ডি ডয়েচে

 

২০১৪ এর এপ্রিল, বিশ্ববিদ্যালয় এর ২য় দিন। প্রথম দিন টা বেশ ভালই কেটেছিল, ঝামেলা টা করল এক জার্মান।আল-জেব্রা ক্লাস এর প্রথম দিনেই বেটা ঘোষণা দিল বাড়ির কাজ করার সঙ্গী খুঁজতে। আরে বেটা ২ টা দিন সময় তো দে। একটু ঘুড়ি-ফিরি মানুষজন চিনি। না প্রথম দিন ই বাড়ির কাজ। আর সঙ্গী কি গাছে ধরে বললেই পাওয়া যায়। ক্লাস এর সবার উপর একবার চোখ বুলিয়ে দেখলাম কোন দেশি ভাইবেরাদর আছে কিনা। ভাগ্য সহায় না আজকে।ক্লাস এ বাদামি চামড়া সুধু আমার ই। দেশে থাকতে সবাই বলেছে জার্মান রা বিদেশি দেখলেই নাক শিটকায়, এই বদ্ধমূল ধারনা আজ বুঝি বাস্তবে পরিণীত হতেযাচ্ছে। বিপদ থেকে আমাকে উদ্ধার করল এক জার্মান ই। আমার পাশে বসা জার্মান ছেলেটাই হাত বাড়িয়ে দিয়ে প্রশ্ন করল আমরা একসাথে বাড়ির কাজ করতে চাই কিনা। উফ বড় একটা ফারা গেলো।

জার্মান দের সম্পর্কে আমাদের ধারনা মিশ্র। এ ধারনার অনেকটাই আমারা এদের সাথে পরিচিত হবার আগে, দেশে থাকতেই অর্জন করেছি এবং এখন ও আমাদের মাঝে লালন করছি। ভুল ধারনা থাকতেই পাড়ে, এতে দোষের কিছু নাই, কিন্তু ধারনা টা আদৌ সত্য কিনা তা যাচাই না করার প্রবণতা আত্মঘাতী।

জার্মান বিশ্ববিদ্যালয় গুলতে তত্ত্বীয় শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ এবং দলবদ্ধ হয়ে কাজকরার ও শিক্ষা দেওয়া হয়। এই ক্লাস গুলতে মূলত কিছু বেসিক প্রশ্নের মাধ্যমে যাচাই করার চেষ্টা করা হয় একজন শিক্ষার্থী সবলতা ও দুর্বলতা কোথায়। তো আমার দুর্বলতা কোথায়? অনুমান করুন। ঠিক ধরেছেন আমি মানুষের সাথে কথা বলতে ভয় পাই। এই দুর্বলতা আমাদের অনেকের ই। আর অপরপক্ষ যদি বিদেশী হয় তাহলে তো কথাই নাই।তো এই দুর্বলতা ঢাকার উপায়? সহজ প্রশ্ন, দোষ টা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া। আমাদের অধিকাংশই এই নীতিতে বিশ্বাসী।আমরা তখন বলে বেড়াই এরা মিশুক না, এরা বিদেশী পছন্দ করে না আর কত কি। আজকে থেকে কথা বলা শুরু করুন, ছাত্রাবাস এর কিচেন এ বিশ্ববিদ্যালয় এর ক্যান্টিন এ, দেখবেন একমাস এর মধ্যে বন্ধু সংকট মুক্ত হয়ে গেছেন, বদ্ধমূল ধারনার পরিবর্তন হয়ে গেছে।

 

একটি সেমিনার এ অংশগ্রহণ করেছিলাম একবার। শুরুতেই একটা চিঠি দেওয়া হল সবাইকে।

একটি ১৬ বছর বয়স এর কিশোর লিখেছে

আমি এমন একটি দেশ থেকে এসেছি  যেখানে খাবার এবং থাকার জায়গার সংকট নিত্যদিনের। অসুখ এবং মহামারি হানা দেয় প্রতি বছর ই। আমার এবং আমার ৫ ভাই বোন এর খরচ যোগার করতে বাবা কাজ করেন প্রতিদিন।

 

চিঠির শেষে একটি প্রশ্ন। অনুমান করুন চিঠির লেখক কোন  দেশ থেকে এসেছেন। আমার উত্তর ছিল বাংলাদেশ।আর একটি খামে সঠিক উত্তর টা লেখা ছিল। আমাদের সবার উত্তর লেখা শেষ এ আমারা অই খাম টি খুললাম। সঠিক উত্তর জার্মানি। চিঠিটা ৪০ বছর আগে লেখা এক জার্মান এর।

আমার দেওয়া উত্তর টাই সবচেয়ে বড় বর্ণবাদ।আমরা নিজেরাই সবচেয়ে বড় বর্ণবাদই। এবং আমাদের বর্ণবাদ এর শিকার আমরা নিজেরাই। আমারা নিজেরাই যদি বিশ্বাস করি যে আমরা সভ্যতার মাপকাঠিতে নিচু জাতি তবে একজন বিদেশি আমার সম্পর্কে অন্য ধারনা পোষণ করবে কিভাবে?

 

লেখক  মামুন শিকদার

বার্লিন , জার্মানি

Print Friendly, PDF & Email