যন্ত্রে ভাসে বাংলা ভাষা

 

বছর দুয়েক আগের কথা। এক বন্ধুর সঙ্গে কম্পিউটার থেকে ফেসবুকে কথা হচ্ছিল লিখে লিখে। আমরা কথা চালাচালি করছিলাম বাংলাতেই। কম্পিউটার বন্ধ করে বাইরে যেতে হলো। অসুবিধা কী! মুঠোফোন থেকেই তো চলে ফেসবুক চ্যাট। বন্ধু তখনো বাংলায় চালিয়ে যাচ্ছে। আর মুঠোফোন থেকে আমি রোমান হরফে বাংলা মানে বাংরেজি প্রত্যুত্তর লিখে যাচ্ছি। হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমার বার্তাই জমছে শুধু, ওদিকে সাড়াশব্দ নেই। কিন্তু তাকে ‘অনলাইন’ দেখাচ্ছে। ফোন দিলাম। উত্তর না দেওয়ার কারণ হিসেবে বন্ধু জানাল, ‘রোমান হরফে কেউ বাংলা লিখলে উত্তর দিই না।’ তাকে জানালাম, মুঠোফোন থেকে বাংলায় লিখতে ঝামেলা হচ্ছে, তাই রোমান হরফে কাজ চালাচ্ছি। এর পর থেকে যতবার রোমান হরফে বাংলা লিখতে যাই, ততবারই সেই ঘটনার কথা মনে পড়ে। আর সেটা মনে করে নেহাত ঠেকে না গেলে বাংরেজি (বাংলা+ইংরেজি) লিখি না অনলাইনে।

এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা মনে করেন যখন কথাগুলো বাংলা, তখন তা বাংলাতেই লেখা ভালো। আর ইংরেজিটা ইংরেজিতেই। ইন্টারনেটে এখন সহজেই বাংলা হরফ লেখা যায়। মুঠোফোনেও এসেছে সে সুবিধা। এই যে এবারের ফেব্রুয়ারি মাস যখন এল, ফেসবুকে তাকিয়ে দেখলাম বাংলা কবিতায় ‘স্ট্যাটাস’ দেওয়ার ঢল নামল। ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা!’ একুশ শতকে অন্তর্জাল প্রযুক্তির এই যুগে বসে অনলাইনে এমন স্ট্যাটাস, এমন লেখা দেখলে কার না মন ভালো হয়ে যায়। তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে বয়স্ক বাঙালি যাঁরা ডিজিটাল মাধ্যমে কমবেশি সক্রিয়, তাঁদের বেশির ভাগই বাংলা হরফেই লিখছেন বাংলা। মনের ভাবটা ঠিকঠাক প্রকাশিত হচ্ছে ডিজিটাল দুনিয়ায়। কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবের ফেসবুকে বাংলাতেই স্ট্যাটাস দেন। এই তো কদিন আগে লিখলেন, ‘তুমি নূপুর পরো না, জানি। তবু, তুমি যদি কখনো আসো, জানি, নূপুরের শব্দ পাব।’ এই স্ট্যাটাসটাই যদি ‘tumi nupur poro na…’ ঢঙ্গে বাংরেজিতে লেখা হতো, প্রিয় পাঠক, আপনার বা আমার কি তাতে মন ভরত?

মঈনুল আহসান সাবের তাই বললেন, ‘যা বলতে চাচ্ছি তা রোমান হরফে বোঝানো যায় না। ইন্টারনেটে বা মুঠোফোনে বাংলায় লিখলে অনুভূতিটা এমন হয়—আমি যা বলতে চাচ্ছি সেটাই আমি লিখছি।’ ফেসবুক বা ই-মেইলে অভ্র সফটওয়্যার ব্যবহার করেই লেখেন তিনি। ‘স্মার্টফোনের জন্য ব্যবহার করি মায়াবী সফটওয়্যার। আবার কিছু কিছু বাংলা হরফ লেখার জন্য অন্য কোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করি।’ মঈনুল আহসান সাবের নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানালেন, অনলাইনে এবং মুঠোফোনে বাংলায় লেখার হার অনেক বেড়েছে। এমনকি অনেকে খুদে বার্তাও পাঠাচ্ছেন বাংলায়।
মো. ওমর মোস্তাফিজ পড়াশোনা করেছেন ইংরেজি মাধ্যমে। এখন শিক্ষানবিশি করছেন একটি প্রতিষ্ঠানে। সেখানেও ইংরেজিতে বেশি কাজ। তার পরও তিনি ফেসবুকে স্ট্যাটাসগুলো দেন বাংলায়। বললেন, ‘সব কথা ইংরেজিতে প্রকাশ করতে পারি না, যা আমি বাংলায় পারি। এ কারণে মনের কথাটা ঠিকঠাক বোঝাতে বাংলাতেই স্ট্যাটাস দিই।’

বাংলায় কিভাবে লিখব, পিসিতে বা মোবাইল ফোনে?

কম্পিউটার যন্ত্রে বা ইন্টারনেটের মতো সর্বজনীন মাধ্যমে বাংলা লেখাটা কিন্তু কাগজ-কলমের মতো সহজ নয়। কম্পিউটার বোঝে যন্ত্রভাষ। সেই ভাষার সঙ্গে মায়ের মুখের ভাষাটির খাপ খাওয়ানো খুব একটা সহজ ছিল না। আজ ব্লগে, ফেসবুকে, ই-মেইলে অনেকটা সহজে যে লিখতে পারছি বাংলা, তার শুরুটা বেশি দিনেরও নয়। কম্পিউটারের বাংলার চর্চা গত শতকের আশির দশকের শেষভাগ থেকে শুরু। প্রয়োজনের তাগিদেই তার অগ্রযাত্রা হয়েছে। বাংলাদেশে অনলাইন ইন্টারনেটের সূচনা ১৯৯৬ সালে। তখন থেকেই ইন্টারনেটে বাংলা ভাষা ছড়িয়ে দেওয়ার নানা চেষ্টা দেখা গেল। পিডিএফ ফাইল করে, লেখাকে ছবি বানিয়ে ভারী ভারী ফাইল বানিয়ে এক-দুই ফর্দ বাংলা লেখা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা অনেকেরই মনে আছে। সময় বেশি লাগত, বাংলায় লেখা ফাইল ই-মেইলে জুড়ে দিয়ে (অ্যাটাচড) পাঠানো হতো। অন্য কম্পিউটারে সেই লেখা খুলবে তো! এ আশঙ্কা থেকে বাংলা ফন্টটাও পাঠিয়ে দিতে হতো। এই যে এত চেষ্টা, তা কেন? উত্তরটা তো বাবুই পাখি দিয়েই রেখেছে কত কাল আগে—‘কষ্ট পাই তবু থাকি নিজের বাসায়।’
অনলাইনে বাংলা লেখার জোয়ার এসেছে একুশ শতকের গোড়ার দিক থেকে। তত দিনে কম্পিউটার বা ডিজিটাল যন্ত্রে যেকোনো ভাষা লেখার কারিগরি নীতি ‘ইউনিকোড’ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের বাংলাও ঢুকে গেল ইউনিকোডে। কয়েকজন মেধাবী তরুণ প্রোগ্রামারের হাত ধরে অভ্র নামের সফটওয়্যারটি এসে অনলাইনে বাংলা লেখার ব্যাপারটাকে করে দিল জলবৎ তরলং। পেশাগত কাজে বাংলা লিখতে হয় যাদের তাদের বাংলা কি-বোর্ড লে-আউট মুখস্থ থাকে। বাদবাকি মানুষের কী হবে? তাঁরাও তো চান বাংলায় মনের ভাব প্রকাশ করতে। ধ্বনিভিত্তিক (ফোনেটিক) কি-বোর্ড তাদের আশা পূরণ করল। অভ্র দিয়ে amar লিখলে ‘আমার’ চলে আসে। এ ব্যবস্থা বেশ সহজ করেছে। এভাবে হয়তো বানানরীতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে শতভাগ মেনে চলা যায় না এখনো, কিন্তু মনের ভাব প্রকাশ যেখানে মুখ্য সেখানে রীতিনীতি কিছুটা গৌণ হলে ক্ষতি কী?

মুঠোফোনেও বাংলা লেখার প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন শুরু থেকেই। এই শতকের গোড়ার দিকে দেখা গেছে জাভা সমর্থন করে এমন মুঠোফোনে বাংলা লেখার সফটওয়্যার ঢুকিয়েছেন তরুণ প্রোগ্রামাররা। পরে নকিয়ার ফোনসেটগুলোতে বাংলা কি-বোর্ডও দেখা গেছে। আর হাল সময়ের স্মার্টফোনে মায়াবীসহ বেশ কিছু অ্যাপস আছে, যেগুলো দিয়ে বাংলা লেখা যায়। গুগলে ইংরেজি থেকে বাংলা, বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করার সুবিধাও যোগ হয়েছে। গুগল বা পিপীলিকার মতো সার্চ ইঞ্জিনে বাংলা লিখে তথ্য খোঁজা যায়। অনলাইনে বাংলা চর্চায় বড় অবদান রেখেছে বাংলা ব্লগ সাইটগুলো। তাই এ সময়ে এসে বাংলা হরফে ডিজিটাল মাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরা সহজ আর এ ধারা ক্রমেই বাড়ছে।

যত দিন যাচ্ছে, প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলায় নিজেকে প্রকাশের চলটাও বাড়ছে। আর বাড়বে নাই-বা কেন? রামনিধি গুপ্ত তো বলেই গেছেন—
নানান দেশের নানান ভাষা,
বিনে স্বদেশী ভাষা,
পুরে কি আশা?

সুত্রঃ প্রথম আলো।

Print Friendly, PDF & Email
Adnan Sadeque
Follow me

Adnan Sadeque

লেখকের কথাঃ
http://bsaagweb.de/germany-diary-adnan-sadeque

লেখক পরিচয়ঃ
http://bsaagweb.de/adnan-sadeque
Adnan Sadeque
Follow me