• Home »
  • Cities-in-Germany »
  • ট্রিয়ার – প্রাচীন তবুও যেন চিরতরুণ এক নগরী

ট্রিয়ার – প্রাচীন তবুও যেন চিরতরুণ এক নগরী

 

প্রাচীন রোমানরাও বন্দী হয়ে পড়েছিল এ শহরের মায়াজালে। মসেল নদীর সবুজ উপত্যকায় তারা নির্মাণ করে এই শহর। জার্মানির প্রাচীনতম শহর হিসেবে ট্রিয়ার এখনো রোমানদের ফেলে যাওয়া চিহ্নসমূহ ধারণ করে আছে। আজ এইসব প্রাচীন স্নানাগার আর মিনারের মাঝেই বসবাস করছে হাজারো তরুণ শিক্ষার্থী।

View_of_Trier_from_Porta_Nigra

 

 তথ্য ও পরিসংখ্যানঃ

  অধিবাসীঃ প্রায় ১ লক্ষ ৬ হাজার

  শিক্ষার্থীঃ প্রায় ২৩ হাজার

  বিশ্ববিদ্যালয়ঃ ৩টি

  মাসিক ভাড়াঃ ২৮৯ ইউরো

  পরামর্শঃ নিজেকে একজন স্থানীয় মনে করুন আর “কিউবিকিউলাম” পিৎজা     একবার খেয়ে দেখুন!

  ওয়েবসাইটঃ www.trier.de

 

ট্রিয়ারে স্বাগতম

ট্রিয়ারের বয়স প্রায় ২০০০ বছরের বেশি যা এটিকে জার্মানির প্রাচীনতম শহরে পরিণত করেছে। মসেল নদীর উপত্যকায় রোমানরা এ শহর গড়ে তোলে। এ অঞ্চল তার চমৎকার ওয়াইনের কারণে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। হাঁটাহাঁটি করার জন্যে এখানে রয়েছে বেশ সুন্দর অনেকগুলো আঙ্গুরক্ষেত, তবে শহরের মধ্যেও প্রকৃতির অনেক নিদর্শন আছে। এখানকার ঐতিহাসিক ভবনগুলোকে ছাপিয়ে বেড়ে ওঠা প্রাচীন বৃক্ষরাজি গ্রীষ্মকালের আলোছায়ার রাজ্যে আপনাকে স্বাগত জানাবে। নীরবতা আর প্রশান্তির ছন্দে আচ্ছাদিত এই বিশেষ পরিবেশ ট্রিয়ারকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে ।

শহরের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থলের যেদিকে চোখ যায় তার প্রায় সবদিকেই আপনি খুঁজে পাবেন রোমানদের ফেলে যাওয়া পদচিহ্ন। প্রতি বছর প্রায় ২০ লক্ষ পর্যটক আসেন ট্রিয়ারে। এখানকার রেলওয়ে স্টেশনটি ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে আপনার দৃষ্টি এড়াতে পারবে না এ নগরীর প্রাচীনতম প্রবেশপথটি যা পোর্টা নিগ্রা নামে খ্যাত। তোরণ-শোভিত পথটি অতিক্রম করার পরপরই আপনি একটি বৃহৎ ফুটপাথে প্রবেশ করবেন যেখানে অনেকগুলো ক্যাফে ও দোকান সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে এবং এখানে আপনি কোন-আইসক্রিম খেতে খেতে দোকানগুলো ঘুরেফিরে দেখতে পারেন।

Trier_Porta_Nigra_BW_1

 

চিত্রঃ পোর্টা নিগ্রা

এখানকার গির্জাটি আরেকটি উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ পর্যটকদের জন্য। এখানকার অতিকায় গির্জা এবং পোর্টা নিগ্রা ইউনেস্কো কর্তৃক “বিশ্বের ঐতিহ্যময় স্থান” এর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। হৃদয়গ্রাহী ভবনটিতে রয়েছে পবিত্র নিমার মহামূল্যবান ধ্বংসাবশেষ যা পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। পুরাণমতে, যীশুখ্রিস্ট ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় এ নিমা পরেছিলেন।

Trier Church

 

চিত্রঃ ট্রিয়ার গীর্জা

আপনি ঘুরে আসতে পারেন হাউপ্টমারক্ট বা প্রধান বাজারটি যা এ শহরের সর্ববৃহৎ প্লাজা। মজার ব্যাপার হল, ট্রিয়ারের অল্পসংখ্যক জার্মান নগরগুলোর প্রথাগত অর্ধকাষ্ঠ নির্মিত বাড়ি রয়েছে। রোমানদের বাড়ি নির্মাণের পদ্ধতি ভিন্ন ছিল; তারা কাঠের চেয়ে পাথরকে বেশি প্রাধান্য দিত। কিন্তু, হাউপ্টমারক্টে আপনি জার্মানির প্রথাগত কাষ্ঠনির্মিত ভবনের সন্ধান পাবেন।

 

Trier-markets

 

চিত্রঃ হাউপ্টমারক্ট

গির্জা ও কনস্টান্টটাইন রাজপ্রাসাদের ঠিক পিছনে আছে কুরফারস্টলিচেস পালাইস(নির্বাচনী প্রাসাদ) এবং প্রাসাদের বাগানসমূহ। ওখানেই আপনি খুঁজে পাবেন ট্রিয়ারের রেনিশ রাজ্য জাদুঘর যেটি আপনার সামনে শহরটির ঘটনাবহুল ইতিহাস তুলে ধরবে। সুন্দর আবহাওয়ার দিনে আপনি এখানকার অনেক অধিবাসীদের প্রাচীন বৃক্ষশালার ছায়ায় আরাম করতে দেখতে পারেন।

kurfuerstl-palais

এর সাথে যোগ করা যেতে পারে এই বলে যে, আপনি ক্যাথিড্রাল স্কয়ার ঘুরে যেতে পারেন যেখানে প্রতি বছর বড়দিনকে সামনে রেখে বসে এক বিশাল হাট। রোমানদের সময়কার নির্মিত স্নানাগারের ধ্বংসাবশেষ এখনো ধারণ করছে এ নগরী যেখানে আপনি যদি চান স্নান করতে পারেন। আর খানিকটা দূরে গেলে আপনার চোখে পড়বে প্রাচীন রোমের মল্লযোদ্ধাদের লড়াই পর্যবেক্ষণের জন্য রোমানদের নির্মিত গ্যালারি; যা বর্তমানে থিয়েটার এবং কনসার্ট জন্য নির্ধারিত স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

 

 

 

ট্রিয়ারে বসবাস

trier-Marktplatz ট্রিয়ার খুব বড় কোন শহর নয়, যার মানে দাঁড়ায় আপনি বাইকে করে শহরের সব  গুরুত্বপূর্ণ অংশে পৌঁছোতে পারেন। এবং রাত্রিতে আপনাকে বাড়ি ফেরা নিয়ে চিন্তা  করতে হবে না কেননা শহর এলাকার বাসগুলোই আপনাকে সবখানে নিয়ে যাবে।  প্রধান রেলওয়ে স্টেশন এবং পোর্টা নিগ্রা হল বাস আগমন ও নির্গমনের দুটি  কেন্দ্রবিন্দু।

শহরটি বেশ ছোট হওয়ার কারণে এখানকার আঙ্গুরক্ষেতগুলো ঘুরে আসা যেতে  পারে। আঙ্গুরক্ষেতগুলোর মাঝে গ্রীষ্মে হাঁটাহাঁটি করলে কেমন হয় বলুন তো?

আপনি এখানে কখনো একঘেয়ামিতে ভুগবেন না। ভিই’মার্কট(পশুর হাট)’র নিকটে অবস্থিত মেট্রোপলিস নামের ক্লাবটি শিক্ষার্থীরা বেশ পছন্দ করে। তরুণ বয়সী ছেলেমেয়েরা জিব্রা ক্লাবে সাক্ষাৎ করে থাকে যেখানে ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি নিয়মিত আয়োজন করা হয়ে থাকে।

বিশিষ্ট সাংবাদিক ফ্লোরিয়ান স্কুবার্থ’র মতে, “আপনি যদি ট্রিয়ারকে এখানকার মানুষদের মতো করে উপভোগ করতে চান তাহলে আপনি চেখে দেখুন কিউবিকিউলাম’র পিজা সালাদ! এর বিশেষত্ব হচ্ছে আপনি শুধু এ পিজা কিউবিকিউলামে পাবেন। এর পিজা পুরো ট্রিয়ার জুড়েই বিখ্যাত।”

আপনার যদি সংগীতে বেশ আগ্রহ থাকে তবে আপনি পোর্টা নিগ্রার কাছে অবস্থিত ক্যাফে ব্যুনেনহফের সামনে খোলা আকাশের নিচে গরমকালে নিয়মিতভাবে আয়োজিত যে কোন একটি জ্যাজ কনসার্টে উপস্থিত হতে পারেন। রোমানদের তৈরি গ্যালারিতে গ্রীষ্মে প্রচুর কনসার্ট ও মল্লযোদ্ধাদের লড়াইয়ের আয়োজন করা হয়। সুপরিচিত বেশ কয়েকটি ব্যান্ড রোমানদের প্রাচীন এ মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেছে যাদের মধ্যে রয়েছে জার্মান অঙ্গরাজ্য কোলন’র রক ব্যান্ড “ব্যাপ” এবং জার্মানির মধ্যযুগীয় ধাঁচের রক ব্যান্ড “ইন এক্সট্রেমো”। এছাড়া এখানে মাঝেমধ্যে অপেরা সংগীত পরিবেশন করা হয়ে থাকে। আপনি যদি চান তবে এখানকার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আলতে টুচফাব্রিকে(টু’ফা) বিভিন্ন কনসার্ট এবং কর্মশালায় অংশগ্রহণ করতে পারেন।

আপনি যদি ইউরোপিয়ান সংস্কৃতির স্বাদ নিতে চান তবে একদিনের জন্যে হলেও লুক্সেমবোউর্গ ঘুরে আসতে পারেন। ট্রিয়ার নগরী থেকে জার্মান এ অঙ্গরাজ্যটিতে যেতে মাত্র আধ ঘণ্টার মতন সময় লাগবে এবং কথা দিচ্ছি আপনি মূল্যবান সময়ের সদব্যবহারই ঘটবে।

marktplatz_trier-1024x682

 

আরমেনিয়া থেকে আগত অ্যানি’র সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারঃ

 

২৮ বছর বয়সী অ্যানি ওহানিয়ান আরমেনিয়া থেকে ট্রিয়ারে এসেছেন এবং এখানে তিনি পরিবেশগত অর্থনীতি বিষয়ে ডকটোরেট করছেন। তিনি ট্রিয়ারের অর্থনীতিতে “মাজিসটার” খেতাবও লাভ করেছেন।

আপনি কী করে ট্রিয়ার ও জার্মানিতে এলেন?

অ্যানিঃ আমি স্কলারশিপের জন্যে আবেদন করেছিলাম। ডাড এবং উন্মুক্ত সামাজিক প্রতিষ্ঠান (ওএসআই) যৌথভাবে প্রতি দুই বছর অন্তর একটি স্কলারশিপ দিয়ে থাকে। এবং আমি অর্থনীতি ও জার্মান জানার কারণে ট্রিয়ার ছিল আমার একমাত্র পছন্দ।

আপনি জার্মান ভাষা শিখলেন কী করে?

অ্যানিঃ আমি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে থাকাকালীন সময় থেকেই জার্মান শিখছিলাম এবং আমার মা ছিলেন একজন জার্মান শিক্ষিকা। স্কুলে থাকাকালীন সময়ে জার্মান ও ইংলিশের মধ্যে যে কোন একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল আমার, তাই আমি ইংলিশ পরবর্তীতে শিখে নেবো এই ভেবে আমি জার্মান ভাষা বেছে নিলাম।

আপনি ট্রিয়ার কিভাবে পছন্দ করলেন?

অ্যানিঃ ট্রিয়ার এক কথায় চমৎকার। আমি এখানকার মানুষদের খুব পছন্দ করি ও আমাকে বলতেই হবে এটিই আমার বর্তমান বাড়ি। আমি এখানকার প্রকৃতি বেশ উপভোগ করি, এবং আঙ্গুরক্ষেতগুলো বেশ সুন্দর। আমি ছোটখাটো শহরগুলো পছন্দ করি কেননা এখানে মানুষের সাথে সাক্ষাৎ ও সম্পর্ক তৈরি অনেক সহজ। আমি সবসময় বেড়াতে এবং পরিচিত মুখ দর্শন করতে বেশ পছন্দ করি। মাঝেমাঝে আমি বার্লিনে আমার কাজিনদের সাথে দেখা করে থাকি। বার্লিনও অনেক সুন্দর, ঐখানে আছে অনেক বৈচিত্র্য ও সম্ভাবনা, কিন্তু অপরিচিত অনেক মানুষকে একসাথে দেখার ব্যাপারটি আমাকে বিব্রত করে।

 ট্রিয়ারে আপনার কোন প্রিয় স্থান আছে কি?

অ্যানিঃ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি হ্রদ সদৃশ আছে যেটি আমি বেশ পছন্দ করি। আমি মাঝেমধ্যে বাইকে করে পেটরিসবার্গে উঠে পড়ি যেটি পুরো শহরটি এক নজরে দেখে নেওয়ার জন্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। এখান থেকে আপনি সাতসকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠা এক শহরকে দেখতে পারেন।

ট্রিয়ারের কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য প্রদান করে থাকে?

অ্যানিঃ এখানে আছে অনেক প্রাচীন স্থাপনা; যেমনঃ রোমানদের সময়কার নির্মিত স্নানাগার, পোর্টা নিগ্রা। আমি শহরের মাঝেই এ ধরনের স্থাপনা দেখব বলে আশা করিনি। আরমেনিয়াতে এ ধরনের স্থাপনা দেখার জন্য আপনাকে শহরের বাহিরে যেতে হবে। এবং এখানে, সকল মিনার ও স্থাপনা শহরের মাঝে থেকেই শহরের শোভা বর্ধন করছে।

জার্মানিতে আসার পর আপনার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ কোনটি ছিল?

অ্যানিঃ ২০০৫/০৬ সালে আমি যখন প্রথম বোকুমে আসি তখন বেশ আশ্চর্যের একটি ঘটনা ঘটে। আমার স্মরণে আছে আমি কোন এক রবিবার কিছু একটা খেতে চেয়েছিলাম। আমি আমার হলের বন্ধুদের মুদি’দোকানে কেনাকাটার জন্য যাচ্ছি বলে বলেছিলাম। তারা সবাই বলল, “সৌভাগ্য তোমার সহায় হোক কেননা আজ রবিবার।” রবিবার সকল দোকানপাট বন্ধ থাকে এ বিষয়টার সাথে আমি এখন নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি।

 

বিস্তারিত আরও তথ্যের জন্যে দেখুন. . .

http://www.studiwerk.de (বহির্গমন লিঙ্ক)

 

অনুবাদঃ মোহাম্মদ সাইফ ইফতেখার

মূললেখাঃ study-in.de

Print Friendly