স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা (সাক্ষাৎকার-২ঃ নাসের, নুরেনবার্গ)

Contents

 

জার্মানিতে পড়তে আসা নিয়ে সবারই অনেক ধরণের ভাবনা চিন্তা থাকে। কিভাবে আবেদন করব, শেষ পর্যন্ত ভিসা পাব কিনা, টাকা পাঠাব কিভাবে, যাবার পর পূর্বভাবনার সাথে বাস্তবতার কতটুকু মিল পাব এইরকম অনেক ভাবনা। জার্মানিতে পা দিয়ে নতুন জীবনের সাথে খাপ খেয়ে মানিয়ে চলতে গিয়ে অনেক ধরণের নতুন অভিজ্ঞতার দেখা মিলে। নতুন দেশের নতুন নিয়ম, নতুন মানুষদের থেকে নতুন করে মূল্যবোধ এবং দেশ থেকে সাথে করে নিয়ে আসা স্বপ্ন এবং জার্মানির বাস্তবতা- এই অভিজ্ঞতাকে অন্যদের সাথে শেয়ার করার উদ্দেশ্য নিয়ে এই সিরিজের সুত্রপাত।

স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা-২ (নাসের, ফ্রিডরিশ আলেক্সান্ডার ইউনিভার্সিটি এরলাঙ্গেন/নুরেনবার্গ)

নাসের পড়তে এসেছিল ২০১৪ সালে হালেতে পলিমার ম্যাটেরিয়াল বিজ্ঞান নিয়ে। বছর না গড়াতেই কোর্স বদল করে চলে নতুন করে মাস্টার্স শুরু করেছে নুরেনবার্গের ফ্রিডরিশ আলেক্সান্ডার ইউনিভার্সিটিতে রসায়নে। ক্রিসমাসের ছুটিতে লিওনবার্গে বেড়াতে এসেছিল নাসের, এই সুযোগে  কথা বলছিলাম নাসেরের সাথে তার জার্মানিতে আসার আগেকার এবং আসার পরের অভিজ্ঞতার একটা তুলনামূলক চিত্র পাঠকদের জন্য তুলে ধরতে।

উচ্চশিক্ষার জন্য তুমি জার্মানি কেন পছন্দ করলে?

নাসেরঃ  রসায়নে জার্মান বিজ্ঞানীদের খ্যাতি, অনেকগুলো বড় বিশ্বমানের রাসায়নিক কোম্পানি জার্মানিতে অবস্থিত। রসায়নে ক্যারিয়ার করার কথা ভেবে, বিশেষত জার্মানির বায়ারে কাজ করব – এমন আকাঙ্ক্ষা থেকে জার্মানির পথে পা দেয়া।

জার্মানিতে আসার আগে, সবচেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলে কি নিয়ে?

নাসেরঃ ২০১৪তে অনেকের ভিসা প্রত্যাখ্যান হচ্ছিল। তাই ভিসা পাওয়া, ভিসা ইন্টারভিউ নিয়ে সবচেয়ে বেশী টেনশনে ছিলাম।

জার্মানিতে আবেদনের জন্য সবচেয়ে কঠিন ধাপ কোনটি ছিল?

নাসেরঃ  আইএলটিএস-এ ভাল স্কোর তোলা।

জার্মানিতে আসার আগে জার্মানি সম্পর্কে কেমন ধারণা ছিল?

নাসেরঃ আসার আগে অনেক বেশী গোগলে জার্মানি সম্পর্কে পড়াশোনা করতাম। আমার ধারণা হয়েছে জার্মানরা রোবট টাইপের এবং সবকিছু সময় মেপে করে।

জার্মানিতে আসার পরের অভিজ্ঞতা কেমন হল?

নাসেরঃ বেশিরভাগ জার্মানরা বন্ধুত্ব সুলভ। বিশেষ করে বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা ইউনিভার্সিটিতে জার্মানদের কাছ থেকে প্রচুর সাহায্য পায়। কিছু রেসিস্ট মানসিকতার জার্মানও পেয়েছি। এই দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা চমকপ্রদ।

জার্মানিতে আসার পর তুমি কোর্স এবং ইউনিভার্সিটি বদল করেছিলে যার কারণে প্রায় বছর খানেক সময় ব্যয় হয়েছে। এটা নিয়ে কিছু বল।

নাসেরঃ বাংলাদেশীদের মধ্যে জার্মানিতে আসার পরে কোর্স বদলের সংখ্যা অনেক বেশী। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এর জন্য দায়ী হল দেশে থাকা অবস্থায় কোর্স মডিউল সম্পর্কে কোন স্পষ্ট ধারণা না নিয়ে শুধু ভিসা পাবার কথা ভেবে ইউনিভার্সিটি বা কোর্স নিয়ে সিদ্ধান্তে আসা। এই ভুলের কারণে এক বছরে ৪-৫ লক্ষ টাকা নিজের পকেট থেকে গেছে। আরেকটা বাস্তবতা হল, বাংলাদেশের ব্যাচেলর করে এসে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা মাস্টার্সের কোর্স ঠিকমতো ধরতে পারে না। সবচেয়ে বেশী অসুবিধা হয় ল্যাবে হাতে কলমে কাজ করতে গিয়ে।

এখানে চাকরির কি অবস্থা, এখনও কোন কাজ পেয়েছ?

নাসেরঃ হালেতে (পূর্ব জার্মানি) বাংলাদেশী ছাত্ররা তেমন কোন চাকরী পায় নি। সেই তুলনায় পশ্চিম জার্মানির নুরেনবার্গে চাকরির সুযোগ অনেক বেশী।  ব্যক্তিগত ভাবে এখনো তেমন কোন কাজ পাই নি, বিশেষ করে হালেতে থাকাকালীন সময়ে পাওয়া অসম্ভব মনে হয়েছে। তবে এখন পশ্চিমে কাজ পাব বলে আশা করছি।

তুমি বাংলাদেশ থেকে বি-১ কোর্স শেষ করে জার্মানিতে এসেছিলে। এইজন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ মাস, খরচ পড়েছে প্রায় এক লক্ষ টাকার মতন। এটা তোমার জন্য পরবর্তিতে কতটুকু কাজে দিয়েছে?

নাসেরঃ আসার পরে অনেকগুলো কাজ আমার জন্য সহজ হয়েছে। ভিসা বাড়ানোর জন্য জার্মান ভাষায় কথা বলতে পারার কারণে শুধুমাত্র আমিই একমাত্র বিদেশি ছাত্র যার কোন ব্লক একাউন্ট করতে হয় নি। যেকোন সময়ে বিপদে আপদে সাহায্য পেয়েছি অবলীলায়। এমনকি অন্য ছাত্র ছাত্রীরা ফরেন অফিসে যাবার সময় দোভাষী হিসেবে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। যতটুকু কষ্ট জার্মান শিখতে পেয়েছি, তার পুরোটাই সার্থক হয়েছে এখানে এসে।

বাংলাদেশের কি কি জিনিস মিস করছ?

নাসেরঃ ঢাকা এবং ঢাকার বন্ধুদের।

তোমার চোখে বাংলাদেশের সাথে জার্মানির কি কি পার্থক্য?

নাসেরঃ আমাদের দেশে সময়ের কোন দাম নেই। এমনকি বাংলাদেশি ছাত্ররা জার্মানিতে এসে ক্লাসে দেরি করে এসে প্রফেসরদের বকা খায়।  শুধু বড় শহর নয়, গ্রামে গঞ্জেও এই দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা দারুণ। সব জায়গাতেই গণপরিবহণ ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত। জার্মানিতে ক্লাসে প্রফেসররা ছাত্রদের সব প্রশ্নের উত্তর সময় নিয়ে দেন, এমনকি উত্তর তৎক্ষণাৎ জানা না থাকলে পরেরদিন ক্লাসে এসে প্রথমেই উত্তর তৈরি করে নিয়ে আসেন। বাংলাদেশে ক্লাসে প্রশ্নোত্তর বা ছাত্র শিক্ষকের যোগাযোগ বা ইন্টারকেশন অপ্রতুল।

জার্মানিতে আসতে ইচ্ছুক এমন নতুনদের জন্য কি কোন উপদেশ দেবে?

নাসেরঃ ভালোমতো সবকিছু জেনে আসা উচিত। শুধু ভিসার চিন্তা না করে শহর, কোর্স, ইউনিভার্সিটি সম্পর্কে জেনেশুনে তারপর সিদ্ধান্তে আসা উচিত।

সাক্ষাৎকারঃ মোহাম্মদ আবু নাসের। 

সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং অনুলিখনঃ আদনান সাদেক।

২৭.১২.২০১৫, লিওনবার্গ, জার্মানি।

 

প্রিয় সবাই,

জার্মানিতে আসার আগের এবং পরের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা নতুন ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার পর্ব লেখার কাজে হাত দিয়েছি। এই অভিজ্ঞতা যেমন তোমাদের নিজেদের উপকার বয়ে আনতে পারে, তেমনি নতুনদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকতে পারে। প্রতিটি সাক্ষাৎকার বক্তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে সাজানোর ইচ্ছে আছে, এই কারনে সাক্ষাৎকারের প্রশ্নগুলো প্রতিবার ভিন্নধর্মী হবে। যারা নিজেদের অভিজ্ঞতা অন্যদের সাথে ভাগ করে নেয়ার যাদের আগ্রহ আছে, তাদের প্রতি অনুরোধ সরাসরি আমার সাথে যোগাযোগ করার। সাক্ষাৎকার নেবার পরে সাক্ষাতকারদাতার অনুমতি সাপেক্ষে লেখাগুলো আমাদের ব্লগে প্রকাশিত হবে। কেউ চাইলে ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন রেখেও সাক্ষাৎকার দিতে পারে। যাদের সাথে সামনা সামনি কথা বলার সুযোগ পাওয়া যাবে না, তাদের থেকে টেলিফোনে সাক্ষাৎকার নেয়া হবে। জার্মানিতে বসবাসরতদের সয়াহতা কামনা করছি।         

বিনীত, 

আদনান সাদেক

এই সিরিজের অন্যান্য সাক্ষাৎকারঃ 

Print Friendly, PDF & Email

ফেসবুক মন্তব্যঃ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

  1. Pingback: স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা (সাক্ষাৎকার-৩ঃ সাজ্জাদ, কেম্পটেন) | বিসাগ (www.BSAAGweb.de)