রান টুয়ার্ড ইউর ফিয়ার

 

মোটামুটি হতদরিদ্র পরিবার থেকে আমার উঠে আসা। বাইরে পড়তে যাবার স্বপ্ন দেখাটাই ছিল অলীক। বাবার টাকা ছিল না, নিকট আত্মীয়দের থেকেও তেমন কোন সাহায্য পাবার সম্ভাবনা নেই। উল্টো বাবা অবসর নিয়েছেন ব্যচেলর শুরু করার আগেই। সংসারের বড় ছেলে। সবাই বলল, আগে পাশ করে দেশে কয়েক বছর কাজ করে সংসারের হাল ধর।

নিম্ন মধ্যবিত্তদের অনেক রকমের সমস্যা থাকে। বোনদের বিয়ে দিয়ে তারপরে যা করার কর। এইসব গ্যাঁড়াকলের মধ্যে আবার প্রেম করে ফেললাম। একটু বয়সে ছোট হলেও নাহয় হতো, প্রেম হল সম বয়েসির সাথে। উনি আবার তার পরিবারের সবচেয়ে বড় সন্তান। তারমানে ব্যাচেলর পড়াকালীন সময়ে একইসাথে সংসার দেখ, প্রেমিকার বিয়ের চাপ, টাকা পয়সার অভাব, পরিবারের অসম্মতি, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা – এই মিলিয়ে বিদেশ যাওয়ার কথা শুনলেই সবাই দুইদিকে মাথা নাড়তো।
reality[1]

এই সময়ে স্টিভ চ্যান্ডলারের একটা কথা পড়লাম। Run towards your fear. মানে হচ্ছে, তোমার যেখানে ভয় সেটা থেকে না পালিয়ে তার দিকেই ছুটে যাও। যেমন, যার পানিতে ভয়, তাকে গভীর পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। যারা উচ্চতার ভয়, তাঁকেই হিমালয়ের চুড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। জীবনের বাঁধাগুলোকে সামনে গিয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে। বাঁধা থেকে পালিয়ে যাওয়া মানেই হেরে যাওয়া। এই একটা লাইন আমার জীবন বদলে দিল।

পড়ার পাশাপাশি একসাথে ৬-৭ টা করে টিউশনি করে টাকা জমালাম। পাশ করার এক সপ্তাহ পরে সংসার দেখার বদলে কোন আয় রুজি ছাড়াই বাড়ির অসম্মতিতে বিয়ে করলাম। আমাদের শুধু বিয়ের অনুষ্ঠান হল, বৌভাত হল না। কারণ ছেলের অনুষ্ঠান করার পয়সা নেই। বউ ঘরে তুলতে পারলাম না, কারণ বাড়িতে থাকতে দেবার জায়গা নেই। নতুন বউকে রেখে বিয়ের দুই সপ্তাহ পর জার্মান ভাষা না জেনে জার্মানিতে জার্মান ভাষাতেই মাস্টার্স শুরু করলাম। উদ্দেশ্য জার্মানিতে গিয়ে যেভাবেই হোক জার্মান ভাষাতে হলেও মাস্টার্স শেষ করে আবার একটা চাকরিও যোগাড় করতে হবে।

জীবন আমাকে যতো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল, চেষ্টা করলাম ঠিক সেগুলোকেই প্রতিপক্ষ বানিয়ে বধ করতে। সব ক্ষেত্রে সফল না হলেও এই মন্ত্রের ফলাফলে আমি মোটামুটি সন্তুষ্ট। শুন্য থেকে শুরু করে জার্মান ভাষা রপ্ত করে, দুই বছরের মাস্টার্স সময় মতন শেষ করে, চাকরি যোগাড় করে, বউকেও প্রবাসে এনে ফেললাম। স্টিভ চ্যান্ডলারের কথামতন যেখানে হেরে যাবার ভয়, যেখানে নিশ্চিত পরাজয়ের সম্ভাবনা, সেটাকে না এড়িয়ে সেই বাঁধাকেই জয় করার প্রচেষ্টায় ব্রত হলাম।

সবার জীবন এক নয়। সবার সামর্থ এক নয়। জীবন আমাদের একেক জনকে একেক ভাবে পরীক্ষা করে। অসময় দুঃসময়ে আমরা ভাবি সবকিছুই বুঝি আমাদের বিপক্ষে। আমরা ভয় পাই, এই বুঝি তরী ডুবে গেল। আবার এইসব দেয়ালে পিঠ ঠেকা দুঃসময়গুলোই আমাদেরকে আমাদের সেরাটা দিতে অনুপ্রাণিত করে। প্রতিকূল সময়ে জিদ চেপে বরং আমরা জীবনকেই বদলে দিতে পারি। সবকিছু অনুকূলে থাকলে বরং আমরা আলসে হয়ে যাই। কেউ আমাদেরকে সাহায্য করবে, কেউ একদিন পথ বাতলে দেবে, হয়তো একদিন ভাল সময় আসবে – এই ধরণের পজিটিভ থিংকিং বা আশার বানী দিয়ে বাস্তবতার পরিবর্তন হয় না। জীবন বদলায় তখনি যখন আমরা বাঁধাকে তুচ্ছ করে সম্মুখ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি।Bildergebnis für run toward your fear

একটা ছেলে (John Rahul Ash) খুব দুঃখ করে গ্রুপে একটা পোষ্ট দিয়েছে। জার্মানি আসার স্বপ্ন দেখার পথে তার অনেক বাঁধা। তার ভয় তার স্বপ্ন বুঝি পূরনের নয়। কেউ তাকে সান্তনা দিয়েছে, কেউ তাকে বলছে চীনে যেতে কেননা সেটা নাকি সহজ!

আমি বলি, জার্মানি কঠিন হোক, ব্লক একাউন্টের ঝামেলা থাকুক, জিপিএ কম থাকুক, স্বপ্ন যদি জার্মানির হয়, তাহলে জার্মানিতেই যাবে। এই নিয়ে কোন আপোষ হবে না। জার্মান ভাষা বলতে দাঁত ভেঙে যাক, এই ভাষাই রপ্ত কর।

এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময় তার।

 

আদনান সাদেক, ২০১৭

#BSAAG_Inspirational_Writings

অন্যান্য পর্ব ও লেখকের কথা

Print Friendly, PDF & Email
Adnan Sadeque
Follow me

Adnan Sadeque

লেখকের কথাঃ
http://bsaagweb.de/germany-diary-adnan-sadeque

লেখক পরিচয়ঃ
http://bsaagweb.de/adnan-sadeque
Adnan Sadeque
Follow me