জীবন যখন জার্মানিতে:২ (বৃষ্টিস্নাত, ১৪ ডিগ্রী সেলসিয়াসের বার্লিনে)

 

চিৎকার- চেঁচামেচিতে একজন লোক সবার সাথে সাথে আমারও দৃষ্টি আকর্ষণ করল। লোকটা যে USA এ যাচ্ছেন, তাঁর কালকে একটা সেমিনার আছে, সেটা অনেক বার শুনতে  শুনতে  আমার এখনো মুখস্থ হয়ে আছে। আগের দিনে, এক দিনের ফ্লাইট দেরীতে মনে হয় কাতার-এয়ারওয়েজ এর লোকজন কে শুধু গালি দেওয়াটা বাদ রেখেছিল, তাই লোকটাকে আজকে দেখেই চিনতে ভুল হয় নি।

মন ভালো রাখার একটা সহজ উপায় হল, চুপ চাপ আশেপাশের মানুষজনকে খেয়াল করা আর মজার এবং অদ্ভুত কিছু আবিষ্কার করা। কাজটা খুব কঠিন ও না। মানুষ খুব ই অদ্ভুত প্রাণী। তো, ওই লোকটাকেই খেয়াল করতে লাগলাম, যখন প্লেনে ওঠার জন্য ওয়েটিং রুম এ ছিলাম। লোকটা কে ঘিরে ২-৩ জনের এর একটা গ্রুপ হয়ে গেল, সবাই অতীব আগ্রহী, আর লোকটাও আনন্দিত তাঁর USA-সেমিনার এর ব্যাপারে এতো লোকের আগ্রহ দেখে, মনে হল প্লেন এর সব যাত্রী এতো ক্ষণে জেনে গেছে যে আমাদের সাথে একজন যাচ্ছে যার কালকে USA এ একটা বিশাল সেমিনার আছে। যাইহোক, এই লোকটা কে, আর আশে পাশের মানুষদের শেষ মুহূর্তের ফোন-আলাপচারীতা দেখতে দেখতে সময় হয়ে গেলে সুড়ঙ্গ পথ ( !)  দিয়ে প্লেনে চড়া।

নামতে হল দোহা-তে। নেমেই ভাবতে লাগলাম ৭ ঘণ্টা সময় কিভাবে একা একা কাটাবো। পুরো টার্মিনাল ঘুরেও এখনো দেখি বার্লিন-এর প্লেন এর সময় ৫ ঘণ্টার মত বাঁকি। এর মধ্যেই বাসায় এবং বন্ধুদের ফেইসবুকে জানিয়ে দিয়েছি আমার ফ্লাইট এর খবরা-খবর। শূন্যতা অনুভব করতে লাগলাম সাথের কারো জন্য। সাথে থাকলে সময় গুলো অবশ্যই এই রকম বিরক্তিকর হতো না।

৮৪৪,৫৩২৮ মেট্রিক টন কার্গো সাইজের, পৃথিবীর এই ২৬ তম ব্যস্ততম এয়ারপোর্ট-এর ব্যস্ততা দেখতে দেখতে সময় হয়ে গেলো বার্লিনের ফ্লাইটের।পুরো প্লেনের যাত্রীদের মধ্যে আমার রঙের আর কাউকে দেখলাম না, অধিকাংশই জার্মান। তবে একটা ব্যাপার বেশ ভালোই লেগেছে, এই এয়ারপোর্ট -এর ল্যান্ড এরিয়াতে কিছুটা হেটে গিয়ে প্লেনের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়েছিল।

Dr. Arnold Barnett (Massachusetts Institute of Technology), ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৪ সালের এক গবেষণায় পেয়েছিলেন যে, মানুষের মৃত্যু ঝুঁকি প্রতি ফ্লাইটে ১/(৭মিলিয়ন)।

এটা বুঝায় যে, কোন একটা দেশের ভালো মানের প্লেনে করে ভ্রমণ করলে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা ১/ (৭ মিলিয়ন) প্রতি ফ্লাইটে। আরেকটু হিসেব করলে দেখা যায়, কেউ যদি তাঁর জীবনের প্রতিদিন ই প্লেনে ভ্রমন করে, এই গবেষণা থেকে ধারনা করা যায় , একটা প্লেন দুর্ঘটনা ঘটতে তাঁর ১৯০০০ বছর লেগে যাবে। [১]

গত ২০ বছরের ট্রেন দুর্ঘটনার কিছু হিসেব থেকে দেখা যায়, মানুষের ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা ১/ (১ মিলিয়ন) প্রতি ট্রেন যাত্রায়। [১]

ভাবতেই অবাক লাগে, ট্রেন এর চেয়ে প্লেন ভ্রমণ ১০ গুন নিরাপদ, যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় যাত্রীবাহী এয়ারলাইনার, ৫,১৪৫ বর্গ ফুটের জায়গা সম্বলিত AIRBUS A380 স্বাচ্ছন্দ্যে উড়ে যাছে।

বসে থেকে থেকে একদম ক্লান্ত, মুভি-গান কিছুই দেখতে বা শুনতে ইচ্ছে করছে না। জার্মান রা যে চুপচাপ, রোবটের মত সেটা আগেই শুনেছিলাম। তাও, ভাবলাম, পাশের লোকটার সাথে কথা বলি। নিজে থেকে হ্যালো বলার পর লোকটার স্বতঃস্ফূর্তটায় আমি মুগ্ধ। সে নিজে থেকেই তাঁর পরিচয় বলল।

সে একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, নিজের একটা অটোমোবাইল কোম্পানি আছে। বড় হয়েছে মাগডেবুর্গ এ। এখন তাঁর গার্ল ফ্রেন্ড কে সাথে নিয়ে বার্লিনে থাকে। বেশ, আমিও মাগডেবুর্গে যাচ্ছি শুনে ঠিকানা জানতে চাইলো। একদম অজানা এক জায়গার ঠিকানা কিছুটা যেনে নেয়ার চেষ্টা করলাম। তারপর, তাঁর ক্যারিয়ার, পড়াশুনা নিয়ে কথা বলতে বলতে সময় দ্রুত চলতে লাগল।

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটাও একা একা  দেখে শান্তি-সুখ কিছুই পাওয়া যায় না। সাথে একদম কাছের  মানুষ লাগে। যেমনটা, মেঘ আর মেঘের উপরে ভেসে ভেসে উড়ে চলার কোন অনুভূতি ই কাজ করে নি। এভাবেই, বৃষ্টিস্নাত, ১৪ ডিগ্রী সেলসিয়াসের, বার্লিনে চলে আসলাম। আর, শুরু হল জার্মান ভাষা নিয়ে বিরূপ অভিজ্ঞতা।

Mohammad Soriful Islam (https://www.facebook.com/shorif.eee189)

Magdeburg, Germany

[১] www.anxieties.com/86/flying-howsafe#.Urzr__RDv0c

 

Print Friendly