জার্মানির বুকে রোমান স্বপ্ন নিয়ে ‘ট্রিয়ার’

 

ট্রিয়ার – বন শহর থেকে খুব দূরে নয়৷ এখান থেকে দ্রুতগামী ট্রেনে চাপলে ট্রিয়ার যেতে সময় লাগে মাত্র এক ঘণ্টা৷ খ্রিষ্টের জন্মের ১৭ বছর আগে, অর্থাৎ রোমান আমলে শহরটি প্রতিষ্ঠিত হয়৷ তবে সে সময় এর নাম ছিল ‘অগাস্টা ট্রেভেরোরাম’৷

ট্রিয়ার শহরে যে জিনিস দুটি সবচেয়ে বিখ্যাত, সেগুলো হলো রোমান আমলের সাক্ষী বিশালাকার ‘অ্যাম্ফিথিয়েটার’ আর ‘কনস্টানটাইনের বাসিলিকা’ বা প্রাসাদ৷

শোনা যায়, ট্রিয়ারবাসী সে আমলে কাইজারথার্মের মতো ‘হটস্প্রিং’ বা উষ্ণকুণ্ডে স্নান করতো৷ কেল্টিক এই জনগণের ওপর রোমান সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হয়নি কখনোই৷ তারা নিজেরাই নাকি রোমানদের দেখাদেখি তা ভালোবেসে নকল করতে শুরু করেছিল৷ প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. ক্লাইস-পেটার গ্যোয়থার্ট জানান, ‘‘লোকজন রোমান পোশাক-পরিধান, বাসন তৈরির কায়দা, বাড়ি তৈরির পন্থা – এ’সব অনুকরণ করতে শুরু করে৷ কিছুটা দেরিতে, সামর্থ্য বুঝে৷ দেওয়ালে আঁকা ছবি, মেঝে কিংবা দেওয়ালে মোজাইকের অলঙ্করণ, এমনকি খাওয়া-দাওয়ার রীতিনীতি – রোমানদের সবই নিয়েছিল কেল্টরা৷ তবে এরপরও বাড়িতে কেল্টিক ভাষাতেই কথা বলতো তারা৷ আর অফিস-কাছারির ভাষা ছিল ল্যাটিন৷”

কনস্টানটাইনের বাসিলিকা বা প্রাসাদ

বলা বাহুল্য, খোদ রোম শহরের উত্তরে প্রায় পুরোপুরি সংরক্ষিত কোনো রোমান নগরতোরণ খুঁজতে গেলে, আসতে হবে এই ট্রিয়ার শহরেই৷ শহরের অন্যান্য রোমান নিদর্শনের মতো নগরতোরণ ‘পোর্টা নিগ্রা’-ও ১৯৮৬ সাল থেকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ৷

পোর্টা নিগ্রার বয়স আজ আঠেরো’শ বছর হবে৷ যদিও বহু আগে থেকেই তোরণের বেলে পাথর রোদ-বৃষ্টিতে কালো হয়ে গেছে৷ সে জন্যই হয়ত এর নাম ‘পোর্টা নিগ্রা’৷ অর্থাৎ, কৃষ্ণ তোরণ৷ সেই কৃষ্ণ তোরণের আশেপাশে রোমান সৈনিকদের পোশাক পরা ‘ট্যুরিস্ট গাইড’-দের দেখা যায়৷ তারা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে অনর্গল বলে যেতে থাকে রোমান সাম্রাজ্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসের কথা৷ প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. ক্লাইস-পেটার গ্যোয়থার্ট-এর কথায়, ‘‘আসলে ট্রিয়ারে রোমান স্থাপত্য, রোমান সংস্কৃতির এ ধরণের অসংখ্য নিদর্শন প্রত্নতত্ত্ববিদদের কাছে একটা স্বপ্নের মতো৷ এক্ষেত্রে ট্রিয়ারের কোনো জুড়ি নেই৷ এত জিনিস, এত ভালো অবস্থায় রয়েছে এখানে৷ তার ওপর এসব সত্যিই সাধারণের বোধগম্য, এটা আর কোথাও নেই৷”

রোমান সাম্রাজ্যের অনেক পরে মধ্যযুগে তৈরি হয় ট্রিয়ারের ‘লিবফ্রাউয়েনকির্শে’ বা ‘চার্চ অফ আওয়ার লেডি’৷ আর প্রখ্যাত এই ক্যাথিড্রালও ইউনেস্কো দ্বারা স্বীকৃত, বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ৷ বর্তমান ক্যাথিড্রালটির মূল বা আদত অংশটি অবশ্য নির্মিত হয় খ্রিষ্ট পরবর্তী ৩৪০ সালে৷ যা দেখতে আজও ট্রিয়ারে ভিড় জমে৷

‘লিবফ্রাউয়েনকির্শে’ বা ‘চার্চ অফ আওয়ার লেডি’

সংখ্যার হিসেবে বছর প্রতি ট্রিয়ারে পর্যটকদের সংখ্যা ত্রিশ থেকে চল্লিশ লাখ৷ তাদেরই মধ্যে একজনের কথায়, ‘‘অসাধারণ, আশ্চর্য! রোম আর ইটালির অন্যান্য জায়গা পোর্টা নিগ্রার তুলনায় ধ্বংসস্তূপ বলে মনে হতে পারে৷”

অন্য আর একজনের কথায়, ‘‘মনে হয় এখানে যেন প্রত্যেকেরই আঙুরক্ষেত আর ওয়াইন তৈরির ব্যবসা রয়েছে, আছে ওয়াইন টেইস্টিং-এর ব্যবস্থা৷ দেখে আমরা চমকে গেছি৷ আমরা ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটা খাসা রিসলিং ওয়াইন পরখ করে দেখেছি৷ দারুণ!”

হ্যাঁ, মোজেল নদীর ধার ধরে সাইক্লিং করা আর জায়গায় জায়গায় দাঁড়িয়ে ওয়াইন পরখ করার চর্চা আছে ট্রিয়ারেও৷ হবে না? ট্রিয়ার থেকে রোম্যান্টিক মোজেল ভ্যালি তো আর খুব দূর নয়! পাহাড়ের ঢালে আঙুরক্ষেত, অসাধারণ সব দুর্গ আর কোখেম-এর মতো শিল্পীর হাতে আঁকা শহর, যেখানে ওয়াইনই প্রধান উপজীব্য৷ আর এই ওয়াইন তৈরিও কিন্তু সেই রোমান আমলেরই উত্তরাধিকার৷

 

অনুষ্ঠানটি শুনতে ক্লিক করুন এখানে

বিশেষ করে রিসলিং আঙুরটি এ’অঞ্চলে খুব ভালো ফলে৷ আবার স্পেটবুর্গুন্ডারের মতো হাল্কা রেড ওয়াইনও৷ ওয়াইন প্রস্তুতকারক মার্টিন প্রুম বললেন, ‘‘ওয়াইন তৈরির ক্ষেত্রে মাটি বা জমিই ওয়াইনের চরিত্র নির্ধারণ করে৷ জলবায়ু, জমি, অঞ্চলের যা যা বিশেষত্ব৷ তাই স্থানীয় স্লেট পাথরই এখানকার ওয়াইনের চরিত্র নির্দিষ্ট করে৷ কত রকমের যে স্লেট পাথর আছে এখানে, তার ইয়ত্তা নেই৷”

মোজেল উপত্যকার ওয়াইন রোমান আমলের একটি নৌকাতে চড়েও উপভোগ করা যায়৷ তবে এই নৌকাটি হালে নির্মাণ করা হয়েছে৷ নাম ‘স্টেল্লা নোভিওমাগি’ বা নয়মাগেনের তারা৷ এটি চলে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত৷

‘অ্যাম্ফিথিয়েটার’, ‘পোর্টা নিগ্রা’ থেকে শুরু করে ট্রিয়ারের যাত্রা শেষ হয় মোজেল ভ্যালিতে রোম্যান্টিক এই নৌকাবিহারের মধ্যে দিয়ে৷ স্বপ্ন নয়, চোখের সামনেই যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে রোমানদের জীবন৷

[youtube_sc url=”https://www.youtube.com/watch?v=wWmFhBel2m0″]

প্রতিবেদন দেবারতি গুহ, সম্পাদনা জাহিদুল হক।

Source: DW.DE

Print Friendly, PDF & Email