নামে কিবা আসে যায়: একটি বিড়ম্বনা

 

সদ্য জন্ম নেওয়া বাচ্চাদের ডাক নাম বা প্রথম নাম বা First Name খুবই স্পর্শকাতর একটা বিষয় এই জার্মান দেশে। কোন বাচ্চার নাম এমন অদ্ভুত রাখা যাবে না যাতে সারাজীবন তাকে স্কুলে বা সমাজে উপহাসের পাত্র-পাত্রী হতে হয়। একটা বাচ্চার সামাজিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই এটা করা হয়।

আমাদের দেশে যেমন ‘নামে কিবা আসে যায়’ বলে আদর করে বা অজ্ঞানতায় সদ্যভূমিষ্ঠ বাচ্চার নাম কেউ কেউ ‘লাল্টু, বল্টু, গুলটু, চিকন আলী, কালা বা ধলা মিয়াঁ, শরবতি বা দিলখুশ বেগম’ টাইপ রাখেন – এদেশে তার অনুমতি নেই। নিয়ম অনুযায়ী এদেশে একটা বাচ্চার:

– প্রথম নাম বা ডাক নাম শুনেই বাচ্চার লিঙ্গ-প্রকৃতি জানা যাবে অর্থাৎ নাম শুনেই বোঝা যাবে যে এটা একটা ছেলে, নাকি মেয়ে। তা না বোঝা গেলে দ্বিতীয় কোন নাম বা মিডল নেম যোগ করতে হবে।

– কোন প্রচলিত বা ঐতিহ্যবাহী ‘ফ্যামিলি নেম’ বা ‘লাস্ট নেম’ (যেমন, ম্যুলার, স্মিড, ব্রাউন, কোওল) নামগুলো কোন বাবা-মা তার বাচ্চার নাম ‘প্রথম নাম‘ হিসেবে ব্যাবহার করে ‘অসন্মান’ করতে পারবে না।

– কোন কুখ্যাত ব্যাক্তির নাম, যেমন: ওসামা বিন লাদেন, হিটলার বা তার নাৎসি বাহিনীর কারো নামে বাচ্চার নামকরণ অবৈধ এবং অবশ্যই তা অনুমতি পাবে না।

– একইভাবে কোন ফল (যেমন: পেয়ারা, নাশপাতি, আপেল), কোন প্রোডাক্টের বা বস্তুর নাম (যেমন: ইওগার্ট বা দই, পুপে বা পুতুল, গ্রামোফোন), কোন স্থানের নাম (যেমন, বার্লিন, ন্যাপলি, মিসিসিপি) বাচ্চার ‘প্রথম নাম’ হিসেবে অনুমতি পাবে না।

রেজিস্ট্রি করা সব নাম লিপিবদ্ধ করে একটা বিশাল মোটা বই আছে এদের। এই বাইরে ‘নতুন’ কোন নাম কোন বাবা-মা রাখতে চাইলে সেই নামের উৎপত্তি, নামের অর্থ, লিঙ্গ-প্রকৃতি, উচ্চারণ-প্রণালী সহ গবেষণা করে এরপর তা ঐ বইএ রেজিস্ট্রি করতে হবে।

বলাই বাহুল্য, আমার দুই ছেলে ‘জায়ান’ ও ‘জাভিয়ান’ নাম দুটি ঐ বইয়ে ছিল না। এরপর আমাকে পাঠানো হল শহরের “নাম গবেষণা ইন্সটিটিউটে”। তারা ব্যাপক গবেষণা করে নামপ্রতি ৪০ ইউরো হিসেবে মোট ৪০X২=৮০ ইউরো সন্মানি নিয়ে অবশেষে নাম দুটি ঐ বইয়ে লিপিবদ্ধ করেছে। আশার কথা, এরপর জার্মানিতে অন্য যে কোন বাবা-মা তাদের বাচ্চার নাম এই ‘দুই নামে’ রাখতে চাইলে আর কোন বাঁধা নেই।

আমাদের বাংলাদেশেও ভবিষ্যত প্রজন্মের নামগুলো যৌক্তিক, অর্থবোধক করার ও কারো হাসির-খোরাক না করার জন্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী। সরকারের উচিত এই ব্যাপারে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং মীরজাফর, রাজাকার, ঐতিহাসিক স্বৈরাচারী শাসক বা কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহারে বাঁধা দিয়ে আইন করা। সঙ্গে প্রতিটি ভবিষ্যৎ বাবা-মা’র ই উচিত “জানের ছদকা আকিকার” মাধ্যমে তাদের বাচ্চার একটা সুন্দর ও অর্থবোধক নাম রাখা, যাতে তার বুকের ধনটিকে সারাটা জীবন শুধুমাত্র তার নামের কারনে সমাজে হাসি-তামাশার পাত্র-পাত্রী না হতে হয়।

লেখকঃ খাজা রহমান, পরিবেশ প্রকৌশলী ও গবেষক, হেমহোলজ সেন্টার ফর ইনভায়রন্মেন্টাল রিসার্চ। লাইপজিগ, জার্মানি।

Print Friendly, PDF & Email