দূরবীন : আগমন

 

 

অক্টোবর ২০১১

রাত ৮ টার দিকে আমরা রওয়ানা হলাম, উদ্দেশ্য হজরত শাহজালাল বিমান বন্দর। কিছু ঘণ্টা আগে ও নতুন কিছু পাবার উত্তেজনায় কাঁপছিলাম কিন্তু এখন কেমন যেন লাগছে। স্বপ্নের মাঝে ট্রেন মিস হয়ে গেলে যেমন অনুভূতি হয় অনেকটা তেমন। কিছুক্ষণ পর বেয়াদব চোখ দুটো ও কেমন জেনো অদ্ভুত আচরণ শুরু করলো। রাত ১০ টায় আমাদের উড়োজাহাজ জার্মানি এর উদ্দেশ্যে উড়াল দেওয়ার কথা। বাবা পাশে বসে আছেন। তার চোখেও কিছু এক টা হয়েছে। আমার মতই তার বার বার চোখ মোছা দেখে খুব অবাক হলাম। বাবা কাঁদতে জানে জানতাম না।

আজ রাস্তা ও ফাকা। মনে মনে খুব ট্রাফিক জ্যাম আশা করছিলাম। আবার কবে বাবার পাশে এমন বসতে পারব কে জানে । ৯ টা বাজার আগেই পৌঁছে গেলাম আমরা। আরও ৩ জন আমার সাথে একি প্লেন এ যাচ্ছে, তাদের খুঁজছি। একজনকে দেখতে পেলাম বাকি ২ জন এখনো পৌছায় নি। আমারা ৪ জন একি এজেন্সি থেকে (এক ই ফারম এর মুরগি)। মনির ওর মা এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। মনিরের মা এর ও আমার মা এর মতই অবস্থা। সুধু বললেন “আমার ছেলেটা খাওয়ার বেপারে খুব অমনোযোগী, একটু দেখো বাবা।“

এর মধ্যে বাকি দু জন ও এসে হাজির। আনোয়ার ভাই এর সাথে আজি প্রথম দেখা। অনেক নাম শুনেছি তার। ভীষণ ভাল ছাত্র। সিলেট শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। থেকে অসামাজিক বিজ্ঞান ব্যাচেলর এ ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড (অথবা থার্ড) হয়েছিলেন তিনি । তবে তার এই পরিচিতির কারণ তার রঙিন ছাত্র জীবন নয়। প্রথম চেষ্টায় ভিসা পেতে সক্ষম হন নি তিনি এ কারণে। প্রথম দেখায় ই কেমন যেন ভাল লেগে গেল লোকটাকে। সেই ভাল লাগা টা এখনো আছে। রাত ১১ টায় আমাদের প্লেন আকাশে উড়ল। পাশাপাশি আসন না পাওয়ায় আমরা ২ ভাগ হয়ে বসেছি। রাতে এর অন্ধকার এর কারণে কিছুই দেখা যাচ্ছিলোনা তবুও জানালা দিয়ে বাহিরে দেখার চেষ্টা করছিলাম। তুরকীস এয়ারলাইন এর বাজে খাবার এর কথা বাদ দিলে তেমন কিছু আর ঘটেছিলো বলে মনে পরছে না।

জার্মান সময় সকাল ১০ টায় আমরা বের হলাম বিমানবন্দর থেকে। এর মধ্যে এটি শক খাওয়া হয়ে গেছে আমার। ঢাকার গুলিস্তান থেকে কেনা অতি উঁচুমানের লাগেজ টা কোন এক বিদঘুটে কারণে তার আকৃতি হারিয়েছে একবার ব্যবহার করার আগেই। টেনে নেওয়ার যে ফাংশন টা ছিল তা আর কাজ করবে বলে মনে হয় না। ভাগ্য ভাল এজেনছির কথায় এয়ারপোর্ট পিক আপ বুক করেছিলাম ৭০ ইউরো দিয়ে। পরে জেনেছিলাম taxi তে গেলেও ৩০ ইউরো র বেশি লাগতো না। ভাঙ্গা লাগেজ আর বেঢপ আকৃতির ব্যাগ নিয়ে বেরলাম আমরা।

বাহিরে আরিফ ভাই অপেক্ষা করছিলেন আমাদের জন্য আর এক জার্মান ভদ্রলোক। আর অপেক্ষা করছিলেন আমার মামা, আমার সাথে সাথে তার ও একটি স্বপ্ন পুড়ন হলও আজ।

চমৎকার আবহাওয়া রোদ ঝলমল করছে কিন্তু এর পরেও কনকনে ঠাণ্ডা। আমার স্টুডেন্টভোনহাইম এ ব্যাগ রেখেই রওয়ানা হলাম আরিফ ভাই এর স্টুডেন্টভোনহাইম এর উদ্দেশে। ৭০ ইউরো দিয়ে এক মাসের বাস ট্রেন এর টিকেট কিনলাম। পকেটে করে নিয়ে আসা ২৫০ ইউরো তো এখানেই প্রায় শেষ।

ওই হস্টেল এ তো রমরমা অবস্থা । ১৪ জন বাংলাদেশি সবাই আমরা একি সাথে গোএথে ইন্সটিটিউট এ ক্লাস করেছি ( একি ফারম এর মুরগি)। এরা আমার মাস তিনেক আগে এসেছেন। সবাই এক সাথে খাবার খেলাম।

পরের দিন থেকে ভাষা শেখার ক্লাস শুরু। দিন শুরু হলও সকাল ৭ টায়। শুরু হলও জীবনের এক টি নতুন অধ্যায়।

ভাষা শেখার স্কুল এ প্রথম দিন ই গেলাম ৩০ মিনিট দেরিতে। আমাদের জন্য যে জার্মান ভদ্রলোক অপেক্ষা করছিলেন তিনি প্রথম দেখায় ই স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি বিরক্ত। প্রায় ১০ দিন আগে শুরু হয়েছে এমন একটা ক্লাস এ আমাদের ঢুকিয়ে দিল প্রায় আমাদের মতের বিরুদ্ধে। তার যুক্তি যেহেতু আমরা A1 করে এসেছি এই প্রথম ১০ দিন কোন বেপার না।

আমাদের ক্লাস এ ৩ জন সদস্য নিয়ে আমরা বাঙালিরা ই সংখ্যাগরিষ্ঠ। বিদেশি শিক্ষার্থী দের মধ্যে আবার ৩ জন DAAD এর বৃত্তি পাওয়া। আমাদের মুখের সামনে প্রিমিয়াম স্টুডেন্ট এর মুলা ঝুলিয়ে আমাদের এজেন্সি যে প্রায় ৩ গুন টাকা খসিয়ে নিয়েছে বুজতে দেরি হয়নি। এমনকি আমাদের জন্য যে বাসা ঠিক করা হয়েছে তার মাসিক ভাড়া শুনে আমাদের জার্মান শিক্ষক রা পর্যন্ত পিলেচমকে উঠেছিল।

প্রায় ২ সপ্তাহ লেগে গেলো পুলিস রেজিস্ট্রেশন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা সহ অনন্য সকল আনুষঙ্গিক কাজে। এর মধ্যে ৭ ইউরো খরচ করে ছবি তুললাম। বুঝলাম বাবার দেওয়া উপদেশ টা আসলে অতো খারাপ ছিল না, অনেক গুল টাকা বেচে যেত ছবি গুল নিয়ে আসলে। এর মাঝে বার্লিন ঘুরে দেখার সুযোগ হয় নি। আগে যারা এসেছে কাজ নিয়ে খুবি ব্যস্ত তাই সময় দিতে পারছে না।আমিও একা বের হবার সাহস পাচ্ছিনা। একদিন ক্লাস এর অবিরতিতে অনন্য সকল কে খুঁজতে গিয়ে জেনেছি আরিফ ভাই ছাড়া বাকি রা ক্লাস এ আসেনা বললেই চলে ( বাকি ১২ জন)। যাদের এতদিনে A2 শেষ করে B1 এ থাকার কথা তারা এখন ও A1 এই পরে আছে। না থাকেলেই বরং অবাক হতাম। প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করলে ক্লাস এ আসবে কি করে ? ওদের কে কটূক্তি করতাম, কিন্তু বুঝতে বেশিদিন লাগেনি যে এটাই রুঢ় বাস্তবতা।

ভিসা বাড়ানোর জন্য টাকা সংগ্রহ শুরু করলাম। যে টাকা দেশে ব্লক করেছিলাম তা তো ভিসা পাওয়ার পর উঠিয়ে দিয়ে দিয়েছি পাওনাদার দের ( তখন ও দেশে এর ব্যাংক এ ব্লক করেই ভিসা পাওয়া যেত) । টাকা একসাথে হওয়ার সাথে সাথেই ভিসা বাড়াতে গেলাম। ২ দিন এর মধ্যে টাকা ফেরত দেওয়ার ওয়াদা করেছি, এছাড়া ভিসা না বাড়িয়ে কাজ খুঁজতে ও পারছিনা। পকেটের ২৫০ ইউরো এর মাঝেই শেষ।

চলবে……

Print Friendly, PDF & Email