আইনের জালে বাঁধা, সুশৃঙ্খল জীবন

 

চলার পথে প্রতিটি বাঁকে নানা আইনের ফাঁদে পড়তে হয় জার্মানির মানুষকে৷ যেখানে চুল পরিমাণও আইনের চোখ ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই৷ আর সেজন্যই হয়তো প্রত্যেকেই এতোটা স্বচ্ছন্দে ভোগ করতে পারেন নিরাপত্তার অনুভূতি৷

এই সমাজের আঁকে-বাঁকে ঘুরতে গিয়ে তাই প্রায়ই চোখে পড়ে চমৎকার ভদ্র বেশে পুলিশ সদস্যদের হাঁটাচলা৷ খুব অল্প-স্বল্পই দেখা মিলে এই বাহিনীর সদস্যদের৷ তবে অধিকাংশ সময়ই দেখা যায় তাদের জন্য নির্ধারিত ভদ্র রঙের পোশাকের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের জন্য নির্ধারিত ভদ্র রঙের কারে করে ঘুরে বেড়াতে৷ এমনটি খুব কমই দেখা যায় যে, কোথাও দাঁড়িয়ে তারা টহল দিচ্ছে৷ কারণ পুলিশ সদস্যরা একদিকে যেমন কোথাও দাঁড়িয়ে নেই, আবার অন্যদিকে যেন তারা সব জায়গায় বিরাজমান৷ কারণ শহর থেকে গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাস-ট্রাম স্টেশন, বাজার কিংবা মোড়েই দেখা যায় পুলিশের সাহায্য চাওয়ার জন্য বিনামূল্যে ফোন করার নির্ধারিত বাক্স৷ সেখানে নির্ধারিত বোতামে চাপ দিলেই সাথে সাথে অপর পার থেকে পুলিশ সদস্যরা সাড়া দেবেন৷ আর তারপরই একটি বিশেষ সুরে ভেঁপু বাজিয়ে ক্ষণিকের মধ্যেই ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে যাবেন জনগণের সেবক এই পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা৷

রাইনলান্ড ফাল্স রাজ্যের পুলিশ বাহিনী

প্রায়ই মনে হয় এদেশে পুলিশ সদস্যরাই বোধ হয় সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ৷ কারণ এমনটি কখনও কারো মুখে শোনা যায় নি যে, কেউ তাদের ঠোলা বলে গালি দিচ্ছে কিংবা তাদের ব্যাপারে কারো এতোটুকু নেতিবাচক ধারণা রয়েছে৷ তারা একদিকে যেমন অহেতুক কাউকে কখনই হয়রানি করে না তেমনি আবার কেউ আইন ভঙ্গ করলে এতোটুকু ছাড় নেই সেটাও সবার জানা৷ তাই প্রায়ই মনে হয়, এশিয়ার দেশগুলিতে সেনাবাহিনীর সদস্যদের ব্যাপারে অন্তত এখনও মানুষের যে একটা সম্মানসূচক দৃষ্টিভঙ্গি আছে বলে মনে হয়, এখানকার পুলিশ সদস্যরাই তার চেয়েও বেশি শ্রদ্ধা আর ভক্তি পান৷ তবে পুলিশের মতো পেশায় থেকে কেউ এতোটা সম্মান পাওয়ার পেছনে সম্ভবত সবচেয়ে বড় কারণ হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তাদের শতভাগ দৃঢ়তা৷ কারণ এদেশের কোন একজন পুলিশ কিংবা কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীই এক পয়সাও ঘুস নেন কিংবা দেন, এমন কথা শোনা যায় না৷ তেমনি আবার কোটি টাকা দিয়েও তাদের দায়িত্ব থেকে এতোটুকু সরানো যাবে না এমন বিশ্বাস প্রায় সবার বলেই মনে হয়৷

যাহোক, পুলিশ গোষ্ঠীর সদস্যদের প্রতি এতোটা ভক্তি দেখে পাঠক বিরক্ত হতেই পারেন৷ তার যথেষ্ট কারণও রয়েছে আমাদের সমাজের সেই আইনের রক্ষকদের সাধুতার কারণে৷ তবুও এখানকার পুলিশ সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা তৈরির আরো কিছু কারণ রয়েছে৷ তা না বললেই নয়৷ যেমন প্রতিটি মানুষ এখানে নিজের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন৷ ঠিক একইভাবে মানুষের এবং নিজেদের অধিকার ও ক্ষমতার সীমারেখার ব্যাপারে পূর্ণ সচেতন পুলিশ সদস্যরাও৷ হয়তো কোন ব্যক্তিকে আটক কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন৷ কাছেই কোন পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে৷ ফলে হেঁটে যাওয়ার পথ৷ দেখা যায়, সেই অপরাধী কিংবা সন্দেহভাজন ব্যক্তির সাথে দুই তিন জন পুলিশ সদস্য পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছেন৷ শুধু পোশাকেই তাদের মধ্যে পার্থক্য বোঝা যায়৷ কিন্তু এছাড়া কোন ব্যবধান থাকে না তাদের মধ্যে৷ অর্থাৎ কোন হাতকড়া পরানো নেই৷ পথে নিয়ে যেতে যেতে লাঠিপেটা করা হয় না কাউকে৷ এমনকি আইনি অধিকার ছাড়া কাউকে স্পর্শও করে না খাকি পোশাক পরিহিত এসব সভ্য-ভদ্র মানুষগুলো৷

অবশ্য পুলিশের এতোটা ভদ্রতার আরেকটি কারণ হতে পারে যে, এদেশে দৌড়ে পালিয়ে কারো পক্ষে রক্ষা পাওয়ার কোন উপায় নেই৷ একদিকে যেমন কোন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা কোন অপরাধীকে ছত্রছায়ায় রেখে রক্ষা করবে না৷ অন্যদিকে এখানকার প্রতিটি মানুষের সকল প্রয়োজনীয় তথ্য সরকারের কাছে সুস্পষ্টভাবে সংরক্ষিত৷ অর্থাৎ প্রতিটি নাগরিকের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য কর্তৃপক্ষের হাতে রয়েছে৷ দেশি হোক বিদেশি হোক প্রতিটি মানুষের হাতে রয়েছে নিজস্ব পরিচয় পত্র৷ এমনকি পথের ধারে যদি কেউ ছোট্ট হোক বড় হোক কোন অপরাধ করেই ফেলে, পলাতক থাকার বিন্দুমাত্র গলিপথ কারো জন্যেই খোলা নেই৷

তবে আসল কথাই যাওয়া যাক৷ ইউরোপের সবচেয়ে ধনী দেশ বলেই হয়তো জার্মান সমাজের আনাচে-কানাচে নানা বাহারের গাড়ির বহর চোখে পড়ার মতোই৷ তাছাড়া একদিকে গাড়ির সংখ্যা বেশি আবার অন্যদিকে নিরাপত্তাও বেশ ভালো বলেই হয়তো সব গাড়িকে একেবারে গ্যারেজে পুরে মানুষের চোখের আড়ালে রাখার সুযোগ এবং প্রয়োজনীয়তা দুটোই থাকে না৷ ফলে প্রায় সব রাস্তার ধারেই দেখা যায় গাড়ি রাখার সুন্দর ব্যবস্থা৷ অবশ্য ঠিক কোন জায়গায় ক’টা গাড়ি কতক্ষণ সময় কীভাবে রাখা যাবে সেটিও সুনির্দিষ্ট করে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে৷ তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো গাড়িতে কখনও কোন আঁচড় পড়ার কথা চট করে শোনা যায় না৷ আসলে মূল কথা হলো কেউ কোন গাড়িতে আঘাত করে পালিয়ে বেঁচে যাবে এমন সুযোগতো কোথাও নেই৷ কারণ অনেক জায়গায় ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার চোখ হাঁ করে চেয়ে রয়েছে৷

একদিন এক সহকর্মী এসে বললেন, আজ আমার খুব মন খারাপ৷ কারণ জিজ্ঞেস করতেই বললেন সেই আজব কাহিনী৷ তিনি গত মাসে কোন কোন দিন কোন পথে ঠিক কয়টার সময় নির্ধারিত গতির চেয়ে বেশি গতিতে গাড়ি চালিয়েছিলেন তার ফিরিস্তি আজ বাসায় এসে হাজির৷ এমনকি ঠিক যেই মুহূর্তে গাড়ির গতি নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, সেই মুহূর্তের ছবিসহ যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে জরিমানার চিঠির সাথে৷ আর লিখে দেওয়া হয়েছে জরিমানার পরিমাণ এবং তা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে৷ শুধু তাই নয়, গাড়ি চালাতে গিয়ে এমন অপরাধের মাত্রার উপর নির্ভর করে গাড়ি চালকের ছাড়পত্রে যোগ হতে থাকে নির্ধারিত পয়েন্ট হ্রাসের চিহ্ন৷ হতে পারে চালকের ছাড়পত্র পুরোপুরি বাতিল কিংবা নির্ধারিত সময়ের জন্য স্থগিত৷ এমনই নানা আইনি বেড়াজালের মধ্য দিয়েই হয়তো জার্মান জাতি হয়ে উঠেছে সুশৃঙ্খলতার এক চমৎকার উদাহরণ৷

প্রতিবেদন: হোসাইন আব্দুল হাই
সম্পাদনা: সঞ্জীব বর্মন
সূত্রঃ DW.de

Print Friendly