• Home »
  • Deutsche-Welle-Article »
  • জার্মানিতে ‘অবৈধভাবে’ বসবাসরত মানুষদের দুরবস্থা

জার্মানিতে ‘অবৈধভাবে’ বসবাসরত মানুষদের দুরবস্থা

 

আনুমানিক ৪০০,০০০ বিদেশি বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই জার্মানিতে বসবাস করেন৷ এইসব মানুষরা সবসময় আতঙ্কে থাকেন৷ মানবাধিকার ও নিয়মিত চিকিত্সার সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত তাঁরা৷

ইকুয়েডর থেকে আসা মারিয়া (নাম পরিবর্তন করা) কখনও বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়েননি৷ ট্রাফিকের লাল বাতিতে রাস্তা পার হননি৷ কাজকর্মে ফাঁকি দেননি৷ ঝাড়ামোছা করেছেন মনোযোগ দিয়ে৷ কখনও অসুস্থতার কারণে ছুটি নেননি৷ যদিও তাঁর বেতন দিয়ে জীবনধারণ করাটা ছিল খুব কষ্টকর৷ ১৫ বছর ধরে ভালই কাটছিল৷ অবশেষে এল ২০০৯ সালের গ্রীষ্মকালের সেই দিনটি৷

অতর্কিতে পুলিশি নিয়ন্ত্রণ

সেদিন তাড়া ছিল মারিয়ার৷ শর্টকাট পথে স্টেশনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন৷ অতর্কিতে পুলিশের নিয়ন্ত্রণের মুখে পড়েন তিনি৷ পুলিশ ডকুমেন্ট দেখতে চাইলে কিছু দেখাতে পারেননি মারিয়া৷ কেননা তাঁর তো কোনো বৈধ কাগজপত্রই ছিল না৷ এর পরের ঘটনা সহজেই অনুমান করা যায়৷ মারিয়ার মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছিল৷

কাগজপত্রহীনদের চিকিৎসা দিচ্ছেন ভিয়র্ট ও কর্টমান

মেয়েকে বছরটি শেষ করার সুযোগ দেওয়া হয়৷ তা নাহলে সেদিনই মারিয়াকে বহিষ্কারের জন্য আটক করা হতো৷ মারিয়ার কন্যার জন্ম হয়েছে জার্মানিতে৷ মায়ের দেশকে চেনে সে শুধু মানচিত্র থেকে৷ স্প্যানিশ বলে খুব ভাঙা ভাঙা৷ তার বাবাও বৈধ কাগজপত্র ছাড়া জার্মানিতে বসবাস করতেন৷ মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ হয়েছে অনেক আগেই৷

প্রশংসনীয় উদ্যোগ

‘‘এটা খুবই দুঃখজনক”, বলেন ৬১ বছর বয়সি সিগরিট বেকার-ভিয়র্ট৷ ‘মেডি নেত্স বন’ নামে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন তিনি৷ এর মাধ্যমে উলরিশ কর্টমান ও আরো দশ সহকর্মীর সঙ্গে শরাণার্থী ও বৈধ কাগজপত্র ছাড়া জার্মানিতে বসবাস করছেন, তাঁদের দেখাশোনা করেন বেকার-ভিয়র্ট৷ এইসব মানুষ যাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়া চিকিত্সা পায়, সেই চেষ্টা করেন তিনি৷

এই উদ্যোগটি গঠিত হয় ২০০৩ সালে৷ তখন আশা করা হয়েছিল একদিন হয়তো এর আর প্রয়োজন হবে না৷ কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক দিক দিয়ে এখন পর্যন্ত অবস্থার পরিবর্তন হয়নি – বলেন প্রাক্তন শিক্ষিকা সিগরিড বেকার-ভিয়র্ট৷

তাঁর নেটওয়ার্কে বন শহর ও আশেপাশের অঞ্চলের বিভিন্ন বিভাগের ৮০ জন হৃদয়বান চিকিৎসক সম্পৃক্ত৷ এটি একটি স্বাধীন সংস্থা৷

‘মেডি নেত্স বন’ এর অফিস

চাঁদার টাকায় চলে এর কর্মকাণ্ড৷ ২০১৩ সালে সাহায্যপ্রার্থী মানুষদের চিকিত্সাবাবদ ৪৩,০০০ ইউরো খরচ করে সংস্থাটি৷

কাগজহীনরা’ চিকিত্সা পান

প্রতি সোমবার ‘কাগজহীনরা’ বিকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে সাতটা পর্যন্ত চিকিৎসার জন্য জড়ো হন বনের উত্তরাঞ্চলে বিবর্ণ একটি বাড়িতে৷ অনুমান করা হয়, বন ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ৪,০০০-এর মতো মানুষ ‘অবৈধভাবে’ জার্মানিতে বসবাস করছেন৷

অনেকে ভীতসন্ত্রস্তভাবে প্রবেশ করেন চিকিত্সাকেন্দ্রে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই ওয়েটিং রুম ভরে যায় বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষজনে৷ তাঁরা এসেছেন নানা অসুখবিসুখ নিয়ে ফিলিপাইন্স, পেরু, কসোভো, সিরিয়া ইত্যাদি দেশ থেকে৷ নিজেদের পরিচয় দিতে চান না তাঁরা৷ তাঁদের আস্থা অর্জন করতে সিগরিড বেকার-ভিয়র্টকেও বেশ বেগ পেতে হয়েছে৷

কঠিন অসুখও দেখা দেয়

জ্বরজারি, পিত্তসমস্যা, টনসিলের ব্যথা ইত্যাদি সচরাচর দেখা দেওয়া রোগব্যাধির পাশাপাশি টিউমার ও ক্যানসারের মতো কঠিন অসুখবিসুখ নিয়েও আসেন অনেকে৷ কাজ হারানোর ভয়ে অসুখের কথা গোপন রাখেন কেউ কেউ৷ অনেকে আবার কার কাছে যেতে হবে, তাও জানেন না৷ তাই এই চিকিত্সাকেন্দ্রে আসতে আসতে অনেকটাই দেরি হয়ে যায়৷

চিকিৎসার জন্য এখানে এসে অপেক্ষা করতে হয়

এইসব মানুষের চিকিত্সার জন্যও জার্মানিতে কিছু আইনকানুন রয়েছে৷ তবে শুধু কঠিন অসুখবিসুখের ক্ষেত্রে৷ এই অবস্থায় জার্মানিতে সাময়িকভাবে অবস্থানের অনুমতি পান তাঁরা৷ অসুখ ভাল হয়ে গেলে সেটা আবার বাতিল হয়ে যায়৷ ‘মেডি নেত্স বন’-এর পক্ষে কেমোথেরাপির মতো চিকিত্সার ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব নয়৷ তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই নামধাম প্রকাশ করে এই ধরনের অনুমতির ব্যবস্থা করতে হয় সিগরিড বেকার-ভিয়র্টকে৷

আর্থিক টানাপড়েনে কিংবা ধরা পড়ার আতঙ্কে থাকতে থাকতে মানসিক অসুখে আক্রান্ত হয়ে পড়েন অনেকে৷ এ ক্ষেত্রেও ভুক্তভোগীদের জন্য সাময়িক অনুমতির ব্যবস্থা করতে পারেন বেকার-ভিয়র্ট ও তাঁর সহযোগীরা৷

মানবতাই বড় বিষয়

মারিয়া ও তাঁর মেয়ের কী অবস্থা হয়েছিল, সেটা জানেন না বেকার-ভিয়র্ট৷ তিনি আশা করেন, অন্তত তারা ভাল আছে৷ বিশেষ করে বাচ্চা মেয়েটি পিতৃপুরুষের অপরিচিত দেশে মানিয়ে নিতে পেরেছে৷

আজ এই ধরনের ঘটনা ঘটলে কঠিন পরিস্থিতির আওতায় ফেলে ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ আইনসিদ্ধ করার চেষ্টা করেন তিনি৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘যে সব বাচ্চার জন্ম জার্মানিতে, বন্ধুবান্ধবও রয়েছে এখানে, তারা তো আসলে বিদেশি নয়! এই দেশেরই মানুষ৷”

সূত্র~ ডয়েচে ভেলে বাংলা

Print Friendly, PDF & Email