• Home »
  • Higher-Study-in-Germany »
  • স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা (সাক্ষাৎকার-১ঃ জিয়েম, ফুর্টভাঙ্গেন)

স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা (সাক্ষাৎকার-১ঃ জিয়েম, ফুর্টভাঙ্গেন)

 

জার্মানিতে পড়তে আসা নিয়ে সবারই অনেক ধরণের ভাবনা চিন্তা থাকে। কিভাবে আবেদন করব, শেষ পর্যন্ত ভিসা পাব কিনা, টাকা পাঠাব কিভাবে, যাবার পর পূর্বভাবনার সাথে বাস্তবতার কতটুকু মিল পাব এইরকম অনেক ভাবনা। জার্মানিতে পা দিয়ে নতুন জীবনের সাথে খাপ খেয়ে মানিয়ে চলতে গিয়ে অনেক ধরণের নতুন অভিজ্ঞতার দেখা মিলে। নতুন দেশের নতুন নিয়ম, নতুন মানুষদের থেকে নতুন করে মূল্যবোধ এবং দেশ থেকে সাথে করে নিয়ে আসা স্বপ্ন এবং জার্মানির বাস্তবতা- এই অভিজ্ঞতাকে অন্যদের সাথে শেয়ার করার উদ্দেশ্য নিয়ে এই সিরিজের সুত্রপাত।

স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা-১ (জিয়েম, হখশুলে ফুর্টভাঙ্গেন)

জিয়েম পড়তে এসেছে ব্যবসায়িক কনসালটেন্ট নিয়ে মাস্টার্সে পড়াশোনা করতে জার্মানির একদম দক্ষিণের ব্ল্যাক ফরেস্টের গহীনের ছোট শহর ফুর্টভাঙ্গেনে। কথা বলছিলাম জিয়েমের সাথে তার জার্মানিতে আসার আগেকার এবং আসার পরের অভিজ্ঞতার একটা তুলনামূলক চিত্র পাঠকদের জন্য তুলে ধরতে।

উচ্চশিক্ষার জন্য তুমি জার্মানি কেন পছন্দ করলে?

জিয়েমঃ আবেদন করা সহজ, কম খরচ। আমি বাংলাদেশে বেশ কয়েক বছর একটি কেমিক্যাল কোম্পানিতে কাজ করেছি যেখানে জার্মানির অনেক প্রোডাক্টের বাংলাদেশে বাজারজাতকরনের সাথে যুক্ত ছিলাম। মেইড ইন জার্মানির উচ্চমান এবং সেইসব প্রডাক্টের বাজারে চাহিদা দেখে মনে হয়েছে জার্মানিতে আসা ভবিষ্যতের জন্য লাভজনক হবে।

Hochschule Furtwangen

জার্মানিতে আসার আগে, সবচেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলে কি নিয়ে?

জিয়েমঃপড়াশোনা শেষ করে ভাল চাকরি পাব কিনা, আবার ফেরত আসতে হবে কিনা এইসব নিয়ে ভেবেছি। তবে দেশে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলাম ব্লকের একাউন্টে পাঠানো টাকা নিয়ে, এবং টাকা পাঠানোর পর ভিসা না পেলে আবার সব টাকা ফেরত পাব কিনা ইত্যাদি। আমি টাকা পাঠানোর পর ইউরোর দাম বেশ কমে গেল। যদি টাকা আবার ফেরত আসতো ভিসা না পাবার কারণে, তাহলে ইউরোর অবমূল্যায়নের জন্য প্রায় তিন লক্ষ টাকা ক্ষতি হতো।

জার্মানিতে আবেদনের জন্য সবচেয়ে কঠিন ধাপ কোনটি ছিল?

জিয়েমঃ ব্লক একাউন্টের টাকা পাঠানো।

জার্মানিতে আসার আগে জার্মানি সম্পর্কে কেমন ধারণা ছিল?

জিয়েম, ফুর্টভাঙ্গেন।

জিয়েমঃ আমি ভাবতাম জার্মানরা এশিয়ানদের ছোট চোখে দেখে, বা এদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। জার্মানিকে চিনতাম হিটলারের দেশ হিসেবে, এরা নিজেদের ছাড়া মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করে না। আসার আগে মিডিয়ায় ড্রেসডেনে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিছিল দেখে চিন্তিত ছিলাম। জার্মানিতে আসার আগে জার্মানদের নিয়ে মূলত নেগেটিভ ধারণাই ছিল ভেতরে।

জার্মানিতে আসার পরে পরের অভিজ্ঞতা কেমন হল?

জিয়েমঃ জার্মানিতে এসেছি দুই মাসের একটু বেশি হল। এই অল্পদিনে আসার আগের খারাপ ধারণাগুলো পুরোপুরি কেটে গেছে। এখানকার মানুষ বন্ধুসুলভ এবং পরোপকারী। কোন বিপদে পড়লে সবসময়েই সাহায্য পেয়েছি, সেটা ইংরেজিতে কথা বলেও পাওয়া গেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে মানুষ যেচে এসে জিজ্ঞেস করেছে সাহায্য লাগবে কিনা। আমি যে শহরে এসেছিলাম, সেটা ছোট একটা শহর। মনে মনে মসজিদ খুঁজছিলাম। আমি মুসলমান জানতে পেরে একজন প্রতিবেশী জার্মান নিজে থেকে এসে বুঝিয়ে দিয়েছে কোথায় মসজিদ, কিভাবে যেতে হয়। ধর্ম পালনে বা ধর্মের কারনে বিন্দুমাত্র কোন বৈষম্য এখনও পর্যন্ত চোখে পড়ে নি। শুক্রবারের জুম্মার সময় একটা ক্লাসের শিডিউল দেয়া ছিল। নামাজ পড়তে গেলে ফিরে এসে ক্লাসের অর্ধেক সময় পার হয়ে যায়। এটা শিক্ষককে বুঝিয়ে বলতেই সে বিনাবাক্যে ক্লাসের সময় পিছিয়ে দিল।

এখানে চাকরির কি অবস্থা, এখনও কোন কাজ পেয়েছ?

জিয়েমঃ এখনও পার্ট টাইম জব পাইনি, তবে অড জব করার ইচ্ছেও নেই। সেকারনে সরাসরি কোম্পানিতে আবেদন করছি। বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করে সেখান থেকে বেশ কিছু সাড়া পেয়ে মনে হচ্ছে কিছু একটা পেয়ে যাব দ্রুত। পড়া শেষ করার পর ভদ্র চাকরি পাব – এইরকম আত্মবিশ্বাসও পাচ্ছি। তবে জার্মান ভাষা জানলে প্রথম মাস থেকেই চাকরি পেয়ে যেতাম বলে মনে করি ।

বাংলাদেশের কি কি জিনিস মিস করছ?

জিয়েমঃ মূলত বাবা-মা এবং পরিবারের অন্যদেরকে মিস করি।

তোমার চোখে বাংলাদেশের সাথে জার্মানির কি কি পার্থক্য?

জিয়েমঃ বাংলাদেশে যেকোন কাজে মানুষ প্রথমেই খারাপটা নিয়ে বেশি ভাবে। যেমন রাস্তায় বের হলে কিছু একটা হতে পারে, বিদেশে যাবার কথা ভাবলে আগেই খারাপ কিছু হতে পারে এটা চিন্তা করে। আমাদের সব কিছুতেই খারাপ দেখার একটা অভ্যেস আছে। জার্মানিতে মানুষজনের চিন্তাভাবনা বা কথাবার্তার মধ্যে কখনই এই জিনিস পাইনি। বরং তারা সবকিছুকে পজিটিভলি বা সব কিছুর মধ্যেই তারা ভালটা আগে দেখে। যেকোন কিছুতেই জার্মানরা একটা নিম্নতম মান বজায় রাখে। কোয়ালিটি ভাল না হলে তারা গ্রহণ করে না। এদের ঘড়ির কাঁটা দেখে সময় মেনে চলাও আমাদের দেশে পাওয়া যায় না। এরা সবকিছুতেই খুব পরিকল্পনা করে কাজ করে, আমাদের কাজের মধ্যে দূরদৃষ্টির খুব অভাব।

জার্মানিতে আসতে ইচ্ছুক এমন নতুনদের জন্য কি কোন উপদেশ দেবে?

জিয়েমঃ মাস্টার্সের জন্য পড়তে আসা ব্যাচেলর থেকে উত্তম। জার্মান ভাষা শিখা উচিত দেশে থেকেই আর আবেদন করার জন্য কোন এজেন্সির কাছে যেন কেউ না যায়।

সাক্ষাৎকারঃ কাজি মোহাম্মদ জিয়েম 

সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং অনুলিখনঃ আদনান সাদেক।

১১.০৬.১৫, ভিলিঙ্গেন শোয়েনিঙ্গেন, জার্মানি।

 

প্রিয় সবাই,

জার্মানিতে আসার আগের এবং পরের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা নতুন ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার পর্ব লেখার কাজে হাত দিয়েছি। এই অভিজ্ঞতা যেমন তোমাদের নিজেদের উপকার বয়ে আনতে পারে, তেমনি নতুনদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকতে পারে। প্রতিটি সাক্ষাৎকার বক্তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে সাজানোর ইচ্ছে আছে, এই কারনে সাক্ষাৎকারের প্রশ্নগুলো প্রতিবার ভিন্নধর্মী হবে। যারা নিজেদের অভিজ্ঞতা অন্যদের সাথে ভাগ করে নেয়ার যাদের আগ্রহ আছে, তাদের প্রতি অনুরোধ সরাসরি আমার সাথে যোগাযোগ করার। সাক্ষাৎকার নেবার পরে সাক্ষাতকারদাতার অনুমতি সাপেক্ষে লেখাগুলো আমাদের ব্লগে প্রকাশিত হবে। কেউ চাইলে ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন রেখেও সাক্ষাৎকার দিতে পারে। যাদের সাথে সামনা সামনি কথা বলার সুযোগ পাওয়া যাবে না, তাদের থেকে টেলিফোনে সাক্ষাৎকার নেয়া হবে। জার্মানিতে বসবাসরতদের সয়াহতা কামনা করছি।         

বিনীত, 

আদনান সাদেক

এই সিরিজের অন্যান্য সাক্ষাৎকারঃ 

Print Friendly, PDF & Email