জার্মানির পথেঃ১৩ জার্মানিতে স্পন্সরশীপের বিস্তারিত নিয়মাবলী

 

জার্মানি যেতে সবচেয়ে বড় বাঁধাগুলোর একটি ব্লক একাউন্ট দিয়ে ৮ হাজার ইউরো দেখানো। অনেকের জন্যই একটা বিশাল দেয়ালের মতন, আবার টাকা দেখানোর পরেও টাকা পাঠানো নিয়ে অনেক ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়। অনেককে আবার জার্মানিতে আসার পরে ব্লক একাউন্ট দেখাতে হয়, কোন কোন ক্ষেত্রে সেটা দ্বিতীয় বছরেও চাওয়া হয়। এই বাঁধা পাশ কাটানোর সবচেয়ে কার্যকরী উপায়টির নাম স্পন্সরশীপ।

স্পন্সরশীপ কি?

জার্মানিতে আসতে ভিসা প্রয়োজন এমন সকল দেশের নাগরিকদের জন্য জার্মানিতে ভিসা পেতে যথেষ্ট আর্থিক সামর্থ্য আছে সেটা দেখানোর একটি উপায়ের নাম স্পন্সরশীপ বা জামিননামা। এই জামিনের মাধ্যমে জামিনদাতা একজনকে জার্মানিতে থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে পারেন এবং তার অবস্থানকালের সকল খরচের জামিন বা গ্যারান্টি দেন। খরচের মধ্যে বিশেষত মাসিক খরচাদি, চিকিৎসা এবং বাসস্থান এবং ছাত্রদের ক্ষেত্রে টিউশন ফি বা পড়ার খরচ বোঝায়। জামিনদাতা এই আমন্ত্রণ পত্র জার্মানির নিজ শহরের ফরেন অফিস থেকে উত্তোলন করে জামিন প্রাপককে পাঠাবেন এবং সেই পত্র দেখিয়ে জামিন প্রাপক স্থানীয় দূতাবাস থেকে ভিসা নিতে পারেন। সাধারণত এই ভিসা বেশ দ্রুত ইস্যু করা হয়, টুরিস্ট ভিসার ক্ষেত্রে এমনকি সাথে সাথেও পর্যন্ত।

কে স্পন্সর হতে পারবেন?

জার্মানিতে বৈধ বসবাসরত যেকোন ব্যাক্তি জামিন দিতে পারবেন। এইজন্য জার্মান নাগরিক হতেই হবে এমন কোন কথা নেই। এমনকি আত্মীয় বা পরিবারের সদস্য হতে হবে এমন কোন নিয়মও নেই। তবে নাগরিক এবং পারিবারিক সম্পর্ক থাকলে তারা অগ্রাধিকার পাবেন এটা বলাই বাহুল্য।

জামিনদাতার যোগ্যতা

জামিনদাতার যথেষ্ট আর্থিক আয় থাকতে হবে। চাকরি দাতাদের এতটুকু আয় থাকতে হবে যেন তিনি তার পারিবারিক এবং মাসিক খরচাদি চালানোর পরেও অন্তত ১০০০ ইউরো উদ্ধৃত দেখাতে পারেন। এক্ষেত্রে তার স্থায়ী কাজের চুক্তি/কন্ট্রাক্ট থাকতে হবে। চুক্তির একটি কপি এবং শেষ অন্তত তিন মাসের বেতনের রসিদ দেখাতে হয়। ব্যবসায়ীদেরকে গত বছরের লাভ ক্ষতির হিসেব থেকে দেখাতে হবে যে তার জামিন হবার যথেষ্ট আর্থিক ক্ষমতা আছে। পিএইচডি বা সীমিত সময়ের চাকরির চুক্তি থাকলে অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র টুরিস্ট হিসেবে (শুধুমাত্র তিনমাসের জন্য) আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে। তবে কাউকে ছাত্র ভিসায় এক বছরের জন্য স্পন্সর করা কঠিন হবে।

স্পন্সর দাতাকে যথেষ্ট বড় বাসা দেখাতে হবে, অথবা আমন্ত্রিত অতিথির জন্য আলাদা বাসা ভাড়া করে দেখাতে হবে। যথেষ্ট বড় বাসা বলতে সাধারণত প্রতিজনের জন্য অন্তত ১৫ স্কয়ার মিটার, এটা শহর ভেদে সামান্য এদিক ওদিক হতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, জামিনদাতার পরিবারে ৪ জন সদস্য থাকলে এবং নতুন একজনকে নিজের বাসায় আশ্রয় দিয়ে স্পন্সর দিতে চাইলে তার বাসা অন্তত ৭৫ স্কয়ার মিটার হওয়া উচিত।

জামিনদাতার ঝুঁকি

স্পন্সরশীপ দেয়া আপাতদৃষ্টিতে সহজ হলেও স্পন্সরশীপের সম্পূর্ণ সময়কাল জুড়ে জামিনদাতাকে বেশ কিছু ঝুঁকির কথা মাথায় রাখতে হবে। যেমন, যেকোনো কারণে জামিন প্রাপক কোন ঝুট ঝামেলায় পড়লে, বা নিজে কোন ঝামেলা তৈরি করলে, তার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব এবং আর্থিক খরচের দায়ভার জামিনদাতার থাকবে। কেউ যদি স্পন্সরশীপ নিয়ে এসে ইউরোপের অন্য দেশে গা ঢাকা দেয়, সেক্ষেত্রে তাকে নিরাপত্তা বাহিনীর খুঁজে পাওয়া থেকে শুরু করে দেশে ফেরত পাঠানো পর্যন্ত যত খরচ, সব কিছু জামিনদাতা দিতে বাধ্য থাকবেন। অন্যদিকে এই জাতীয় কিছু ঝামেলা হলে, জামিনদাতাকে পরবর্তীতে ফরেন অফিসে ঝামেলায় পড়তে হবে, বা পরবর্তী কাউকে স্পন্সর করতে চাইলে সেটা আর সম্ভব হবে না। একারণে শুধুমাত্র নিজের একান্ত বিশ্বস্ত কাউকেই জামিন দেয়ার পরামর্শ দেয়া হল।

একইসময়ে একজনের জন্য একাধিক স্পন্সর দেয়া বেশ কঠিন ব্যাপার। আবার একবার কাউকে স্পন্সরশীপ দিয়ে দিলে সময়সীমা শেষ হবার আগে জামিনদাতাও চাইলেও স্পন্সরশীপ বাতিল করা সম্ভব নয়। সুতরাং কাউকে এক দীর্ঘ সময়ের জন্য স্পন্সর করার আগেই এই ঝুঁকিগুলো চিন্তা করে দেখা উচিত।

আবেদনপত্রের প্রথম পাতা

 

স্পন্সরশীপের ধাপসমূহ

জার্মানিতে অবস্থানরত জামিনদাতা তার নিজস্ব শহরের স্থানীয় রাথ-হাউসে (ফরেন অফিস) প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যাবেন। এখানে খেয়াল রাখতে হবে যে, জামিনদাতাকে সশরীরে যেতে হবে। অফিসে গিয়ে তাকে বলতে হবে যে, তিনি একজন অতিথির জন্য „Verpfichtungserklärung“ চান।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকাঃ

  1. ব্যক্তিগত পাসপোর্ট বা ভিসার কাগজপত্র।
  2. আর্থিক অবস্থার প্রমাণাদি। চাকরির চুক্তিপত্র, বেতনের রসিদ, ব্যবসার বাৎসরিক লাভক্ষতির হিসেব, অন্যান্য আর্থিক সম্পত্তির প্রমাণাদি ইত্যাদি।
  3. আমন্ত্রিত অতিথির পূর্ণ নাম, পাসপোর্ট নম্বর, ঠিকানা, জামিনদাতার সাথে সম্পর্ক ইত্যাদি তথ্যাদি।
  4. আমন্ত্রিত অতিথির জন্য হেলথ ইনস্যুরেন্স বা চিকিৎসা বীমার প্রমাণাদি।
  5. বাসস্থানের প্রমাণাদি। বাসার আকৃতিসহ চুক্তিপত্র ইত্যাদি।
  6. অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানোর সময়কাল আবেদনপত্রে লিখে দিতে হবে।

এইসব কাগজপত্র ঠিক থাকলে ফরেন অফিস সাধারণত সাথে সাথেই Verpfichtungserklärung জামিনদাতাকে ইস্যু করবেন এবং জামিনদাতাকে সকল ঝুঁকি মেনে নিয়ে স্বাক্ষর করতে হবে। এই কাগজটি মুল কপি জামিনদাতা অতিথিকে পোষ্টে পাঠিয়ে দিতে পারেন। সেই কাগজ নিয়ে স্থানীয় দূতাবাসে গেলে ভিসার আবেদনকারীকে আর কোন ব্লক একাউন্ট বা আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণাদি দেখাতে হবে না।

একইসাথে এই পদ্ধতিতে স্টুডেন্ট ভিসায় জার্মানিতে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীকে স্পন্সর করা সম্ভব। তবে জার্মানিতে এরমধ্যে অতিথি ভিসায় চলে এসেছে বা এসাইলাম নিয়ে আছে, এমন কাউকে স্পন্সর করা সম্ভব নয়।

স্পন্সরশীপের কাগজ „Verpfichtungserklärung“ পেতে ২৫ ইউরো ফি দিতে হয়।

আবেদনপত্রের শেষপাতা

 

তথ্য সূত্রঃ

ইংরেজিতে লেখা পিডিএফ ফর্ম (এরলাঙ্গেন শহরের ফরেন অফিস) http://goo.gl/EvG4g6

উইকিপিডিয়াঃ http://goo.gl/0cYPU8

ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের আবেদনপত্রের ফর্মের একটি (পিডিএফ ফাইল) উদাহরনঃ http://goo.gl/XgcbAu

জার্মান মন্ত্রনালয়ের তথ্যঃ http://goo.gl/AdTgKC

ইংরেজিতে ফোরাম আলোচনাঃ http://goo.gl/mxL0tr

আদনান সাদেক, ২০১৫

অন্যান্য পর্ব ও লেখকের কথা

Print Friendly, PDF & Email

ফেসবুক মন্তব্যঃ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

  1. ভাই জান। জার্মান মেয়ে সাথে বন্দুত হয়ছে সে আমাকে জার্মান নিয়ে যেতে চায়। কোন ভিসায় গেলে আমার জন্য ভালো হয়।

     
  2. Adnan Sadeque ভাইয়া আমার হাজবেন্ড ইটালিতে থাকে।
    ওর রেসিডেন্স পারমিট আছে এবং ২ বছর পর ও সিটিজেনশিপ পাবে। এখন যদি আমি ২ বছর পর ইটালি থেকে জার্মানিতে পড়তে যেতে চাই সেক্ষেত্রে কি আমার ব্লক একাউন্ট দেখানো লাগবে? আমার ব্যাচেলর বাংলাদেশ থেকে নেওয়া।
    ভাইয়া প্লিজ একটু জানাবেন দয়া করে।

     
    • খুব সম্ভবত লাগবে না। নিশ্চিত জানতে ইতালিতে আপনার স্বামীকেই খোঁজ নিতে বলুন।

       
  3. জামিন দাতা যদি ইতালির সিটিজেন প্রাপ্ত হয় তাইলে কি করতে পারবে?

     
    • খুব সম্ভবত পারবেন না। তারপরেও উনাকেই নিজস্ব শহরের মিউনিসিপলস অফিসে যোগাযোগা করতে বলতে পারেন।

       
  4. vaiya amer mama Germany ta take…tahole amer mama amer jonno ki sponsorship patate parbe kina….r mama sponsorship patale ki r blocked account kolete hobe naki……