• Home »
  • BSAAG »
  • জার্মানির পথে -১ „বিসাগের হাত ধরে“

জার্মানির পথে -১ „বিসাগের হাত ধরে“

 

২০০১ সালে যখন ইন্টারনেট ছিল না বললেই চলে, তখন জার্মানিতে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সচ্ছলতার অভাবে বাসায় ইন্টারনেট কানেকশন নেবার উপায় নেই, বুয়েটের ফ্রি ইন্টারনেট কানেকশনই একমাত্র ভরসা। সেই সময়কার নেটের স্পিডের কথা ভাবলে এখনো বুকে কাঁপুনি চলে আসে। আর কিছু না, শুধু গোগোল ওপেন করতে কম করে হলেও দুই মিনিট সময় লাগত। তারপরে তো সার্চ করা শুরু। খুব মনে আছে, কম করেও ৫-১০ মিনিট সময় লাগত একটা ইউনিভার্সিটির হোম পেইজ ওপেন হতে। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাব – এই স্বপ্নটা কিছুতেই হার মানত না ইন্টারনেটের স্পীডের কাছে। তিন চার ঘণ্টা সময় কেটে যেত শুধু একটা ইউনিভার্সিটির আবেদনের ফর্ম খুঁজে তাদের রিকোয়ারমেন্ট বুঝতে বুঝতে। অনেকবার এমন হয়েছে যে, ঠিক শেষ মুহূর্তে এসে লাইনটা কেটে যেত। তার মধ্যে আবার পেছনে আরেকজন এসে অপেক্ষা করছে, কতবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে মন খারাপ করে পিসিটা ছেড়ে দিতে হয়েছে – কোন সাফল্য ছাড়াই।

এই যুগের ছেলে পেলেরা সারাদিন ফেইসবুকে থাকে। বাসায় ল্যাপটপ ছেড়ে বাইরে বের হবার আগে প্রথমেই মোবাইল ফোনে লগ ইন করে নেয়। ইন্টারনেট আর তথ্যে এরা ডুবে আছে সবসময়। এরা কি আমাদের সেই সময়কার যুদ্ধ উপলব্ধি করতে পারবে? তবে বিসাগের বদৌলতে গত দুই বছরে খুব টের পেয়েছি, এত তথ্যের ভিড়েও প্রয়োজনীয় এবং নির্ভুল তথ্যের বড় অভাব। আবার যাদের কাছে সঠিক তথ্য আছে, তাদের সময় কোথায় অন্যদের সামান্য উপকারটুকু করার! তাঁরা ব্যস্ত নিজের গছর গোছাতে।

বিসাগ তার ব্যতিক্রম।

বিসাগের এই প্লাটফর্মের মাধ্যমে আমরা একটা সামান্য উদাহরণ তৈরি করছি। আমাদের উদ্দেশ্য দেশের জন্য কিছু একটা করা, দেশ মানে আমাদের কাছে সবার প্রথমে দেশের মানুষ। আমরা বিশ্বাস করি জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা, চাকরি, পিএইচডি ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে আমরাই বাংলাদেশের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য সঠিকতর পথপ্রদর্শক। আমাদের হেঁটে আসা পথের ভুলত্রুটি যেন নতুন প্রজন্মের পথ চলার অন্তরায় না হয়, সেই লক্ষ্যে আমাদের উদ্দেশ্য। অনেক তথ্যের মাঝে সঠিক ইনফরমেশনটি আমরা খুঁজে দেব তোমাদেরকে। জার্মানিতে শুধু একটা ভিসা নিয়ে আসা নয়, এখানে যেন তোমরা প্রত্যেকে নিজেকে সফল করে প্রতিষ্ঠিত করতে পার, তার জন্য প্রতিটি পদে পদে থাকবে আমাদের গাইডলাইন।  সফল হবার ফর্মুলা আমাদের জানা আছে, আমাদেরকে বিশ্বাস করে সেই পথে যদি তোমরা চলতে পার, তবে সাফল্য তোমাদের হাতে ধরা দেবেই।

আমাকে সেইদিন কে যেন বলছিল, ভাইয়া আপনি সবাইকে লেখার মধ্যে তুমি করে লিখেন, এটা কি ঠিক শোনায়! জার্মান ভাষায় আপনি আর তুমি দুইটা ফর্ম আছে। বাংলার আপনি আর তুমির সাথে সেখানে একটু পার্থক্য আছে। আমাদের ভাষায় “আপনি” সন্মানসুচক একটি অভিব্যক্তি। কেউ বয়েসে (কিংবা পদমর্যাদায়) বড় হলে এখানে তাঁকে আপনি করে না বললে তুলকালাম হয়ে যাবে। জার্মান ভাষায় “আপনি” (“Sie“) যেমন সম্মানের বিষয়, তেমনি সম্পর্কের মাঝে একটা ফর্মাল দূরত্ব তৈরি করে। এখানে তুমি („Du“) করে বলা মানে কাউকে খুব আপন করে নেয়া, সহজ একটা সম্পর্ক তৈরি করা। আমি যখন তোমাদের জন্য লিখছি, তখন তুমি বলে সম্বোধন করি। কেননা বাংলাদেশী হিসেবে তোমরা আমার খুব কাছের মানুষ।

এই সিরিজে থাকবে জার্মানিতে আসার আগের প্রস্তুতি থেকে শুরু করে এখানে আসার পর জীবনযাত্রায় আবশ্যক প্রতিটি পদের ব্যাখ্যা। আমাদের ওয়েব সাইট এবং গ্রুপে দেওয়া আছে প্রায় প্রতিটি খুঁটিনাটি ইনফরমেশন, যদিও এই সবকিছু একদিনে প্ল্যান করে করা হয়নি। এই কারণে অনেক তথ্যই একাধিকবার আছে, অনেক তথ্য সাজানো হয়নি সময়ানুক্রমে। চেষ্টা থাকবে এই সিরিজের আওতায় সবকিছুকে ঢেলে সাজানোর জন্য, যেন এই একটি সিরিজের থেকেই প্রয়োজনীয় সব ধাপ খুঁজে নেয়া যায়।

জার্মানিতে আসা নিয়ে এমন কাজ এর আগে হয়েছে এমন জানা নেই। কোন সন্দেহ নেই যে, খুব সহজ হবে না এই মহাযজ্ঞ শেষ করা। তবে ভরসা আছে এই ভেবে যে, আমরা যখন দুই বছর আগে বিসাগ শুরু করেছিলাম, তার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের ছাত্র ছাত্রীদেরকে এই দেশে পথ প্রদর্শন করার কথা কেউ ভাবেনি। এবং আমরা সেটাতে এখনো পর্যন্ত সফল। কাউকে না কাউকে শুরু করতেই হয়, আপাতত না হয় আমরাই এই গুরু দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলাম। আমাদের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য থাকল বিসাগের ২০ হাজার সদস্য আর শতাধিক ভলান্টিয়ার, বাংলাদেশে এবং জার্মানিতে।

চলবে…

আদনান সাদেক, ২০১৩

লেখকের কথা

Print Friendly, PDF & Email