• Home »
  • Deutsche-Welle-Article »
  • জার্মানিতে অঙ্গদানের ক্ষেত্রে নতুন আইন প্রণয়নের চিন্তাভাবনা

জার্মানিতে অঙ্গদানের ক্ষেত্রে নতুন আইন প্রণয়নের চিন্তাভাবনা

 

অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দানের ব্যাপারে জার্মানিতে এখনও সচেতনতার অভাব রয়েছে৷ অথচ কারো মস্তিষ্কের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অন্য কোনো মরণাপন্ন রোগীর জীবন রক্ষা করতে পারে৷

১৯ বছরের কেভিন কিছুদিন আগেও ছিল সুস্থ সবল এক তরুণ৷ কিন্তু হঠাৎ একদিন অজ্ঞান হয়ে যায় সে৷ পরীক্ষা করে জানা গেল মারাত্মক এক ধরনের হৃদরোগে ভুগছে সে৷ নতুন হৃদযন্ত্র না পেয়ে কৃত্রিম এক ধরনের পাম্প বসিয়ে দেয়া হয়েছে তার হার্টে৷ এই মেশিনেই এখন আবদ্ধ কেভিনের জীবন৷ কেভিন জানায়, ‘‘এটা কোনো ভাল অনুভূতি নয়, খুবই খারাপ৷ কিন্তু মেশিন খুলে ফেললে আমি আধ ঘন্টার মধ্যে মারা যাব৷”

হার্টের পাম্পটি তার শরীরকে কাহিল করে ফেলছে৷ এই ভাবে চললে বেঁচে থাকবে সে আর মাত্র কয়েক বছর৷ ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য ১০০ কিলোমিটার দূরে লাইপৎজিগের হার্ট ক্লিনিকে কেভিনকে নিয়ে যান তার বাবা৷ নিজের অনুভূতি জানায় কেভিন এভাবে, ‘‘গাড়িতে করে যাওয়ার সময় সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকি৷ হাসপাতালে গিয়ে শুনতে হবে, অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়নি তো? সংক্রমণ হয়নি তো? হাসপাতালে থাকতে হবেনা তো? সংক্রমণ হলে সেটা খুব বিপজ্জনক হবে৷ আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে সব কিছু৷”

কেভিনের বাবা বলেন, ‘‘মনে হয় সব কিছুই যেন ছবির মত ঘটে যায়৷ স্পষ্ট কোনো চিন্তাভাবনা করা যায়না৷ বাবা হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারিনা৷ কিডনির সমস্যা হলে আমি ওকে একটা কিডনি দিতে পারতাম৷ কিন্তু হার্টের ক্ষেত্রে তো তা সম্ভব নয়৷”

অঙ্গদানের ক্ষেত্রে দ্বিধাদ্বন্দ্ব

কেভিনের মত ভাগ্য আরো অনেকেরই৷ জার্মানিতে রয়েছে অঙ্গদাতার অভাব৷ ব্রেইন ডেড বা মস্তিষ্কের মৃত্যু হলে হার্ট, লিভার, কিডনি, ফুসফুস এসব অঙ্গ অনেক সময় ভাল থাকে৷ কিন্তু অন্যান্য অনেক ইউরোপীয় দেশের মত জার্মানিতে অঙ্গদানের ক্ষেত্রে উইল করতে দ্বিধা লক্ষ্য করা যায় মানুষের মধ্যে৷ আত্মীয়স্বজনের সিদ্ধান্তটাও ইতিবাচক হয়না বেশির ভাগ ক্ষেত্রে৷ প্রতি সাতে একজন অঙ্গদাতা পাওয়া যায়৷

সমস্ত ব্যবস্থাটা পরিচালিত হয় জার্মানির অঙ্গদানের সমন্বয় কেন্দ্র থেকে৷ জার্মানিতে হাজার হাজার রোগী বৃথাই কোনো অঙ্গের জন্যে অপেক্ষা করে থাকেন দিনের পর দিন৷ খ্যাতনামা অঙ্গ প্রতিস্থাপন বিশেষজ্ঞ গ্যুনটার কির্সটে’র মতে স্বাস্থ্য বিভাগ ও রাজনীতিকদের উদ্যোগের অভাবই এক্ষেত্রে দায়ী৷

তাঁর ভাষায়, ‘‘আমরা সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়নের আহ্বান জানাচ্ছি৷ তাদের উচিত জনগণকে অঙ্গদানের ক্ষেত্রে সচেতন করা৷”

জ্ঞানের অভাব৷ এ কারণে কেভিন কেরুটের মত রোগীদের ভুগতে হচ্ছে৷ লাইপৎজিগের হার্ট ক্লিনিকে পরীক্ষা করে দেখা গেল কেভিনের অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে৷ অদ্ভুত ব্যাপার হল, অবস্থা আরো খারাপ হলেই কেবল কেভিনের সুস্থ একটি হৃদযন্ত্র পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে৷

নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ

অঙ্গদানের ক্ষেত্রে এই দুরবস্থার কারণে রাজনীতিকদের টনকও নড়েছে৷ তাঁরা এখন অঙ্গদান ও প্রতিস্থাপন আইনের পরিবর্তন করতে চাইছেন৷ জার্মান সংসদের নিম্নকক্ষ বুন্ডেসটাগের সিডিইউ/সিএসইউ দলের সংসদীয় প্রধান ফল্কার কাউডার এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘আমরা জার্মানিতে আরো বেশি অঙ্গদাতার প্রয়োজন অনুভব করছি৷ এ জন্য আমরা প্রচেষ্টা চালাচ্ছি, যাতে মানুষরা জীবনে অন্তত একবার বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামায়৷ আমি কী অঙ্গ দান করতে চাই, না চাইনা, নাকি এই বিষয়ে আমার কিছুই বলার নেই৷”

পাসপোর্ট, পরিচিতি পত্র বা ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার সময় প্রত্যেককে অঙ্গ দানের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হবে৷ সিদ্ধান্তটা ডকুমেন্টে লিখে রাখা হবে৷ এসপিডি দলের সংসদীয় প্রধান শ্টাইনমায়ারও এই নতুন আইন প্রণয়নের ব্যাপারে সহযোগিতা করছেন৷ দুরারোগ্য কিডনির রোগে আক্রান্ত স্ত্রীকে নিজের কিডনি দিয়েছেন শ্টাইনমায়ার কিছুদিন আগে৷ কিন্তু সংসদের নিম্নকক্ষে এব্যাপারে বিরোধী কন্ঠও শোনা যাচ্ছে৷ সবুজ দলের স্বাস্থ্যবিষয়ক সাংসদ এলিজাবেথ শার্ফেনব্যার্গ বলেন, ‘‘আমার পাসপোর্টটি বিশ্বের যে কোনো বিমান বন্দরে দেখাতে হয়৷ সেখানকার কর্মীদের আমি এ সম্পর্কে তথ্য দিতে ইচ্ছুক নই৷ এ ছাড়া মানুষকে এই বিষয়টি নিয়ে মাথা না ঘামানোর অধিকারও দিতে হবে৷”

অঙ্গ প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত জার্মান ফাউন্ডেশনের মুখপাত্র গ্যুন্টার কির্সটে এই ধরনের বিতর্ককে ভুল বলে আখ্যা দেন৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘সমস্যাটা হল, এক্ষেত্রে আবার আতঙ্ক দেখা দিতে পারে, প্রশ্ন জাগতে পারে মস্তিষ্কের মৃত্যু নিয়ে৷ বৈজ্ঞানিক দিক দিয়ে বিষয়টি খুবই স্পষ্ট৷ এ ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ নেই৷ কিন্তু বিতর্ক শুরু হলেই মানুষের মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে৷”

কেভিন কেরুট’এর আশা, অঙ্গদানের ব্যাপারে আইনের সংস্কার হলে সুস্থ হৃদযন্ত্র পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে তার৷ মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়াও সহজ হবে৷

[youtube_sc url=”https://www.youtube.com/watch?v=3079f5kJgO8″]

প্রতিবেদন: রায়হানা বেগম
সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আল-ফারূক

Print Friendly