অবৈধভাবে বাস – প্রতি মুহূর্তে আতঙ্ক

 

জীবন যখন সরু সুতোয়

ছয় বছর ধরে জার্মানিতে অবৈধভাবে বাস করছেন সান ডে, তাঁর কথায় অন্ধকারের এক জগতে৷ ভাগ্য ভালো থাকলে ঘণ্টায় তিন ইউরোর কাজ ও কোথাও একটু শোয়ার জায়গা পান তিনি৷ আর অসুখ বিসুখ করলে পড়তে হয় অকূলপাথারে৷

জার্মানিতে ৫ থেকে ১০ লাখের মতো বিদেশি বসবাস করেন, যাদের দেশটিতে থাকার মতো বৈধ কাগজপত্র নেই৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য অনেক দেশেই এরকম অবস্থায় বিদেশিদের কয়েক বছর পর পর থাকার অনুমতি দেয়া হয়৷ কিন্তু জার্মানিতে এক্ষেত্রে এখনও অনীহা দেখা যায়৷ বেআইনিভাবে বসবাসকারীদের মধ্যে রয়েছেন পাঁচমিশেলি লোকজন৷ রয়েছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল থেকে আসা শরণার্থী ও রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীরা৷ আছেন সন্তানের কাছে থাকতে আসা অনেক বৃদ্ধ মা বাবা আর রয়েছেন পড়া ছেড়ে দেয়া কিছু বিদেশি ছাত্রছাত্রী৷ যাদের হয়ত স্বদেশে ফিরে যাওয়ার পথটাও মসৃণ নয়৷

প্রতি মুহূর্তে আতঙ্ক

অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশিদের প্রতি পদে পদে দোষ-ত্রুটি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়৷ লাল ট্রাফিক বাতিতে রাস্তা পার না হওয়া, বিনা টিকিটে ট্রামে বাসে না ওঠা, কারো সাথে ঝগড়াঝাটিতে জড়িয়ে না পড়া, এসব দিকে লক্ষ্য রাখতে হয় তাদের৷ একটু এদিক ওদিক হলেই পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয় থাকে৷ কাজ করে বেতন না পেলেও মুখ বুজে থাকতে হয়৷ অসুখ বিসুখে ডাক্তারের কাছে বা হাসপাতালে যেতেও আতঙ্ক তাদের৷ এসব কারণে মানসিক অসুখের কবলেও পড়েন অনেকে৷

পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আসা শিক্ষিত এক মানুষ সান ডে এখনও জার্মানিতে বৈধভাবে থাকার কাগজপত্র পাননি৷ তাই কোনোও রকমে ছোট খাট কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে তাঁকে৷ কখনও কখনও শিশি বোতল কুড়িয়ে তা বিক্রি করে কিছু আয় করেন৷ একবার কয়েক সপ্তাহের বেতন না দিয়ে মালিক তাঁকে প্রতারণা করেন৷ কিন্তু প্রতিবাদ করার কোনো উপায় ছিল না৷ অসুখ বিসুখ হলেও ডাক্তার দেখাতে পারেন না সান ডে৷ কিছুদিন আগে অ্যালার্জি হওয়ায় ভীষণ শ্বাসকষ্ট হয়েছিল তাঁর৷ অবশেষে মার্টিন লুথার চার্চের সাহায্য নিতে হয়েছিল তাঁকে৷ সান ডের ভাষায়, ‘‘অবৈধভাবে বসবাস করলে সর্বদা লড়াই করে চলতে হয়৷” দুবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন ভুক্তভোগী এই মানুষটি৷

অবৈধ অভিবাসীদের পুলিশের কাছে ধরা পড়ার ভয়ে থাকতে হয় সবসময়

 

এগিয়ে এসেছে কিছু সংগঠন

মানবিক এই সমস্যাটা নিয়ে মিউনিখ, বার্লিন ও কোলনসহ কয়েকটি শহরে কিছু কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে৷ অবৈধভাবে বসবাসকারীরা যাতে কিছুটা হলেও মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সে ব্যাপারে সচেষ্ট হয়েছেন এখন কোলনের নগর কর্তৃপক্ষ৷ আন্তঃসংস্কৃতি বিষয়ক মুখপাত্র আন্ড্রেয়াস ফেটার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশিদের বৈধতা দেয়া আমাদের লক্ষ্য নয়৷ আমাদের চিন্তাভাবনা হল, সমাজ এটা হতে দিতে পারে না, যে কিছু মানুষ অসুস্থ হয়ে পেছনের ঘরে মারা যাবে কিংবা বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারবে না৷”

সম্প্রতি কোলন শহরের গির্জা কর্তৃপক্ষ অবৈধ অভিবাসীদের সমস্যা বিশেষ করে স্বাস্থ্যরক্ষার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছেন৷ এ লক্ষ্যে একটা কমিটি গড়ে তোলা হয়েছে৷ কমিটিতে রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নগর প্রশাসন, পুলিশ, বিভিন্ন সামাজিক সংস্থা ইত্যাদি৷ কমিটির পক্ষ থেকে অসনাব্রুক ইউনিভার্সিটির অভিবাসী গবেষণা ইন্সটিটিউটকে কোলনের অবৈধ অভিবাসীদের অবস্থা সম্পর্কে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের ভার দেয়া হয়৷

সমীক্ষা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বেশ কিছু সুপারিশ উঠে আসে, যে গুলির বেশ কিছু বাস্তবায়িত হয়েছে৷ বিশেষ করে অবৈধ অভিবাসীদের স্বাস্থ্যরক্ষার উন্নয়ন করা হয়েছে৷ গির্জার তরফ থেকে জরুরি বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ বাচ্চাদের জন্য স্কুলে ভর্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে৷

এই কর্মসূচির জন্য পাঁচটি পরামর্শ কেন্দ্র খোলা হয়েছে৷ যার একটি হল প্রোটেস্টান্ট গির্জার সমাজকল্যাণমূলক সংস্থা ডিয়াকনি৷ এই সংস্থায় কাজ করেন মার্টিনা ডোমকে৷ তাঁর সহায়তায় অনেক অবৈধ অভিবাসী ছোট খাট অসুখ বিসুখে চিকিত্সা পাচ্ছেন৷ মার্টিনা জানান, ‘‘অনেকেই আমার কাছে আসেন, যেহেতু তাদের মানসিক ও শারীরিক শক্তি একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়৷ বৈধ কাগজপত্র না থাকায় যে কোনো কাজই তাদের নিতে হয়৷ সে সব কাজ যে খুব সহজ তা বলা যায় না৷”

নিষ্ঠুর পরিহাস

কঠিন অসুখ হলে বা বয়স হয়ে গেলে বেআইনিভাবে বসবাসকারীদের আর কোনো গতি থাকে না৷ মার্টিনা তাদের স্বদেশে চলে যেতে পরামর্শ দেন৷ কেননা এখানে তাদের থাকার অনুমতি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে৷ মার্টিনা ডোমকে অবশ্য মানবিক কারণে কাউকে কাউকে জার্মানিতে থাকার ব্যাপারে সাহায্য করেছেন৷ কিন্তু সে সব কারণ কারোই কাম্য হতে পারে না৷ মার্টিনার ডোমকের ভাষায়, ‘‘কারো কঠিন অসুখ হলে যেমন কেউ ক্যান্সার বা এইডস’এ আক্রান্ত হলে এবং স্বদেশে চিকিত্সার সুব্যবস্থা না থাকলে জার্মানিতে থাকার অনুমোদন পেতে পারেন৷”

তবে এসব তত্পরতা সত্ত্বেও কোলন শহরে বৈধ কাগজহীন অভিবাসীরা স্বাভাবিকভাবে জীবন কাটাতে পারছেন, এ কথা বলা যায় না৷ সান ডে’র ভাষায়, ‘‘বেআইনিভাবে থাকতে থাকতে কখনও এমন সময় আসে, যখন আর জীবন চালানো যায় না৷”

প্রতিবেদন: ডেনিস শ্টুটে / আরবি

সম্পাদনা: জাহিদুল হক

Source: http://www.dw.de/dw/article/0,,16144179,00.html

 

Print Friendly, PDF & Email