জার্মানদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসছে

 


বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের অনেকেই মাছ, মাংস খাওয়া ছেড়ে দিচ্ছেন৷ সম্প্রতি অ্যামেরিকান লেখক জনাথন স্যাফরান ফোয়ের’এর বেস্টসেলার বই ‘ইটিং এনিমেলস’ প্রকাশ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা আরো জোরালো হয়েছে জার্মানিতে৷

লেখক জনাথান পশুর খামারগুলোতে জীবজন্তুগুলোকে যে ভাবে রেখে পরে তাদের হত্যা করা হয়, তাকে অত্যন্ত নৃশংস বলে উল্লেখ করেছেন৷ ছোট জায়গায় ঠাসাঠাসির মধ্যে থাকতে থাকতে জীবগুলো রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে৷ অ্যামেরিকা ও ইউরোপের বাজারে ৯৯ শতাংশই মাংসই আসে ফার্মের জীবজন্তু থেকে৷ জনাথানের মতে পশু পাখিকে যে ভাবে রাখা হয় – তা যে শুধু অনৈতিক তাই নয়, পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর৷

এই ধরনের ফার্মের কারণে বায়ুমন্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণও বাড়তে থাকে৷ জার্মানির সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘ডি সাইট’এর সাহিত্য বিভাগের সম্পাদিকা ইরিস রাডিশ সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম দিয়েছেন, ‘মাংস খাওয়া গাড়ি চালানোর চেয়েও খারাপ’৷ পরিবেশ দূষণের কথা চিন্তা করেই একথা লিখেছেন তিনি৷ এছাড়া তিনি মাংস খাওয়ার নৈতিক দিকটা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন৷ ইরিস রাডিশ বলেন, আগে মনে করা হত শুধুমাত্র বিত্তশালীরাই বুঝি তাঁদের খাদ্যের তালিকায় মাংস রাখতে পারেন৷ দরিদ্রদের পক্ষে তা সম্ভব নয়৷ আর স্বেচ্ছায় মাংস খাওয়া বাদ দেওয়াটাকে তো রীতিমত বাঁকা চোখে দেখা হত৷

এখন অবশ্য অবস্থার বেশ পরিবর্তন হয়েছে৷ নিরামিষাশীদের বরং কিছুটা সমীহের চোখেই দেখা হয়৷ ক্যান্টিন, রেস্তোঁরা বা যে কোনো পার্টিতে ভেজিটেরিয়ানদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকে৷ চিকিৎসকরাও বেশি পরিমাণে শাকসবজি ও কম মাংস খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন৷ বিশেষ করে রেড মিট খাওয়ার অপকারিতা সম্পর্কে পত্র পত্রিকায় ফলাও করে বলা হয় যে, এসব খেলে নানা রকম রোগ ব্যাধি হতে পারে৷ জার্মান ভেজিটেরিয়ান সমিতির মুখপাত্র সেবাস্টিয়ান স্যোশ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘মানুষের চিন্তাধারা অনেকটাই বদলে গেছে৷ এখন নিরামিষাশী হওয়াটা কিছুটা যেন ফ্যাশনও৷ হলিউডের অনেক চিত্রতারকাও মাছ, মাংস খাওয়া বাদ দিয়েছেন৷ কেউ কেউ আবার প্রাণীজাত যে কোনো খাবার, যেমন ডিম, দুধ এসবও ছুঁয়ে দেখেননা৷ মানুষ এখন আধুনিক এবং জীব-জগতের প্রতি দরদি হয়ে বাঁচতে চায়৷”

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সাধারণত ভেজিটেরিয়ানদের দুই তৃতীয়াংশই নারী, বেশির ভাগই উচ্চ শিক্ষিত এবং বড় বড় শহরে বসবাস করেন৷ এ ছাড়া আরেকটা ব্যাপারও লক্ষ্যণীয়, নিরামিষাশীরা ক্রমেই ভোজনরসিক হয়ে উঠছেন৷ এ প্রসঙ্গে সেবাস্টিয়ান স্যোশ বলেন, ‘‘আমি মনে করি, মানুষ এখন সচেতনভাবেই বলতে পারে, ‘অনেক ক্ষেত্রে কমটাই বেশি ভাল’৷ অন্যদিকে আবার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ভেজেটেরিয়ানদের মধ্যে রসনাতৃপ্তির বিষয়টিও ক্রমেই প্রাধান্য পাচ্ছে৷ আমরা একটি ভেজেটেরিয়ান মেলারও আয়োজন করেছি, যার নাম দেয়া ‘হয়েছে ভেজি ওয়ার্লড’৷ এটির উপশিরোনাম হল, ‘ভোজনরসিকদের জন্য মেলা’৷ দুটি ধারাকেই মেলাতে চাই আমরা : একদিকে প্রাণী ও পরিবেশবান্ধব আচরণ অন্যদিকে নিজের রসনাকেও বঞ্চিত না করা৷”

মার্কিন লেখক জনাথন স্যাফরান’এর মতে, সবচেয়ে ভাল হচ্ছে একদম মাংস না খাওয়া৷ সেটা সম্ভব না হলে কম মাংস খাওয়াটাই শ্রেয়৷ কম মাংস খাওয়া যে, স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল, এই সচেতনতাটা এখন জার্মানির জনসাধারণের মধ্যেও জেগে উঠছে৷ শোনা যাক কয়েকজনের মন্তব্য: ‘‘মাংস কম খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভাল৷ কিন্তু আমি এখনও নিজের রসনাকে সংবরণ করতে পারছিনা৷ মাংস খেতে আমার খুব ভাল লাগে৷ আর একটা সমস্যা হল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে বেশিরভাগ সময়েই মাংসের খাবার থাকে৷ অন্যদিকে নিরামিষের তরকারিগুলো দেখলে তেমন লোভনীয় মনে হয়না৷”

‘‘মাংস কম খাওয়াটা ভাল৷ আমিও অনেকদিন ধরে মাংস খাওয়া কমিয়ে দিয়েছি৷ এখন তো শোনা যাচ্ছে মাংসের উৎপাদনের সঙ্গে কার্বনডাইঅক্সাইডের নির্গমন বা পরিবেশ দূষণের একটা সম্পর্ক রয়েছে৷ তাই মাংস কম খাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সচেতনভাবেই চিন্তাভাবনা করতে হবে আমাদের৷”

‘‘আমি নিজের ভেতর একটা সচেতনতা লক্ষ্য করছি৷ হয়তো বা গোটা সমাজেই এখন এই ধরনের একটা ঢেউ চলছে৷ মানুষ গুণগত মানের দিকে ঝুঁকছে বেশি৷ লোকে জৈবিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত মাংস খাচ্ছে এবং দৈনন্দিন খাদ্যের তালিকা থেকে মাংসের পরিমাণ কমিয়েও দিচ্ছে৷”

প্রতিবেদন: রায়হানা বেগম

সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আল-ফারূক

সোর্সঃ dw.de

Print Friendly, PDF & Email