• Home »
  • Featured »
  • রিলে দৌড়ের ব্যাটনটা আমরা কাকে দিয়ে যাচ্ছি?

রিলে দৌড়ের ব্যাটনটা আমরা কাকে দিয়ে যাচ্ছি?

 

জার্মানির মিউনিখ শহরে ২ বছরের প্রশিক্ষনে এসেছিলেন বাংলাদেশের এক সুদর্শন যুবক। তড়িৎ প্রকৌশলী হলেও একজন জাঁদরেল বিসিএস কর্মকর্তা। কর্মক্লান্ত এক বিকেলে তিনি এক সড়ক পার হতে গিয়ে ঘটলো বিপত্তি। লালবাতি দেখেও আশেপাশে তেমন কেউ নেই ভেবে যেইনা রাস্তায় নেমেছেন, অমনি এক মহিলার চিৎকারে রাস্তার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মহিলার সঙ্গে ৩/৪ বছরের এক বাচ্চা।

ভাষা না জানলেও পাশের এক লোকের ইংরেজি অনুবাদের সহায়তায় তিনি বুঝলেন যে ভদ্রমহিলা তার বাচ্চাকে রাস্তায় সাবধানে চলাচলের নিয়মকানুন শেখাচ্ছেন।

কিন্তু লালবাতির মধ্যেও কেউ রাস্তা পার হচ্ছে দেখে বাচ্চাটি তার মাকে “মিথ্যাবাদী” বলছে আর জিদ ধরেছে ওভাবেই পার হতে। মহিলার দাবী উনি যেন ভুল স্বীকার করে বাচ্চাটির কাছে ক্ষমা চান। প্রচণ্ড লজ্জিত উনি তাই করেন এবং বাচ্চাটিকে বুঝিয়ে বলেন যে ওভাবে রাস্তা পার হওয়া বিপদজনক, অনুচিত। সেদিনের অভিজ্ঞতায় উনি আমাকে বলেছিলেন যে প্রশিক্ষণের বাকি সময়ে সেই ভুল আর করেননি। বর্তমানে উনি বাংলাদেশ সরকারের একটি সেবাদানকারী সংস্থার অতি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

নীতি-আদর্শ আর আইন মানায় জার্মানরা বিশ্বে অনুকরণীয়, কিন্তু কিভাবে হল? বাচ্চাদেরকে এদের বাবা-মা উচিত-অনুচিত শেখায়, রাস্তায় কিছু পেলে “লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড“ এ জমা দেয়া শেখায়, কুকুর-বিড়ালের মতো নিরীহ প্রাণীকে আদর-যত্ন করতে শেখায়, ভেদাভেদ না করে সবাইকে সম্মান করতে শেখায়। মজা করেও কোন জার্মানকে দিয়ে দুর্নীতি করানো যাবে না, চেষ্টা করেছি। ‘নৈতিক না’ বলে এড়িয়ে যায়। আর জার্মান আইন ও তার প্রয়োগ কতো কঠোর তা সে তার পরিবার, সমাজ থেকে শিখেই বড় হয়।

পানি পরিশোধনের নিত্যনতুন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা আর বিভিন্ন দেশে প্রয়োগ ছাড়াও আমরা ছাত্র, শিক্ষক ও প্রকৌশলীদেরকে প্রযুক্তির প্রশিক্ষন দেওয়ার পাশাপাশি স্কুলের বাচ্চাদেরকে নিয়ে “ওয়াটার ফান – জীবনের জন্য পানি“ নামে একটা কর্মশালা করি। মরুর দেশ জর্ডান আর প্যালেস্টাইনের বাচ্চাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে পানি কতোটা মূল্যবান, পানির অপচয় নয়, কিভাবে সহজেই ময়লা পানি পরিষ্কার করে আবার ব্যবহার করা যায়। “বড়দেরকে শিখিয়ে লাভ নেই কিন্তু বাচ্চাদের মাথার মেমোরি কার্ড-হার্ডডিস্ক একদম তরতাজা, মনে রাখবে আজীবন” – এটাই মূলত জার্মান প্রজেক্ট দলের মূলনীতি। হাতেনাতে ফল। জর্ডানিয়ান এক বাবা-মার অভিযোগ যে তাদের বাচ্চা নাকি এখন বাড়িতে পানির ট্যাপ ছাড়তেই দেয় না, রান্নাঘরের ময়লা পানি দৌড়ে বাগানের গাছে দিয়ে আসে।

ঘরের বা টয়লেটের বাতি বন্ধ করতে ভুলে যাওয়া আমার স্কুলপড়ুয়া ছেলের উপর প্রয়োগ করেও ম্যাজিকের মতো ফল পেলাম। বিদ্যুতের অগ্নিমূল্য এবং কিভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করা হয় তা বলার পর থেকে ও নিজে তো সুইচ বন্ধ করেই, বাবা-মা করলো কিনা পাহারা দেয়। এটা খাবো না, ঐ কাপড়টা পড়বোনা’র মতো আব্দার বন্ধ হয়ে গেলো আফ্রিকার ভাগ্যবঞ্চিত বাচ্চাদের কিছু ছবি দেখানোর পর। পুরাতন তো বটেই, পারলে এখন সে নতুন কাপড়ও এলাকার রেডক্রসের কন্টেইনারে রেখে আসে।

আসলে আমাদের তো অফিসে বসের মন বুঝতে হয়, ব্যাবসায়-আদালতে মক্কেলের মন বুঝতে হয়, স্টার জলসার নায়িকা ‘পাখি’র মনও বুঝতে হয়, বাচ্চার মন বোঝার সময় কই? বিবেকহীন অভিভাবকরাই একটা বিবেকহীন প্রজন্ম তৈরি করে রেখে যায়। আর অভিযোগ দেয় দেশের বিরুদ্ধে, অজুহাত দেয় “দেশের কিছু হবে না” বলে। ২০ বছর পর আমরা তেমন বাংলাদেশই দেখতে পাবো যেমন এখন শেখাচ্ছি নিজেরই বাচ্চাকে।

জীবনের এই রিলে দৌড় শেষে আমাদের হাতের ব্যাটনটা কাকে দিয়ে যাচ্ছি? সে কি যোগ্য হয়ে তৈরি হচ্ছে আমার দলকে নেতৃত্ব দিয়ে বিজয়ী করার?

লেখকঃ খাজা রহমান, পরিবেশ প্রকৌশলী ও গবেষক, হেমহোলজ সেন্টার ফর ইনভায়রন্মেন্টাল রিসার্চ। লাইপজিগ, জার্মানি।

 

Print Friendly, PDF & Email