• Home »
  • Cities-in-Germany »
  • হ্যানোভারঃ জার্মানি’র উত্তরাঞ্চলের এক সবুজ নগরী

হ্যানোভারঃ জার্মানি’র উত্তরাঞ্চলের এক সবুজ নগরী

 

হ্যানোভার ইউরোপের বৃহত্তম অরণ্য নগরী হিসেবে খ্যাত। শহরটির ১১% অংশ পার্ক এবং বাগান দ্বারা পরিবেষ্টিত- যা এখানকার যান্ত্রিক জীবনে ভারসাম্য প্রদান করে থাকে। এই শহরে নিয়মিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বাণিজ্য মেলা’র আয়োজন করা হয়ে থাকে এবং এখানেই মাখন, ময়দা ও চিনি দিয়ে তৈরি হয় জগতবিখ্যাত লিইব’নিজ বিস্কুট। 

New Town Hall and Maschsee

New Town Hall and Maschsee

তথ্য ও পরিসংখ্যানঃ

জনবসতিঃ ৫,০৯,০০০

শিক্ষার্থী সংখ্যাঃ ৪০,০০০

বিশ্ববিদ্যালয়ঃ ৭টি

মাসিক ভাড়াঃ ২৯৯ ইউরো

পরামর্শঃ আবিষ্কার করুন বহুমাত্রিক সংস্কৃতি’র লিন্ডেন!

ওয়েবসাইটঃ www.hannover.de

হ্যানোভারে স্বাগতম

পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের আবাসস্থল এই নগরী আধুনিকতার ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত হয়নি। নিডারজাখসেন অঙ্গরাজ্যের রাজধানী শহর এই হ্যানোভার প্রচুর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় বিজ্ঞান এবং বাণিজ্যের জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরজুড়ে সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে যা প্রায় ৪০,০০০ শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছে। সাধারণত বছরের নির্দিষ্ট দুটো সময়ে পুরো বিশ্বের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় হ্যানোভার; যার মধ্যে একটি হচ্ছে যখন শহরে ডিজিটাল ইন্ডাস্ট্রির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট “সি’বিট” অনুষ্ঠিত হয়, এবং আরেকটি সময় হচ্ছে যখন হ্যানোভারে বিশ্বের সর্ববৃহৎ বাণিজ্য মেলা “ হ্যানোভের ম্যাসে” আয়োজন করা হয়।

Maschsee

Maschsee

হ্যানোভারের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলটি ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এই কারণেই এখানে কিছু ঐতিহাসিক দালান রয়েছে। তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে নিউয়েস রাথাউস (নতুন টাউনহল)। আপনি চাইলে এইক্ত বিশেষ লিফটে করে গোথিক ভবনের গম্বুজে ঘুরে আসতে পারেন। এই লিফটটি গম্বুজের আর্ক অনুসরণ করে থাকে এবং এটি একসাথে ৫ জন মানুষকে বহন করতে পারে। আপনি ১০০ মিটার উঁচু প্লাটফর্ম হতে পুরো নগরীর একটি চমৎকার দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। সিটি সেন্টারের পুরনো অংশে আপনি খুঁজে পাবেন মারক্ট’কিচ(মার্কেট চার্চ)। এটিকে জার্মানির উত্তরাঞ্চলের একটি সাধারণ স্থাপত্যশৈলী’র উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে। লাল-ইট’র দালানগুলো উত্তরাঞ্চলের অনেক শহর এবং গ্রামের আলাদা করে বলার মতন বৈশিষ্ট্য। মারক্ট’কিচ(মার্কেট চার্চ)’র নিকটে অবস্থিত বারগস্ত্রাসি’তে আপনি ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত হ্যানোভারের সবচেয়ে পুরনো অর্ধ কাষ্ঠনির্মিত বাড়িটি ঘুরে আসতে পারেন।

মাচ’সি মানুষের তৈরি একটি হ্রদ এবং এটিতে নদীর ন্যায় কোন জলধারা নেই যা এটিকে অসাধারণ করে তুলেছে। শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত “কপ’কি” হল আড্ডা দেওয়ার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয়; এখানে রয়েছে প্রচুর দোকানপাট। এইজিদিএনতো’প্লাটজ হ্যানোভারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যা স্থানীয়দের কাছে “এই’জি” নামে সুপরিচিত। শহরের এ অংশে আপনি হালআমলের দালানকোঠাগুলো খুঁজে পাবেন যেখানে ব্যাংক ও বীমা সংস্থা’গুলোর সদরদপ্তর অবস্থিত।

Clock at Kröpcke square

Clock at Kröpcke square

অতীতে হ্যানোভার ছিল রাজা ও রাজকুমার’দের আবাসস্থল; যখন এ শহরে হে’রেনহউসের বাগান ও হে’রেনহউসেন দুর্গ নির্মিত হয়। বর্তমানে আপনি বিভিন্ন ধরনের ফুল ও গাছপালায় ঘেরা      বাগানগুলো ঘুরে আসতে পারেন, এর সাথে আপনি চাইলে দুর্গের ভেতরকার জাদুঘরটিও ঘুরে দেখতে পারেন।

হ্যানোভারে বসবাস

জর্জেন’গারতেন নামে একটি বিশাল পার্ক রয়েছে হ্যানোভারে; প্রচুর আদিবাসী ও বেশিরভাগ সময়ে শিক্ষার্থীরা জগিং, পড়াশুনা অথবা বারবিকিউ’র উদ্দেশ্যে এ পার্কটিতে বেড়াতে যান। জার্মানির বৃহত্তম অরণ্য নগরী নামে পরিচিত এইলেন’রীডহ্যানোভারের উপকণ্ঠে অবস্থিত।হ্যানোভারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে এর সংস্কৃতি। এখানে রয়েছে বিশ্বের অধিক জাদুঘর যেগুলো প্রতিটি সময়ের শিল্পশৈলী প্রদর্শন করে আসছে যার মাধ্যমে এখানে বেড়াতে আসা মানুষগুলো শহরের ইতিহাসের সাথে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন।

এখানকার স্প্রেনজেল জাদুঘরটি মর্যাদাপূর্ণ জাদুঘরগুলোর মধ্যে একটি যেখানে হয়ে থাকে বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক শিল্পশৈলী’র প্রদর্শন। অনেক শিক্ষার্থী লিন্ডেন জেলায় বসবাস করে এবং তাদের অবসর সময় ব্যয় করে। “লিমার” হল একটি পথচারী সড়ক যা এই স্পন্দনশীল শহরের কেন্দ্র। লিন্ডেন’র নৈশজীবন পরিবর্তনশীল এবং সহজ-সরল ধরনের। এখানকার গ্রীষ্ম মৌসুমের বিয়ার বাগান ছাড়াও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ফাউস্ট  নিয়মিত ভিত্তিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী এবং মাছি বাজারের আয়োজন করে থাকে। এখানে রয়েছে অনেক ক্যাফে যার প্রতিটি নিজস্ব বৈশিষ্টের কারণে সুপরিচিত; যার কারণে এদেরকে শহরের উত্তর অংশে “লিস্টার মাইল” বলা হয়। “গাজর এবং কফি” নামের ক্যাফেটিতে নিরামিষভোজীরা সকালের নাস্তা পেতে পারে এবং “লুলু”তে কিছু টেবিলে বিনামূল্যে খেতে পারেন।    বিশিষ্ট প্রতিবেদক বেটিনা রুহল্যান্ড বলেছেন, “হ্যানোভারে আমার পছন্দের অংশ হচ্ছে লিন্ডেন। লিন্ডেনে আপনি পাবেন অনেক ছোটখাটো দোকান ও ক্যাফে এবং আপনি এখানকার বহুমাত্রিক সংস্কৃতি উপভোগ করতে পারেন। বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা দিতে পারেন “আনটার্ম সোয়াঞ্জ”-এ। এটি হচ্ছে আর্নস্ট আগস্টের মূর্তি যেখানে দেখা যায় তিনি প্রধান রেলওয়ে স্টেশনের সামনে ঘোড়ায় চেপেছেন। এ স্টেশন বিভিন্ন কার্যক্রম শুরুর জন্য স্টার্টিং পয়েন্ট হিসেবে বেশ জনপ্রিয়।”

“ফে’টে ডি লা মিউসিক” হচ্ছে হ্যানোভারের বৃহত্তম সংগীত উৎসব। প্রকৃতপক্ষে, এটি একটি আন্তর্জাতিক উৎসব যেটি বিশ্বের ৩৪০টির অধিক দেশে উদযাপন করা হয়ে থাকে। সংগীত শিল্পীরা শহরের বিভিন্ন স্থানে খোলা আকাশের নিচে সংগীত পরিবেশন করে থাকেন এবং পুরো শহরকে সুর-সংগীতে মাতোয়ারা করে রাখেন। আগস্টে অধিবাসীরা তাদের সন্ধ্যা মাচ’সি’র তীরে অতিবাহিত করেন। চমৎকার রন্ধনশৈলী, সংগীত এবং পরিবেশের সমন্বয়ের কারণে আপনি ছুটির দিনগুলোর অনুভূতি পাবেন। অপরপক্ষে, এসচুটযেনফেস্ট এবং ওকটোবেরফেস্ট পুরনো ধাঁচের এবং গতানুগতিক। আপনি বিয়ার ও এসচ’নাপস দিয়ে তৈরি “লূট’জে লাগ” নামের হ্যানোভার অঞ্চলে বিশেষভাবে পরিচিত একপ্রকার পানীয় দিয়ে শুরু করতে পারেন।

হ্যানোভারে রোমানিয়া থেকে আগত ডায়না’র সাথে একান্ত সাক্ষাৎকার

২৭ বছর বয়সী ডায়না আপোসটল “কমিনিউকেশন ম্যানেজমেন্ট”-এ মাস্টার্স করার উদ্দেশ্যে রোমানিয়া থেকে হ্যানোভারে এসেছেন।

Diana from Romania

Diana from Romania

আপনি হ্যানভারে পড়াশুনার সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?

ডায়নাঃ আমি ভবিষ্যতে কমিনিউকেশনের করপোরেট জগতে কাজ করতে চাই।হ্যানোভারে তারা আন্তঃ-disciplinary ডিগ্রি’র প্রোগ্রাম পরিচালনা করে থাকে যাতে তত্ত্বীয় এবং ব্যবহারিক উভয়দিকই   সমান গুরুত্ব পেয়ে থাকে। “কমিনিউকেশন ম্যানেজমেন্ট” বিষয়ে মাস্টার্স প্রোগ্রামটি কমিনিউকেশনের করপোরেট জগতের কৌশলগত দিকটির প্রতি জোরালোভাবে নজর দিয়ে থাকে। জার্মানিতে হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হয়ে থাকে এবং হ্যানোভার এ ক্ষেত্রে আমার প্রথম পছন্দ ছিল।

হ্যানোভার কি আপনার আশা পূরণ করতে পেরেছে? কোন চমক কি ছিল, যদি থাকে তবে তা কী কী?  

আমি হ্যানোভার নিয়ে ইতিবাচক দিক দিয়েই বিস্মিত হয়েছিলাম। এখানে অনেক চমৎকার স্থান আছে, যেমনঃ শহরের মাঝামাঝিতেই আছে সুবিশাল অরণ্য আইলেনরীড। আমি সুবিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে অভ্যস্থ; তাই হ্যানোভারে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত বিজ্ঞান বিভাগের ক্ষুদ্র সেমিনার গ্রুপের সাথে আমাকে মানিয়ে নিতে হয়েছে। এখানে আমার ক্লাসে ১৪ জন শিক্ষার্থী আছে; যেখানে ভিয়েনায় আমি ১,০০০ জন শিক্ষার্থীর একসাথে বসে ক্লাস করতাম।

হ্যানোভার পড়াশুনার জন্য একটি ভালো শহর কেন?  

হ্যানোভারে শিক্ষা কার্যক্রমের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনেক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে। তারা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে। নিডারজাখসেন অঙ্গরাজ্যের রাজধানী শহর হিসেবে হ্যানোভার ঐ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। মিউনিখ, হামবুর্গ বা ডূসেলদ্রফের সাথে তুলনায় জীবন এখানে স্পষ্টভাবে অনেক সাশ্রয়ী, তারপরও আপনি এখানে একটি বড় শহরের ন্যায় সকল সুযোগ-সুবিধা  উপভোগ করতে পারবেন। এ সকল কারণে এটি শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত একটি শহর।

Sprengel museum

Sprengel museum

হ্যানোভার শহরের কোন বিষয়টি আপনি সবচেয়ে বেশী পছন্দ করেন? এমন কোন জায়গা আছে যেটা আপনার আলাদা করে ভালো লাগে?

এখানে সবকিছু হাতের নাগালের মধ্যেই। অবকাঠামোগতভাবে হ্যানোভার ভালো, কিন্তু ভাল আবহাওয়ার সময়ে আপনি সহজেই বাইকে করে কিংবা হেঁটে বেড়িয়ে আসতে পারেন। হ্যানোভার সবুজে ঢাকা একটি নগরী, যদিও প্রথম দর্শনেই সেটি আপনার নজরে আসবে না। গ্রীষ্মে আপনি মাচ’সি পার্ক ঘুরে দেখতে পারেন বা আইলেনরীডের সুবিশাল অরণ্যের মাঝে হেঁটে বেড়াতে পারেন।

Linden

Linden

হ্যানোভারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য মোটেই ব্যয়বহুল নয়; কিন্তু অনেকেই এ বিষয়টি জানেন না। এখানকার কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের অপেরা, থিয়েটার ও সিনেমার টিকেটের ওপর বিশেষ ছাড় দিয়ে থাকে এবং জাদুঘরগুলো শুক্রবারে অবৈতনিক ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।

সুত্রঃ study-in.de

অনুবাদকঃ শুভ ইফতেখার

Print Friendly