জার্মানীর দিনগুলি -২

 

এবারের লেখাটা দিতে অনেক অনেক বেশী দেরী হয়ে গেল। আসলে এখানকার লাইফটা এমন যে মাঝে মাঝে সময় বের করাটা কষ্টকর হয়ে যায়। যদিও কথাটা অজুহাতের মতন শুনায়। তবে কথা দিচ্ছি এরপরের লেখাগুলো আসতে এত সময় লাগবে না। প্রথম পর্বের লিঙ্কটিও এখানে দেয়া হল আবার……
http://bsaagweb.de/germany-experience-tanzeem-1/

দ্বিতীয় কিস্তি

মন যতই ভাল না হোক মানুষের শরীর বলে একটা ব্যাপার আছে। তাই ক্লান্তির কারণে এক সময় ঘুমিয়ে গেলাম।  কিন্তু জেট লেগের জন্য ঘুম ভেঙ্গে গেল ভোর ৪টায়। তখন বাংলাদেশে বাজে সকাল ৮টা। এয়ারর্পোট থেকে নেমেই একটা লিবারা সিম কিনেছিলাম। রাতে আর সিমটা একটিভ করা হয় নাই। তাই ভোর ৪টার সময় সেই সিমটা একটিভ করার চেষ্টা করছিলাম। আম্মুর সাথে কথা বলার জন্য মনটা আকুপাকু করছিল। কিন্তু কোনভাবেই সিমটা একটিভ করতে পারছিলাম না। আমার সাথের ব্যাচমেটো কিছুক্ষণ ট্রাই করল, কিন্তু ও পারছিল না। সেই সময় আমাদের রুমের এক ইন্ডিয়ান ছেলে আমার সিমটাকে একটিভ করে দিল। কোনভাবে ও মনে হয় আমাদের মনের অবস্থা বুঝেছিল। বিদেশে আসার পরে প্রথম আম্মুর সাথে কথা হল তারপর। তারপরে আবার ঘুমাতে গেলাম।

কিছুক্ষন পরে ঘুম থেকে উঠে ইন্টারনেটে ঢুকার ট্রাই করছিলাম, কিন্তু পারছিলাম না। হোষ্টেল বুক দিবার সময় দেখেছিলাম এখানে নাকি ফ্রি ইন্টারনেট, তাও কানেক্ট হতে পারছিলাম না। কানেক্ট হবার সময় জার্মান ভাষাতে কি জানি সব আসছিল। প্রচণ্ড মন খারাপ লাগছিল। কারন আমার সিমে খুব বেশী ব্যালেন্স ছিল না। অন্যদিকে আমার ছোটবেলার এক ফ্রেন্ড যে কিনা এখন আমেরিকাতে পিএইচডি করছে, আমার স্কাইপে ক্রেডিট ভরে দিয়েছিল। তা দিয়েই দেশে কথা বলার ইচ্ছা ছিল। মন খারাপ করেই হোস্টেলের নিচে নেমেছিলাম। তখন একটা স্প্যানিশ ছেলে আমাকে নেটে কানেক্ট করে দিল। আমি বাসার সাথে লম্বা সময় ধরে কথা বললাম। কথা বলার সময় হয়ত বারবার চোখ ছল ছল করে উঠছিল, কিন্তু এই যান্ত্রিক দেশে এক প্রবাসীর চোখের পানি দেখার মতন কেউ ছিল না।

তবে আমি এই ইন্ডিয়ান আর স্প্যানিশ ছেলের কথা আমি সারা জীবন মনে রাখব। তাদের ধন্যবাদও দেয়া হয় নাই।  তাদের সেই ছোট হেল্প আমাকে এই নুতুন জীবনের শুরুটা কিছুটা হলেও সহজ করে দিয়েছে।

কিছুক্ষণ পরে ক্যাম্পাসের এক সিনিয়র নামের  আমাকে ফোন করল। লিপুই আমার নং উনাকে দিয়েছিল। উনি আমাদের “কনষ্টাল্বারবাখে” নামের এক জায়গাতে যেতে বললেন। একা একা কিভাবে সেই জায়গাতে গেলাম সেটা খোদা জানেন, সেখান থেকে গেলাম ভার্সিটিতে, হলাম এন্রোল। পুরো সময়টা ছিলাম তাড়ার উপর, এরই মাঝে জার্মানীর মজার মজার কিছু জিনিস দেখলাম……………।

যেমন জার্মানরা যখন এক্সেলেটর ধরে নামে তখন তারা সবাই ডান দিকে সাইড করে দাড়ায়। কারন হল কারোর যদি বেশী তাড়া থাকে তাহলে বাম দিক দিয়ে যেন নেমে যেতে পারে। আবার এখানে রাস্তা পার হবার জন্য আলাদা সিগনাল থাকে। কিংবা যেব্রা ক্রসিং দিয়ে যে কেউ যখন ইচ্ছা পার হতে পারেন, গাড়ি আপনাকে দেখে থেমে যাবে। এছাড়া আরো কিছু মজার ব্যাপার আছে। এখানে হকাররা কাটা ফল বিক্রি করে। যে ফল সকালে ২ ইউরো দিয়ে খেতে হয় সেটাই আবার বিকালে ১ ইউরো পাওয়া যায়। তবে সবচাইতে বড় ব্যাপার হল এখানে কেউ নিয়ম ভাঙ্গে না। একদমই না।

সব কাজ শেষ করে আমরা নতুন বাঙ্গালীরা মিলে গেলাম মাইন নদীর ধারে। সেখানে গিয়ে আমার মনে হল এটাই হবে আমার একা সময় কাটানোর জায়গা। আমি এখন পর্যন্ত যত জায়গাতে ছিলাম সেখানে আমার নিজের এমন একটা জায়গা ছিল। চট্রগ্রামে ছিল বি-ব্লক বীচ, ঢাকাতে ছিল বারিধারা লেক, আর জার্মানীতে মনে হয় মাইন নদী। খুব বেশী মিস করছিলাম সেখানে গিয়ে, কেমন জানি হারিয়ে গিয়েছিলাম। তবে জার্মানীর এই নদীটা কেমন জানি খুব শান্ত, আমাদের পদ্মা, মেঘনার মতন উত্তাল না।

রাতের খাবার খেলাম এক বাঙ্গালীর বাসাতে। ২ দিন পরে খেলাম ভাত। প্রথম ভরপেট খাবারও বলা যায় জার্মানীতে। শেষ হল জার্মানীতে কাটানো প্রথম পূর্ন দিন। তখনো জানি না সামনে কি আছে কপালে ………

চলবে……

Print Friendly, PDF & Email

ফেসবুক মন্তব্যঃ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.