জার্মানির ডায়রি

Contents

 

লেখকের কথা:

ঠিক এক যুগ আগের কথা। ২০০১ সাল, আমরা তখন অনেক সেশন জটে জট পাকিয়ে অবশেষে চতুর্থ বর্ষের ছাত্র, পাশ করে আর কিছুদিন পরে উচ্চশিক্ষা নিতে বিদেশ যাব – এমন একটা স্বপ্ন চোখেমুখে । বুয়েটের স্ট্যান্ডার্ড নিয়ম আর ঐতিহ্য (!) মেনে মনে মনে এক পা প্রায় আমেরিকার পথে। টোফেল দেয়া শেষ, জিআরই নিয়ে বসব বসব করছি। এমন সময় আল কায়েদার আমেরিকায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলা (কিংবা কেউ কেউ বলেন আমেরিকার নিজের লোকদের করা প্ল্যানে ঘটানো কাজ, সে যাই হোক না কেন)। আমরা যখন পাস করি করি তখন ভিসা দেওয়া তো দূরের কথা, আমেরিকার নামও মুখে আনা নিষেধ। স্কলারশিপ টিপ দিয়েও কোন কাজ হচ্ছে না এমন এক দুঃসময়! এমন একটা সময়ে একদম কোন কিছু না জেনে, প্রায় কোন জার্মান ভাষা না শিখেই ২০০২ সালের এপ্রিলের ৮ তারিখ চলে আসি জার্মানিতে।

অনেক বছর শেষে পিছন ফিরে তাকিয়ে ইদানীং মনে হয় জীবন যদি আবার শুরু করতে পারতাম, আর ৯১১ যদি না ঘটতো আর যদি জানা থাকতো জার্মানিতে কি কি সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, তাহলে চোখ বুজে আমেরিকা কানাডা বাদ দিয়ে জার্মানিতেই আসতাম। সেই প্রথম বছরগুলির সীমাহীন প্রতিকূলতা আর সম্পূর্ণ নতুন একটা ভাষা এবং কালচার শিখে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা – এইসব অভিজ্ঞতার আলো আমাদের নতুন প্রজন্মকে দিয়ে যাওয়া উচিত – এমন একটা উপলব্ধি থেকে লিখতে বসা।

কোনদিনও লেখক ছিলাম না। বুয়েটে ভর্তি হচ্ছিলাম এই সময়ের কথা, আমার সহধর্মিণী বলেছিল ওঁ নাকি আমার চিঠি পড়েই তখন প্রেমে পড়েছিল। তাঁরই চাপাচাপিতে পড়ে এইসব হাবিজাবি লিখা। কারো ভাল লাগলে এই সামান্য প্রচেষ্টা সার্থক মনে করব।

এই লেখাগুলি তাদের জন্য যারা অনেক বাঁধা আর প্রতিকূলতার মুখেও স্বপ্ন দেখতে ভুলে না, নিজের জন্য এবং নিজের দেশের জন্য। বাংলাদেশকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে যারা শেখালো, সেই শাহবাগের নির্ঘুম গনজনতার জন্য উৎসর্গিত থাকল এই লেখার প্রতিটি অক্ষর।

আদনান সাদেক, ২০১৩-২০১৪

জার্মানির ডায়রিঃ১ অপমান

সমস্যাটা যে শুধু আজকের ক্লাসটা নিয়েই তা নয়, সেমিস্টারের শুরু থেকেই একটা কিছু গোলমাল হয়েছে, কোন ক্লাসেই ইদানীং আর কিছু বুঝতে পারছি না।

জার্মানির ডায়রিঃ২ স্বপ্ন-ভেঙে বাস্তবে

মাঝে মাঝে যখন বেলা নেমে আসে, দূরে সূর্য ডোবার সময় ঘনিয়ে আসে আর চারদিক অদ্ভুত একটা নরম আলোয় ডুবে যায়, মনে পড়তে থাকে বহুদূরে ফেলে আসা আপনজনদের, তাদের আশা আর অনেক বছরের জমানো প্রতিশ্রুতির কথা। কেন যেন মনে হতে থাকে স্বপ্ন দেখা কত সহজ; কঠিন শুধু এই বাস্তবতার সামনে এসে দাঁড়ানো।

জার্মানির ডায়রিঃ৩: প্রথম আলো

মোবাইল কম্যুনিকেশনের মতন সহজ একটা বিষয় শেখানোর জন্য ফেটভাইস সাহেব কখন থেকে বকবক করছেন, একটা জব না পেলে এই লেকচার শোনার জন্য আমাকে আর জার্মানিতে থাকতে হবে না সেটা কি তিনি কখনো কল্পনাতেও ভাববেন!

জার্মানির ডায়রিঃ৪ প্রথম প্রেম

হাঁটতে হাঁটতে বেখেয়ালে হাতে হাত লেগে যাচ্ছিল কয়েকবার, একটা সময় অবাক হয়ে খেয়াল করলাম সেই হাত সরিয়ে নেবার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না তাঁর মধ্যে। আমার বুকের মধ্যে যেন এক লক্ষ প্রজাপতি উড়ে গেল।

জার্মানির ডায়রিঃ৫ স্পোর্টস কার

মরিয়া হয়ে ড্রাইভারকেই আবার জানতে চাইলাম এই জায়গাটা কোথায়, এইবার যেন আর চেক থেকে এসেছি কিনা এই প্রশ্ন না করে এইজন্য ইংরেজিতেই জানতে চাইলাম। তাঁর কাছ থেকে ভাঙা ইংরেজিতে বুঝতে পারলাম আমি ড্রেসডেনের পাশের একটা ছোট শহর মাইসেনে চলে এসেছি, প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে, এবং আজকে রাতে আর কোন বাস নেই ড্রেসডেনে ফিরে যাবার।

জার্মানির ডায়রিঃ৬ মুক্তির রঙ

কয়েক হাজার মাইল দূরে রাত জেগে ফেইসবুকে বসে আছি, কেউ যদি কাজের ফাঁকে দুই একটা ছবি আপলোড করে দেয়। আমাদের অনেক বছর আগের চিকা মারার স্বপ্ন এখন অনেক বড় হয়ে সত্যি সত্যি বাস্তবে রূপ নেবার পথে। বুয়েটের দেয়ালগুলো এখন শুধু আর ইট পাথরের স্তম্ভ নয়, ওরা এখন থেকে গল্প বলে শোনাবে আমাদেরকে, আমাদের নতুন প্রজন্মকে। আমাদের মা-বোনদের হারানো সম্ভ্রমের ইতিহাস, গণহত্যার ইতিহাস, আর তার থেকে জেগে ওঠা কোটি প্রতিবাদের মুঠি, মুক্তির গল্প, আমাদের স্বাধীনতার গল্প। রক্তের মতনই মুক্তির রঙগুলো পৃথিবীর সব দেশেই এক।

জার্মানির ডায়রিঃ৭ স্বাধীনতা 

স্বাধীনতা মানে প্রতিদিন ঘুমাতে যাবার আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করা “আজকে সারাদিনে আমি শুধুমাত্র দেশের জন্য কতগুলো মুহূর্ত ব্যয় করলাম? যেই মানুষগুলো আমাকে স্বাধীন ভাবে কথা বলার সুযোগ করে দিল, অধিকারের লড়াইয়ে যারা জীবন তুচ্ছ করল, সেই অধিকার ও তাঁর চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখতে আমি কি কি করলাম?”

জার্মানির ডায়রিঃ৮ প্রথম প্রহর 

আমি ঢুকতেই ট্রেন ছাড়ল, দরজার কাচের ভেতর দিয়ে বাইরের সেই সহৃদয় মানুষটির দিকে তাকালাম। আগের ট্রেনে পরিচিত হওয়া সেই ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে হাত নাড়ছেন। চেনা নাই জানা নাই, কই ভাবছিলাম নিচে রাখা সুটকেসটা একা পেয়ে কেউ আবার নিয়ে যায় কিনা। আর সেই অজানা সহযাত্রী আমাকে ট্রেনটা মিস হতে দিল না। আমার চোখদুটো এক অজানা ভাললাগায় আদ্র হয়ে উঠল।

জার্মানির ডায়রিঃ৯ সর্বনাশী

আশপাশের কথায় যতটুকু বুঝলাম, অনেক বৃষ্টি হয়েছে চেক রিপাবলিক সহ পূর্ব ইউরোপের কয়েকটা দেশে, সেই পানি এখন বইছে ড্রেসডেনের উপর দিয়ে। প্রায় নাকি বন্যা বন্যা ভাব। এমন বন্যা নাকি এখানে সহজে দেখা যায় না, সবাই ধুম ধাম ছবি তুলছে। আমি মনে মনে হাসলাম, যেই বন্যায় নদীর পাড়ে দাঁড়িয়েই সবাই ক্যামেরার সামনে পোজ দিচ্ছে, সেটাকে বন্যা বলাই বাহুল্য।

জার্মানির ডায়রিঃ১০ ক্রিকেট এবং একটি স্বপ্নপূরণ

চারদিক থেকে ছুটে আসছে অনেকগুলো ক্রিকেট পাগল ছেলেপেলে। মানহাইম, ডার্মস্টাড, ফ্রাঙ্কফুর্ট, ইয়েনা, নুরনবার্গ, আলেন, স্টুটগার্ট, মিউনিখ থেকে ছুটে আসছে তৌফিক, তৌসিফ, মাজহার, তালেব, মাইনুল, জামাল, রনি, টিটু ভাই, মামুন, নাইম, নিয়াজ এমন অনেকগুলো মুখ। উপলক্ষ জার্মান কর্পোরেট লিগ। আট দলের লিগের শুধুমাত্র একটি দলে থাকছে লাল সবুজের পতাকাধারী কয়েকজন যুবক। প্রতিপক্ষে থাকছে ভারত, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, অস্ট্রেলিয়া, সাউথ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড থেকে আগত প্রবাসীদের নিয়ে গড়া শক্ত কয়েকটি দল।

জার্মানির ডায়রিঃ১১ দ্বিতীয় জন্ম

প্রথম জন্মমুহূর্তের স্মৃতি আমাদের কাররই মনে থাকেনা। কেউ কেউ নাকি ড্রাগ নিয়ে চেষ্টা করে মায়ের গর্ভ থেকে বের হবার সময়ের অনুভূতি। তবে কেউ কেউ আবার বেঁচে থাকতে থাকতেই আরেকবার জীবন পায়, তাদের দ্বিতীয় জন্ম হয়। সেই দ্বিতীয় জন্মের প্রতিটা মুহূর্ত আমি টের পেলাম। সেই জন্মে কি অসম্ভব বেদনা, বেঁচে থাকার কি অলীক আনন্দ!

জার্মানির ডায়রিঃ১২ প্রফেসর

কামাল ভাই ট্রেন থেকে নামার একটু পরেই দেখা গেল তিনি ফাঁকা বকেন নি। একজন মধ্য বয়েসী জার্মান ভদ্রলোক তার জন্য অপেক্ষা করছে স্টেশনে। তার ব্যবহার অত্যন্ত অমায়িক, চমৎকার উচ্চারণে ইংরেজিতে কামাল ভাইকে সম্ভাবন করলেন। কামাল ভাইয়ের মুখে বিশ্বজয়ীর হাসি, আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বুঝলে আদনান, স্কলারশিপ পাবার ভাবটাই আলাদা।

জার্মানির ডায়রিঃ১৩ একটি চুক্তিপত্র

প্রোডাক্ট দেখে কারখানার প্রোডাকশনের সব নিয়ম নীতি আর প্রসেস বোঝা যায় না। এই দেশের স্কুল হল মানুষ গড়ার কারখানা, আর সেই কারখানার প্রোডাক্ট হল জার্মানরা। এতদিন জার্মানদের দেখে এই দেশের প্রোডাক্ট গুলোর সাথে পরিচিত হয়েছি। এইবার এহার স্কুল শুরু হবার পর থেকে স্কুলে কিভাবে নিয়ম কানুন শিখিয়ে এই প্রোডাক্ট তৈরি হচ্ছে, সেটা একটু একটু করে শিখছি।

জার্মানির ডায়রিঃ১৪ অন্যরকম একুশ

কাঁচুমাচু হয়ে বসে আছি, সুজানার ভাব সাব দেখে মনে হচ্ছে আমাকে নিয়েই আসল অনুষ্ঠান হবে। একের পর এক ভয়াবহ রকমের মানুষজনকে নিয়ে এসে সে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে থাকল। স্থানীয় সরকারের প্রতিমন্ত্রী, সার্ব্রুকেনের ইউনিভার্সিটির ভাষা বিভাগের প্রভাষক, স্থানীয় জাদুঘরের প্রধান। আমার দেবার মতন কোন পরিচয় নেই। সুজানা বলে, ও হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে এসেছে, এই দেশ থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পালিত হবার রীতি। এইটুকুতেই সবাই মুগ্ধ।

জার্মানির ডায়রিঃ১৫ স্বপ্ন

ক্ষমতা, বিত্ত, খ্যাতি এইসব আমাদের সবাইকেই প্রভাবিত করে। আমাদের বেঁচে থাকার জগতে এইসব পার্থিব জিনিসের পাশেও রাইমুন্ড, সজলের মতন মানুষেরা শিখিয়েছে শুধু স্বপ্নের জন্য বেঁচে থাকতে। তারা দেখিয়েছে, প্রতিটি স্বপ্নের পথে বাঁধা অবধারিত। সত্যিকারের স্বপ্ন এমন এক জিনিস যার জন্য জীবন পর্যন্ত তুচ্ছ করা যায়।

জার্মানির ডায়েরিঃ১৬ “বন্ধু, কি খবর বল!“

আমাদের জীবনের সুন্দরতম এবং আনন্দময় সময় আমাদের শৈশব এবং কৈশোরকাল। জীবন বড় কঠিন, সে তার স্বাভাবিক নিয়মে এইসময়ের বন্ধু প্রিয়জনদের দূরে সরিয়ে দেয়। তারপর কখনও কখনও জীবন আবার গভীর মমতায় অনেক বছর আগের প্রিয় মুখগুলিকে সামনে নিয়ে আসে। হারিয়ে যাওয়া দিনের সকল অস্পষ্ট হয়ে আসতে থাকা ছবিগুলো আবার ফিরে ফিরে আসে। অতীতের স্মৃতি চারণ আর নস্টালজিয়াতে চারদিক ভরে ওঠে। সেই তুলনাহীন আনন্দে ভাসতে ভাসতে হারিয়ে যাওয়া সব স্কুল কলেজের অসংখ্য প্রিয় মুখের কথা মনে পড়ে। মনে মনে অপেক্ষায় থাকি, একদিন আবার সেই সুর বাজবে। হঠাত অচেনা পথে দেখা হয়ে যাবে পুরনো কোন চেনা মুখের সাথে। বুকে জড়িয়ে ধরে বলব, „বন্ধু, কি খবর বল।“

জার্মানির ডায়েরিঃ১৭ “ল্যাপটপকাব্য“

ব্যাংকে টাকা নেই, কিন্তু সেইদিন থেকে কবে একটা ল্যাপটপ কিনব – এই চিন্তায় রাতে ঘুমোতে পারি না। ড্রেসডেন শহরে নতুন কম্পিউটারের একটা দোকান আছে। সেখানে গিয়ে কাঁচের শোকেজে সাজানো থরে থরে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থাকি। একবার দোকানদার আমাকে দেখে বিরক্ত হয়ে বলল, পছন্দ হয়েছে? আমি মাথা নেড়ে না বলে চলে আসি। পরের দিন আবার যাই। দোকানদার আমাকে দেখে একটু সতর্ক হয়। সে জানে আমি কিছু কিনব না, তারপরও এত ঘন ঘন কেন আসা?

জার্মানির ডায়েরিঃ১৮ “প্রাচুর্য”

অনেকদিন বিদেশে থাকলে অবশ্য ধীরে ধীরে এই প্রাচুর্যের রঙিন চশমা সাদা হয়ে আসতে থাকে। আমাদের বাড়ীর নিচের পার্কিং-এ প্রায়শই বিএমডব্লিও, অডি বা পোর্শের জিপ পার্ক করা থাকে। ঘরের ময়লা ফেলতে নিচে নামি, আবার উপরে উঠে আসি। পার্কিং এর দামী গাড়ী আলাদা করে চোখেই পড়ে না।
বিদেশের প্রাচুর্যময় জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়ে মাঝে মাঝে অত্যন্ত ক্ষুদ্র কিছু দৃশ্য মনে গভীর ভাবে দাগ কাটে। এতটাই গভীর যে ছবি তুলে অন্যদেরকে সেটা জানাতে ইচ্ছে করে।

জার্মানির ডায়েরিঃ১৯ “বিশ্বাস”

গত এক যুগে পথে ঘাটে অনেক বিদঘুটে জায়গায় অনেক রকম অদ্ভুত ভাবে অনেকের সাথে পরিচয় হয়েছে, অপরিচিত জনের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আপনজনের মত গল্প হয়েছে, অনেকবার অনেক দোকানে গিয়ে মেইড ইন বাংলাদেশ লেখা দেখে অজান্তেই অদরকারী কাপড়ে হাত বুলিয়েছি। তবে একটা জিনিস কখনো চোখে পড়েনি, সেটা হল বাংলাদেশের পতাকা। যদিও নিজের গাড়িতে সবসময় একটা বাংলাদেশের পতাকা ঝুলে, কিন্তু পথে ঘাটে অসংখ্য পতাকার মাঝে নিজের দেশের পতাকা হঠাত করে দুলতে দেখার আনন্দটাই অন্যরকম।

জার্মানির ডায়েরিঃ২০ “ড্রাগন”

সাত বছর হবে হবে এই সময়টাই এইরকম। এই বয়সে শিশুসুলভ ব্যাপারগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে থাকে। শিশুরা এইসময় কিশোরীতে রূপান্তর হতে থাকে। সব শিশুসুলভ জিনিস আবার চলে যায় না। এই বয়সে তারা অবিশ্বাস নিয়ে ড্রাগনের মতন প্রাণী কল্পনা করে। এই ড্রাগনরা তাদের ঘুমের ঘোরে তাদের শিয়রে এসে পাহারা দেয়। তারা ভয় পেলে ড্রাগন পালক মেলে তাদেরকে কোলে আশ্রয় দেয়। যেকোনো বিপদে পড়লে ড্রাগন আগ্রাসী হয়ে তাদের শত্রুর দিকে আগুন ছুঁড়ে দেয়। খেলার সময় হলে ড্রাগন তাদেরকে পিঠে নিয়ে আকাশের সবচেয়ে উঁচু মেঘের দেশে উড়ে যায়। ছয় থেকে সাতে পা দেবার সময়টাতে রিহার কল্পনার রাজ্য পাহারা দেয় ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রাগনরা।

জার্মানির ডায়েরিঃ২১ “উপলব্ধি”

একদিন অনেক খুঁজেও কোন পার্কিং পাচ্ছি না। তখন আমার প্রথম মেয়েটার বয়স ১০-১১ মাস হবে। সে মাত্র হাঁটতে শিখছে এবং অফিস থেকে ফেরার সময়টা সে অপেক্ষা করে থাকে কখন বাবা ফিরবে। সদ্য বাবা হওয়া মানুষটাও এই সময়টা বাসায় ফেরার জন্য অধীর হয়ে থাকে। বাসায় ফিরে আমরা সামনের পার্কে যাই। সেখানে এহা বালি দিয়ে খেলে। দোলনায় চড়ে। একটু হাঁটতে গিয়ে পড়ে যায়। আমি সাথে সাথে ছুটে যাই না (এই অংশটা জার্মান বাবা-মা দের থেকে দেখে শেখা)। দূর থেকে দেখেও না দেখার ভান করি। এবং মেয়েকে নিজে নিজে উঠে দাঁড়াতে দেই। এহার বয়স ১ বছর ছুঁই ছুঁই করছে। এই সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত সোনায় মোড়ানো। আমি পাশে বসে চোখে অসীম বিস্ময় নিয়ে এহার বড় হওয়া দেখি। এইসব চমৎকার সময় পার্কিং খোঁজার কাজে নষ্ট করার কোন মানেই হয় না।

জার্মানির ডায়েরিঃ২২ “অংক এবং কিছু আনন্দ”

পরের বার এহার শিক্ষিকার সাথে দেখা হবার সময়ও শিক্ষিকা আমাকে দেখেই এহার প্রশংসায় মুখর হলেন। এই বাচ্চাকে নিয়ে যেন আমরা কোন চিন্তা না করি, সে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এই জাতীয় কথাবার্তা বাংলাদেশে বললে মানায়। জার্মানরা সাধারণত কোন বিষয় নিয়েই এতটা উচ্ছ্বসিত হয় না। এরা কঠিন মুখে বলবে, তোমার মেয়ের হাতের লেখা ভাল, কিন্তু খাতা বেশি পরিষ্কার রাখে না। শুধু গ্রেড ভাল হলে হবে না, পরিচ্ছন্নতার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

জার্মানির ডায়েরিঃ২৩ “কুকুর, ভয় এবং পুলিস”

দেখলাম এহা তেমন ব্যথা পায় নি। এবং মারার পরে নাকি মহিলা আবার নরম স্বরে তাকে সরি বলেছে। এহার মন খারাপ অন্য কারণে। তার বক্তব্য অনুসারে সে কোন ভুল করে নি। ভদ্র মহিলা রঙ সাইডে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারপরেও সে কড়া ব্রেক করেছে। তাকে কেন দোষারোপ করা হল। আমার স্ত্রী এই ধরণের যেকোনো ঘটনায় মুখে একটা বিশেষ ভান তৈরি করে। সেই মুখ বলে, মিঃ জার্মান ফ্যান, ঠ্যালা সামলাও। কালো চামড়াকে এরা মানুষই মনে করে না!

Print Friendly, PDF & Email

Comments Closed

  1. Pingback: জার্মানির ডায়রি ৯: সর্বনাশী | বিসাগ (www.BSAAGweb.de)

  2. Pingback: জার্মানির ডায়রিঃ১১ দ্বিতীয় জন্ম | বিসাগ (www.BSAAGweb.de)

  3. Pingback: জার্মানির ডায়েরিঃ১৫ “স্বপ্ন” | বিসাগ (www.BSAAGweb.de)

  4. Pingback: দশটি ধাপে জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা | বিসাগ (www.BSAAGweb.de)

  5. Pingback: ফেসবুকে জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা বিষয়ক ফ্রি তথ্য যাচাই করে নিন | বিসাগ (www.BSAAGweb.de)

  6. Pingback: জার্মানির ডায়রি-৩: প্রথম আলো | বিসাগ (www.BSAAGweb.de)

  7. Pingback: জার্মানির ডায়রিঃ১৪ অন্যরকম একুশ | বিসাগ (www.BSAAGweb.de)

  8. Pingback: জার্মানির ডায়রি-১৩: একটি চুক্তিপত্র | বিসাগ (www.BSAAGweb.de)

  9. Pingback: BSAAG TSC Seminar 2013 – Video Blog | বিসাগ (BSAAG)

  10. Pingback: জার্মানির ডায়রি-২: স্বপ্ন-ভেঙে বাস্তবে। | BSAAG

  11. Pingback: জার্মানির ডায়রিঃ১০ ক্রিকেট এবং একটি স্বপ্নপূরণ | BSAAG

  12. Pingback: জার্মানির ডায়রি-৬: মুক্তির রঙ | BSAAG

  13. Pingback: জার্মানির ডায়রি ৮: প্রথম প্রহর | BSAAG

  14. Pingback: জার্মানির ডায়রি-৭: স্বাধীনতা | BSAAG

  15. Pingback: জার্মানির ডায়রি-৪: প্রথম প্রেম | BSAAG

  16. Pingback: জার্মানির ডায়রি-১২: প্রফেসর! | BSAAG

  17. অসাধারণ লিখেছেন ভাইয়া। আরো লেখা চাই.

     
  18. ওয়েব সাইট খুব ধীরে লোড হয় , ব্যান্ডউইথ একটু বাড়িয়ে নিবেন আশা করি, জানেনইতো আমাদের দেশের ইন্টারনেট স্পীড এর খবর।

     
  19. Your writings just made me cry!.. Ajke amar boro vaiar jonmodin!! Mon kharap korte chainai.. 🙁 Shuveccha thaklo.. Keep writing..