• Home »
  • BSAAG »
  • জার্মানিতে নতুনদের জন্যঃ “ফিউচার ইজ নট ইক্যুয়াল টু পাস্ট”

জার্মানিতে নতুনদের জন্যঃ “ফিউচার ইজ নট ইক্যুয়াল টু পাস্ট”

 

সম্প্রতি ভিসা পেয়েছে, এবং জার্মানিতে আসছ সামনের সেমিস্টারে, তাদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা।

১। ভিসা পাওয়ার জন্য অনেক অভিনন্দন। অনেক কষ্ট (!) করে ভিসা পেয়েছ, সুতরাং মিষ্টি খাওয়াও মানুষজনকে বেশী করে, ফেসবুকে বন্ধুদের খবর দাও। মিষ্টি খাওয়ানো এবং লাইক গনা শেষ হয়েছে? এইবার বাস্তবতায় ফিরে আসা যাক। জার্মানিতে সফল হবার পথে যতগুলো ধাপ, তার মধ্যে সবচেয়ে সহজ এবং গুরুত্ব বিহীন ধাপটি হল ভিসা পাওয়া। মাত্র গা-গরম করার পর্ব শেষ হয়েছে, আসল খেলা এখনও শুরু হয়নি।

২। অভিজ্ঞতা থেকে নতুনদের জন্য সতর্কবাণী। জার্মানিতে আসার পর, প্রায় ২৫ ভাগ ছেলেমেয়ে (সংখ্যাটা বাড়ছেই) আবিষ্কার করে এই কোর্স তাদের পক্ষে শেষ করা সম্ভব নয়। এবং প্রথম এক বছর এদের নষ্ট হয় আরেকটা ইউনিভার্সিটি এবং নতুন কোর্স খুঁজে বের করার কাজে।reality[1]

৩। প্রায় ৯০ শতাংশ ছাত্র ছাত্রী ২ বছরের কোর্স সময় মতন শেষ করতে পারে না। এদের বেশীরভাগই অন্তত ৩ বছর সময় নেয়। যেসব কোর্সের পরিসংখ্যানের কথা বললাম, এগুলো ইংরেজি মাধ্যমের। জার্মান মাধ্যমে পড়তে আগতদের বেশীরভাগই প্রথম এক বছর শিত নিদ্রায় থাকে। এই সময় পড়াশোনা ছাড়া আর অন্য সকল প্রকার কার্যক্রমে এদেরকে পাওয়া যায়।

৪। বেশীরভাগ ইউনিভার্সিটিগুলোতে পড়াশুনায় বাংলাদেশী ছাত্র ছাত্রীরা অন্যান্য দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে। এবং আমার অভিজ্ঞতায়, জার্মানিতে জার্মান ভাষা শেখার ক্ষেত্রেও অন্য যেকোনো দেশের থেকে আমাদের ছেলেমেয়েরা পিছিয়ে।

৫। পড়াশোনা বাদ দিলে অন্য কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য আমাদের ছাত্রছাত্রীরা এগিয়ে আছে। এর মধ্যে রান্না করা, সময়ে অসময়ে পার্টি, ফেসবুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয়, সুযোগ পেলেই প্যারিস রোম লন্ডন ঘুরে আসা ইত্যাদি “কাজের” নাম নেয়া যেতে পারে।

৬। জার্মান ভাষা ভাল না জানায় বেশীরভাগ ছাত্রছাত্রী এখানে সবচেয়ে খারাপ ধরণের “অড” জবগুলো করে। বিদেশে সব কাজই সমান, তারপরও উচ্চতর ডিগ্রী নিতে এসে একজন ছেলে যখন প্রায় অশিক্ষিত বিদেশি লেবারদের সাথে কারখানার ময়লা পরিষ্কার করছে, বা ম্যাকডোনাল্ডে বাথরুম পরিষ্কার করে, সেটা দুঃখজনক।

৭। ভিসা পাবার আগে পর্যন্ত যাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আমাদের অবস্থা টাইট, জার্মানিতে পা দেবার সাথে সাথে এদের ৯০ শতাংশকে ফেসবুকে নিজের স্ট্যাটাস, বিভিন্ন সেলফি আপডেট দিয়ে নিজেদের জাহির করার পাশাপাশি অন্যদেরকে সাহায্য করার কথা বেমালুম ভুলে যাবে। যারা আসার আগে ইমেইল করে ইন বক্স ভরে ফেলেছে, এদেরকে মেসেজ করলেই, “ভাই, একটু বিজি আছি/নিজের কাম, ঘরের কাম, পড়াশোনা ফেইল্লা ফাও ফাও ফেসবুকে অন্যরে সাহায্য করার টাইম নাই” জাতীয় উত্তর পাওয়া যায়। এদের অনেককেই খুঁজলে এখনও বিসাগ গ্রুপে ঘুমন্ত অবস্থায় পাওয়া যাবে।

তালিকাটা আর বেশী বড় করলাম না। এর মধ্যেই হয়তো অনেকের ভ্রু কুঁচকে যাচ্ছে। কিছু করার নেই, আমার কাজ সত্য এবং বাস্তবতা তুলে ধরা। এবং সেটা বেশীরভাগ সময়েই তিক্ত হয়। এটা দুঃখজনক বাস্তবতা যে, আমাদের দেশ যে সকল ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য যেকোনো দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে, সেটা জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা ছেলেমেয়েদেরকে অন্যান্য দেশের ছাত্র ছাত্রীদের সাথে তুলনা করলে টের পাওয়া যায়।

একবার দুবাই এয়ারপোর্টে মোটামুটি বেশ ভাল অবস্থানে থাকা এক বাংলাদেশী আমাকে বলছিলেন, দুবাইয়ের বিদেশি লেবারদের মধ্যে বিভিন্ন ভাগ আছে। এবং তার মধ্যে সবচেয়ে নিচের ধাপের লেবার হল বাংলাদেশীরা। তার কথা শুনে খারাপ লেগেছিল। এখন জার্মানিতে প্রায় একই অবস্থা দেখে মনে হয় সব জায়গাতেই নিচের দিকের অবস্থানটা আমাদের জন্য প্রায় পাকাপোক্ত যেন। সবার শেষে থাকার জন্য লড়াই দরকার হয় না, এটা হল সহজ একটা কাজ। আমরা কষ্ট করে কিছু পেতে চাই না। ফ্রি যতটুকু পাওয়া যায়, তাতেই সই।

আমাদের ছেলেমেয়েদের অবস্থান ভাল নয়, এরা পড়া বাদ দিয়ে ফালতু কাজে সময় নষ্ট করে, নিজের প্রয়োজনে সাহায্য পাওয়া শেষ হলে অন্যকে সাহায্য করার কথা ভুলে যায়।

তারপরও তাহলে কেন লিখতে বসা? কেন বিসাগ চালানো? জেনে শুনেও কেন অন্যের উপকার করা, যখন জানি এই ছেলেগুলো ভিসা পেলেই আর আমাদের চিনবে না? কেন নিজের সময় ব্যয় করে অযথা অরণ্যে রোদন করা?

মাস্টার্স থিসিস করছি এমন একটা সময়ের কথা। ইউনিভার্সিটিতে থিসিস করতে পয়সা পাওয়া যায় না, ব্যাংক একাউন্ট খালি। কোম্পানিতে সুযোগ ছিল করার, সেখানে দুটো পয়সাও পাওয়া যাবে। তারপরও প্রফেসর বললেন, কষ্ট করে ডিপার্টমেন্টেই কাজটা কর, পরে কাজে দেবে। ভদ্রলোক আমাকে বিশেষ স্নেহ করতেন, তার উপদেশ ফেলতে পারলাম না।

থিসিস জমা দেয়ার মাস দুই আগের কথা। থিসিসের ফলাফল মিলে নি। থিসিস জমা দেবার তারিখের ঠিক দুই সপ্তাহ পরেই ভিসার মেয়াদ শেষ। এর মধ্যে কিছু একটা চাকরী না হলে সোজা দেশে ফেরত। ২০০৪ সালে জার্মানিসহ পশ্চিমা বিশ্বে ব্যাপক মন্দা চাকরির বাজারে, আবেদন করলে কেউ উত্তরও দেয় না। চেনা অনেক বাংলাদেশী বড় ভাই পাশ করে দেশে ফিরে গেছেন শূন্য হাতে। এদিকে দেশে ফিরলেও নাকি জার্মান ডিগ্রীর তেমন কোন কদর নেই।

প্রফেসরের সাথে দেখা করলাম। এখানে প্রফেসরদের কাছে কেউ ব্যক্তিগত গল্প বলে না। তারপরও বিভিন্ন কারণে এই ভদ্রলোকের সাথে একটা সুসম্পর্কে গড়ে উঠেছিল। সেই সুবাদে তাঁকে সব কথা খুলে বললাম। বললাম, আমাকে দিয়ে কিছু হবে না, থিসিসের কাজও শেষ করতে পারব না। ভদ্রলোক অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবলেন। তারপর বললেন, মানুষের ভবিষ্যৎ কখনও তার অতীতের সমান নয়। তুমি আজকের দিন পর্যন্ত কোন একটা ব্যাপারে (যেমন তোমার থিসিস) সফল হতে পার নাই, তার মানেই এই নয় যে আগামীকালও তুমি সফল হতে পারবে না। “ফিউচার ইজ নট ইক্যুয়াল টু পাস্ট।”

হ্যাঁ, আমার আশা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ছেলে মেয়েরাও একদিন এই উপলব্ধি টের পাবে নিজের ভেতরে। এতদিন আমরা সবার থেকে পিছিয়ে আছি বলেই সবসময়ই আমরা পিছিয়ে থাকব – এই কথাটা তারা আর মেনে নেবে না। তারা একসময় উপলব্ধি করবে, দেশের উন্নতি মানে প্রথমে নিজের উন্নতি। দেশের জন্য কিছু করা মানে নিজের দায়িত্ব নিয়েও আরেকজনের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়ার সময় এবং ইচ্ছেটুকু খুঁজে বের করে নেওয়া। সেই প্রতীক্ষাতেই‪#‎BSAAG‬ এর পথচলার সার্থকতা।

তোমরা শুধু একটা সুযোগ চেয়েছিলে এবং তা এখন তোমাদের হাতের মুঠোয়। সেই সুযোগ হেলায় যেন নষ্ট না হয়! সবাই অনেক বড় হও, নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি অন্যদেরকেও তোমাদেরকে নিয়ে গর্ব করার সুযোগটুকু তৈরি করে দাও – এই শুভ কামনায় “Willkommen in Deutschland!”

আদনান সাদেক, ২০১৪

অন্যান্য পর্ব ও লেখকের কথা

Print Friendly, PDF & Email