হামবুর্গঃ সমুদ্রের কোল ঘেষে পড়ালেখা

 

হামবুর্গ শহরটি জার্মানির উত্তরে বাল্টিক সাগর আর উত্তর সাগরের মাঝে অবস্থিত। বিভিন্ন গনমাধ্যম সংস্থা আর প্রধান প্রধান কর্পোরেশান গুলোর অবস্থান এই শহরে হওয়ায় এই শহর জার্মানির অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র। হামবুর্গ সাধারনত বিভিন্ন সংস্কৃতির মিলনস্থল। বন্দরে তুমি দেখবে জাহাজগুলি সাগরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছে- যেন এই পোতাশ্রয়ের শহর ‘পুরো পৃথিবীর সিংহদ্বার’

At the Alster River

আলস্টার নদী

তথ্য ও পরিসংখ্যানঃ

লোকসংখ্যাঃ ১,৭১৮,০০০
শিক্ষার্থীঃ ৯২,২০০
বিশ্ববিদ্যালয়ঃ ১৭
মাসিক ভাড়াঃ ৩৫১ ইউরো
দ্রষ্টব্যঃ স্থানীয়রা তাদের ঐতিহ্যময় হ্যামবার্গার খেতে ভালবাসে- যা ‘Jim Block’ এ চেখে নিতে পার!!
ওয়েবসাইটঃ www.hamburg.de

হামবুর্গে স্বাগতমঃ

হামবুর্গ জার্মানির উত্তরে, উত্তর মহাসাগরের সমুদ্রোপকুলে অবস্থিত। এলবে নদী এই শহরের ঠিক মাঝখান দিয়ে স্পন্দিত রক্তনালিকার মত প্রবাহিত, যা এই শহরকে বিশ্বব্যাপি পরিচিতি দিয়েছে। শহরের ঠিক মাঝে অ্যালস্টার নামে একটা হ্রদ আছে যা এই শহরের প্রাণকেন্দ্রকে দিয়েছে প্রশস্তি আর প্রশান্তির অনুভূতি, এর জন্য অ্যালস্টারকে ধন্যবাদ দেয়াই যায়। নদী, সৈকত আর সাগর সবসময়ই হ্যামবার্গবাসীদের কাছ গুরুত্বপূর্ন ছিল।

হ্যামবার্গের হানসিয়াটিক সিটি জার্মানির প্রধান গুরুত্বপুর্ন অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলির একটি। বিশাল নৌবন্দর, উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারক এয়ারবাস, বিভিন্ন প্রথম সারির প্রতিষ্ঠান এখানকার চাকরীরবাজারের প্রধান নিয়োগদাতা। এছাড়াও এ শহর একটি গুরুত্বপুর্ন গনমাধ্যম কেন্দ্রঃ প্রচুর প্রকাশনা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সম্পাদকীয় অফিস আর টেলিভিশন স্ট্যাশন এখানে অবস্থিত।

হামবুর্গে পড়াশোনার সুবিধার্থে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। ‘ইউনিভার্সিটাট হামবুর্গ’ ছাড়াও এ শহরে আছে মর্যাদাপুর্ন ‘টেকনিশে ইউনিভার্সিটাট হ্যামবার্গ-হারবার্গ(TUHH)’ এবং অ্যাপ্লাইড সায়েন্সের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় আর উচ্চশিক্ষার ব্যক্তি পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

হারবার

হারবার

হামবুর্গের প্রাচীনতম নিদর্শন হলঃ সেইন্ট মাইকেলিস চার্চ, স্থানীয়রা যাকে ভালবেসে ডাকে ‘ডেয়ার মিকেল(Der Michel)’। এখানে এবং স্পাইচারস্টাড বা গুদামঘরের জেলা খ্যাত স্থান থেকে তুমি হামবুর্গের ইতিহাস এবং এখানকার অধিবাসীদের মন-মানসিকতা জানতে পারবে। ঘটনাসুত্রে, হামবুর্গের মানুষদের একই নামে প্রচলিত সুস্বাদু খাবার! আছে। যা এসেছে ‘মিকেল’ থেকে, যা ‘ডম’ থেকে খুব কাছেই পাওয়া যায়। ‘ডম’ বলতে আভিধানিক অর্থে স্থানীয় ক্যাথেড্রালকে বোঝায়। কিন্তু এটা প্রার্থনার স্থান নয়, এটা একটা অনেক বড় জন-উৎসব যা বছরে তিন বার অনুষ্ঠিত হয়।

মিসেল

মিসেল

বেলাভুমিতে হেঁটে বেড়ানোর সময় তুমি সাগরের ঢেউ আর গাংচিল দেখতে পার, এছাড়া চাইলে জাহাজ ঘাঁটের সবুজ তামার তৈরি মনোরম স্টেজগুলোর সৌন্দর্যের প্রশংসা করতে পার। এখানেই বিশাল কন্টেইনার জাহাজ আর নানা রঙের নৌকাগুলি নোঙর ফেলে, আর সাগরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ‘ফিশমার্ক্ট’ এ তুমি বিশেষ সামুদ্রিক খাবার চেখে দেখতে পার যেমনঃ রুটি আর উত্তর সাগরের বাগদা চিংড়ির গুটান রোল। বেলাভুমির পাশেই বিখ্যাত স্থান ‘সেইন্ট পলি’। ‘কিয়েজ’ বা এর সংলগ্ন শহরের ‘লাল আলোর ডিস্ট্রিক্ট’ আর কুখ্যাত ‘রিপারবান’ যা সবসময় নাবিক, স্থানীয় আর পর্যটকদের বিনোদনের স্থান। অসংখ্য ক্লাব, পানশালা আর আমোদ-প্রমোদের সুবিধা এই রঙ্গিন স্থানে সকল প্রকার মন-মননের মানুষকেই আকৃষ্ট করে।

শহরদর্শনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অংশ হল অত্যাধুনিক ‘হাফেনসিটি’ যা সম্প্রতি বছরগুলোতে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। তুমি অনেক দূর থেকে জমকালো ‘এল্বফিলহারমোনি’ দেখতে পারবে। এলবে নদী দিয়ে হ্যামবার্গের বন্দর পার হওয়া জাহাজগুলোও নিকটদুরত্ব থেকে এই অট্টালিকা দেখতে পায়।

ফুটবল অত্যাবশকীয়ভাবে হ্যামবার্গের জীবনধারার একটি গুরুত্বপুর্ন অংশ আর এখানে দুটি ক্লাবও আছেঃ এফসি সেইন্ট পলি যার প্রতি স্থানীয়রা গভীর অনুরক্ত, যার     আছে বহুসাংস্কৃতিক ভাবমুর্তি আর অনেক অতীতের ইতিহাস। শহরের সবচেয়ে বড় ফুটবল ক্লাব ‘হ্যামবার্গার স্পোর্টভেরাইন’ বা সংক্ষেপে HSV এরও আছে সুদীর্ঘ গৌরবের ইতিহাস। ফুটবল হল জার্মানির অন্যতম প্রধান শখের কাজ। অল্পবয়স্করা পার্কে গিয়ে  বলে লাথি দেয়ার ফাকে দেখা-সাক্ষাৎ করতে পছন্দ করে, বা তারা একসাথে টিভিতে ম্যাচ দেখার জন্য একত্রিত হয়।

রেপ্রিবাহ্ররন

রেপ্রিবাহ্ররন

স্থানীয়রা এক প্রকার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেযাকে বলে ‘প্লাটডয়েচে’ বা Low German. এটা তাদের দৈনন্দিন কথা বলার সময় বিশেষ কিছু অভিব্যাক্তি আর চালচলনে প্রতিফলিত হয়। যেমনঃ Waterkant যার অর্থ উপকূল(High German: Wasserkante.) যখন ‘হ্যামবার্গাররা’ শহরের বিভিন্ন অংশ নিয়ে বলে, তারা “in” এর স্থলে “auf(on)” বলে। আরও “on Schanze”  বা “on St. Pauli”  তারা আরও বলে “in Barmbek” বা “in Grindelviertel” তুমি যদি ভাল করে শোন তবে এটা খেয়াল করবে। দুঃখের কথা অতিঅল্প মানুষই এই উপভাষায় কথা বলে আর এরা সচরাচর বয়ষ্ক।

হামবুর্গে বসবাসঃ

পারতপক্ষে হামবুর্গের আবহাওয়া পরিবর্তনশীল। এক মুহূর্তে রৌদ্রজ্জ্বল ঠিক পরের মুহূর্তেই যেন বৃষ্টি! অবশ্যই তোমার সাথে একটা পুরু কোট-জামা আনা উচিৎ। উপকুলের দিকে খুব ঠান্ডা হাওয়া প্রবাহিত হয়।

তুমি কোন এক নৌকায় চড়তে পার, আর পুরো বেলাভুমির চারপাশ ঘুরে দেখতে পার। নৌকা এলবে আর ‘ফ্লিটে’(শাখার মত বেরিয়ে যাওয়া ছোট প্রনালী)  মধ্য দিয়ে যায়। তুমি একটা বিশিষ্ট আঙিকে শহরকে দেখতে পাবেঃ নদী থেকে তুমি  দেখবে ‘কাছে আর দূরে’ মানুষ বারবিকিউ খাচ্ছে আর বিনোদনে মেতে আছে। হ্যামবার্গের মানুষ রৌদ্রজ্জ্বল দিনে উএফেলগুয়েন জেলার এলবস্ট্রান্ড সৈকতে অথবা বন্দরের পাশেই ‘ফিকশন’ পার্কে বেড়াতে আসে।

হাফেনসিটি

হাফেনসিটি

গ্রাইন্ডেলফিয়ারটেলে আছে অনেক অনেক পার্ক আর বাগান যেখানে তুমি প্রশান্তি পাবে। যদি তুমি হালকা ব্যয়াম করতে চাও, তুমি শহরের সামুদ্রিক এলাকার সুবিধা নিতে পার আর চাইলে পালতোলা নৌকা চালাতে পার, বৈঠা বাইতে পার বা ‘দাঁড়িয়ে প্যাডেল’ চালাতে পার।কেনাকাটার জন্য সেরা জায়গাগুলি হল মোয়েঙ্কেবার্গস্ট্রাসে, ইউংগফার্নষ্টাইগ আর অলস্টারের পার্শ্ববর্তী রাস্তাগুলি। কর্মচঞ্চল স্টার্নশাঞ্জে, বা স্থানীয়রা যাকে ‘শাঞ্জে’ বলে, একটু বেশি প্রথাগত এলাকা। এখানে তুমি পাবে ক্যাফে, পানশালা, রেস্তোরাঁ, দোকান, হস্তশিল্প, স্টুডিও আর পার্ক।

তুমি যদি আনন্দ-ফুর্তি করতে বাইরে যেতে চাও আর বাস্তবেই স্থানীয়দের সাথে পরিচিত হতে চাও, তবে তোমাকে অবশ্যই শাঞ্জে যেতে   হবে। এখানে ছোট ছোট ক্লাব আছে যেখানে তুমি খুব দেখতে দেখতেই নতুন মানুষদের সাথে পরিচিত হয়ে যাবে। এখানে বিভিন্ন সংস্কৃতির লোকজন আসে কিন্তু তারা একসাথেই হ্যামবার্গের মনন ও চালচলন ভাগাভাগি করে   নেয়।

জাপান থেকে আসা আয়ানোর সাথে সাক্ষাৎকারঃ

আয়ানো তাজিমা ২৩ বছর বয়সী জাপানি আর সে সংগীত ও ভায়োলিন নিয়ে পড়াশোনা পড়ছে হামবুর্গের ‘হখশুলে ফিউর মিউজিক উন্দ থিয়েটার(HMT)’ এ।

জাপানের আয়ানো

জাপানের আয়ানো

তুমি কেন পড়াশোনার জন্য হামবুর্গকে বেছে নিয়েছ?

বেশিরভাগ সংগীত শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন হল তার শিক্ষক বা প্রফেসর। আমার শিক্ষকের সাথে পরিচয় আমার বন্ধুর মাধ্যমে আর তাঁর কাছে আমি  একটা ক্লাসে অংশ নেই। এটা খুব ভাল ছিল। এজন্যই আমি চেয়েছি তাঁর কাছে শিখতে।

হামবুর্গ আর টোকিওর মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য কি?

সেখানে আছে চমৎকার অলস্টার আর অন্যান্য পার্ক। টোকিও অনেক বেশি মানুষের অনেক বিশাল শহর। টোকিওতে যেন প্রতিটি দিনই ক্রিসমাসের বাজার, যা আমাকে ক্লান্ত করে ফেলে।

তোমার কি কোন পছন্দের জায়গা আছে?

অলস্টারের পাশের পথটা সত্যিই খুব সুন্দর। আমি একটা জাপানি রেস্তোরাঁয় ওয়েটার হিসেবে কাজ করি আর মাঝে মাঝে সেখানে সাইকেলও চালাই। এছাড়া আমি মানুষগুলোকে পছন্দও করি। তারা খুব ভাল আর নির্ভেজাল।

হামবুর্গের দৈনন্দিন জীবনে মানিয়ে নিতে তোমাকে কোনটা সাহায্য করেছে?

যখন আমি এখানে আসি তখন আমার বয়স ছিল  ১৮। এখানে কিছু জাপানি থাকত। তারা শুরুতে আমাকে অনেক সাহায্য করেছে।

‘জার্মান আমলাতান্ত্রিক জংগল’ এ কি তোমার কোন সমস্যা হয়েছিল?

আমার ভিসা নিয়ে কোন সমস্যা হয়নি, আর কর্তৃপক্ষে মহিলাও খুব ভাল ছিল।

বিন্নেন আলস্টার

বিন্নেন আলস্টার

হঠাৎ যদি ঘরের জন্য মন কাঁদে তখন কি কর?

স্মার্টফোন নিয়ে অনেক কিছু বলার আছে, অনেকসময় ফোনে কথা বলি। এছাড়াও আমার মোবাইলে বন্ধু আর পরিবারের অনেক ছবি আছে।

 

সুত্রঃ study-in.de

অনুবাদকঃ রানা বনিক

Print Friendly