• Home »
  • Higher-Study-in-Germany »
  • স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা (সাক্ষাৎকার-৩ঃ সাজ্জাদ, কেম্পটেন)

স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা (সাক্ষাৎকার-৩ঃ সাজ্জাদ, কেম্পটেন)

Contents

 

জার্মানিতে পড়তে আসা নিয়ে সবারই অনেক ধরণের ভাবনা চিন্তা থাকে। কিভাবে আবেদন করব, শেষ পর্যন্ত ভিসা পাব কিনা, টাকা পাঠাব কিভাবে, যাবার পর পূর্বভাবনার সাথে বাস্তবতার কতটুকু মিল পাব এইরকম অনেক ভাবনা। জার্মানিতে পা দিয়ে নতুন জীবনের সাথে খাপ খেয়ে মানিয়ে চলতে গিয়ে অনেক ধরণের নতুন অভিজ্ঞতার দেখা মিলে। নতুন দেশের নতুন নিয়ম, নতুন মানুষদের থেকে নতুন করে মূল্যবোধ এবং দেশ থেকে সাথে করে নিয়ে আসা স্বপ্ন এবং জার্মানির বাস্তবতা- এই অভিজ্ঞতাকে অন্যদের সাথে শেয়ার করার উদ্দেশ্য নিয়ে এই সিরিজের সুত্রপাত।

স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা-৩ (সাজ্জাদ, ইউনিভার্সিটি অফ এপ্লায়েড সায়েন্স, কেম্পটেন, বায়ার্ন)

সাজ্জাদ পড়তে এসেছে ২০১৬ সালে কেম্পটেনের হখশুলেতে তড়িৎ কৌশল নিয়ে।  প্রথম সেমিস্টার শেষ হবার আগেই সাজ্জাদ ভাবছে ইউনিভার্সিটি পরিবর্তন করার কথা। সাজ্জাদের আগ্রহ ক্রিকেট খেলার। এই সুবাদে ফেসবুকে যোগাযোগ করে আমাদের লিওনবার্গে শহরে বেড়াতে এসেছিল মূলত ক্রিকেট টুর্নামেন্ট খেলার জন্য। এই সুযোগে  কথা বলছিলাম সাজ্জাদের সাথে তার জার্মানিতে আসার আগেকার এবং আসার পরের অভিজ্ঞতার একটা তুলনামূলক চিত্র পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে।

উচ্চশিক্ষার জন্য তুমি জার্মানি কেন পছন্দ করলে?

সাজ্জাদঃ  টিউশন ফি নেই, কারিগরি বিদ্যায় উন্নত, তড়িৎ কৌশলে পড়লে নিজের জন্য ভাল হবে – এমন আকাঙ্ক্ষা থেকে জার্মানির পথে পা দেয়া।

জার্মানিতে আসার আগে, সবচেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলে কি নিয়ে?

সাজ্জাদঃ  ভিসা ইন্টারভিউ নিয়ে সবচেয়ে বেশী টেনশনে ছিলাম, ভিসার ফলাফল কি আসবে – এই নিয়ে ভাবছিলাম। জার্মানিতে আসা নিয়ে কোন ধরণের টেনশন ছিল না,  এখানে আসলে সবকিছু ম্যানেজ করতে পারব সহজেই- এমনই মনে হয়েছিল।

জার্মানিতে আবেদনের জন্য সবচেয়ে কঠিন ধাপ কোনটি ছিল?

সাজ্জাদঃ  জার্মান ইউনিভার্সিটি থেকে বাংলাদেশের ইউনিভার্সিটির ট্রান্সক্রিপট এবং গ্রেড শীটের একটা বিবরনী চেয়েছিল। এটা দিতে দেশের কর্তৃপক্ষ গড়িমসি এবং অহেতুক ঝামেলা তৈরি করে। এই নিয়ে অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। একসময় নিজে লিখে রেজিস্টারের কাছে নিয়ে যাবার পরেও রেজিস্ট্রার অফিস থেকে সাইন করতে অস্বীকার জানায়। শেষ পর্যন্ত জার্মান ইউনিভার্সিটি এই ব্যাপারটা সহানুভূতির চোখে দেখাতে রক্ষা হয়।

এছাড়াও ব্লক একাউন্ট নিয়ে ডয়েচে ব্যাংকের নতুন নিয়ম নিয়ে বেশ কিছু ভোগান্তি হয়েছিল।

জার্মানিতে আসার আগে জার্মানি সম্পর্কে কেমন ধারণা ছিল?

Hochschule Kempten

সাজ্জাদঃ জার্মানদের বন্ধুত্বপূর্ণ জেনেছি বড় ভাইদের কাছ থেকে, এখানে জীবন অনেক সহজ, বিশেষ করে বাংলাদেশের তুলনায়। সবকিছু নিয়ম অনুসারে হয় এই দেশে।  প্রথম তুষারপাত নিয়ে অপেক্ষায় ছিলাম,   ভাবতাম এখানে এসে হলে সিট পাব, নিজের জগত পাব, স্পোর্টস করার অনেক ধরণের সুযোগ পাব। সম্ভব হলে জার্মান জাতীয় ক্রিকেট দলে খেলব।

জার্মানিতে আসার পরের অভিজ্ঞতা কেমন হল?

সাজ্জাদঃ মিউনিখ এয়ারপোর্টে প্রথম দিন নামার পর মূল লাগেজ পেলাম না। লাগেজ না নিয়েই কেম্পটেনে চলে এলাম। আসার পরে রুম না থাকায় এক বড় ভাইয়ের সাথে শেয়ার করলাম। ঠিক ১১ দিন কর্তৃপক্ষের নজরে পড়াতে এটা নিয়ে একটু সমস্যা হয় এবং আমাকে সেইদিন বিকেল ৫টার মধ্যেই ঘর ছেড়ে দেবার নোটিশ দেয়া হয়। কারণ মূলত হলের রুমে একজনের বেশী অন্য কাউকে রাখার নিয়ম নেই। পরে আমাকে অনেক ঝামেলা করে প্রাইভেট বাসা খুঁজতে হয়। পরবর্তিতে এক জার্মান পরিবার আমাকে রুম দেয়, এবং তারা আমাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে। এদের সাথে থেকে আমার জার্মানদের সম্পর্কে একটা ভাল ধারণা তৈরি হয়েছে। আসার আগে রেসিজম নিয়ে কথা শুনেছিলাম, এখানে আসা পরে এমন কোন খারাপ অভিজ্ঞতা এখনো হয় নি।

জার্মানিতে আসার পর তুমি কোর্স এবং ইউনিভার্সিটি (সর্বোপরি শহর) বদল করার ভাবছ। এটা নিয়ে কিছু বল।

সাজ্জাদঃ  তড়িৎ কৌশলে দেশে পড়ার পরে জার্মানিতে একই মেজরে মাস্টার্স করা নিয়ে ব্যাপারটা সহজ হবে ভাবছিলাম।  কিন্তু এখানে আসার পরে মনে হচ্ছে কোর্স কন্টেন্টে আমার জন্য অনেক নতুন এবং অপরিচিত বিষয় পড়ানো হচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে এই কোর্সে স্পেশালাইজেশন করাটা কঠিন, এটা আমার পছন্দ হচ্ছে না।

এখানে শহর ছোট, সন্ধ্যে ৫-৬ টার মধ্যে মনে হয় যেন সমস্ত শহর ঘুমিয়ে পড়ে। পড়ার পাশাপাশি কাজ পেতে কষ্ট হচ্ছে। মূল সমস্যা হচ্ছে জার্মান না জানার কারণে।  এই শহরের অনেকেই মিউনিখে গিয়ে কাজ করে। তাতে ২-৩ ঘণ্টা সময় চলে যায়, যাওয়া আসায়, সময় তো নষ্ট হয়ই।

এখানে চাকরির কি অবস্থা, এখনও কোন কাজ পেয়েছ?

সাজ্জাদঃ শহর ছোট হওয়ার কারণে এখানে চাকরির সুযোগ সীমিত । আর যেগুলোও আছে সেগুলো জার্মান ভাষা জানা না থাকলে কাজ পাওয়া খুব কঠিন। অনেক চেষ্টার পর প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে ম্যাকডনাল্ডে পার্ট-টাইম একটা কাজ পেয়েছি । ওখানে আগে একজন বাংলাদেশি বড় ভাই কাজ করতেন এবং উনি সাহায্য করেন কাজটা পেতে।

তুমি বাংলাদেশ থেকে কতটুকু জার্মান ভাষা শিখে জার্মানিতে এসেছিলে। এটা তোমার জন্য পরবর্তিতে কতটুকু কাজে দিয়েছে?

সাজ্জাদঃ বাংলাদেশ থেকে একটা শব্দও শিখে আসি হয় নি। যদি শিখে আসতাম তাহলে এখানের জীবনযাত্রা অনেকটা সহজতর হত।

বাংলাদেশের কি কি জিনিস মিস করছ?

সাজ্জাদঃ পরিবারের সবাইকে অনেক বেশী মিস করছি। এছাড়া দেশীয় খাবার, বিশেষ করে মায়ের হাতের রান্না। প্রচন্ড আড্ডাবাজ ছিলাম । বন্ধুমহল এবং ছোট-ভাইবোনদের সাথে উত্তরা সেক্টর-৩ ফ্রেন্ডস ক্লাব মাঠে এবং সেক্টর-১৩ বডিলাইন এর আড্ডাগুলো খুব মিস করি। আমি ক্রিকেট খেলা পাগল একটা ছেলে । ক্রিকেট খেলা এবং শীতকালে ব্যাডমিন্টন খুব বেশী মিস করছি।

তোমার চোখে বাংলাদেশের সাথে জার্মানির কি কি পার্থক্য?

সাজ্জাদঃ সাধারণত যে ব্যাপার গুলো আমার চোখে পড়েছে

১। এদের ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়গুলো সমসাময়িক বিদ্যা নিয়ে তৈরি করা। বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্ট গুলোতে অনেক আগেকার জিনিস পড়ানো হচ্ছে, যার এখন কোন ব্যবহার নেই।

২। এদের ট্রান্সপোর্টেশন (বাস, ট্রেন, ট্রাম ) সার্ভিস খুবই সময় মেনে চলে। আর, ট্রাফিক জ্যাম এখনো চোখে পড়েনি।

৩। এরা ছোট ছোট চেষ্টা গুলোকে খুব উৎসাহিত করে যেটা আমরা বাংলদেশিরা পারি না ।

৪। আবহাওয়ার তুলনা করলে বাংলাদেশের শীতকালে যতটা প্লাস থাকে, এখানে ততটাই মাইনাস তাপমাত্রা।

জার্মানিতে আসতে ইচ্ছুক এমন নতুনদের জন্য কি কোন উপদেশ দেবে?

সাজ্জাদঃ জার্মান আসতে হলে যথেষ্ট পরিমাণে প্রস্তুতি নিয়ে আসা উচিত। যেমন জার্মান ভাষা যত বেশী শিখে আসা যাবে, তত বেশী ভালো। ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্টদের জন্য প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ ম্যাটল্যাব, সি , সি++ ইত্যাদি ভালো মত জানা থাকলে অনেক বেশী লাভবান হবে।

সাক্ষাৎকারঃ  সাজ্জাদ হোসেন।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং অনুলিখনঃ আদনান সাদেক।

২৫.০১.২০১৭, লিওনবার্গ, জার্মানি।

 

প্রিয় সবাই,

জার্মানিতে আসার আগের এবং পরের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা নতুন ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার পর্ব লেখার কাজে হাত দিয়েছি। এই অভিজ্ঞতা যেমন তোমাদের নিজেদের উপকার বয়ে আনতে পারে, তেমনি নতুনদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকতে পারে। প্রতিটি সাক্ষাৎকার বক্তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে সাজানোর ইচ্ছে আছে, এই কারনে সাক্ষাৎকারের প্রশ্নগুলো প্রতিবার ভিন্নধর্মী হবে। যারা নিজেদের অভিজ্ঞতা অন্যদের সাথে ভাগ করে নেয়ার যাদের আগ্রহ আছে, তাদের প্রতি অনুরোধ সরাসরি আমার সাথে যোগাযোগ করার। সাক্ষাৎকার নেবার পরে সাক্ষাতকারদাতার অনুমতি সাপেক্ষে লেখাগুলো আমাদের ব্লগে প্রকাশিত হবে। কেউ চাইলে ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন রেখেও সাক্ষাৎকার দিতে পারে। যাদের সাথে সামনা সামনি কথা বলার সুযোগ পাওয়া যাবে না, তাদের থেকে টেলিফোনে সাক্ষাৎকার নেয়া হবে। জার্মানিতে বসবাসরতদের সয়াহতা কামনা করছি।         

বিনীত, 

আদনান সাদেক।

 

এই সিরিজের অন্যান্য সাক্ষাৎকারঃ 

 

Print Friendly, PDF & Email