জার্মান রাজনীতি

 

ঘুম ঘুম চোখে সকাল বেলা বাড হনেফের স্টেশনে ট্রাম থেকে নেমেই দেখি সামনে দাঁড়িয়ে এক মহিলা। হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, ফ্রুশটুক, মানে নাশতা লাগবে? দেখলাম তার হাতে একটা কার্টনে করে নাশতার প্যাকেট আর আপেল। ফাও নাশতা নিতে সেকেন্ডের বেশি সময় লাগলো না। আপেলও নেন একটা, বললেন তিনি। সেটাও নিলাম। ”১৪ তারিখ লান্ডটাগের (জার্মানির রাজ্য সংসদ) নির্বাচন, ভুলবেন না যেন” আপেল দিতে দিতে মনে করিয়ে দিলেন। এবার ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম। “আরে আপনার ছবি তো আমি দেখেছি, আপনি কি সিডিইউর প্রার্থী?” মহিলাও হাসিমুখে মাথা নাড়লেন। তারপর দ্রুত আরেকজনের দিকে এগিয়ে গেলেন।
পরের দিন সকালে একই কাহিনী। তবে এবার এসপিডি, জার্মানির আরেক বড় দল। তার প্রার্থী আর সমর্থকেরা দেখি ট্রাম স্টেশনে নাশতা বিলিয়ে যাচ্ছে আর সাথে লিফলেটও ফ্রি। আমি তিন দিন সকালের নাশতা লান্ডটাগ ইলেকশনের ক্যাম্পিং এর সুবাদে মুফতে পেয়েছি।
গত সপ্তাহে ইলেকশনও হয়ে গেছে। নর্থ রাইন রাজ্যে বরাবরই এসপিডির দখল থাকে। তবে এবার সিডিইউর জয়জয়কার।

অফিসের কলিগকে জিজ্ঞেস করলাম কোন দলকে ভোট দিয়েছে, সিডিইউ, এসপিডি দুটো দলেরই সমর্থক আছে। আমার দুই প্রতিবেশী বাসায় এসেছিলেন কাল। একজন গ্রিন পার্টি আরেকজন লিংক মানে বামকে ভোট দিয়েছে। আমার নিচের তলায় এক বৃদ্ধ থাকেন। কিছুদিন আগে কথা প্রসঙ্গে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন এবারের নির্বাচনে তিনি এএফডি, মানে যারা মুসলিম বিরোধী বলে পরিচিত তাদের ভোট দিবেন। আমার সাথে এটা নিয়ে আবার হাল্কা বাতচিতও হয়েছে তার। তবে এরপরও মাঝে মধ্যে আমার বাসায় খাবার নিয়ে আসতে তার কোন সমস্যা হয় না।

অদ্ভুদ লাগে, কত দল আর তাদের সমর্থক অথচ একইসঙ্গে বসবাস। নেই কোন বিদ্বেষ কিংবা ঘৃণার ছড়াছড়ি। এদেশেও আদর্শের রাজনীতি চলে, কিন্তু কোন চেতনার ব্যবসা নেই। এখানেও রক্ষণশীল আর উদারপন্থীদের মধ্যে ব্যবধান বিরাজমান। রয়েছে তর্ক আর বিতর্ক। রাতের টক শোগুলোতেও চলে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা। কিন্তু কে কাকে ভোট দিলো সেটা কেউ লুকায় না। কারণ জানে এজন্য তার চাকরি যাবে না। তার নামের আগে পরে কোন বিশেষণ জুড়ে দেয়া হবে না।


অথচ এই দেশেও দেশপ্রেম আছে। কিন্তু নেই চেতনার নামে ঘৃণাবাজি। নেই কোন ব্যক্তিপূজা। উগ্র জাতীয়তাবাদ কতটা ভয়ঙ্কর জার্মানদের চেয়ে বোধহয় বেশি আর কেউ জানে না। তাই একটা সহাবস্থানের পরিবেশ তারা কেবল রাজনীতিতেই নয়, সমাজের সব জায়গাতেই তৈরি করে নিয়েছে।

কিন্তু এই সহাবস্থানের সুযোগেই আমাদের দেশী ভাইয়েরা তাদের রাজনীতি এখানে আমদানীর সুযোগ পাচ্ছে। বাংলাদেশের কমিউনিটিতে এই বিভেদের রাজনীতির নোংরামি সুযোগ পেয়ে এখানকার সমাজেও ছড়িয়ে পড়ে। যার প্রমাণ মাঝে মধ্যেই ফেসবুকে দেখা যায়। আমি ভাবি এই দেশে গণতন্ত্রের নুন খেয়ে যারা নিজেদের মধ্যে ফ্যাসিবাদী চেতনা লালন করে তারা কত বড় অকৃতজ্ঞ!! এদের ভাগ্য ভালো যে এদেশের মানুষ বাংলা জানে না। নয়তো তারা জানতো দেখতে নিরীহ এই বাঙালী ব্রাদার্সরা আসলে কী চিজ!!

লিখেছেনঃ Riazul Islam

Print Friendly, PDF & Email

ফেসবুক মন্তব্যঃ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.