দুরবিন ২ : নতুন জীবনের সূচনা

 

 

       ভোর ৪ টা কনকনে ঠাণ্ডা এর মধ্যেই আউসল্যান্ডার বেহরডে ( জার্মান ইমিগ্রেশন অফিস) এর গেট এর সামনে লাইন ধরে অপেক্ষা করছি। কান আর নাক এর অনুভূতি হারিয়েছে অনেকক্ষণ আগেই। হাত আর পা এ কিম্ভুত কিমাকার হাত মোজা আর এভারেস্ট এ ওঠা যাবে এমন জুতা থাকা সত্ত্বেও অবশ হওয়ার যোগার। মনে মনে শপথ করলাম এর পরের বার বসার জন্য ফল্ডিং চেয়ার নিয়ে আসব। সকাল ৭ টায় গেট খুলে ভিতরে ঢুক তে দেওয়া হল। এর পর আরও এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর আমরা মুল বিল্ডিং এর ভিতর ঢুকলাম। উপরে উঠে আমার স্টুডেন্ট ভিসা নেওয়ার কাউন্টার খুঁজতে খুঁজতে অই দিনে বরাদ্দ কৃত wartenummer ( সিরিয়াল নাম্বার) সব বিলি করা শেষ। এক জার্মান ভদ্রলোক লাউড স্পিকার এ কিছু বললেন। জার্মান ভাষায় ব্যাপক জ্ঞান থাকায় এক টি শব্দ ও বুঝলাম না। ২ ঘণ্টা অপেক্ষার পর পাশে বসা একজন এর কাছে জানলাম আজ আর সিরিয়াল নাম্বার দেওয়া হবে না। ৪ ঘণ্টা ঠাণ্ডায় দাঁড়িয়ে থাকাটাই বৃথা।

      পরের দিন আবার। ভিসা যে আমার অতিজরুরি দরকার। ভিসা পেলাম ১ বছর এর। অন্য সবাই ২ বছর এর ভিসা পেয়েছে শুনেছি। মামা কে খবরটা দিতেই একটা ঠিকানা দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন কাজের খোঁজে। ম্যানেজার ভদ্রলোক এক বাংলাদেশী কিন্তু কোন এক কারণে আমার সাথে হিন্দিতে কথা বলা শুরু করলেন। ইন্ডিয়ান খাবার এর রেস্তরাঁ। বেশ জমকাল, খুব সুন্দর করে সাজানো। বাংলাদেশি ভদ্রলোক মালিকের কাছে নিয়ে গেলেন। আমার কাজের অভিজ্ঞতার কথা জিজ্ঞাসা করলেন। পয়সার অভাবে অনেক ঝুঁকি নিয়ে ভিসা ছাড়াই একদিন এর চুক্তিতে এক বাংলাদেশীর কাছে কাজ করেছিলাম এর মাঝে। সেটাকেই অভিজ্ঞতা বলে চালিয়ে দিলাম। কাজ হল। প্রথম ৭ দিন পয়সা ছাড়া প্রতিদিন ৬ ঘণ্টা করে ( শুক্র ও শনি বার ৮ ঘণ্টা) কাজ করতে হবে এর পর পয়সা দেবে যদি এর মাঝে কাজ শিখে নিতে পারি।

      তাতেই রাজি হলাম। খাবার আর পানিয় অতিথি দের টেবিল এ পৌঁছে দেওয়া আর তাদের মিষ্টি একটা হাসি উপহার দেওয়াই আমার কাজ। সহজ ই তো কাজ। ঘণ্টাখানেক পর দেখি পানিয় পৌঁছে দেওয়া সহজ কিন্তু হাসি টা বেশ কঠিন।আমাকে দোষ দিয়ে লাভ নাই ম্যানেজার ভদ্রলোক এর ব্যবহার ই এর জন্য দায়ই। আমাদের দেশে হোটেল আল সালাদিয়ার পানি পরিবেশন করে যে ছেলেটা তার সাথেও মালিক পক্ষ যখন এমন ব্যবহার করে তার কেমন লাগে হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। দেশে গেলে ছেলেটা কে ডেকে কিছু কথা বলব ঠিক করলাম।

      ছুটির এমন আনন্দ আর পাইনি কখনো। মনে এক রাশ অভিমান নিয়ে যাচ্ছি মামার কাছে। নিজের আপন ভাগ্নে কে জেনে শুনে কেউ পাঠায় এমন জায়গায় কাজ করতে। ট্রেন এ আর এক পরিচিত বাঙালীর সাথে দেখা। তার কাজের কথা শুনে অভিমান দূর হয়ে গেল। সে এক রেস্তোরাঁর DJ ( থালাবাসন মাজা তার কাজ)। আমি সরাসরি Food runner এর কাজ পেয়েছি শুনে খুব একচোট আমার ভাগ্যের প্রশংসা করলেন। অন্য সবাই নাকি হাজার খানেক থালাবাসন মাজার পর সুযোগ পায় এই কাজ করার।

      অভিযোগ করা আর হলনা। অনেক কষ্টে চোখের পানি আড়াল করলাম। পরে জেনেছিলাম মামা ঠিক ই দেখতে পেয়েছিল, ভেঙে পরতে পারি ( অথবা তার ঘাড়ে চেপে বসতে পারি) এই ভয়ে বলেন নি।

      রাত ১২ টা ১ টা পর্যন্ত কাজ সকাল ৮ টায় ক্লাস। এক সপ্তাহ পর ক্লাস মিস দেওয়া শুরু করলাম। দেশে ৯৫% নাম্বার নিয়ে A1 পাশ করেছিলাম সেই A1 ২য় বার পরীক্ষা দিয়ে পেলাম ২.( টেনেটুনে পাশ আরকি)। ক্লাস এ নতুন কিছু ত শেখা হয় ই নি যা শিখেছিলাম তাও ভুলে গেছি। A2 ও গেলো ও ভাবেই। এরমাঝে একবার আমাকে ক্লাস থেকে বেরকরে দিয়েছে আমার শিক্ষক আমার উপস্থিতি ৫০% এর কম হওয়ায়। আমার সাথের বাকি ৩ জন এখন ও A2 তেই আছে। নতুন এক ক্লাস এ আবার B1 শুরু করলাম। যেই আমি ৯০ % পেয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করতাম সেই আমি ই ৫০% পেয়ে পাস করে খুশি হওয়া শিখে নিয়েছি। আমাদের ভাষা শেখার স্কুল এখন প্রায় ২য় বাংলাদেশ।। ৭০% শিক্ষার্থী ই বঙ্গ দেশ থেকে আগত মুরগি। আমার সাথে আসা ১৭ জন এর মধ্যে আমারা ৩ জন B2 করছি বাকি সব প্রফেশনাল কামলা য় পরিণত হয়েছে। তাদের মাঝে কয়েকজন সত্যি ই পড়াশুনা করার স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল, কিন্তু ৮ লাখ টাকার ঋণ এর বোঝায় স্বপ্ন ঢাকা পরে গেছে তাদের।

চলবে……..

লেখক: মামুন শিকদার

বার্লিন, জার্মান

Print Friendly, PDF & Email