• Home »
  • BSAAG »
  • ছি ছি ছি জার্মানরা কত খারাপ

ছি ছি ছি জার্মানরা কত খারাপ

 

ঘটনা ০১ঃ

জার্মানি আসার ১২ দিন পর স্টুডেন্ট ডর্মে উঠেছিলাম। ডর্ম টা আমি বাংলাদেশ থেকেই পেয়েছিলা, যেটা সাধারণত সহজে পাওয়া যায় না। স্টুডেন্ট ডর্মে ১০০MBPS নেট স্পীড অথচ ব্যাবহার করতে পারছি না। ব্যাবহার করতে হলে আমার স্টুডেন্ট আইডি দিয়ে লগ ইন করতে হবে আমাদের ইউনিভার্সিটির সার্ভার এ। খুবই সহজ একটা ব্যাপার, একটা গাইড লাইন ও পেয়েছিলাম নেটে কিন্তু আমার জার্মান ভাষা জ্ঞান শূন্যে কোটায় থাকার কারনে অনেকবার চেষ্টা করার পরে ও কোন কাজ হল না।

রুমে নেট নেই এজন্য আর রুমে থাকতে ইচ্ছা করছে না, ভাবছিলাম  ক্যাম্পাসে গিয়ে wifi চালাব। রুম থেকে বের হতেই মেয়েটার সাথে দেখা। প্রথমদিনে রুমে উঠার সময় পাশের রুমের এই সোনালী চুলের নীল চোখওয়ালা মেয়েটার সাথে পরিচয় হয়। ভালমন্দ জিজ্ঞাসা করার পর ওকে বললাম আমার নেট কানেকশন নেই (ছি ছি ছি জার্মান কত খারাপ দেশ নেট কানেক্ট হয় না) ক্যাম্পাসে যাচ্ছি wifi ব্যাবহার করতে। মেয়েটা আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, তোমার রুমে চল, দেখি আমি কিছু করতে পারি কি না। মেয়েটা আমার ল্যাপটপে বসে চেষ্টা করছে নেট কানেক্ট করার, আমি লক্ষ্য করছি ওর মুখের এক্সপ্রেশনটা, একবার কপাল কুচকায়, একবার চোখ বড় বড় করে কি সব দেখে আর সেই সাথে আমি ভাবছি, নেট কানেক্ট করার এই ব্যাপার গুলো আমি একটু আধটু বুঝি, তুমি যা করছ এগুলো আমি আগেই করেছি। কিছুক্ষন পর মেয়েটা আমাকে জিজ্ঞাসা করল তুমি কি ম্যানুয়ালি কনফিগারেশন করেছ তোমার ল্যাপটপ ইথারনেট কানেক্ট করার জন্য। আমি ভদ্র ছেলের মত উত্তর দিলাম না, সাথে এটাও বললাম এটা তো অটোমেটিক করা থাকে। এবার ও সমস্যা টা বুজতে পারল। সবমিলিয়ে ১০-১৫ মিনিট লাগল সব কিছু ঠিক করতে।

ঠিক করার পর ৫ মিনিট লেকচার দিল মানে আমাকে বিস্তারিত ভাবে বুঝাল কেন আমি কানেক্ট করতে পারি নি। কেন অটোমেটিক কনফিগারেশনে কাজ হয়নি। তারপর কানেক্ট করার সময় কি কি সমস্যা হতে পারে, এর সমাধান কি কি। খুব পরিষ্কার ভাবেই আমাকে বুঝিয়ে একটা মিস্টি হাসি দিয়ে চলে গেল। এই নেট কানেক্ট করার সমস্যা টা আর ৪ জন ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টের  হয়েছিল যে গুলো আমি ঠিক করেছিলাম।

 

ঘটনা ০২ঃ

রুমের চাবি রুমে রেখে চলে যাই। এই ভুল টা এখন পর্যন্ত ৪-৫ বার হয়েছে গত ৬ মাসে। কপাল ভাল হলে হাউস মাষ্টার এসে খুলে দিয়ে যায়। আর যেদিন হাউস মাষ্টার থাকে না পাশের রুমের জার্মান বা ASTA থেকে কেউ এসে চাবি ছাড়া প্লাস্টিকের টুকরা দিয়ে খুলে দেয়। এই আনঅফিসিয়ালি প্লাস্টিকের টুকরা দিয়ে রুম খোলা বেশ কষ্টসাধ্য এবং অনেক সময় লাগে। কিভাবে খুলতে হয় এটাও শিখিয়ে দিয়েছে(ছি ছি ছি জার্মানরা কত খারাপ আমাকে আনঅফিসিয়ালি রুম খোলা শিখিয়েছে)। কিন্তু যতবার এই ভুল করেছি ততবারই কোন না কোন জার্মান কষ্ট করে এবং সময় নিয়ে রুম খুলতে সাহায্য করেছে। একবার তো একজন হাতে ছোটখাট আঘাত ও পেয়েছিল লক খোলার সময়। অথচ কখন কেউ কোন বিরক্ত প্রকাশ করেনি এই ব্যাপার নিয়ে। মাসে এক দুই বার এ রকম মিষ্টি যন্ত্রণা বেশ উপভোগ করেছি, আর না। গতকাল দরজার সাথে কাগজে “চাবি” লিখে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিয়েছি। এই ভুল ষষ্টবার হবে না আশা করি।

 

ঘটনা ০৩ঃ

একটা ডকুমেন্ট আনতে ইন্টারন্যাশনাল অফিসে গেলাম আজ। সম্ভবত লাঞ্চ আউয়ার চলছিল। দরজা খুলে মে আই কাম ইন বলতে ম্যাডাম আইন মোমেন্ট বিটে বা এ রকম কিছু একটা বলল(ইন্টারন্যাশনাল অফিসে ভুলে মাঝে মধ্যে জার্মান বলে), ভাবে বুঝলাম একটু পরে ঢুকতে বলছে। ২ মিনিট পর ডাকদিল। সাথে নতুন একটা চায়নিজ মেয়ে ছিল দরজার সামনে দাড়ান। দুইজনে একসাথে ডুকলাম। মেয়েটার যে ডকুমেন্ট লাগবে সেটা সে এই রুমে পাবে না, অন্য রুমে যেতে হবে। কিন্তু তারপরও এই রুমের ম্যাডাম তাকে সব বুঝিয়ে দিচ্ছে এবং সেই রুমের ম্যাডাম কে ও সব বলে দিচ্ছে ফোনে।

সম্ভবত লাঞ্চ আউয়ার এজন্য হালকা সাউন্ডে একটা গান বাজছিল FM এ, এই গান টা আমি আগেও শুনেছি কোন রেস্টুরেন্ট বা বারে। গানের নাম টা জানি না, কোন ভাষায় গাচ্ছে সেটা ও জানি না। এজন্য খুজতে পারি নি। তবে অনেক ভাল লাগে গান টা। গান টা শোনার সাথে সাথে আমি কান খাড়া করে দিয়ে শুনছি। এটা মেডাম লক্ষ্য করেছেন। মেয়েটার সাথে কথা বলা শেষ হলে ম্যাডামকে শুধু বললাম নাইচ সং। ম্যাডাম উত্তর দিলেন এটা একটা স্পানিশ গান। সাথে সাথে আমি জিজ্ঞাসা করলাম দয়া করে আপনি কি এই গান টার নাম বলতে পারবেন। ম্যাডাম বলল দুঃখিত আমি স্প্যানিশ জানি না। এই পুরো ঘটনা টা এই রুমের পাশের আর একটা ম্যাডাম লক্ষ্য করলেন, সঙ্গে সঙ্গে উনি উনার ফোন বের করে একটা অ্যাপ চালু করে এই ম্যাডামের কাছে দিয়ে বললেন গান টা ১০-২০ সেকেন্ড রেকর্ড করতে। রেকর্ড শেষে গান টার নাম চলে আসল অ্যাপ টিতে। আমাকে গান টার নাম দিল সেই সাথে এটা ও জানাল এই অ্যাপ টার নাম এবং এটা কিভাবে কাজ করে।(ছি ছি ছি জার্মানরা কত খারাপ ইউনিভার্সিটিতে গেলে গান শোনায়, গান খোজার অ্যাপ দেয়)। কাজ শেষে ম্যাডাম কে কিভাবে ধন্যবাদ দিব সেটা বুজতে পারছিলাম না।

এটা যদিও স্প্যানিশ গান তবুও আমার কাছে অনেক ভাল লাগে। (গানের লিঙ্ক টা কমেন্টে দিয়ে দিলাম, ইউটিউব 800,156,271 views) আমার কাছে মনে হয় গানের কোন দেশ নেই, কোন ভাষা নেই, আছে শুধু সুর তাল বা লয়। গান হল ইউনিভার্সাল এবং এটা সবার জন্য উন্মুক্ত।

 

তিনটে ঘটনা থেকে কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য করা যায়। এরা শুধু মাছ খেতে সাহায্যই করে না, কিভাবে মাছ ধরতে হয় সেটা ও শিখিয়ে দেয়। বাংলাদেশে লোকজন কতটা হেল্পফুল সেটা আমরা সবাই জানি, এবং সেসব লোকজন একটু আধটু সাহায্য করে তারা আর জিনিসটা শিখাতে চায়, মনে করে শিখিয়ে দিলে তো আর আমার কাছে আসবে না। কিন্তু জার্মানরা নিজের খেয়ে শুধু বনের মহিষ তাড়ায় না, নদী ও পার করে দেয়। জার্মানদের নিয়ে এ রকম অনেক অনেক ঘটনা লিখা যায়, হাজার হাজার উদাহরন দেয়া যায়। কিন্তু আমি হাইব্রীড অলস, লিখতে অনেক কষ্ট হয় এজন্য আর লিখা হয় না। সময় নিয়ে পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

Print Friendly, PDF & Email