট কয়েকটি ছেলেদের উদ্যমতা আর স্বপ্ন দেখে স্যাররা এগিয়ে আসলেন। রোবট বানানো হল। পত্রিকায় আসল। ক্যাম্পাসের চেহারা পরিবর্তন হল। নিজের ডিপার্টমেন্টকে তুলে ধরতে পেরে খুব ভাল লাগল। কিন্তু আস্তে আস্তে বুঝলাম বহির্বিশ্বে প্রতিযোগিতা করার জন্য রোবট বানাতে আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। শুরু হল নতুন স্বপ্ন। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন। বাবাকে জানালাম। বাবা গড়রাজি।

অটোমেশন এন্ড রোবটিক্সে পড়তে আজ ৩ সপ্তাহ হল আমি জার্মানিতে। ৪৭০০ মাইল দূরে। কখনো ভাবিনি এভাবে একা একা থাকব। কোন বোন নেই, তাই ছোটবেলায় সব কাজে মা কে আমিই সাহায্য করতাম। কাজে ওলট পালট হলে মা বকা দিতেন। ঘর সবসময় পরিষ্কার রাখতে বলতেন। সবকিছু গুছিয়ে রাখতে বলতেন। বড় ভাইয়ের সাথে ঝগড়া না করতে বলতেন। আজ যখন একা একা ঘর পরিষ্কার করছিলাম, সবকিছু গুছিয়ে রাখছিলাম, রান্না করছিলাম, তখন ভাবছিলাম “হঠাৎ করে জীবনটা কেমন যেন একদম পাল্টে গেল”……..

লিখেছেনঃ শাওন সূত্রধর, ডর্টমুন্ড

Print Friendly