পর্দা নামল বহু আকাংখিত সেমিনারের

 

বছরের প্রথম দিনের সকালটা ছিল একটু বেশিই কুয়াশাচ্ছন্ন। ধারণায় ছিল এদিন বুঝি সূর্য্যি মামার দেখাই মিলবে না। এই কনকনে শীতের সকালে আমাদের যেতে হবে টিএসসি তে। গত প্রায় পনেরো দিন হল যার আয়োজন চলছে। সকাল ন’টার মধ্যেই কিছু বাদে প্রায় সবাই উপস্থিত হল। আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে সূর্য্যি মামাও দাঁত বেশ করে হেসে তার দিনব্যাপী উপস্থিতির কথা জানান দিল। শীতের সকালে রোদের উষ্ণতা পেয়ে আমরা কাজ শুরু করে দিলাম সোৎহাসে। চারটি স্টল সাজাতে হবে, এখানে এই কাগজ ওখানে ওই কাগজ লাগাও। এর মধ্যে আরাফাত আসল ফেষ্টুন ব্যানার ইত্যাদি নিয়ে। সেগুলো লাগিয়ে দেখা গেল কিছু প্রিন্টিংয়ের কাজ বাকি। একে একে সেগুলা করে যথাস্থানে তা আঠা বা স্কচটেপ দিয়ে লাগিয়ে দেয়া হল। আদনান ভাই বুঁদ হয়ে আছেন ল্যাপটপে যেখানি তিনি সেমিনারের উপস্থাপনার শেষ প্রস্তুতিটুকু নিচ্ছেন হয়ত।

মাঝে আদনান ভাই, চারিদকে আমরা

 

কাজে ব্যস্ত সবাই

 

হাসি ঠাট্টাও চলছে, আবার সেবাও সরবরাহ করা হচ্ছে

এগারোটা বাজতে না বাজতেই উৎসুক ছাত্রছাত্রীরা আসা শুরু করলেন। স্টল থেকে আমরা তাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলাম আর লিফলেট বিলোচ্ছিলাম। কিন্তু আগত মানুষের তুলনায় আমাদের পক্ষ হতে স্টল ও তথ্যদাতার সংখ্যা ছিল খুবই অপ্রতুল। শেষে না পেরে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত হল যে আগত সকলের প্রশ্নের উত্তর দেয়া হবে মিলনায়তনের ভেতরে। আমরা সবার নিকট হতে প্রশ্ন সংগ্রহ শুরু করলাম।

দুপুর একটায় শুরু হল প্রশ্নোত্তর পর্ব। টানা চলল আড়াইটা পর্যন্ত। এরপরই বিরতি। বিরতির আগেই ডেকচি ভর্তি ভূণা খিচুড়ি আর গো-মাংস নিয়ে হাজির আদনান ভাইয়ের সহধর্মিনী শর্মি আপু। আমাদের জন্য অতি সৌভাগ্যের বিছয় ছিল এই যে, সকল খাবারই ছিল আমাদের সকলের প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের আম্মা শ্রদ্ধেয়া আয়েশা ফয়েজের হাতে। আমরা আয়োজকরা দু’ভাগে ভাগ হয়ে খেতে গেলাম। অতি সুস্বাদু সেই খাবার দিয়ে উদরপুর্তি করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে পুনরায় কাজে নামলাম।
এরপরই শুরু হল আমাদের সেমিনারের প্রস্তুতি গ্রহণ। মাইক ঠিক আছে কিনা, সাউন্ড সঠিকমত কাজ করছে কিনা, মঞ্চের সম্মুখভাগ হতে অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরানো হয়েছে কিনা সব খুঁটিনাটি দেখে নিতে হল সবাইকে মিলে। ওদিকে যারা রেজিষ্ট্রেশনের দায়িত্বে ছিলেন তারা বসে গেলেন কাগজ ও কম্পিউটার নিয়ে, যাতে করে প্রবেশপ্রার্থীদের আইডি চেক করে ঢোকানো যায়। এসময় আদনান ভাই সকলকে ডাকলেন। সবাই একত্রিত হওয়ার পর বেশ উত্তেজিত ও কিঞ্চিত ভাবনা মিশ্রিত অবয়ব নিয়ে আদনান ভাই সেমিনার চলাকালীন কার কি দায়িত্ব তা এক এক করে বুঝিয়ে দিতে লাগলেন। ওদিকে তখন বাইরে ভিড় জমছে যারা সেমিনারে থাকার জন্য এসেছেন। এদিকে আমরা আমাদের কাজ বুঝে নিচ্ছি ওদিকে ভিড় বাড়ছেই। স্বল্প সময়ের মিটিং শেষ করে আমরা যার যার কাজে চলে গেলাম। বাইরে তখন প্রবেশপ্রার্থীদের বিরাট বিরাট তিনটি সারি।

মিলনায়তনের ভেতর বাহির

 

শুরু হল মিলনায়তনে আগতদের প্রবেশ। অত্যন্ত সুষ্ঠু ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে একে একে সবাই ভিতরে গিয়ে বসল। সামান্য সময় দেরি করেই বিকেল পাঁচটায় কানায় কানায় পূর্ণ দর্শক নিয়ে শুরু হল সেমিনার। সারাদিন বাদে এতক্ষণে আয়োজক ছেলেমেয়েরা সামান্য ফুরসুরৎ পেল কিছুক্ষণ আড্ডায় মেতে উঠার যারা সারা দিন ব্যস্ত ছিল কাজে। এদিকে মাঝে মাঝেই মানুষ আসতেই থাকল যারা হয়ত কোন কারণে দেরি করে ফেলেছে। একটা সময়ে যখন আগতদের আসা বন্ধ হল তখন আমরা আয়োজকরাও ভিতরে গিয়ে সেমিনারে দেয়া আদনান ভাইয়ের বক্তৃতা শুনতে থাকলাম। পুরো অনুষ্ঠান ভিডিও হতে থাকল। আমার দায়িত্ব ছিল আগতদের সাক্ষাৎকার নেয়া। আমি বাইরে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেমেয়েদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ভেতরে ঢুকে বক্তৃতা শুনতে থাকলাম। ঘন্টা দেড়েক হাতে রেখে আদনান ভাই তাঁর উপস্থাপনা শেষ করলেন কারণ দর্শকদের মধ্যে তখন প্রশ্নবোধক দৃষ্টি।

চলছে বক্তৃতা

Download Presentation File as PDF

ফ্রেমে বন্দী আমরা

 

আমাদের পরিকল্পনা ছিল সকলের নিকট হতে কাগজে প্রশ্ন সংগ্রহ করে মঞ্চে সেসবের উত্তর দেয়া হবে, তবে শুধুমাত্র বাছাইকৃত প্রশ্নের। কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হল না। আদনান ভাই হয়ত বুঝতে পেরেছিলেন দর্শকের মন। তাই তিনি সরাসরি প্রশ্ন ও উত্তরের ব্যবস্থা করলেন। আমাদের উপস্থাপকদ্বয় মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে পুরো মিলনায়তন ছুটতে লাগলেন এ মাথা হতে ও মাথা। মঞ্চে উত্তর দিয়ে চলেছেন চারজন যাদের সবারই জার্মানে থাকার ও পড়ালেখা করার সুদীর্ঘ্য অভিজ্ঞতা রয়েছে। তারই আলোকে তাঁরা অত্যন্ত ধৈর্য্য ও আন্তরিকতার সহিত উত্তরের পর উত্তর দিয়ে চলছেন। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে সেই কখন কিন্তু একদিকে প্রশ্নও যেমন শেষ হওয়ার নাম নেই, অন্যদিকে উত্তরদাতাদেরও যেন কোন ক্লান্তি নেই। একটা সময় সবকিছুর যবনিকাপাত ঘটল। দর্শকরা একে একে বের হচ্ছে। আমি আবারো তাদের সাক্ষাৎকার নিতে দৃশ্যধারণে দায়িত্বপ্রাপ্ত লোককে নিয়ে ছুটে গেলাম সদর দরজায়। আমি জানতে চাইলাম সেমিনার নিয়ে তাদের মতামত। এভাবেই আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল সফল একটি সেমিনারের পর্দা নামল।

চলছে প্রশ্ন সংগ্রহ

 

দর্শকের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন চারজন

এরপর আমরা খালি মিলনায়তনে ছবি উঠার প্রায়-প্রতিযোগীতা শুরু করলাম। আমাদের ফ্রি-ফটোগ্রাফার রাজিয়া বিন্দুমাত্র বিরক্তি না দেখিয়ে ক্লিকের পর ক্লিক করে গেলেন। শেষে জানলাম তিনি প্রায় ছয় গিগাবাইট শুধু ছবিই তুলেছেন! এসব করে আমরা নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলাম। কেউ কেউ হিসাব করতে বসল কত টাকা আমাদের ডোনেশন হিসেবে উঠেছে। পুরো আয়োজনের তুলনায় যদিও তা পরিমাণে খুব কম কিন্তু বৌধিক বিচারে তা আমাদের নিকট অমূল্য। আগত অভ্যাগতরা ভালোবেসে আমাদের বাক্সে যা ফেলেছেন আমাদের কাছে তাই ধনতুল্য। সকল হিসাব নিকাশের পাট চুকিয়ে সকলের নিকট হতে বিদায় নিয়ে সবাই আমরা বাড়ির পথ ধরলাম। আঁধার রাত্রিতেও নিয়ন আলোতে তখন সকলের চোখ জ্বলজ্বল করছে সাফল্যের রুপালি রংয়ের প্রতিফলিত আলোতে। এ যেন বিশ্বজয়ের আনন্দ!

চলছে পোষ্টারিং ও সাক্ষাৎকার

 

আমরা আমরাই, সকলে একত্রে
এবারে একটি প্রত্যয়নঃ আমাদের অধিকাংশই ইতোপূর্বে এত বড় কোন আয়োজনে নিজেকে জড়িত করেনি। সে হিসেবে এটা ছিল অনেকের জন্যই এক নতুন অভিজ্ঞতা। তাই একত্রে কাজ করতে গিয়ে বারবার ভুল হয়েছে, আদনান ভাই বকা দিয়েছেন আবার সমাধানও দিয়েছেন। তিনি মূলত বেশ খানিকটা খুঁতখুঁতে প্রকৃতির। সবকিছুই তাঁর নিখুঁত হওয়া চাই। সামান্য এদিক সেদিক গ্রহণযোগ্য নয়। যেকোন কাজ করেই আমরা তাঁকে দেখিয়ে ফাইনাল করে নিতাম। নজরুলের প্রেমিকা যেমন গোঁ ধরে বলেছিল “চাঁপা এনে দাও, নয় বাঁধব না চুল” তদ্রুপ আদনান ভাইয়ের এক কথা- “ব্যাপারটা এমন হতে হবে, নয় একসেপ্ট হবে না”।
তাঁর সাথে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি একজন মানুষ কতখানি একাগ্রতার সহিত দেশের মঙ্গলের কথা চিন্তা করতে পারলে মাত্র পনেরো দিন সময় নিয়ে দেশে এসে পুরো সময়টাই মানুষের তরে বিলিয়ে দেয়। অনেকেই তো বিদেশে থাকে, ভালো আয় রোজগারও করে কিন্তু দেশের জন্য কিছু করার তাগিদ বোধ করতে দেখা যায় খুব কম মানুষকেই। সেদিক দিয়ে তিনি সুষ্পষ্টভাবে ব্যক্তিক্রম। আমরা তাঁর কাছ থেকে শিখেছি সময়ানুবর্তিতা, শিখেছি সত্য ও যৌক্তিক বিষয়ে অটল থাকা।
কয়েকদিনের এই টিম ওয়ার্কে আমরা সবাই যেন একে অপরের অতি আপনজনে পরিণত হয়েছি। সেমিনার শেষ, কিন্তু এই পরমাত্মীয়তা শেষ হবে না। অভিমানী কবির মত আমরা বলতে চাইনা-
মনে হয়, অজস্র মৃত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম
আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়–
রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
দূর হতে যদি দেখ চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।
আমরা কেউ কাউকে বিদায় দিব না। আমরা আমাদের পারষ্পারিক সম্পর্ক দীর্ঘ্যস্থায়ী করতে প্রয়াস চালাবো।

ফেসবুককে ধন্যবাদ না দিয়ে উপায় নেই। চারিদিকে নানান হতাশার খবরে ফেসবুকের পেইজগুলো যখন গিজ গিজ করে, কথায় কথায় নোংরা রাজনীতি টেনে এনে বাগাড়ম্বর করা হয়, ধর্মে-অধর্মে, আস্তিকে-নাস্তিকে ডান-বামের তর্কাতর্কিতে যখন মধ্যপন্থীরা কোনঠাসা, যখন অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ও নির্লজ্জভাবে অন্যদের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে ভব্যতার নিম্নতম বল্গাহীন, অর্থহীন ও রুচিহীন খিস্তিখেউড়ে ফেসবুকের পাতা ভরে যায় সেই নিদানকালে যখন এই ধরনের আশাব্যঞ্জক কাজ হয় শুধুমাত্র দেশের মানুষের ও তাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তখন ফেসবুক ব্যবহার করার স্বার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায়। পরিশেষে কবিগুরুর চরণ উচ্চারণ করেই আদনান ভাইসহ আয়োজক সকলকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাতে পারিঃ ‘জগতের আনন্দ যজ্ঞে তোমার নিমন্ত্রণ,ধন্য হলো ধন্য হলো মানব জীবন’।

All photos from the event:
https://www.facebook.com/media/set/?set=a.449788708420409.109293.207406302658652&type=1&l=5b172f4bfa

Print Friendly, PDF & Email