বিদেশ ভালো: ‘কবরে মোর ফুল নয় আলু’ দিও

 

কলম্বাসের আমেরিকা ডাকাতি করতে যাবার কারণে গোলাকার এই মর্ত্যে গোলাকার এক বস্তুর অদ্ভুত স্বাদ আমাদের জানা হয়।

চাষাবাদের দিক থেকে ধান,গম,ভূট্টার পর সেই গোলাকার মহাশয়ের অবস্থান। ধারণা করা হয় ইনকা-ইন্ডিয়ান সভ্যতায় উনার প্রথম আবাদ হয়…। সেটাও আবার খ্রিস্টর্পূব আট হাজার অব্দ থেকে পাঁচ হাজার অব্দের দিকের কথা।

১৫৩৬ সালে স্প্যানিশরা পেরু দখল করে প্রথম ‘উনা’র স্বাদ জানতে পারেন। ১৬০০ শতাব্দির শেষভাগে স্প্যানিশরা নিজেদের দেশে ‘উনা’রে চাষ শুরু করেন। ‘উনা’র নাম নিতেই যারা একেবারেই অজ্ঞান সেই আইরিশরা এর চাষাবাদ শুরু করে ১৫৮৯ সালে। ঘ্যান ঘ্যান বাদ।

জার্মানদের ‘উনি’ অনেক কাছের। একদম মোর আপনার চেয়ে আপন যে জন, সেই যে আমার ‘আলু’। জার্মানদের কাছে আলুর বিকল্প মোটামুটি আলু-ই এবং সব জার্মানদেরই মোটামুটি আলুর দোষ আছে (এখানে ইহা একটি নিষ্পাপ অর্থ বহন করে)।

আলু আপনাকে মোটা করবে- এ টাইপ কথা বললে জার্মানিতে মাইরের সাক্ষাৎ মোটামুটি নিশ্চিত।

যা হোক, জার্মানিতে কিন্তু মহান আলুর যাত্রা মোটেও এই আলুময় ছিল না। জার্মানিতে ‘কিং ফ্রেডরিক (দুই) অফ প্রুশিয়া’ বলে এক বিখ্যাত মান্যবর রাজা ছিলেন।

কেউ উনাকে ডাকেন ‘ফ্রেডরিক দা গ্রেট’ বলে, কেউ ডাকেন ‘ওল্ড ফ্রিটজ’। কিছুটা পাগলাটে এই রাজার জন্ম আজ থেকে প্রায় তিনশ’ বছর আগে। উনার রাজত্বের বর্তমান নাম-পট্সদাম।

বার্লিন থেকে ম্যাগডেবার্গ (মাগডেবুর্গ) যাবার পথেই পড়বে এই পটসদাম। একদমই বার্লিনের কাছে।

এই পাগলা রাজা একবার শুনলেন দক্ষিণ আমেরিকাতে এক আজব গাছ পাওয়া যাচ্ছে। নাম আলু। তো রাজার তা চাই। যে কথা সেই কাজ।

উনি গ্রামের কাছে এক বিশাল জায়গা নিয়ে আলুর চাষ করলেন। তারপর শুরু হলো আলুর জলসা। জলসা মানে আলু নিয়ে নাচ-গান নয়। আলুর গুণ-কীর্তন করে প্রচার-প্রচারণা। আলুর কী কী উপকার (এখানে বলে রাখি যারা রূপর্চচার নামে রূপ-খরচা করছেন উনারা আলুর জুস চেহারায় ট্রাই করতে পারেন। বিফলে মূল-আলু ফেরত), আলু চাষে কীভাবে বড়লোক হওয়া যায়-এসব আর কী!

কিন্তু ওই অঞ্চলের জার্মানদের ঘাড়ের শিরার কিছু অংশে বাঙালি বাস করত। তারা উল্টা রাজাকে বললো- ‘আমার খাওয়া আমি খাবো, যাকে খুশি ( আই মীন যা খুশি) তাকে খাবো।’

রাজাও দমলেন না। তিনি তার সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন আলুক্ষেত পাহারা দিতে। যাতে করে মানুষ আলুর গুরুত্ব বুঝতে পারে। হলোও তাই। সবাই ‘আলু (কার্টোফেল) কী এমন গুরুত্বপূর্ণ যে পাহারা দিতে হবে’-এই টাইপ কথাবার্তা শুরু করে দিলো।

রাজা রাতের বেলার পাহারাদারদের বললেন, ‘একটু ঢিলাভাবে পাহারা দিতে।’ উদ্দেশ্য গ্রামের মানুষজনদের দিয়ে আলু চুরি করানো। হলোও তাই, মানুষ রাজার ক্ষেতের আলু চুরি করে নিজেদের বাগানে চাষ শুরু করলো। এরপর বাকিটা আলুহাস (আই মিন ইতিহাস)।

জর্মানরা আলুকে লবণের মতো ভালোবাসে। আর সেই রাজার কবরে ফুলের বদলে দেয়া হয় আলুর অর্ঘ্য।

আমার এই আলুরে জানিবার ঘটনার সূত্রপাত রান্নাঘর থেকে। আমার তখন না খেয়ে তিন মাসে ১২ কেজি ওজন কমে গেছে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে মনে হয়,আয়নার মানুষটাকে ‘রুবি রায়ের মতো কোথায় যেন দেখেছি।’

খেতে না পাইলেও ইউনিভার্সিটির শেফরে নিয়ম করে দুই বেলা গালি-গালাজ করি। কারণ ব্যাটা যা রান্দে আর রান্নার পর রান্নার গুণগান করে যেমনে কান্দে..মনে চায়..থাক, কী মনে চায় না বলি। এটা ভদ্রলোকের নিউজ পোর্টাল।

আমার রান্নাজ্ঞান তখন অনেকটা ‘অবিবাহিত পুরুষের বাচ্চাদের ডায়াপার বদলের জ্ঞানের’ মতো কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্পের আক্কেল জ্ঞানের মতো। তো সেই জ্ঞান নিয়া আমি ভাবলাম রন্ধন শিল্পে বিপ্লব ঘটাবো।

বিপ্লবের জন্য জোগাড় করলাম এক ভারতীয় ছাত্রের ফেলে যাওয়া বাসমতি চাল আর শুকনা মরিচ। পেঁয়াজ এখানে মোটামুটি সুলভ। আমি নেমে পরলাম বিপ্লবে।

আমি আলু ভর্তা বানালাম। আমার আলুর সাথে এ রকম মরিচের ব্যবহার দেখে এক জার্মান যুবক নিজের কষ্ট আর চেপে রাখতে পারলো না। আমি যেভাবে আলুকে দুই হাতে দলাই-মলাই করছি তা দেখে ও বলেই ফেললো-‘এটা তো নির্দোষ আলু, তোমার সাবেক প্রেমিকার বর্তমান প্রেমিক না।’

আমি শুকনা মরিচ টাইপ হাসি দিলাম। বললাম,’কাইন প্রবলেম। এটা জার্মান আলুর বাঙালি ভর্তা।’

ও খানিকটা ক্ষেপে গিয়ে যা বললো…সোজা বাঙলায় তার মানে দাঁড়ায়- ‘ব্যাটা বাঙালি!! আলু হইলো জার্মানদের বেসিক স্টেপল আর তোমার কাছে থিকা আমি শিখবো আলুর ব্যবহার?’

শিল্পীর ক্যানভাসে 'আলুর রাজা কিং ফ্রেডরিক অফ প্রুশিয়া'

শিল্পীর ক্যানভাসে ‘আলুর রাজা কিং ফ্রেডরিক অফ প্রুশিয়া’

আমি কহিলাম, ‘রাত্তিরে এসো বন্ধু। আলুর লড়াই হবে।’

যথাসময়ে সেই জার্মান আরও দুই জার্মান সমেত হাজির। তাদের আমি শুকনা মরিচের আলুভর্তা আগে পাতে দিলাম। কিন্তু আলুভর্তা আগে দেয়া ঠিক হয় নাই। মুহুর্তের মধ্যে আলুভর্তা খাওয়া শেষ।

আমি বললাম, ‘ভাইয়েরা রসো..ভাতের সাথে আলুভর্তা খাই আমরা।’

ওরা বলে, ‘শোনো বঙ্গ,আলুও একটা স্টেপল আর ভাতও একটা স্টেপল। দুইটা একসাথে মাখায়ে কীভাবে খায়!!’

ওরা আরও কিছু বলতে চাচ্ছিলো,দেখলাম ওদের ঠোঁট আর নড়ে না। চেহারা লাল-নীল-বেগুনির রঙধনু। মুহুর্তেই তিনটা জার্মান হয়ে গেলো জার্মান শেফার্ড। সবার জিভ তখন মাটি ছুঁই ছুঁই।

শুকনা মরিচের ঝালে অজ্ঞান প্রায়। তিনজন দৌঁড়ে কিচেন থেকে পালালো। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই ধুপধাপ শব্দে ফেরত।

আমি ভাবলাম মারবে নাকি! তিনজনের হাতেই আপেল জুস। তারা আরো খাবে। চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপটেড।

আমি বললাম, বুঝো ভাই..পরে যদি..।

নাহ্‌, তারা দমবার নয়। সেই রাতে আমার প্রায় ১০ আলুর ভর্তা তিনজন মিলে সাবাড়।

পরদিন সকালে একজনের সাথে দেখা হতেই জানতে চাইলাম, ‘ভি গেহট্স?’ (কেমন আছো?)।

ওর জবানীতে ও যা বললো, ‘বাঙালি আলুর এই রেসিপির মতো মজার আলুর রেসিপি আর কিছুই হতে পারে না। এখন থেকে আলুভর্তা বানালেই ওকে যেন ইনভাইট করা হয়।’

আমি বললাম, ‘ঝাল ঠিকঠাক ছিলো?’

বললো, ‘তোমার আলুর ওই একটাই ঝামেলা খাবার সময় জ্বলে আবার বের হবার সময়ও জ্বলে।’

আমি বললাম, ‘এটাই জার্মান আলুর বাঙালি ভর্তার মহত্ব। খাবার পরও জ্বলে এবং জ্বালায়। আর তাই বাঙালির ভরসা পানিতে, টয়লেট টিস্যুতে না।’

লেখক:গবেষণা আর লেখালেখির চেষ্টা করেন;

রিনভী তুষার, জার্মানির বার্লিন থেকে

ইমেইল: kurchiphool@gmail.com

ছবি কৃতজ্ঞতা:রিনভী তুষার এবং ইন্টারনেট। 

সুত্রঃ  বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Print Friendly, PDF & Email