• Home »
  • Life-in-Germany »
  • স্মরণে হুমায়ূন আহমেদ – হোয়েনহাইম বিশ্ববিদ্যালয়, স্টুটগার্ট

স্মরণে হুমায়ূন আহমেদ – হোয়েনহাইম বিশ্ববিদ্যালয়, স্টুটগার্ট

 

গত ২৬ আগস্ট জার্মানীর স্টুটগার্টে হোয়েনহাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছাত্রছাত্রীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো প্রয়াত লেখক ও কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের

স্মরণে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান “A simple effort to remember Humayun Ahmed” (স্মরণে হুমায়ূন আহমেদ)।

 

অনুষ্ঠান বিকাল চারটায় শুরু হবার কথা থাকলেও বৃষ্টি বিঘ্নিত আবহাওয়ার দরুন এর শুরু কিছুটা বিলম্বিত হয়। যদিও তাতে আয়োজকদের আন্তরিকতা বা দর্শকদের উৎসাহে কোনরূপ ঘাটতি দেখা যায়নি। অতঃপর অনুষ্ঠান শুরু হয় স্বাগত বক্তৃতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন দিয়ে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে মিঠুন স্বাগত বক্তব্য পাঠ করেন। এর পরপরই হুমায়ূন আহমেদের জন্ম, মৃত্যু, ব্যক্তি ও কর্মজীবন নিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিবেশনা উপস্থাপন করেন রনী। এর মাধ্যমে দর্শকদের সামনে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, স্বপ্ন ইত্যাদি অনেক কিছুই দর্শকের সামনে তুলে ধরা হয়।

 

উক্ত পর্বের পর লেখকের ভাগনি শর্মি আসেন মঞ্চে। উল্লেখ্য এই অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন লেখকের ভাগনি শবনম হায়দার শর্মি ও তাঁর পরিবার।  তিনি শুরু করেন তার বড়মামাকে নিয়ে আবেগঘন ও স্মৃতিবিজড়িত কথামালা। কিছুক্ষন পরেই তিনি প্রচন্ড আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ছোট্ট অডিটোরিয়ামের বাতাস যেন মুহূর্তেই ভারী হয়ে পড়ে আর তার সাথে সাথে দর্শকদের হৃদয়ও আর্দ্র হয়ে আসে। কখনো কান্নাজড়িত কন্ঠে বা কখনো মৃদু আনন্দ রসের মাধ্যমে তিনি যখন তাঁর মামাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করছিলেন তখন দর্শকদেরও দেখা যায় তাঁর বক্তৃতার সাথে একাত্ত হয়ে কখনো নিস্তব্ধতায় ডুবে যেতে বা কখনো সশব্দে হাসিতে ফেটে পড়তে। শর্মি তাঁর সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন মামার সাথে তাঁর একান্ত ছবি ও তাঁকে উদ্দেশ্য করে লেখা হুমায়ূন আহমেদের আজ পর্যন্ত অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি “ জুতাওয়ালা শর্মি”-র অংশ বিশেষ। এর ফলে দর্শকদেরও হুমায়ূন আহমেদের নিজহাতের লেখার সাথে পরিচয় ঘটে। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শর্মি তাঁর বড়মামাকে জড়িয়ে অনেক ঘটনার কথাই উল্লেখ করেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো একবার হুমায়ূন আহমেদ তাঁকে নিয়ে বেইলী রোডে শাড়ী কিনতে যান ও শর্মির পছন্দমত একটি শাড়ী কিনে দেন (সেই শাড়ীটিই শর্মি পড়ে এসেছিলেন অনুষ্ঠানে)। তাছাড়া ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষার আগে হুমায়ূন আহমেদ একবার অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অসুস্থ অবস্থায় বৃত্তি পরীক্ষা দিয়েও পরে বৃত্তি পান,  ভাগিনা-ভাগিনিরা প্রতি ঈদে সালাম করে কিভাবে মামার কাছ থেকে সালামী আদায় করতেন ইত্যাদি এমন আরো অনেক অনেক গল্পই দর্শকদেরকে প্রাণভরে উপভোগ করতে দেখা যায়।

শর্মি মঞ্চ থেকে নেমে গেলে মঞ্চে আসেন মিঠুন ও বায়েজীদ। তাদের যৌথ উপস্থাপনায় দর্শকরা উপভোগ করেন কবিতা ও গানের একটি মিলিত কম্পোজিশন। গানের দায়িত্বে ছিলেন বায়েজীদ ও কবিতা পাঠ করছিলেন মিঠুন। তারা জোছনা, বর্ষা, বৃক্ষরাজি তথা অকৃত্রিম নৈসর্গিক প্রকৃতির প্রতি হুমায়ূন আহমেদের যে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও গভীর অনুরাগ তা কবিতা ও গানের যুগলবন্দীতে সুন্দর পরিবেশনার মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন। নৈসর্গের প্রতি হুমায়ূনের যে ভালোবাসা বা মমত্ববোধ তা তাঁর রচনা, কর্ম  তথা সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁর দর্শক ও পাঠকদের মাঝে সঞ্চালিত হয় ও তাদের মোহিত করে। এই যুগলবন্দী পরিবেশনা যেন ছিল  প্রয়াত সাহিত্যিকের প্রতি তাঁর ভক্তকুলের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

এরপর মঞ্চে আসে হুমায়ূন দৌহিত্রা তথা শর্মির দুই কন্যা, এহা (৫ বছর) ও রিহা (২ বছর)।

তারা পরিবেশন করে আজ পর্যন্ত অপ্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদ রচিত ছড়াগান “একটি পাখির গল্প”।

ছোট্ট শিশুদ্বয় যখন মঞ্চে নেচে গেয়ে গানটি পরিবেশন করছিল, তখন দর্শকদেরও তাদের সাথে ছন্দে তাল মেলাতে দেখা যায়।

পরিবেশনা শেষে তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে এহা ও রিহার প্রস্থানের পর মঞ্চে আসেন সুফল তার পর্ব নিয়ে। তিনি হুমায়ূন আহমেদের বিভিন্ন বই, নাটক, সিনেমা, হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে বিশিষ্টজনের ভাবনা, এবং তাঁর সম্পর্কে তাঁর নিজের ভাবনা ইত্যাদির ভিডিও ক্লিপিংস এর উপর ভিত্তি করে নির্মিত সংক্ষিপ্ত ভিডিওচিত্র “স্মরণে হুমায়ূন আহমেদ” উপস্থাপন করেন। তার পর্বটি দর্শকদেরকে হুমায়ূন আহমেদ এর বিভিন্ন সৃষ্টি সম্পর্কে নস্টালজিক ও আবেগপ্রবণ করে তোলে।

এরপর শুরু হয় দর্শকদের সরাসরি অংশগ্রহনে অনুষ্ঠিত পর্ব “আমাদের স্মৃতিতে আমাদের হুমায়ূন”, যেখানে দর্শকরা হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে তাদের নিজ নিজ আবেগ, অনুভূতি, স্মৃতিকথা ইত্যাদি তুলে ধরার সুযোগ পান। বিশেষ করে রনী পাল যখন তার স্বভাব সুলভ মজার ভংগিতে হুমায়ূনের বিভিন্ন জনপ্রিয় ও আলোচিত চরিত্র যেমন বাকের ভাই, হিমু, মিসির আলী ইত্যাদি সম্পর্কে একের পর এক বলে যাচ্ছিলেন তখন তার বর্ণনার সাথে সাথে দর্শকদের হাসিতে ফেটে পড়তে দেখা যায়। এই পর্বের শেষ দিকটা যেন আসলে একটি চমৎকার ঘরোয়া আড্ডায় পরিণত হয় । হুমায়ূন-ভাগনীকে কাছে পেয়ে দর্শকরা তাকে জেঁকে ধরেন তাদের প্রিয় লেখক সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানতে। এর সাথে সাথে তারা উচ্ছ্বসিতভাবে তাদের নিজেদের মন্তব্যও শেয়ার করতে থাকেন।

আড্ডা যেন আর থামতেই চায়না। তারপরও আড্ডার একপর্যায়ে শুরু হয় দর্শকদের জন্য আপ্যায়ন পর্ব। ঝালমুড়ি, পেঁয়াজু আর ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের সাথে চলতে থাকে দর্শক ও আয়োজকদের মাঝে কুশলাদি বিনিময়, আড্ডা আর বিভিন্ন বিষয়ে স্মৃতিচারণ। আপ্যায়নের বিশেষ আকর্ষণ ছিল শর্মি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত হুমায়ূন আহমেদের বিশেষ পছন্দের খাবার ‘নেরেস্তার হালুয়া’, যার স্বাদ ভোজনরসিকদের খুবই আগ্রহের সাথে আস্বাদন করতে দেখা যায়।

আড্ডা কিছুটা স্তিমিত হয় এলে শুরু হয় পরবর্তী আয়োজনঃ সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে একটি নাটক উপভোগ। নাটকের নাম ‘একদিন হঠাৎ’, রচনা হুমায়ূন আহমেদ, পরিচালনা মোস্তাফিজুর রহমান। নাটকটি ১৯৮৬ সালে বিটিভিতে প্রচারিত হয় ও সেই সময় তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। নাটকটিকে উপস্থিত সব বয়েসী দর্শকদেরকে তুমুলভাবে বিনোদিত করতে দেখা যায়। প্রমাণিত হলো প্রথম প্রচারের পর প্রায় ২৬ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও হুমায়ূনের সৃষ্টি সমভাবে সেই আগের মতই দর্শকদের হাসাতে পারে, কাঁদাতে পারে, আবেগে উদ্বেলিত করতে পারে। একসময় নাটকটি শেষ হয়, কিন্তু তাতেও যেন দর্শকদের মুগ্ধতার রেশ কাটে না। বিদায়ের ক্ষণ বেজে উঠে। আয়োজকদের পক্ষ হতে সুফল ও মিঠুন উপস্থিত দর্শকদের অনুষ্ঠানে আসার জন্য ও অনুষ্ঠানটি উপভোগ করার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষনা করেন। এরপর দর্শকরা একে একে আবেগভারাক্রান্ত মন নিয়ে, বৃষ্টিভেজা পথে বাড়ির দিকে পা বাড়ান। হয়ত তাদের মনে তখনও বাজতে থাকে হুমায়ূনের গান ‘বরষার প্রথম দিনে……’ কিংবা এমনই অন্য কোন গানের অন্য কোন সুর।

টুকরো-ভিডিও: 

[youtube_sc url=”http://www.youtube.com/watch?v=oRa1ElDf4nE” width=”450″ height=”300″]

[youtube_sc url=”http://www.youtube.com/watch?v=iRxuNYKP-Is” width=”450″ height=”300″]

[youtube_sc url=”http://www.youtube.com/watch?v=5_ip_At1K98″ width=”450″ height=”300″]

[youtube_sc url=”http://www.youtube.com/watch?v=o-nS6fzzHps” width=”450″ height=”300″]

 

Print Friendly