কেন জার্মানি-১ “জীবনের জন্য প্রযুক্তি, প্রযুক্তির জন্য জীবন নয়”

 

জার্মানিকে আমেরিকার সাথে তুলনা করা যাবে না কখনোই। এর কারণ দুই দেশের অর্থনৈতিক পার্থক্য নয়, বরং মূল্যবোধের ব্যাপক ব্যবধান। আমারিকার সবকিছুর উপরে অর্থ এবং মুনাফা। জার্মানিতে সবার আগে মানুষের জীবন। আমেরিকার এপল, গোগল, আমাজন, ইন্টেল, মাইক্রোসফট, ডেল ইত্যাদির মতন বড় বড় কর্পোরেট জায়ান্ট জার্মানিতে খুঁজে পাওয়া দুরূহ। তবে তারপরও জার্মানির অর্থনীতি শুধু শক্তিশালী নয়, আমেরিকা চায়নার পর পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম রপ্তানি কারক জার্মানি।

আমেরিকায় কর্পোরেটদের সাফল্য বিচার হয় শেয়ার মার্কেটে কোন কোম্পানির দাম কত হল, সেই দিয়ে। এখানে জব সিকিউরিটি, লেবারদের অধিকার, ছুটিছাটা বা পারিবারিক জীবনের সব কিছুকেই বিচার করা হয় টাকা দিয়ে। মুনাফা আর শেয়ার মার্কেট কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হবার কারণে, এখানে বড় কোম্পানি ছোট কোম্পানিকে গিলে ফেলে, ধীরে ধীরে জন্ম নেয় কর্পোরেট জায়ান্টদের। এরা এত বড় যে দেশের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত এদের ভয় পান, এদের বিরুদ্ধে কিছু বলা তো দূরের কথা।

জার্মানিতে কর্পোরেট বড় কোম্পানির ধারণাটা অনেকটা সামাজিক পরিবারের মতন। এখানে শুধু মুনাফা দিয়ে কর্পোরেট সাফল্যের বিচার হবে না, এখানে দেখা হবে শ্রমিকরা তাদের কাজের মূল্যায়ন পাচ্ছে কিনা, সবাই কাজ আনন্দ নিয়ে করছে কিনা ইত্যাদি। শুধু মুনাফা যেন উদ্দেশ্য না হয়, একারণে প্রতিটা কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট নিয়ন্ত্রিত হয় লেবার ইউনিয়নের মাধ্যমে। চাইলেই কেউ কাউকে কিনতে পারে না, এর জন্য লেবার ইউনিয়নের অনুমতি লাগবে। এর ফলে এই দেশে যত কোম্পানি আছে, তার প্রায় ৭০ শতাংশ ছোট বা মাঝারি কর্পোরেটের সারিতে পড়ে। এদের কর্মচারীর সংখ্যা থাকে সাধারণত ৫০ থেকে ৩০০ এর মধ্যে। সিইওরা প্রায় প্রতিটি কর্মচারীকে ব্যক্তিগত ভাবে চেনেন। যারা এইসব কোম্পানিতে কাজ করে, তারা থেকে যায় সারা জীবন ধরে, অনেকটা নিজের পরিবারের মতন।

একটি কোম্পানি যখন প্রচুর মুনাফা অর্জন করে, তখন তার লভ্যাংশের একটা বিরাট অংশ ভাগ করে দেওয়া হয় সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে। সবাই কাজ করে “নিজের” কোম্পানিকে সামনে এগিয়ে নিতে।

একই সাথে জার্মানিতে আছে মুনাফা বিহীন কিছু কোম্পানি। একটা উদাহরণ জার্মানির সবচেয়ে বড় পাঁচটি কোম্পানির একটি- রবার্ট বোশ। পৃথিবী জুড়ে প্রায় ৩৫০ হাজার কর্মচারীর এই কোম্পানি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি গাড়ির পার্টস সাপ্লাই দেয়। গাড়ির ইঞ্জিন থেকে শুরু করে যেকোনো কম্পোনেন্টে এদের প্যাটেন্ট সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বলা হয়ে থাকে এমন কোন গাড়ি পৃথিবীর বুকে চলে না যার অন্তত একটি পার্টস বোশের নয়।

বোশের বাৎসরিক রেভেনিউ প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার (পৃথিবীর বড় ১০০ কোম্পানির একটি), কিন্তু মজার ব্যাপার হল এরা কোন স্টক মার্কেটে তালিকাবদ্ধ নয়। শুধুমাত্র মুনাফা অর্জন যেন এর উদ্দেশ্য না হয়, সেই কথা ভেবে এই সিদ্ধান্ত। বোশের সব প্রফিট চলে যায় একটি চ্যারিটি সংস্থায়। লাভের টাকা দিয়ে করা হয় রিসার্চ, আরও ভালো প্রোডাক্ট কিভাবে তৈরি করা যায় সেই লক্ষ্যে।

বোশ বলে, ইনভেনশন ইস ফর লাইফ। জীবনের জন্য প্রযুক্তি, প্রযুক্তির জন্য জীবন নয়।

পুনশ্চঃ বোশে কাজ করার অসাধারণ অভিজ্ঞতা হয়েছিল ২০০৮-২০১১ সালে।

আদনান সাদেক, ২০১৪

#BSAAG_why_Germany

জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা বা ক্যারিয়ার সংক্রান্ত প্রশ্নের জন্য যোগদিন বিসাগের ফেসবুক ফোরামেঃ www.facebook.com/groups/bsaag.reloaded
জার্মান ভাষা অনুশীলন এবং প্রশ্নোত্তের জন্য যোগ দিন ফেসবুকে বিসাগের জার্মান ভাষা শিক্ষা গ্রুপেঃ www.facebook.com/groups/deutsch.bsaag

Print Friendly, PDF & Email
Adnan Sadeque
Follow me

Adnan Sadeque

লেখকের কথাঃ
http://bsaagweb.de/germany-diary-adnan-sadeque

লেখক পরিচয়ঃ
http://bsaagweb.de/adnan-sadeque
Adnan Sadeque
Follow me

ফেসবুক মন্তব্যঃ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.