• Home »
  • Higher-Study-in-Germany »
  • স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা (সাক্ষাৎকার-৪ঃ সাকি বিল্লাহ্‌, কেমনিটজ)

স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা (সাক্ষাৎকার-৪ঃ সাকি বিল্লাহ্‌, কেমনিটজ)

Contents

 

জার্মানিতে পড়তে আসা নিয়ে সবারই অনেক ধরণের ভাবনা চিন্তা থাকে। কিভাবে আবেদন করব, শেষ পর্যন্ত ভিসা পাব কিনা, টাকা পাঠাব কিভাবে, যাবার পর পূর্বভাবনার সাথে বাস্তবতার কতটুকু মিল পাব এইরকম অনেক ভাবনা। জার্মানিতে পা দিয়ে নতুন জীবনের সাথে খাপ খেয়ে মানিয়ে চলতে গিয়ে অনেক ধরণের নতুন অভিজ্ঞতার দেখা মিলে। নতুন দেশের নতুন নিয়ম, নতুন মানুষদের থেকে নতুন করে মূল্যবোধ এবং দেশ থেকে সাথে করে নিয়ে আসা স্বপ্ন এবং জার্মানির বাস্তবতা- এই অভিজ্ঞতাকে অন্যদের সাথে শেয়ার করার উদ্দেশ্য নিয়ে এই সিরিজের সুত্রপাত।

স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা-৪ (সাকি বিল্লাহ্‌, হখশুলে মিটভাইডা, কেমনিটজ, সাক্সেন)

সাকি এসেছে ২০১৪ সালে কেমনিটজের পাশে মিটভাইডা হখশুলেতে ডিজিটাল মিডিয়া এবং ফলিত গনিতে মাস্টার্স করতে  (Applied Mathematics in Digital Media)।  ফেসবুকে শরনার্থী বিষয়ে সাকি একটা পোষ্ট দিয়েছিল, সেখানে জার্মানিতে আগত শরণার্থী বিষয়ক বেশ কিছু গুরুত্ব পূর্ণ অভিজ্ঞতার কথা ছিল। এই সুবাদে সাকির সাথে পরিচয়। টেলিফোন কথোপকথনে সাকির জার্মানিতে আসার আগেকার এবং আসার পরের মজার কিছু অভিজ্ঞতার আলোকে এই সাক্ষাৎকার।

উচ্চশিক্ষার জন্য তুমি জার্মানি কেন পছন্দ করলে?

সাকিঃ প্রথমেই বিসাগ পরিবার ও অন্যান্য পাঠকদের ধন্যবাদ । এরপরই আদনান ভাইকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ ও সাধুবাদ জানাই যিনি শত ব্যস্ততার মধ্যেও ভাল কাজ করার জন্য সময় ঠিকই বের করে নিচ্ছেন আর আমাদেরকে সকল ভাল কাজে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন ।

এবার মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক, উচ্চ শিক্ষার জন্য জার্মানী কেন বেছে নিয়েছি আসলে সেটা একটা লম্বা উত্তর । সংক্ষেপে বললে বেশ কয়েকটি কারণ ছিল, কারণ গুলো নিম্নরুপঃ

১. জার্মানীতে কোন টিউশন ফি নেই মানে এক হিসেবে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার সাথে তুলনা করলে জার্মানীতে বিনাবেতনে পড়া মানে ঐসব দেশের তুলনায় বৃত্তিবলা যায় ।

২. পড়ালেখা করাটাই আসলে মুল উদ্দেশ্য ছিল তাই কম খরচে পড়তে পারব এটা একটা প্রধান বিষয় ছিল ।

৩. জার্মানী প্রকৌশলী ও গণিত বিষয় এ পড়ানোর জন্য বিশ্বে প্রথম সারিতে ।

৪. জার্মানীর অর্থনৈতিক ও কাজের ক্ষেত্র অনেক ভাল ।

৫. জার্মানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইউরোপের ভিতর সব থেকে ভাল । বিশেষ করে বিদেশী ছাত্রছাত্রী ও শরনার্থীদের জন্য জার্মানী সব থেকে নিরাপদ ।

৬. অন্যান্য দূতাবাসের তুলনায় জার্মানীর দূতাবাস ভিসা প্রদানে অনেক বেশি নমনীয় এবং স্বচ্ছ । সকল কাগজ পত্র ঠিক থাকলে এবং ইন্টারভিউতে ভাল ভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারলে ভিসা এক প্রকার নিশ্চিত বলা যায় । এমনকি যদি কোন কারণে ভিসা দেয়া না হয় তাহলে আপিল এর ব্যবস্থাও আছে ।

সবদিক বিবেচনা করে আমি জার্মানী কে বেছে নেই । পড়া শেষ করে জার্মনীতে চাকুরী বা ব্যবসা শুরু করেও এখানে নাগরিক হিসেবে থাকার অনেক সুবিধা আছে যা উন্নত অনেক দেশেই নেই ।

জার্মানিতে আসার আগে, সবচেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলে কি নিয়ে?

সাকিঃ  জার্মানীতে আসার আগে সব থেকে বেশি চিন্তিত ছিলাম প্রধানত দুটি বিষয়ে,প্রথমত জার্মান ভাষা জানি না আর দ্বিতীয়ত, জার্মানদের পড়ালেখার মান আমাদের চাইতে অনেক উপরে কিভাবে ক্লাসে ভাল ছাত্র হওয়া যায় সেটা নিয়েও চিন্তিত ছিলাম ।

যেহেতু আমার স্নাতক কম্পিউটার প্রকৌশল(B.Sc. Engineering in CSE) ছিল তাই ফলিত গণিত (M.Sc. in Applied Mathematics in Digital Media) নিয়ে পড়তে আশাটা একটা বিরাট সাহসী পদক্ষেপ ছিল বিশেষত আলবার্ট আইনস্টানের দেশ জার্মানীতে গণিতবিদ্যা পড়ানোর মান অনেক উপরে তাই ।

জার্মানিতে আবেদনের জন্য সবচেয়ে কঠিন ধাপ কোনটি ছিল?

সাকিঃ  জার্মানীতে আবেদনের ক্ষেত্রে আমি কোন দালাল বা এজেন্সীর মাধ্যমে যেতে চাইনি তাই সম্পূর্ণ বিষয়টা ই কঠিন ছিল আমার জন্য । আর বিসাগ নামের কোন ওয়েবসাইট আছে সেটা আমি তখন জানতাম না ২০১৩ এবং ২০১৪ তে যখন জার্মানীতে পড়ব বলে ঠিক করি।

ভিসা পাওয়ার পর এক বন্ধুর মাধ্যমে বিসাগের ওয়েবসাইট লিংক পাই এবং এর পর থেকে কাজগুলো অনেক সহজ হয়ে যায় ।

বাংলাদেশ থেকে জার্মানীতে ব্লক করে টাকা পাঠানোটাই সব থেকে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়েছিল কারণ তখন বাংলাদেশ ব্যাংক এর নিয়ম অনুযায়ী কেউ ভিসা না পেলে টাকা বিদেশে পাঠাতে পারবে না । অন্যদিকে জার্মান দূতাবাস বলেছে যারা জার্মান ব্যাংকে টাকা পাঠাতে পারবে শুধু তাদেরকেই ভিসা দেয়া হবে এবং বিষয়টা আমার সময়ই তারা প্রথম চালু করে । অন্যান্য বিষয় আমার কাছে সহজই মনে হয়েছে শুধু টাকা পাঠানো ছাড়া ।

জার্মানিতে আসার আগে জার্মানি সম্পর্কে কেমন ধারণা ছিল? এবং জার্মানিতে আসার পরের অভিজ্ঞতা কেমন হল?

সাকিঃ  এই প্রশ্নটা করার জন্য আদনান ভাইকে অশেষ ধন্যবাদ দিতে চাই । কারণ বাংলাদেশের বেশিরভাগ অভিভাবক ও সাধারণ মানুষদের ক্ষেত্রে একটা ধারণা আছে যারা বিদেশে পড়তে আসে বিশেষত পশ্চিমা দেশগুলোতে তারা সারাদিন পার্টি, নাইট ক্লাব আর নেশা করে বেড়ায় । আমার মনে আছে আমার এক আত্মীয়ের ছেলে বিদেশে থাকে, তার জন্য কনে দেখতে গিয়ে একবার এক মেয়ে বলে ফেলেছিল যে বিদেশী ছেলেদের তো চরিত্র ভাল না সারাদিন পার্টি আর মেয়ে মানুষ নিয়ে পড়ে থাকে । পাঠকদের কাছে এভাবে উপস্থাপনের জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

দেশে থাকতে আমিও তাই ভাবতাম, হয়ত এখানে কোন কাজ নাই পড়ালেখা ছাড়া । বাকী সময় সবাই তাহলে পার্টি ও ডেটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকে কিন্তু এখানে আশার পর বুঝতে পারলাম আসলে দূর থেকে বিষয়টা এমনই মনে হয়; যেমনটা ইউরোপীয়ান বা পশ্চিমারা আমাদের নিয়ে ভাবে আমরা সবাই গার্মেন্টস এ কাজ করি বা আমাদের দেশে কোন বিলাসবহুল গাড়ী নেই ।

এখানে না আসলে বুঝতে পারতাম না ছাত্রজীবন বাবা-মা ছেড়ে বিদেশে থাকাটা কত কঠিন একটি কাজ । বাসায় শুধু পড়তে হত, আর এখানে আসার পর যদিও সব যন্ত্রচালিত কিন্তু তারপরও কাপড় ধোয়া, তিনবেলা খাবার তৈরী করা, বাজার করা, ভার্সিটিতে যাওয়া, বাবা-মা ও স্বজনদের সাথে কথা বলা, পড়তে বসা এবং সর্বোপরি টাকা আয় করা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে থাকতে পার্টি বা ডেট করার সময় বা শক্তি কোনটাই থাকে না । আর পার্টি বা ডেট করার মানসিকতাও থাকে না এখানে আসার পর ।

আর যদি জার্মানদের ব্যাপারে বলি, তাহলে বলতে হয় আমি এদের মত কর্মঠ এবং চিন্তাশৈলী জাতি খুব কমই দেখেছি । যে কারণে জার্মনীকে বলা হয় উদ্ভাবনার রাজ্য (Land of Ideas) ।

নিরাপত্তার কথা বলতে গেলে এখানে গভীর রাতেও মেয়েরা একা চলতে নিরাপদ বোধ করে ।

আরেকটা বিষয় বলতে চাই, তা হল ভাষা বিভ্রাট, জার্মানী আসার আগে যদিও সামান্য জার্মান ভাষা শিখেছিলাম কিন্তু সেটাতে তেমন গুরুত্ব দেইনি, যেহেতু আমার মাস্টার্স ইংরেজিতে । আর জার্মানী একটা আধুনিক দেশ সুতরাং সবাই ইংরেজি জানবে এটাই ভেবেছিলাম কিন্তু বিধিবাম, আশার পর এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে ভার্সিটিতে আসতে গিয়ে বিশাল এক সমস্যায় পড়তে হয়েছিল শুধু মাত্র জার্মান ভাষা জানি না বলে । তাই জার্মান ভাষা জানাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।

 

এখানে চাকরির কি অবস্থা, এখনও কোন কাজ পেয়েছ?

সাকিঃ এখানে চাকুরী পাওয়া খুবই সহজ তবে জার্মান ভাষায় ভাল দক্ষতা থাকতে হবে । যেহেতু আমার প্রধান উদ্দেশ্য পড়ালেখা তাই চাকুরীর প্রতি তেমন আগ্রহ নেই ছিল না । তবে এখানে প্রতি মাসে যে টাকাটা লাগে তার জন্য ভার্সিটিতে টিউটর হিসেবে এবং মার্সিডিজি বেঞ্জ এ একবার কাজ করেছিলাম । এছাড়া ২০১৫ তে আমি জার্মান সরকারের বিশেষ বৃত্তি পেয়েছিলাম ।

তুমি বাংলাদেশ থেকে কতটুকু জার্মান ভাষা শিখে জার্মানিতে এসেছিলে। এটা তোমার জন্য পরবর্তিতে কতটুকু কাজে দিয়েছে?

সাকিঃ বাংলাদেশে থাকতে এ-ওয়ান পড়েছিলাম । যেহেতু আমার পড়ার বিষয় সম্পূর্ণ ইংরেজি মাধ্যম তাই আমি ব্রিটিশ কাউনসিল থেকে IELTS করেছিলাম । আর জার্মান ভাষা শেখার কারনেই আমি প্রফেসর এবং অন্যান্যদের সাথে আন্তরিকভাবে মিশতে পেরেছিলাম । এবং অবশ্যই এই ভাষা শেখার কারনেই উপরে উল্ল্যেখিত বেশিরভাগ সুযোগ গুলো আমি কাজে লাগাতে পেরেছিলাম । আরো বলতে গেলে চাকুরীর ক্ষেত্রে ভাষা জানাটা ছিল খুবই সহায়ক ।

বাংলাদেশের কি কি জিনিস মিস করছ?

সাকিঃ  বাংলাদেশের বেশির ভাগ সময় বাবা আর মা এর আদর স্নেহ মিস করি । ভাই, বোন ও বন্ধুদের মিস করি । বড় ভাইবোনদের চার জন রাজকন্যা আছে যাদের আমি আমার নিজের সন্তানের মত আদর করি তাদের মিস করি ।

এরপর বাংলাদেশী খাবার, সবজি, ফলমূল ও মাছ যার অনেক কিছু এখানে পাওয়া গেলেও আবার বেশ কিছু পাওয়া যায় না ।মাছ ধরা এবং বন্ধুদের সাথে গান প্র্যাকটিস করা মিস করি ।

তোমার চোখে বাংলাদেশের সাথে জার্মানির কি কি পার্থক্য?

সাকিঃ জার্মানী ও বাংলাদেশের পার্থক্য গুলো বলে শেষ করার মত না । বরং কি কি মিল আছে সেটা আরো সহজ ভাবে বলা যায় । জার্মান ও বাংলাদেশীরা জাতি হিসেবে আমোদপ্রিয় এবং বর্ষাকালে ও গ্রীষ্মকালে জার্মানী ও বাংলাদেশের মধ্যে আমি অনেক মিল খুজেঁ পাই । পার্থক্য বলতে গেলে, জার্মানী বাংলাদেশের চাইতে অর্থনৈতিক, নিরপত্তা, সামাজিক মূল্যবোধ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, চাকুরী ও ব্যবসা, শিক্ষা ও চিকিৎসা সব দিক থেকে এগিয়ে আছে।

জার্মানিতে আড়াই বছরের খরচ কিভাবে চালালে?

সাকিঃ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং সহজে ব্যখ্যা করা কঠিন । উত্তরটা একটু বিস্তারিত বলতে চাই যাতে পরবর্তীতে যেসকল ছাত্রছাত্রী জার্মানীতে পড়তে আসবে তাদের উপকার হয় । খরচের একটা বড় অংশ হচ্ছে ব্লক একাউন্টের টাকা ।

কিন্তু ব্যাপারটা হল ব্লক একাউন্টের টাকা সীমিত এবং বেশিরভাগ টাকাটাই আমি প্রথম বছর খরচা করে ফেলি ।

যার কারণে পরবর্তী বছরে চাকুরী খুঁজতে হয় আমাকে । ভার্সিটিতে টিউটর হিসাবে একটি চাকুরী পেয়ে যাই এবং তার পরের সেমিস্টারে জার্মান সরকারের বিশেষ বৃত্তি (জার্মান স্টিপেন্ডুম) পাই । এছাড়া মার্সিডিজ বেঞ্চ(Mercedes Benz, Daimler AG) তে গ্রীষ্মকালীন চাকুরী বা ফেরিয়েন জব করে ভাল অংকের একটা টাকা পেয়েছিলাম যা পড়ালেখা শেষ করতে সাহায্য করেছে ।

নীচের পাই চার্ট দেখলে একটা ধারণা করা যায় আমার ক্ষেত্রে কিভাবে পড়ালেখার খরচ এসেছিল,

মার্সিডিজ বেঞ্চ এর HR ডিপার্টমেন্ট যারা নিয়োগ ও চাকুরীর বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রন করে সেই প্রতিষ্ঠানের নাম ডায়ামলার এজি (Daimler AG) ।

জার্মানীতে পড়ার খরচ যোগাড়ের একটা ভাল উপায় হচ্ছে এই সামার জব বা ফেরিয়েন জব অথবা গ্রীষ্মকালীন চাকুরী । এ সময় বেশিরভাগ কোম্পানী খুব ভাল বেতনে চাকুরী দেয় ।

তবে মার্সিডিজ বেঞ্চ এর বেতন একজন ছাত্রের স্বপ্নের চাইতেও বেশি থাকে । ফক্সভাগেন(Volkswagen) এও ভাল বেতনের অবকাশকালীন গ্রীষ্মের চাকুরী পাওয়া যায় তবে অবশ্যই জার্মান ভাষায় ভাল দক্ষতা থাকতে হবে ।

এ সকল জবের ক্ষেত্রে আগে থাকতে খোঁজখবর এবং সকল জরুরী সনদ ও কাজগপত্র বা অন্যান্য তথ্য তৈরী রাখতে হয় যাতে ডেডলাইন পার হওয়ার আগেই আবেদন করা যায় । এ দুটি কোম্পানীতে ৩/৪ মাস কাজ করলে প্রায় ৭ থেকে ১০ হাজার ইউরো আয় করা সম্ভব তবে অবশ্যই পড়াটাকে সবসময় প্রাধান্য দিতে হবে । মাসে বাংলাদেশী টাকায় ২ থেকে তিন লাখ টাকা বেতন থাকে এবং কর বা ট্যাক্স ও স্বাস্থ্যবীমার টাকা দেয়ার পরও প্রায় এক লাখ তিরিশ থেকে ২ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। এক্ষেত্রে মনে রাখা ভাল যে একজন ছাত্র ১২০ দিন এর বেশি কাজ করতে পারবে না । আর করলে ভিসা বাতিলসহ নানা জটিল সমস্যা পড়তে বাধ্য ।

মার্সিডিজ বেঞ্চ এ কাজ করার সুবাধে জার্মানদের সাথে সরাসরি কথা বা বন্ধুত্ব করার সুযোগ হয়েছিল যা তাদের কৃস্টি কালচার বুঝতে আমাকে সাহায্য করেছে। আমি যতগুলো চাকুরী করেছি তার ভিতর এই চাকুরীটাই সেরা আছে এখন পর্যন্ত । সুযোগসুবিধা, বেতন এবং সর্বোপরি জার্মান কলিগদের আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে বার বার । আর জার্মানদের ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রম এখনও বাস্তব জীবনে অনুসরণ করার চেস্টা করি।

জার্মানিতে আসতে ইচ্ছুক এমন নতুনদের জন্য কি কোন উপদেশ দেবে?

সাকিঃ  জার্মানীতে যারা পড়তে আগ্রহী তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, যদি মনস্থির করো যে পড়ালেখা করতে চাও তাহলে জার্মানীতে আস, অবশ্যই তোমার স্বপ্ন সফল হবে কিন্তু যদি টাকা উপার্জন বা এই দেশে থেকে যাওয়ার উদ্দেশ্য থাকে তাহলে শরনার্থী বা জব ভিসার জন্য আবেদন করতে পারো । একভাবে এসে অন্যভাবে থাকাটা এখানে খুবই কঠিন বিষয় । মানে ছাত্র হিসেবে এসে শরনার্থী হয়ে যাওয়া বা পড়া শেষ না করে অন্য কিছু করা এখানে খুবই কঠিন । সুতরাং কোন ভিসাতে এখানে আসতে চাও তা আগে ঠিক করো । আর জার্মানীতে থাকার অনেক উপায় আছে তবে সেগুলো সবটাই সৎ ও নৈতিক বা লিগাল ভাবে । অনৈতিক বা আইনকে ফাঁকি দেয়া জার্মানীতে কখনই সম্ভব না । এখানকার মানুষ আইনের প্রতি অনেক শ্রদ্ধাশীল ।

শরণার্থীদের নিয়ে জার্মানিতে তোমার অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু বল।

সাকিঃ শরনার্থী বা উদ্বাস্তু আসলে আমাদের মতই মানুষ কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তারা মানবিক বিপর্যয়ের স্বীকার । যেমনটা আমাদের ভাগ্যে ঘটেছিল ১৯৭১ সালে । জাতি হিসেবে আমরা অনেক উদার মনের তাই অর্থনৈতিক ও অধিক জনসংখ্যার চাপের পরও আমরা বহু সংখ্যাক রোহিঙ্গা, ভারতীয়, পাকিস্তানী, ইউরোপীয়ান, আরব ও অন্যান্য নৃগোষ্ঠীদের আশ্রয় দিয়েছি ।

২০১৫ তে জার্মানীর মিটভাইডা শহরে একটি শরনার্থী কেন্দ্রে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল ভলান্টিয়ার বা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ।

আর্ন্তজাতিক অনুষদ এর প্রধানের লেখা চিঠিটা পাঠকদের জন্য বাংলায় অনুবাদ করে হুবুহ তুলে ধরলাম,

“প্রিয় সাকি,

প্রথমেই শুভেচ্ছা নিও । পর সমাচার, তুমি হয়ত জানো বিভিন্ন দেশ থেকে জার্মানীতে গত শুক্রবার বহু সংখ্যাক উদ্বাস্তু(রিফিউজি) আমাদের শহরে আশ্রয় নিয়েছে । তাই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের সাহায্যের জন্য কিছু ছাত্রছাত্রীদের কে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আহবান জানিয়েছে । তোমার জানা মতে যারা যারা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী তাদের একটি টিম গঠন করে আমাদের সাথে অতিসত্বর যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে । ইংরেজি, জার্মান, ফ্রাঞ্চ, আরবি, স্প্যানিশ, বাংলা, উর্দু/হিন্দি ইত্যাদি ভাষা জানা তোমার কোন বন্ধু থাকলে আমার সাথে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা গেল ।

আগামী সোমবার ৩১ আগস্ট ২০১৫ সকাল ১০টায় তোমার অন্য কোন কাজ না থাকলে আমরা ভার্সিটির রেক্টর(বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান) এর সাথে এ ব্যাপারে মিটিং করতে পারি ।

বিনীত,

জাজকিয়া লাঙ্গহামার

হেড অব্ ইন্টারন্যাশনাল অফিস

ফলিত বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়, মিটভাইডা, জার্মানী” ।

ইমেইল বা ইবার্তা পাওয়ার পর আমি পরের দিনই স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে যোগ দেই এবং শরনার্থীদের সাহায্যে এগিয়ে আসি।

উক্ত শরনার্থী ক্যাম্পে সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমান, ইরাক, আফগানিস্তান, প্যালেস্তাইন, পাকিস্তান, ভারত সহ বাংলাদেশেরও বেশ কয়েকজন শরনার্থী ছিল।

বাস্তব জীবনে যুদ্ধগ্রস্ত কোন দেশের বা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে সংকটাপন্ন কোন দেশের উদ্বাস্তুদের সাহায্য করতে পেরে আমি নিজেকে আসলেই অনেক ধন্য মনে করছি । এতগুলো দেশের মানুষের পাশে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে পারাটা আসলেই সৌভাগ্যের বিষয় যা বাকী জীবন আমার জন্য একটি সুখ স্মৃতি হয়ে থাকবে।

বিসাগ পরিবার, সাক্ষাতকার গ্রহনকারী শ্রদ্ধেয় আদনান ভাই ও সকল পাঠকদের ধন্যবাদ আমার সাক্ষাতকারটি ধৈর্য নিয়ে পড়ার জন্য।

 

সাক্ষাৎকারঃ  সাকি বিল্লাহ।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং অনুলিখনঃ আদনান সাদেক।

১০.০২.২০১৭, জার্মানি।

 

প্রিয় সবাই,

জার্মানিতে আসার আগের এবং পরের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা নতুন ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার পর্ব লেখার কাজে হাত দিয়েছি। এই অভিজ্ঞতা যেমন তোমাদের নিজেদের উপকার বয়ে আনতে পারে, তেমনি নতুনদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকতে পারে। প্রতিটি সাক্ষাৎকার বক্তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে সাজানোর ইচ্ছে আছে, এই কারনে সাক্ষাৎকারের প্রশ্নগুলো প্রতিবার ভিন্নধর্মী হবে। যারা নিজেদের অভিজ্ঞতা অন্যদের সাথে ভাগ করে নেয়ার যাদের আগ্রহ আছে, তাদের প্রতি অনুরোধ সরাসরি আমার সাথে যোগাযোগ করার। সাক্ষাৎকার নেবার পরে সাক্ষাতকারদাতার অনুমতি সাপেক্ষে লেখাগুলো আমাদের ব্লগে প্রকাশিত হবে। কেউ চাইলে ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন রেখেও সাক্ষাৎকার দিতে পারে। যাদের সাথে সামনা সামনি কথা বলার সুযোগ পাওয়া যাবে না, তাদের থেকে টেলিফোনে সাক্ষাৎকার নেয়া হবে। জার্মানিতে বসবাসরতদের সয়াহতা কামনা করছি।         

বিনীত, 

আদনান সাদেক।

 

এই সিরিজের অন্যান্য সাক্ষাৎকারঃ 

 

Print Friendly, PDF & Email