স্মৃতির পাতায় জার্মানীর দিনগুলিঃ পর্ব-০১

 

আজ খুব সকালে ডোর বেলের আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেল । শীত প্রধান দেশে সকাল ৬:৩০ মিনিট মানে অনেক সকাল, এত সকালে কেউ ঘুম থেকে জাগালে আসলে খুবই বিরক্ত হই ।
কাজ থাকলে ভোর তিনটায় উঠার অভ্যাস আছে কিন্তু আজ রবিবার, ছুটির দিন তাই ভাবলাম কোন জরুরী দরকারে কেউ এসেছে হয়ত । কিন্তু কেউ আসলে যোগাযোগ করে আসে সাধারণত । জার্মানীতে সেলুনে চুল কাটানোর জন্যও ডাক্তারদের মত সিরিয়াল নিতে হয়, কারও বাসায় গেলেও তাকে আগে বলে তার সাথে সময় ঠিক করে নিতে হয় কখন সে বাসায় আছে । রবিবার সকাল তাই বিরক্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক । আধোঘুমে ইন্টারকমের রিসিভারটা কানে তুলেতেই, মেইন গেটের ওপাশ থেকে এক বৃদ্ধা মহিলার কাঁপা কাঁপা কন্ঠে জার্মান ভাষায় বলল, হালো, ভি গেহ্ট্স?
বাংলায় যার মানে তুমি কেমন আছো?


আমি বুঝতে পারলাম এ সেই বৃদ্ধা মহিলা যিনি গত মাসেও এসেছিলেন । বললাম, জ্বি ভাল আছি, কোন দরকার?
বৃদ্ধা কিছুটা ইতস্তত করে বলল, বাবা কিছু মনে না করলে মাথিয়াস ভাইজনার আছে তোমার এখানে? ওকে বলো ওর মা বাহিরে অপেক্ষা করছে,
বললাম, না মাথিয়াস নামে এখানে কেউ থাকে না । একই প্রশ্ন গতমাসে বা আগে যতবার এসেছিল ততবারই এই ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করেছিল তাই বিরক্ত হয়ে রিসিভার রেখে দিলাম ।
আবারও বেল বেজে উঠল, রিসিভার উঠাতেই বৃদ্ধা মহিলা বলল, বাবা, মাথিয়াসকে বলো আমি তার মা, আমার নাম ইয়াসমিন ভাইজনার বললেই ও চিনতে পারবে..
প্রতিমাসেই এ বৃদ্ধা এসে এভাবে বিরক্ত করে তাই ভাবলাম আজ দুচার কথা শুনিয়ে দেই যাতে ভবিষ্যতে আর না আসে । ফ্লাট থেকে বের হয়ে গেটের বাহিরে গেলাম । দেখি অনেক বয়স্ক একজন বৃদ্ধা মহিলা পরনে লম্বা স্কাট, হাতে হাটার সুবিধার জন্য একধরনের চাকাসমেত হালকা ওজনের চেয়ার যা সাথে বহন করে নেয়া যায় । আমাকে দেখে অপ্রস্তুত হয়েও তা সামলে নিয়ে একটু মৃদু হাসি দিল বৃদ্ধা মহিলা, বলল, বাবা মাথিয়াস নামে তাহলে কেউ নাই?
আমি বললাম, দেখুন এটা এ পর্যন্ত অনেকবার বলেছি মাথিয়াস নামে কেউ এখানে থাকে না, কেন প্রতিদিন সকালে এভাবে বিরক্ত করেন; কিছুটা বিরক্ত হয়েই বললাম । বৃদ্ধা কিছুক্ষণ চুপ হয়ে রইলেন , চোখের চশমাটা সরিয়ে টিস্যু দিয়ে চোখ মুছলেন, বললেন, বাবা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমার ছেলে এখানে চলে আসে, এই ফ্লাটেই উঠেছিল সে । তারপর আমি পোল্যান্ডে ছোট মেয়েকে নিয়ে আশ্রয় নিই । যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে আর ছেলেকে খুঁজে পাইনি আজো তবে আমার বিশ্বাস সে এখনও বেঁচে আছে । বৃদ্ধার কথা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম । মনে পড়ল, আমাদের দেশেও এমন হাজার হাজার মা আছেন যাদের সন্তান ৭১ এ যুদ্ধে হারিয়ে গেছে আর সেই সকল মা আজো তাদের সন্তান বেঁচে ভেবে নিজেকে স্বান্তনা দেয় আর পথ চেয়ে থাকে খোকা কখন ঘরে ফিরবে । যখন মা অথবা দেশ দুটোর মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বলা হয় তখন কতজন সাহসী সন্তানই আর শুধু দেশকে বেছে নিতে পারে ! মহিলার কাছে ক্ষমা চাইলাম, বললাম, মা আমাকে মাফ করবেন আমি বুঝতে পারিনি তবে আপনার ছেলে জীবিত থাকলে অবশ্যই একদিন ফিরে আসবে । বৃদ্ধা বলল, বাবা, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ, ক্ষমা চাওয়ার কিছু নাই আমি বয়ষ্ক মানুষ ঠিক মত চোখে দেখি না, কানেও কম শুনি; তুমি যে ফ্লাটে থাকো সেখানেই মাথিয়াস ছিল তাই এখানে নতুন কেউ আসলে খোজ নিয়ে দেখি আমার ছেলের কোন খবর জানে কিনা ।
তোমাকে ধন্যবাদ, বলে বার কয়েক চোখ মুছতে মুছতে বৃদ্ধা রাস্তা ধরে সামনে চলতে থাকল, বিড়বিড় করে আপন মনে কি যেন বলছে আর মাথা ডানে বায়ে দোলাচ্ছে । অশ্রুজলে কখন যে আমার দৃস্টি ঝাপসা হয়ে গেল তা বুঝতে পারলাম না । শুধু কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, আপনাকেও ধন্যবাদ…

Print Friendly, PDF & Email

ফেসবুক মন্তব্যঃ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.