জার্মানীর দিনগুলি-৩

 

অনেক আগে আমি বিসাগে একটা সিরিজ লেখা শুরু করেছিলাম। নিজের অভিজ্ঞতার কথা, কষ্টের কথা, আনন্দের কথা। অনেকটা নিজের ব্যাক্তিগত ডায়েরী বলা যায়। মাঝে লেখাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ক্যারিয়ারের ব্যস্ততা ছিল, কিন্তু নিজের আলসেমি আসল কারন। আশা করি এই সিরিজটা আর বন্ধ হবে না। এখানে আমি আগের ২ কিস্তির লিঙ্ক দিয়ে দিচ্ছি

http://bsaagweb.de/germany-experience-tanzeem-1/
http://bsaagweb.de/germany-experience-tanzeem-2/

তৃতীয় কিস্তি

প্রথমেই বলি আমি লেখক না। আমার লেখার দৌড় ফেসবুকে স্ট্যাটাস লেখা পর্যন্ত। আমি কোন কিছু অবর্জাভও করি না ঠিক মতন। তাই প্রতি দিনের ঘটনা আমার পয়েন্ট টু পয়েন্ট মনে থাকবে এটা আশা করাই ভুল। তাই আমার মাথায় সকল কিছু কেমন জানি জগা খিচুড়ি টাইপ হয়ে গেছে। হলে হইছে, এখন থেকে জগা খিচুড়িই লিখব।

ওকে গল্পে আসা যাক———–

হোম সিকনেস নামক নাকি একটা অসুখ আছে। প্রবাস জীবনের শুরুতে নাকি এই অসুখ থাকে। তারপর নাকি ঝাঁ চকচকে বিদেশ দেখে এই অসুখ চলে যায় এবং হোম সিকনেসের জায়গায় হোমের প্রতি বিরক্তি চলে আসে। আমার ক্ষেত্রে এমন কিছুই হয় নাই। আমার হোম সিকনেস ছিল, আছে এবং মনে হচ্ছে থাকবে। কিন্তু হ্যাঁ, প্রথমে যেমন খুব ধাক্কা লেগেছিল সেটা কিছুটা কমে গিয়েছে। আর যাবেই না কেন…প্রতিদিন ঘর থেকে বের হওয়া বিভিন্ন কাজে, তারপর হিব্রু টাইপ একটা ভাষা(জার্মান ভাষা) পরে ট্রেন বের করা, বিভিন্ন যায়গাতে মানুষদের আবার হিব্রুতে কিছু বুঝানো (ফ্রাঙ্কফুটের বাইরে কাউকে ইংরেজিতে কিছু বললে তারা এমন ভাবে তাকায় যেন আমরা হিব্রুতে কথা বলি) এসব করতে করতে হোম সিকনেস কিছুটা কমে আসত। কিন্তু আম্মুর সাথে কথা না বলতে পারলে প্রচণ্ড অস্থির লাগত, এখনো লাগে।

এরই মাঝে একদিন ঘুরে আসলাম বিশ্বখ্যাত Johann Wolfgang Goethe-Universität Frankfurt am Main থেকে। এই ভার্সাটিতে আসলে প্রথমে মনে হবে এমন ক্যাম্পাসও হতে পারে!!!!!! বিদেশে এসে আমি ছবি তুলা ছেড়ে দিয়েছি তাই কোন ছবি নাই আমার কাছে ওই ক্যাম্পসের, পারলে একটু গুগোলে দেখেন আপনারা, কিছু ধারনা হবে। কিন্তু গোয়েথে ভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকেও আমি বেশি আপ্লুত হয়েছিলাম ওই ভার্সিটির একজন কর্মকর্তা দ্বারা, যিনি একজন বাঙ্গালি। নাদির নাম উনার, জার্মানি আসার পরে প্রথম মনে হয়েছিল একজন সত্যিকারের বাঙ্গালির সাথে দেখা হয়েছে। প্রায় ৪০ বছর আছেন তিনি এই দেশে………… আমাদের ধরে রেখে প্রায় ঘণ্টা খানেক গল্প করলেন। বাসাতে নিয়ে যেতে চাইলেন, মাছ দিয়ে ভাত খাওয়াবেন বলে। এমন কিছু মানুষ আছেন বলেই হয়ত পৃথিবী আজও এত সুন্দর 🙂

যাই হোক বলছিলাম হোম সিকনেস নিয়ে কথা। হোম সিকনেস আবার ভয়াবহ ভাবে ব্যাক করে ঈদের দিন। এখানে ঈদ ছিল ৪ তারিখ। অনেক প্লান করে রেখেছিলাম মন খারাপ করব না, আগের দিন স্ট্যাটাসও দিয়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠেই নাজওয়ার ফোন রিসিভ করলাম। এখান পর্যন্ত সব কিছু ঠিক ছিল, যদিও পেটের মাঝে কেমন জানি গুঁড়গুঁড় করছিল। এরপরে আম্মুর সাথে কথা বললাম। ফোন রেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না, হু হু করে কাঁদলাম। রুমের দরজা বন্ধ করে কাঁদলাম।

আমার জম্ম নাকি ঈদের সময়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত কোন ঈদ আমি বাবা-মাকে ছাড়া করি নাই। নামায পরে আব্বুর সাথে কোলাকুলি করেছি, সবার প্রথমে আম্মুকে সালাম করেছি। এটা রুটিন ছিল……… এই প্রথম ঈদে আমি আমার আব্বু আম্মু কাউকে দেখি নাই। সকালের নাস্তা করেছি মাকডোনাল্ডাসে। স্বপ্ন পুরণের মূল্য যদি এটা হয় তাইলে কি এই মূল্য অনেক বেশী না??? আমার জানা নেই…………..

আমার কষ্ট কিন্তু এখানেই শেষ না। দেশে ঈদ ছিল ৬ তারিখে। ওইদিন আবার সবার সাথে কথা হল। এবার আব্বু কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললো। আমি আমার জীবন দশায় আমার আব্বুকে দুইবার কাঁদতে দেখছি। একবার আমার দাদা মারা যাবার সময়, আর এবার আরেকবার…… কি কষ্ট!! কি কষ্ট!!!!!!!!

কিন্তু জীবন কিন্তু চলতে থাকে। আমিও ৬ তারিখে ভার্সিটিতেই ছিলাম, কাজও করেছি……এটাই জীবন। নয় কি?????

চলবে……

Print Friendly, PDF & Email