জার্মানীর দিনগুলি -১

 

জার্মানীতে আসছি প্রায় ১ বছর হতে চলছে। ভাল- মন্দ মিলিয়ে ঘটনাবহুল ১ বছর বলা যায়। কিছু হয়ত খুব সুন্দর অভিজ্ঞতা, কিছু হয়ত না। কিন্তু সবার সাথে শেয়ার করার মতন অভিজ্ঞতাতো বটেই। আমার এই ধারাবাহিক লেখাটা আসলে আমার গত ১ বছরের জার্নির গল্প। আশা করি সবাই খোলা মন নিয়ে পড়বেন…

প্রথম কিস্তি

এটাকে ঠিক প্রবাসের প্রথম দিন বলা যায় না। বরং বাংলাদেশে কাটানো শেষ রাত বলা যায়। সময়টা ছিল ভীষণ রকমের কঠিন। এমনকি এয়ারর্পোটে যাবার সময় কার পাশে বসে ছিলাম তাও মনে নেই। কেমন জানি একটা ঘোরের ভিতরে ছিলাম। এরই মাঝে এক বড় ভাইয়ের ফোন আসলো। ভাইয়ের সাথে কথা বলতে গিয়ে গলা ধরে আসছিল। উনি বার বার আমাকে সাহস দেয়ার ট্রাই করছিলেন। যদিও আমার মনে হচ্ছিল উনার গলাও ভেজা। এই বিশাল মনের দুষ্ট লোকটি শেষের দিকে আমাকে অনেক সার্পোট দিয়েছেন। এয়ারর্পোটে আসার পরে দেখা হোল এক ব্যাচমেটের সাথে। একি ভার্সিটিতে আমরা পড়তে যাচ্ছি। ওর মাকে দেখে বুঝলাম দুনিয়ার সকল মা একি রকম। শুধু আমার আম্মু কষ্ট পাচ্ছে না, সবাই একি ভাবে একি রকম কষ্ট পায়।

ইমিগ্রেশনের প্রকিয়া শুরু হল। কোন ঝামেলাই হল না। ইমিগ্রেশনের শেষ অংশটুকু তখনো বাকি। এরপরে আর কারোর সাথে দেখা হবে না। হাতে তখন সময় তিরিশ মিনিট। আম্মু তখন আমাকে ধরে অনেক কাঁদছিল। আমার ওয়াইফ একদম চুপচাপ বসে ছিল। আর ছোট বোন বলছিল ওর নাকি ঘুম পাচ্ছে!!!!!!!

শেষ সময়টুকুও শেষ। আম্মু কেঁদেই চলছে। বোনের চোখও ছল ছল করছে।  কি কষ্ট!!! কি কষ্ট!!!! কিন্তু সব কিছুর উপরে একটা দৃশ্য আমি কখনই ভুলব না। আমি ইমিগ্রেশন পার হয়ে যাবার পরে আব্বুকে ওপারে ঠায় দাড়ায়ে থাকতে দেখি। হঠাৎ আমি বুঝতে পারি আমি আমার জীবনের সবচাইতে বড় বন্ধুকে ফেলে এসেছি। মনে হচ্ছিল সব কিছু ছেড়ে চলে আসি। কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন!!!!!

অবশেষে যাত্রা শুরু হল। তার্কিশ এয়ারলাইন্সে। সিটগুলো  চাপা, খাবারও অন্যরকম। আর অমন অবস্থায় আসলে খুব বেশী খাওয়াও যায় না।

ট্রানজিট ছিল ইস্তাম্বুলে। এক সময় অনেক স্বপ্ন ছিল এখানে ঘুরব। এখনো আছে।একটা ব্যাপার বলে রাখি।  এখানে ওয়াইফাইতে লগইন করতে ১০ ইউরো লাগে।

ফাইনালি জার্মানি। “হোটেল গ্রেভার ইন” বইতে হুমায়ুন আহমেদ লিখেছিলেন পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ থাকে। কারোর কাছে বিদেশের সব কিছু ভাল লাগে, আর কারোর কাছে কিছুই ভাল লাগে না। আমার কাছে কিছুই ভাল লাগে না। বিশাল এয়ারর্পোটে সব কিছু শান্ত ভাবে হচ্ছে দেখে মনে হয় এত শান্ত ভাবে সব হয় কেন……… আমাকে রিসিভ করতে আসে আমার পুরনো এক বন্ধু । আমার সাথে বিশাল লাগেজ তাই আমি ভাবছিলাম ক্যাবে যাব। কিন্তু ও আমাকে নিয়ে গেল পাবলিক ট্রান্সর্পোটে। এই একটা ব্যাপারে আমি মুগ্ধ হয়েই চলছি, হয়েই চলছি। কোন দেশের ট্রান্সর্পোট যে এত ভাল হবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই।

যাই হোক এয়ারর্পোট থেকে আসলাম ইয়ুথ হোস্টেলএ। এখানে একটা রুম ভাড়া করেছি কয়েকদিনের জন্য…… এমন একটা রুম যেখানে ১ রুমে ১২ জন থাকে। বিদেশ কত কঠিন এটা টের পাওয়া শুরু করলাম। রাতে খেলাম একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট এ। কোন রকমে পেটে কিছু দিয়ে ঘুমাতে গেলাম। শুরু হল আমার প্রবাস জীবন……………

চলবে………

লেখকঃ তানজীম মোঃ জিল্লু

Print Friendly, PDF & Email