• Home »
  • BSAAG »
  • জার্মানিতে নতুনদের জন্যঃ “ফিউচার ইজ নট ইক্যুয়াল টু পাস্ট -২০১৭”

জার্মানিতে নতুনদের জন্যঃ “ফিউচার ইজ নট ইক্যুয়াল টু পাস্ট -২০১৭”

 

আবার সেই সময়টা ফিরে আসছে। সামনের শীতকালীন সেমিস্টার শুরু হতে আর বেশী বাকি নেই। জার্মানির বিভিন্ন শহরে উচ্চশিক্ষার জন্য স্বপ্ন নিয়ে কয়েক হাজার ছেলেমেয়ে আবেদন করেছে। এদের মধ্যে মেধার যাচাইয়ে অল্প কিছু ছেলে মেয়ে সুযোগ পাবে। বাবা মা আত্মীয় স্বজনের থেকে ধার দেনা করে হলেও ব্লকের টাকা যোগাড় হবে। টাকা জোগাড় করতে না পেরে কেউ কেউ চোখ মুছে মোটা মলাটের বইয়ের মাঝে এডমিশন লেটারটার সাথে সাথে স্বপ্নটা লুকিয়ে ফেলবে। কেউ কেউ ভিসার ইন্টার্ভিউতে নার্ভাস হয়ে জানা প্রশ্নটাও দিতে পারবে না। এমন অনেক কেউ কেউ থেকে আবার শেষ পর্যন্ত কিছু ছেলে মেয়ে হাসিমুখে পাসপোর্ট হাতে নিয়ে ঘরে ফিরবে। ভেতরে লাল সোনালি রঙের জার্মানির ভিসা।

একটি সামান্য ভিসা অনেক কিছু বদলে দেয়। আমাদের মতন দরিদ্র দেশের জন্য ভিসা শুধু একটা কাগজ নয়। ভিসা অনেকদিনের প্রতীক্ষার পরে প্রিয়জনের মুখ দেখার মতন। অনেক বছরের স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত বাস্তবে ডানা মেলার প্রতীক। অনেক প্রিয়জনকে দেয়া প্রতিশ্রুতি অবশেষে পূরণের আশা। হঠাৎ করে পৃথিবীটা একটা মুঠোর মধ্যে চলে আসার অনুভূতি। ভিসা পাওয়া আমাদের জীবনের আনন্দঘন মুহূর্তের একটি।
reality[1]

ইদানীং ভিসা পাবার খবরগুলোতে কেন যেন খুব বেশি উল্লসিত হতে পারছি না। ভিসা পাওয়া নিয়ে আমরা যতই উল্লসিত হই না কেন, এটি শুধুমাত্র জার্মানিতে আসার একটি অনুমতি ছাড়া অন্য কিছু নয়। দরিদ্র অবহেলিতের দেশে জন্ম নেয়ার কারণে অনেক ছোট ছোট বিষয়ে আমাদের সীমাহীন আনন্দ নেবার একটি অসাধারণ যোগ্যতা তৈরি হয়েছে। বিদেশের ভিসা তার মধ্যে একটি। পৃথিবীর অনেক দেশের ছাত্রছাত্রীদের জার্মানিতে আসার জন্য কোন ভিসা লাগে না। তাদের বড়জোর একটা প্লেনের টিকেট যোগাড় করতে হয়। এবং এই সব উন্নত দেশের ছেলেমেয়েদের সাথে আর কিছুদিন পরেই ভিসা যুদ্ধে জয়ী বাংলাদেশিদের লড়াইয়ে নামতে হবে। সেখানে ভিসা পাওয়া বা না পাওয়া নিয়ে কোন আলাদা লাইন হবে না। সবাইকে পরীক্ষায় একই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

ভিসা পাওয়ার ঘটনায় উল্লসিত না হতে পারার কারণগুলোতে আসি। জার্মানির যেখানে যাই, যাদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হচ্ছে, সিংহভাগের মধ্যে পড়াশোনা নিয়ে তেমন কোন চিন্তাভাবনা দেখি না। এরা ফেসবুক, রান্নাবান্না পার্টি, ঘোরাঘুরি, ডিএসএলার ছবি তোলাসহ বিভিন্ন “কাজে” এতো ব্যস্ত যে এরা যে আদৌ উচ্চশিক্ষায় এসেছে, এই নিয়ে ঘোর সন্দেহ জাগে। দুই বছরের কোর্স ৪ বছরের শেষ করাটা একটা সাধারণ ঘটনা। বেশীরভাগ ছেলেমেয়ে প্রথম বছরের শুরু করা কোর্স শেষ না করে হুট করে নতুন বেশী ভাল শহর, কোর্স বা ইউনিভার্সিটি খুঁজতে আরম্ভ করেছে। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হল, মাস্টার্স পর্যায়ে উচ্চশিক্ষায় আগত ছেলেমেয়ের প্রায় ৯০ ভাগ জার্মানির মতন উন্নত টেকনিক্যাল দেশে শুধুমাত্র ম্যাকডোনাল্ড বা পিজা হাটের কিচেনের মতন নিচু মানের চাকরি খুঁজে নিচ্ছে। যারা ইঞ্জিনিয়ারিং চিন্তাভাবনা করতে হয় এমন ধরণের বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করবে, তারা যদি দিনের মধ্যে ৮ ঘণ্টা সময় ব্যয় করে কয়েকশ বার্গার বানানো বা কয়েকশ থালা বাসন ধোয়ার মতন শিল্প কলায় নিযুক্ত হয়, তাহলে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে জটিল সমীকরণ সমাধানের মানসিকতা না থাকারই কথা।

আমাদের সময়ে পড়া শেষ করার আগেই চাকরি নিশ্চিত করতে হতো। পড়া শেষ, ভিসাও শেষ। এরমধ্যে কিছু না পেলে দেশে ফিরে যাওয়া। এর কোন ব্যতিক্রম ছিল না। এই অবস্থার এখন পরিবর্তন হয়েছে। পড়া শেষ করে আবার ১৮ মাসের সময় পাওয়া যায়। ভিসা পেয়েছি, এমন খবরে যারা লাইক দিচ্ছে, তাদের অনেকেই এখনো ৪ বছর শেষেও মাস্টার্স শেষ করতে পারে নি। বা অনেক কষ্টে কোনক্রমে মাস্টার্স ডিগ্রী শেষ করেও এখনো একটা সামান্য চাকরি যোগাড় করতে পারছে না। বলা বাহুল্য, জার্মানির অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত ভাল। চাকরি পাওয়া মোটামুটি সহজসাধ্য একটা বিষয়। বরং টেকনিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিং লাইনে চাকরি না পাওয়াটা একটা অবাক বিষয়ের মতন গণ্য হয়।

আরেকটা দুঃখজনক ঘটনা খেয়াল করছি। পড়া শেষ করে চাকরি খোঁজার জন্য ১৮ মাসের ভিসা দেয়া হলেও সেই ভিসা কেউ নিতে চাইছে না। সবাই আরেকটা মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হচ্ছে। পড়ার জন্য নয়, বরং শুধুমাত্র ছাত্রাবস্থায় সুলভে থাকা খাওয়ার বন্দোবস্ত এবং ভিসা নিশ্চিত করতে। এতে করে একদিকে যেমন মূল্যবান একটা আসন নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ছাত্রদের পেছনে জার্মান সরকারের ব্যয় বাড়ছে। কেন টিউশন ফি আসল, এর উত্তর খুঁজতে বেশী ভাবনা করতে হয় না।

ফিউচার ইজ নট ইক্যুয়াল টু পাস্ট-২০১৪

জার্মানির সোনার হাঁস দিনে একটা করে সোনার ডিম দিচ্ছিল। সেই সোনার ডিম পেয়ে আমাদের মতন অনেকে তাদের জীবনকে চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে। একটা সময় অনেকগুলো ছেলেমেয়ে সেই সোনার রাজহাঁসকে গলা কেটে কোন ধরণের পরিশ্রম ছাড়াই একেবারে সবগুলো ডিম খেয়ে ফেলতে চাইছে। তারা নকল ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখানোর ফলে প্রথমে ব্লক একাউন্টের নিয়ম হল। তারা এজেন্সির মাধ্যমে অযোগ্য ছেলেমেয়েদের জার্মানিতে পাঠিয়ে দেবার কারণে যোগ্যদের ভিসা দেয়া নিয়ে কড়াকড়ি শুরু হল। এখন একজন দুইটা করে মাস্টার্স করা শুরু করাতে শুরু হতে যাচ্ছে টিউশন ফি। উদ্বাস্তু সংকটকে পূঁজি করে সিরিয়ার বদলে বাংলাদেশী অবৈধ মানুষে ভরে যাচ্ছে ইউরোপ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে হুমকি এসেছে, বাংলাদেশের জন্য সব ধরণের ভিসা বন্ধ করে দেয়া হতে পারে। সোনার হাঁস কেটে ফেলে সাময়িক উপকারের বদলে আমরা দেশের জন্য কি অসামান্য ক্ষতি বয়ে আনছি, সেটা কেউ খেয়াল করছে না।

যারা ভিসা পেয়েছ, তাদের আনন্দে আত্মহারা হবার মতন কিছু নেই। বিশ কোটি মানুষের দেশে তোমাদের মতন অল্প কিছু মানুষ আদৌ পড়াশোনার সুযোগ পায়। বন্যার পানিতে যেই দেশের মায়ের কোল থেকে রাতের আঁধারে শিশু হারিয়ে যায়, সেই দেশের মানুষ তোমরা। তোমাদের জন্য ভিসা একটি দায়ভারের কাগজ। যারা তোমাদের মতন সুযোগ পায়নি, তাদেরকে তোমাদের মতনই এই সুযোগটা তৈরি করে দেবার দায়ভারের প্রতিশ্রুতি। এই দায়ভার নিয়ে তোমরা বিদেশে আসবে। তোমাদের প্রতিটা পদক্ষেপ দেখে তোমাদের দেশের নাম জানবে বিশ্ববাসী। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি তোমাদের অনুজদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করার দায়িত্ব তোমাদেরই কাঁধে।

 

আজকে যারা ভিসা পাচ্ছে, তাদের আনন্দগুলো যেন নতুন দেশের নতুন পরিবেশে এসে ম্লান হয়ে না যায়। এখানে আসার পরে তোমাদের থেকে তেমন কিছু আশা করি না। শুধু আশা করি তোমরা জার্মান সোনার হাঁস থেকে দিনে একটা করে ডিম নিয়ে সেই সুযোগের উপযুক্ত সদ্ব্যবহার করবে। এবং নিশ্চিত করবে, এই সুযোগ যেন তোমাদের সামনের আরও অনেক অনেক নতুন প্রজন্মের জন্য উন্মুক্ত থাকে।

আমি এখনো বিশ্বাস করি, ফিউচার ইজ নট ইকুয়াল টু পাস্ট। নতুনরা আগের প্রজন্মের ভুলগুলো শুধরে নতুন করে নিজেদের পরিচয় দেবে – এই কামনায়, জার্মানিতে স্বাগতম!

 

#BSAAG_Higher_Study_in_Germany

 

আদনান সাদেক, ২০১৭

অন্যান্য পর্ব ও লেখকের কথা

Print Friendly, PDF & Email