• Home »
  • Higher-Study-in-Germany »
  • জার্মানি: স্বপ্ন, অভিজ্ঞতা, চেষ্টা, একাগ্রতা আর উদারতার প্রতিচ্ছবি

জার্মানি: স্বপ্ন, অভিজ্ঞতা, চেষ্টা, একাগ্রতা আর উদারতার প্রতিচ্ছবি

 

আমার বাবা আমাকে সবসময় তাঁর বড় ছেলের মত মনে করেন…মেয়ে মানুষ বলে যে বিয়েই হবে জীবনের লক্ষ্য এইটা আমার বাবা আর মামনির মধ্যে কখনই দেখিনি…আর সেজন্যই অনার্স এর পরপরই যখন বাবাকে বললাম যে মাস্টার্স করতে বাইরে যাব..বাবা খুবই খুশি হয়েছেন….এই প্রিফেস কিম্বা খাঁটি বাংলায় মুখবন্ধটুক এজন্য লেখা যেন আমার মত আরো অনেক মেয়েরা একটু সাহস করে তাদের ইচ্ছার কথা বাবা-মাকে বলেন এবং নিজের জীবনটাকে একটু বাক্স এর বাইরে এসে সাজানোর জন্য চেষ্টা করেন….

আসল কাহিনীতে প্রবেশ করি এইবার, আমি বরাবরই স্কুল এবং কলেজে বিজ্ঞান নিয়ে পরেছি…কারণ হিসেবে আমার মামনির আমাকে ডাক্তার বানানোর অদম্য কিন্তু এখন অপুরনীয় ইচ্ছার কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য..আর আমার বাবার ইচ্ছা ছিল আমি সাহিত্যে নিয়ে পড়ি…ডক্টরেট করি সাহিত্যে…এই ডাক্তার আর ডক্টরেট এর মধ্যে যেকোনো একটা বেছে নেয়ার অপসন (এর বাংলা ভুলে গেছি) পেলাম এইচ এস সি এর রেজাল্ট এর পরপর।..কিছু সময় নিয়ে অনেক ভেবে চিন্তে বুঝলাম মানুষকে কাঁটাছিড়া করার চেয়ে মানুষের মন আর তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা আমি ভালো পারব।…ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য, দর্শন আর সংস্কৃতির প্রতি নি:সীম ভালবাসা আমার এতদিনের পদার্থ, রসায়ন আর প্রাণিবিদ্যা বইয়ের ভাঁজে লুকান ছিল…অবশ্য বিজ্ঞান এর বিষয় গুলোর মধ্যে রসায়নকেও ভালোবেসে ফেলেছিলাম শেষের দিকে..জৈব রসায়ন আমার খুবই পছন্দের একটা বিষয় আর সাহিত্যের সাথে এই রসায়ন এর কিছু ভালো যোগসূত্র আছে….

তো, অনার্স এর জন্য বেছে নিলাম ইংরেজি সাহিত্য…ছোটবেলায় পরা সেই ব্রাম স্টোকার, ডিকেন্স, জ্যাক লন্ডন, হুগো, মার্ক টোয়েন এমন হাজারো লেখক দের রাজ্যটা আরো ভালোভাবে আবিস্কার করার ইচ্ছাটা ধীরে ধীরে নেশা হয়ে গেল… ইংরেজি সাহিত্যে পড়তে এসে আমার নিজের ভাষার সৌন্দর্য আর মোহনীয়তা আরো বেশি করে বুঝলাম…বহুকাল ধরে পড়ে আসা রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র অথবা হুমায়ূন তারা মিশে গেল শেলী, কিটস আর শেক্সপিয়ার এর সাথে…আমার দিনরাত সব হয়ে গেল গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস আর দর্শনময়..দিনরাত লিখতাম অথবা বই পড়তাম…মাঝে মাঝে ইচ্ছা না করলেও উপায় ছিল না কারণ এই পথ আমারই বেছে নেয়া…..অবশেষে অনার্স শেষ করলাম প্রশান্তির সাথে….ডক্টরেট এর পথে একটু এগিয়ে গেলাম বলা যায়….ভাবলাম ইংল্যান্ড যাব…ডিকেন্স এর সেই টেমস আর শেক্সপিয়ার এর এভন না দেখলেই নয়… বাধ সাধল আন্তর্জাতিক ছাত্রদেরপ্রতি তাদের সেখানের রাজনৈতিক উগ্রতা আরো কিছু এটাসেটা সমস্যা…এর পরের ভাবনা কনাডা যাই না কেন…কিন্তু ভিসা জটিলতার চিন্তা আর আমার অনার্স পরবর্তী জীবনের আলস্যের কারণে এপ্লাই করতে করতে ডেট চলে গেল….আর অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড এ অতিরিক্ত খরচের বহর দেখে আর আগানোর সাহস পেলাম না…বাকি রইল ইউরোপ….হল্যান্ড (দি নেদার্ল্যান্ডস), সুইডেন আর ডেনমার্ক ছিল প্রাথমিক পছন্দ…কিন্তু স্কলারশিপ এর জন্য এপ্লাই করতে আবার আলসেমি লাগল..এই কাগজ সেই কাগজ হেনতেন…তারপর আবার সেই বিশাল খরচপাতির বহর…এইসব ভাবতে ভাবতে একদিন এমন গভীর রাতে বিসাগের ওয়েবসাইটটা পেয়ে গেলাম….কিভাবে হাতেকলমে শিক্ষা নিয়ে একটা দেশে যাওয়া যায় তার সবটুক জানলাম….প্রথম রাতেই আমার মোটামুটি সব ভাইয়ার সব আর্টিকেল পড়া হয়ে গিয়েছিল…কিন্তু তবুও জার্মানী আসার ইচ্ছাটা শক্ত পোক্ত হল না কারণ ইংরেজি সাহিত্য পড়তে জার্মানী যাওয়াটা কেন জানি অদ্ভুতুড়ে মনে হল…যদিও জার্মানী আমার সবসময়ের জন্যই প্রিয় একটা দেশ…জার্মান সাহিত্যিকদের ইংরেজি অনুবাদিত লেখা পড়তে হয়েছে একটা সময় রিসার্চ এর জন্য…আর ডব্লিউ.এইচ.ও (ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশান) এ ডেলিগেট হিসেবে মুন সম্মেলন করার সুবাদে এই দেশটার ব্যাপারে ভালই জানাশোনা ছিল….আর ওয়াকিম লোয়েভ সেই সাথে তার জার্মান ব্যাটালিয়ন তো বহুকালের প্রিয়…কিন্তু তাও জার্মানিতে ইংরেজি সাহিত্য পড়তে যাওয়াটা সুবিধার লাগলো না…আমার অনার্স কোর্সে একজন হাফ জার্মান হাফ বাংলাদেশী প্রফেসর ছিলেন তিনি একদিন বললেন যে বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস আর দর্শনের মিশেল তুমি জার্মানী ছাড়া কোথাও ভালো পাবে না…উনি যদিও নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টরেট করেছেন…জার্মান সংস্কৃতি আর ইতিহাস তাঁর গবেষনার অংশ ছিল…তাঁর থেকে সাহস পেয়ে গেলাম আমার প্রিয় আরেক টিচার এর কাছে…তিনিও অভয় দিলেন…বললেন নতুন কিছু করার চেষ্টা কর…ইংরেজি আর জার্মান সাহিত্যের মধ্যে তুলনা খুব বেশি বৈচিত্রময় আর অনন্য হবে আর সেই সাথে তুমি ফরাসী, রাশিয়ান কিম্বা ল্যাটিন ও ভালো শিখতে পারবে যদি চেষ্টা কর…এরপর পরই সব চিন্তা বাদ দিয়ে বসে গেলাম জার্মান ইউনিভার্সিটি খুঁজতে…প্রথমেই দেখলাম ইউনি এসিস্ট নামক অদ্ভুত একটা জিনিস..এরা নাকি এপ্লিকেশান গুলো প্রথমে নিজেরা রিভিউ করবে তারপর ইউনিভার্সিটিতে পাঠাবে…দেখলাম এই ইউনি এসিস্ট এ এপ্লাই করতে আবার ফি ও দিতে হবে…এত্ত ঝামেলার মধ্যে যেতে ইচ্ছা করল না…জার্মানির সেরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলার একটা তালিকা পেলাম উইকিতে…দেখলাম কিউ এস রেটিং…আরো দেখলাম সাংহাই আর মাস্টার্স পোর্টাল এর রেটিং…ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিগুলোতে তাদের অবস্থান দেখলাম…মোটামুটি ভালই লাগলো সবকিছু…কিন্তু সাহিত্য পড়ার মত ভালো বিশ্ববিদ্যালয় এর মধ্যে পেলাম হুমবোলডট উনিভের্সিটেট বার্লিন, ইউনিভার্সিটি অফ বন আর গোয়েটিংগেন ইউনিভার্সিটি…বার্লিন আর বন এ করলাম না কারণ প্রথমটাতে ৮০% জার্মান জানা আবশ্যক ছিল যদিও ওদের পুরা কোর্সটাই ইংরেজিতে পড়ানো হবে আর বন এ ওরা বে সোয়াই পর্যন্ত চেয়েছিল কারণ ওরা হাফ জার্মান আর হাফ ইংরেজিতে পড়াবে…এরপর গেলাম গোয়েটিংগেন ইউনিভার্সিটির সাইটে…..দেখলাম কোনো অপশনই আমার জন্য কঠিন না বরং একটু বেশিই সহজ আর জার্মান জানা আবশ্যক নয় বরং আইএলটিএস দিয়েই হয়ে যাবে…..সাথে সাথেই মেইল করলাম আমার বিসয়ের মাস্টার্স কোর্স কোঅর্ডিনেটরকে…উনাকে যে কি পরিমাণ ত্যক্ত বিরক্ত আমি করেছি তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব…এখানে আসার পর যখন উনার সাথে দেখা করলাম .. উনি খুবই খুশি হয়ে বলেছেন দেখা হয়ে খুব ভালো লাগলো, আশা করি এখানে তোমার দিনগুলো খুবই ভালো কাটবে আর কোনো কিছু দরকার হলে আমাকে কিম্বা তোমার ইন্টারন্যাশনাল টিউটরদের জিগ্গেস করতে একদম সংকোচ করবে না….যাই হোক, এগুলো আরো পরে বিস্তারিত ভাবে বলব….আবার পুর্বকথায় আসি….আমার বাবা মা কেন জানি শুধু একটা ইউনিভার্সিটির উপর ভরসা করতে পারলেন না…বললেন আরো ২-৩টায় করো…বেশি এপ্প্লাই করলে নাকি সুবিধা।..শুধুমাত্র তাদের জন্যই এরপর ফ্রিডরিখ শিলার উনিভের্সিটেট অফ ইয়েনাতে এপ্প্লাই করলাম….

এখানকার মাস্টার্স কোঅর্ডিনেটর কেও ভালই জ্বালাইসি…আমার বিরক্ত করার তালিকাতে আরো আছেন হুমবোল্ডট উনিভারসিটির ইংরেজি সাহিত্যের কোঅর্ডিনেটর, পাসাউ উনিভারসিটির ইংরেজি সাহিত্যের কোঅর্ডিনেটর, মধ্যিখানে আমার এক বন্ধু অস্ট্রেলিয়া থেকে নক করে বলে এইখানে একটায় এপ্প্লাই কর স্কলারশিপ এর জন্য…তো ঐখানের ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন সিডনির ইংরেজি সাহিত্যের কোঅর্ডিনেটর, এর আগে নেদারল্যান্ড আর বেলজিয়াম এর কিছু ইউনিভার্সিটির কোঅর্ডিনেটরগণের সাথে ধুপধাপ ইন্টারনেট এ মেইল আদান প্রদান….আর করেছিলাম অস্ট্রিয়ার উনিভারসিটি অফ ভিয়েনার ইংরেজি সাহিত্যের কোঅর্ডিনেটরকে….আমার অনার্স শেষ করেছি ২০১৪ এর শেষের দিকে এর পর জানুয়ারী থেকে এপ্রিল আমার এইসব কোঅর্ডিনেটরগণকে জ্বালাতন করেই সময় গেছে…যাই হোক, অস্ট্রেলিয়াতে বেশ আশাবাদী ছিলাম কিন্তু পরে দেখি স্কলারশিপ নিয়েও লাভ নাই…এরপরেও আমার বাবার সাধের টাকাগুলা তার একমাত্র কন্যার পিছনেই ঢালতে হবে যেখানে আমার আরো একটা ছোট্ট ভাই আছে….তো অবশেষে গোয়েটিংগেন আর ভিয়েনাকে বেছে নিলাম, সাথে ছিল বাবা মার জোরাজুরিতে আর একটা ইউনিভার্সিটি, ফ্রিদ্রিখ শিলার অফ ইয়েনা…এরই মধ্যে জব এর জন্য ইন্টারভিউ দিলাম…আল্লাহ পাকের রহমত এ জব পাইলাম..কিছুদিন যাবার পর মনে হল লক্ষ্য থেকে দুরে চলে যাচ্ছি…তো জব ছেড়ে দিলাম….ওই সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত একটা জায়গায় বসে থাকা খুবই অসহ্যকর ছিল…এরপর পরই আইএলটিএস দেয়ার জন্য রেজিস্ট্রেসন করলাম..এপ্রিল এর ৩০ তারিখ আইএলটিএস দিলাম…মে এর ১৩তে রেজাল্ট পেলাম..আশা ছিল ৮ পাব কিন্তু পেলাম ৭.৫ …একটুর জন্য আমার এত্ত স্বপ্নের ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি মিস হয়ে গেল কারণ ওরা ৮-৮.৫ চেয়েছিল ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স এর জন্য…এরপর একটা আইএলটিএস ট্রেনিং সেন্টার এ টিচার হিসেবে এপ্লাই করেছিলাম..এখানে আসার আগ পর্যন্ত ওখানে ক্লাস নিয়েছি…টিচিং আমার কাছে সবসময়ের জন্য আনন্দময় একটা পেশা ছিল আর সেজন্যই এখানে এতদিন ছিলাম আর এখানে ৯-৫টা বসে থাকাও লাগত না….সপ্তাহে ২দিন ক্লাস নিতাম, মাঝে মাঝে মক টেস্ট…তো ভিয়েনা মিস হবার পর ইয়েনা আর গোয়েটিং গেন এ ঝটপট এপ্লাই করে ফেললাম..সেরকম কোনো ঝামেলাই হয় নাই…মানে কোনো এক্সট্রা ডকুমেন্ট হেনতেন…এই ঝামেলামুক্ত এপ্লাই করতে পারাটাই সবচে বড় প্রশান্তি এনে দিল…ইয়েনা তে এপ্লাই করেছিলাম জুন এর শুরুর দিকে আর ঠিক ১৪দিনের মধ্যে ওরা অফার লেটার পাঠিয়েছিল…এরপর করেছিলাম গোয়েটিংগেন এ…ইয়েনা থেকে অফার লেটার পেয়ে গোয়েটিংগেন এর জন্য অস্থিরতা আরো বেড়ে গেল….কারণ এইটার রেটিং বেশি ভালো ছিল…যদিও জার্মানির সব ইউনিভার্সিটিই ভালো কিন্তু আমি মন থেকে চেয়েছিলাম এখানে পড়তে…তো অবশেষে বিসাগে একদিন পোস্ট দিয়ে, ভাইয়াদের সাজেশান নিয়ে ইয়েনার অফার ক্যানসেল করে দিলাম কারণ এর মধ্যেই গোয়েটিংগেন থেকে ওরা আমাকে প্রাথমিকভাবে মনোনীত করেছে জানিয়েছিল…বলেছিল যে কিছুদিন এর মধ্যেই অফার লেটার পেয়ে যাব…জুলাই এর ২০ তারিখ আমি আমার এই আকাঙ্খিত গোয়েটিংগেন ইউনিভার্সিটি থেকে অফার লেটার পেলাম..জার্মান+ইংরেজিতে …সবার দোয়া নিয়ে এরপর শুরু করলাম ভিসা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া…প্রথমেই বিসাগের ব্লক একাউন্ট রিলেটেড সব আর্টিকেল গুলা প্রিন্ট করলাম..সময় খুবই কম ছিল আমার হাতে কারণ সেপ্টেম্বর এর ৩০ তারিখের মধ্যে এনরোল করার কথা লিখা ছিল অফার লেটার এ…কিন্তু এর মধ্যে এই ইউনিভার্সিটির মানবিক অনুষদ এর বেশ কয়জন প্রফেসর আর স্টাফ এর সাথে আমার বেশ ভালো চেনা পরিচিতি হয়ে গিয়েছিল মেইল করতে করতে…তাদের একজন হলেন মার্কুস ভাইয়া, উনাকে বললাম আমার তো ভিসা পেয়ে আসতে অনেক দেরী হবে, তিনি বললেন যে কোনো চিন্তা নাই…তোমার কোঅর্ডিনেটর আপাকে আবার মেইল দেও বল যে লেট এনরোলমেন্ট করার সুযোগ দিতে….আমাদের এখানে সব আন্তর্জাতিক ছাত্ররাই এই সুবিধা পায় আর এই সেমেস্টার যদি একান্তই না পারো তবে পরবর্তী সেমেস্টার এও তোমার আসার সুযোগ রয়েছে..কাজেই কোনো টেনসন কর না…আমি মার্কুস ভাইয়ার কথাগুলো থেকে সাহস পেয়ে আবার জ্বালাতন করতে মেইল করলাম মাস্টার কোঅর্ডিনেটরকে উনি আমাকে লেট এনরোলমেন্ট হবে এই আশ্বাস তো দিলেনই সাথে আমার এনরোলমেন্ট অফিসারকেও তাঁর মেইল এর কপি ফরওয়ার্ড করলেন যেন সেখান থেকে কোনো ঝামেলা না করা হয়…শান্তির ঘুম ঘুমালাম ঐদিন…পরের দিন বিসাগের তথ্য মতো চলে গেলাম মিউচুয়াল ট্রাস্ট এর গুলশান ব্রান্চ এ আপেল ভাইকে খুঁজতে…তাঁর সাথে বাবার কথা হওয়ার পর জানতে পারলাম তিনি আমার বাবার কলিগের দেশী ভাই এবং আমাদের এলাকাতেই থাকেন…আপেল ভাই এর মত এত আন্তরিক আর নিষ্ঠাবান মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি..তিনি একদিনে সব কিছু প্রসেস করে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক এ পাঠিয়ে দিলেন…৭ দিনের মাথায় বাংলাদেশ ব্যান্ক থেক অনুমতি পেলাম এবং টাকা ট্রান্সফার করে দিলাম…টাকা ট্রান্সফার এর দিন বিসাগের এক ভাইয়া (এম আহাম্মেদ আদনান) এর সাথে পরিচয় হলো…জানলাম যে আমার ভিসা ইন্টারভিউ এর তারিখের একদিন আগেই উনি দিবে….আমি এপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিলাম ২৫ অগাস্ট এর আর উনার ছিল ২৪ অগাস্ট…তো টাকা ট্রান্সফার এর একদিন পরেই ডয়েচ ব্যান্ক থেকে মেইল আসল যে ওরা টাকা পেয়ে গেছে..এরপর মার্কেন্টাইল ইন্সুরেন্স থেকে হেলথ ইন্সুরেন্স করলাম সাত হাজার টাকা দিয়ে…পারপাস অপশন এ ওরা লিখে দিল ফর ওয়ার্কিং এন্ড স্টাডিয়িং…এসব করতে করতে ভিসা ইন্টারভিউ এর সময় চলে আসল…সকাল ৮.৪৫ এ গেলাম….বলল ৯টার আগে ঢুকতে দিবে না…কিছুক্ষন অপেক্ষার পর ভিতরে ঢুকলাম..এর আগেও ব্লক একাউন্ট ওপেন করার জন্য কাগজপত্র সত্যায়িত করতে এসেছি এখানে…কাজেই কোনো অস্বস্তিই হয়নি…ব্লক একাউন্ট এর কাগজ যেদিন সতায়িত করতে আসি সেদিন পরিচয় হয়েছে আরেক বিসাগিয়ান তাপস রক্ষিত তপু ভাইয়া আর বৌদির সাথে…ভিসা অফিসার আমাকে ডাকার আগে সব কাগজপত্র লিস্ট অনুযায়ী সাজিয়ে নাসিমা (গার্ড)আপুর হাতে দিলাম…তার প্রায় এক ঘন্টা পর এক নম্বর কাউন্টার এ ডাক পড়ল…আমার নামটা খুব জটিল হওয়াতে অফিসার এর উচ্চারণ করতে একটু কষ্ট হচ্ছিল ডাকার সময়…কাউন্টার এ গিয়ে বললাম “হ্যালো অফিসার, গুড মর্নিং” তিনিও হেসে বললেন “মর্নিং” আমাকে আমার সব অরিজিনাল ডকুমেন্ট ফেরত দিয়ে বললেন “প্লিজ চেক ইফ এভরি পেপার ইজ ওকে অর নট” আমি বললাম “ইয়েস, এভরিথিং ইজ গুড”..এরপর আমাকে বললেন “প্লিজ টেল মি এবাউট ইয়োর এডুকেসনাল হিস্ট্রি…অল দি এক্জ্যাম্স ইউ হহ্যাভ গিভেন সো ফার এন্ড মেনসান অল দা ইয়ার্স রেস্পেক্টিভলি” …আমি বললাম “অলরাইট, আই হ্যাভ প্যাসড মাই এসএসসি ইন 2008, এইচ এস সি ইন 2010 এন্ড কম্প্লিটেড মাই ব্যাচেলর’স ইন 2014″ এরপর তিনি বললেন” ডু ইউ নিড টু হ্যাভ এনি রিকোওয়ারমেন্ট ইন জার্মান ল্যাঙ্গুয়েজ এন্ড প্লিজ টেল মি ইওর সাবযেক্ট এগেইন” আমি বললাম “আই উইল বি ডুয়িং মাই মাস্টার্স ইন ইংলিশ ফিলোলজি এন্ড দে সেইড নো জার্মান প্রফিসিয়েন্সি ইস নিডেড এজ দি এনটায়ার কোর্স উইল বি টট ইন ইংলিশ” …তিনি আরো জিগ্গেস করেছিলেন আমি ব্যাচেলর এ কোনো থিসিস করেছি কিনা আমি ইয়েস বলার পর আমার টপিক কি ছিল এটুক জেনে নিয়ে ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে আমাকে বললেন টাকা জমা দিয়ে আসতে…আমি টাকার রিসিট দিতে গিয়ে ভাবলাম কিছু তথ্য নিয়ে যাই উনার কাছ থেকে… তো বললাম যে কতদিন লাগতে পারে, তিনি বললেন ৪-৬ সপ্তাহ..আমি বলেছি আমার এনরোলমেন্ট এর শেষ তারিখ ৩০ সেপ্টেম্বর…তিনি আমাকে লেট এনরোলমেন্ট এর পরামর্শ দিলেন যেটা আমি আগেই সেরে ফেলেছি…এরপর বললাম “থ্যান্ক ইউ অফিসার, ইট ওয়াস রিয়েলি নাইস মিটিং ইউ” তিনিও আমাকে হেসে বললেন “নাইস টু মিট ইউ টু”….

এরপর থেকে শুরু হলো অপেক্ষা…২৬ অক্টোবার থেকে ক্লাস তাই ২৫ আগস্ট ইন্টারভিউ দিয়ে এসে ভাবলাম এই কয়দিন একটু ঘুরি ফিরি, ফ্যামিলি আর বন্ধুদের সময় দেই…ভিসা ইন্টারভিউ এর আগেই গোয়েথে আ আইনস এ ভর্তি হয়েছিলাম জার্মান ভাষায় কিছু ধারণা পাওয়ার জন্য।…সেখানে আবার একগাদা বন্ধু বানায়ে মায়া বাড়ালাম….অফার লেটার পাওয়ার আগেই স্টুডেনটেনভের্ক এ এপ্লাই করেছিলাম রুম এর জন্য ওরা বলেছিল ১ বছর এর আগে সম্ভব না…তো পরে আরো প্রাইভেট কিছু হোস্টেল এ যোগাযোগ করেছি কিন্তু সেখান থেকেও সেরকম কিছু উত্তর পাইনি…ভিসা ইন্টারভিউ এর আগে তাই একটা ইয়ুথ হোস্টেল এ ১২দিনের জন্য রুম বুক করে+আরো একটা হোটেলে তার পরের দিনগুলোর জন্য বুকিং দিয়ে সেই ডকুমেন্ট প্রিন্ট করে নিয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু ওরা দেখেই নাই এতকিছু…সেপ্টেম্বর এর শেষের দিকে ভাবলাম আর কয়েক দিনের মধ্যেই ভিসার উত্তর পেয়ে যাব কিন্তু খবর পেলাম না….আমার সব বুকিংগুলো এক এক করে ক্যানসেল করতে হলো কারণ এছাড়া না থাকা সত্ত্বেও পুরা দিনগুলোর ভাড়া দিতে হত….অক্টোবার এর ৫ তারিখে ইউনিভার্সিটি থেকে ওরিয়েন্টেসন এর প্রোগ্রাম সূচী পেলাম মেইলে..অস্থিরতা আরো বেড়ে গেল…বিসাগের তথ্য আর তপু ভাইয়ার সাজেশান নিয়ে গোয়েটিংগেন রাটহাউস এ মেইল করলাম…ওরা জানালো ওদের ডিসিশান দেয়া শেষ…পরদিনই সেই মেইল কপি পেস্ট করে ঢাকা এম্বেসিতে পাঠালাম…ওরা ৭ তারিখ মেইল করে বলল ৮ তারিখ এসে ভিসা নিয়ে যেতে…বাসায় ততক্ষণে মিষ্টি বিতরণ শুরু আর আমি বাসা না পাওয়ার টেনশান এ কাতর…৮ তারিখ ভিসা হাতে পেয়ে আরো কিছু বিসাগিয়ানদের সাথে দেখা হলো….সবাইকে শুভকামনা দিয়ে গাড়িতে উঠেই ফোনে জানলাম যে আল্লাহ পাকের দয়ায় বাবার টিকেট করা শেষ…১৪ তারিখ ভোর ৬টায় তুর্কিশ এয়ার এ করে আমি আমার চির পরিচিত পৃথিবী থেকে এক অচেনা অদ্ভুত পৃথিবীতে একা প্রবেশ করতে যাচ্ছি…৮-১৩ তারিখ রাত ১২টা পর্যন্ত একটা মুহুর্তের জন্যও আমি ঘুমানো তো দূরের কথা বসারও সুযোগ পেলাম না…এই আত্বীয় সেই বন্ধু বান্ধব…সেই বাগদত্ত সবাইকে সময় দিতে দিতে আমি অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে ঢুকলাম…সেই ঘোর এখনও কাটায় উঠতে পারি নাই….শপিং এর দায়িত্ব ছিল আম্মুর উপর…বাবা মাঝখান দিয়ে জয়েন করলেন…সব কেনাকাটা আর দেখা সাক্ষাত শেষ হলো ১৩ তারিখ রাত ১১টায়….বাবা বলল আমরা ২টার মধ্যে এয়ারপোর্ট এ চলে যাব…তখনও ব্যাগ গুছানো বাকি…রাত ১১.৩০ এ শুরু হলো ব্যাগ গুছানো…সারা বাড়ি অগোছালো করে যে বাবা মা ভাই, মামা চাচা সবাই মিলে যে যেভাবে পারেন ব্যাগ গুছালেন…একটা বড় লাগেজ এ জামা কাপড় জ্যাকেট, আর একটা ছোট ব্যাগ এ সব ইন্সট্যান্ট খাবার দাবার যার অর্ধেকই আমি রেখে দিয়ে আসছিলাম শেষমেষ…কিন্তু পরে এয়ারপোর্ট এ গিয়ে সবার ব্যাগ দেখে মনে হলো নিয়ে আসলেই ভালো করতাম…আর একটা ব্যাকপ্যাক এ আমার কোণাভাঙ্গা ল্যাপটপ নিয়ে আমি ধুপধাপ সবাইকে সালাম করে, আমার বাগদত্তকে এক নজর দেখে, বাবার কান্নামাখা উপদেশ আর মামনির বিস্ময়াভিভূত মুখের আধো আধো ভাষা “মামনি, ভালো থাকিস” শুনে ইমিগ্রেশন এর জন্য গেট এর দিকে দৌড়ালাম…পিছনে পিছনে আমার ছোটো ভাইটা দৌড়ে এসে বলল “বি এম ডব্লিউ এর রেপ্লিকা আর ব্যাগভর্তি চকলেট যেন মনে থাকে”….এতক্ষণে জমাট বাধা কষ্টগুলো হঠাত করে চোখের পানি হয়ে বের হয়ে আসলো…বললাম “প্রমিজ….দেখিস আমি পারব, তুই আব্বু আম্মুর খেয়াল রাখিস আর দুষ্টামি কম করিস” ….এরপর ইমিগ্রেশন এর আন্কেল আমাকে ২-১টা প্রশ্ন করে ছেড়ে দিলেন…আমি উনাকে বললাম “দোআ কইরেন আমার জন্য” …উনি খুব অবাক হওয়া একটা হাসি দিয়ে বললেন “অবশ্যই” ….বিসাগের কল্যানে একটা ফ্লাইট মেট পেয়ে গেছিলাম আগেই…আগে ভাইয়া বললেও এখন নাম ধরে ডাকি….সমবয়সী যেহেতু..এয়ারপোর্ট এ গিয়েই প্রথম পরিচয় তারপর দীর্ঘ পথের যাত্রার প্রস্তুতি নেয়া একসাথে…ওর নাম সবুজ আহাম্মেদ…তো আমি আর সবুজ আমরা ফাইনাল চেকিং এর পর একসাথে প্লেন এ উঠলাম…সীট আলাদা হওয়াতে একবারে ইস্তানবুল এয়ারপোর্ট এ নেমে দেখা হলো…তুর্কিশ এয়ার এ অনেক বাঙালি রেগুলার যাতায়াত করেন বুঝলাম তাদের অদ্ভুত সব কাজকর্ম নির্দ্বিধায় করে ফেলার ভাব আর কেবিন ক্রুদের নির্লিপ্ততা দেখে…ইস্তানবুল এ ট্রানসিট ছিল ২.৫ ঘন্টার….এয়ারপোর্ট আর তুর্কিশদের চেহারা ভালো হলেও ভিতরে যে গলদ বুঝে ফেললাম…এখানে এসে আমি সবচে অনুভূতিহীন দেখেছি এই তুর্কিশদের..যাই হোক, ট্রানসিট এর ২.৫ ঘন্টা যখন আমি আর সবুজ ওয়াই-ফাই কানেক্ট করতে চেষ্টা মগ্ন তখন এক ভদ্রলোককে দেখলাম আরামে ম্যাকবুকে মেইল টাইপ করছেন…উনাকে গিয়ে বললাম “এক্সকিউজ মি, ক্যান ইউ প্লিজ হেল্প আস টু কানেক্ট দি ওয়াই-ফাই”….উনি বললেন “ওকে, ইউ নো, ইউ নিড টু গিভ দেম ১৩ ডলার্স ইফ ইউ ওয়ান্ট ইট, আই সাজেস্ট ইউ ইউস মাই ম্যাক, সেন্ড হোয়াটএভার মেসেজ ইউ ওয়ান্ট টু বাট ডু নট ওয়েস্ট ইওর মানি”…উনার এই মহানুভবতায় আপ্লুত হয়ে আমরা উনাকে আমাদের সাথে জয়েন করতে বললাম এবং আমাদের দেশ, পড়তে আসা এসব নিয়ে পুরা ২ ঘন্টা গল্প করলাম…জানলাম উনি ক্যানাডিয়ান, নাম রিচার্ড…পেশায় অভিনেতা এবং সাহিত্যে ডবল মাস্টার্স করেছেন….আমাদেরকে বললেন ক্যানাডাতে গিয়ে ঘুরে আসতে আমরাও উনাকে বাংলাদেশ সফরের নিমন্ত্রণ দিলাম..আমাদের মত ছোটো বাচ্চারা এতদূরে বাবা মাকে ছেড়ে একা যাচ্ছে দেখে উনি খুবই রোমাঞ্চকর ফিল করলেন….যদি একবার বয়স জানতেন তাহলে হয়ত এই ফিলটা থাকত না কারণ ইউরোপ আমেরিকাতে বাচ্চারা ১৬-১৭ বছরেই ঘর থেকে বের হয়ে যায় নিজের লাইফ সেট করতে আর আমরা তো সেই হিসেবে বুড়া ভাম ….এরপর সবুজের ডুসেলডর্ফ এর প্লেন এর সময় হলো আর আমার হানোভার এর….২ ফ্লাইট মেট বিদায় নিলাম…এবার একা যেতে হবে….

হানোভার এর প্লেন ভর্তি সবখানে জার্মান….প্লেন ছাড়ার কিছুক্ষণ পর আমার সীট এর নিচে তাকিয়ে দেখি সেই অসাধারণ কিউট জার্মান বাবু উকি মারতেসে আর চোখ টিপ দিয়ে হাসতেসে…এই বাচ্চাকে আমি চেক ইন কাউন্টার এ লাইন এ যখন দাড়ানো ছিলাম তখন দেখি ফ্লোর মুছতেসে চুল দিয়ে…প্লেন এ উঠেও তার দুষ্টামির শেষ নাই… আমার ভাইটার কথা মনে করে আবার চোখে পানি চলে আসল…পাশের সীট এর মহিলা আমাকে অনেকক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করছিলেন…এইবার আমাকে কান্না কান্না দেখে বললেন “ডোন্ট ওরি, আর ইউ ট্রাভেলিং টু হানোভার ফর দা ফার্স্ট টাইম”…আমি বললাম ইয়াপ… তিনি আমাকে অভয় দিয়ে বললেন একদম চিন্তা কর না…এখানে সবাই খুবই হেল্পফুল…আর আমি পড়তে যাচ্ছি শুনে খুশি হয়ে বললেন দেখবে জার্মানি কত্ত ভাল্লাগবে তোমার….এই মহিলাই পরে এক আন্কেলকে দিয়ে আমার ব্যাগ গুলা ক্যারি করতে হেল্প করেছিলেন…উনার নাম ইলাই…হয়ত কোনদিন ঘুরতে ঘুরতে দেখা হবে আবার…

এয়ারপোর্ট এ আমাকে রিসিভ করতে এসেছিলেন আরো ২ভাই …রায়হান ভাইয়া আর হিমন ভাইয়া…তাদের সহযোগিতায় জার্মানিতে আমার প্রথম ট্রেন ভ্রমণ হানোভার থেকে গোয়েটিংগেন সম্পন্ন হলো রাত ৮টায়…একদম শেষ সময়ে একটা ইয়ুথ হোস্টেল বুকিং দিয়েছিলাম ইমার্জেন্সির জন্য কিন্তু সেটা আমার শহর থেকে ৪০ কি.মি. দুরে হওয়াতে বাবা বিভিন্ন জায়গায় খোজ খবর করে এক ভাইয়াকে বের করেছিলেন এইখানে আমার ইউনিভার্সিটিতেই যিনি পিএইচডি করতেসেন…অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভাইয়ার আমাকে ট্রেন স্টেশন থেকে তাঁর বাসায় উঠাতে হয় এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে এখানে থাকার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়….এখানে এসে দেখলাম ভাবি অসুস্থ…নবাগত অতিথি মাকে জ্বালাতন প্রক্রিয়া এখন থেকেই শুরু করে দিছে বুঝলাম…ভাইয়ার টেনশান আর ঝামেলার ব্যাপারটাও বুঝলাম…কিন্তু আমিও তো নিরুপায়…তো এই ভাইয়া আমাকে থাকা, খাওয়া থেকে শুরু করে এখানকার বাঙালি কমিউনিটির সাথে পরিচয় করানো সবই করলেন…আজকে এই বাসায় আমার ১৯ দিন পূর্ণ হলো….এখানে রুম পাওয়া এতই ঝামেলার যে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করেও লাভ হচ্ছিল না…অবশেষে এতদিন পর আমার সেই ২ মাস আগে এক প্রাইভেট হোস্টেল এ এপ্লাই করার সুবাদে+এখানে ভাইয়ার বিভিন্নভাবে চেষ্টার ফসল হিসেবে একটা রুম এর ব্যবস্থা করা গেল….নভেম্বর এর ১ তারিখ থেকে কন্ট্রাক্ট করলেও আমি যাচ্ছি কালকে কারণ আমার রুম এ যেই আপু থাকতেন তিনি আজকে রুমটা ছেড়ে দিচ্ছেন…

কালকে আমি এই বাসা থেকে চলে যাচ্ছি…ভাইয়া ভাবি এতদিন মুখ বুঝে কষ্ট করার সওয়াব নিশ্চয় আল্লাহ পাক তাঁদের দিবেন…এখানে আসার পর অনেক কিছু বুঝতে শিখেছি, অনেক কিছু দেখেছি….মানুষের উদারতা আর সংকীর্ণতা…তাদের কষ্ট আর প্রাপ্তি…সব কিছুই খুব বেশি চাক্ষুস এখানে…কেউ কিছু গোপন করতে চাইলেও এখানে যেন কিছুই গোপন না…সবাই সব জানে…সবাই সব বুঝে…কেউ জেনেও জানে না আর কেউ বুঝেও না বুঝার ভাব ধরে থাকে…আর এখানে সবাই একা..জার্মান, তুর্কিশ, ভারতীয়, বাঙালি সবাই একা….যদিও মানুস মাত্রই একা কিন্তু এখানে সবার একাকিত্বটা একটু বেশিই চোখে লাগে….অবশ্য এখানে সবাই ভালোও…সবাই সবার মত ভালো…যারা আসবেন, নিজেকে ভালো রাখার আর ভালো থাকার অনুপ্রেরণা নিয়ে আসবেন… সবার জন্য আমার পক্ষ থেকে অনেক অনেক দোয়া আর শুভকামনা।

পুনশ্চ: এখানে এসেই একটা সিম কিনবেন যেন দেশে কথা বলতে পারেন…আমি লাইকা নিয়েছি ..এটা দিয়ে লাইকা টু লাইকা ৫০০ মিনিট .ফ্রি কথা বলতে পারবেন আর ইউরোপ এর যেকোনো দেশ থেকে বাংলাদেশ এ ৩ সেন্ট পার মিনিট কথা বলতে পারবেন।
ব্যাঙ্ক, ইউনিভার্সিটি ভর্তি, হেলথ ইন্সুরেন্স আর সিটি অফিসে রেজিস্ট্রেসন এর জন্য এখানের এড্রেস লাগবে, যারা রুম ম্যানেজ করতে পারেন নাই তারা নিজ নিজ শহরে কোনো ভাই অথবা আপুর এড্রেস দিয়ে হেল্প করতে বলবেন…আর এসব ব্যাপারে বাঙালিদের চেয়ে অন্য যেকোনো দেশের মানুষ থেকে যে সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি সেটা মাথায় রাখবেন…আমি মেয়ে দেখে অনেক সুবিধা পেয়েছি যেগুলি হয়ত ভাইয়ারা পাবেন না…কাজেই এসব ব্যাপার মাথায় রাখবেন….চেষ্টা করবেন বাঙালি কমিউনিটির বাইরে ফ্রেন্ড বেশি বানাতে কারণ তাহলে একটা ভ্যারিয়েশান পাবেন সেই সাথে আপনার ভাষাগত দক্ষতাও বাড়বে….বাঙালিদের সাথে বেশি মিশলে ওই বাক্স এর মধ্যেই আবার আটকা পড়বেন যেটা আপনাকে ভবিষ্যতে একা চলাফেরা করতে সমস্যার মধ্যে ফেলবে।
এখানে গরম পানিটা খালি খাবেন না কারণ এটা কেমিকাল দিয়ে গরম করা হয় বলে শুনেছি…কাজেই ঠান্ডা পানি ফুটিয়ে খাওয়াই ভালো।
ব্যান্ক, হেলথ ইন্সুরেন্স এর কার্ড সাথে সাথে পাবেন না….বরং বহুতদিন অপেক্ষা করতে হবে কাজেই কিছুদিন চলার মত টাকা সাথে নিয়ে আসবেন….মোটামুটি সব ইউনিভার্সিটিই টিউশন ফ্রি কিন্তু সেমেস্টার ফী দিতে হয় আশা করি সবাই জানেন…তাই এসব কাজের জন্য টাকা নিয়ে আশাই ভালো …যদিও সেমেস্টার ফী ব্যান্ক ট্রান্সফার এর মাধ্যমেই দিতে হয়….সেটা পরিচিত কাউকে বলে ম্যানেজ করে নিবেন।
অরিজিনাল সার্টিফিকেট আর ল্যাপটপ (যদি থাকে) নিয়ে আসতে ভুলবেন না…কারণ এখানের ল্যাপটপ বিশ্বসেরা হলেও সবকিসু জার্মান ইন্সট্রাকটেড….যদি ভাষাটা ভালমত না পারেন তাহলে সমস্যায় পড়তে পারেন আর এসেই এতগুলা টাকা দিয়ে ল্যাপটপ কেনার মানে হয় না….তাই দেশেরটাই নিয়ে আসতে পারেন…আমার ইউনিভার্সিটিতে আমি ফ্রি ডেস্কটপ পেয়েছি কিন্তু ল্যাপটপ পাইনি তাই আমার এই কোণাভাঙ্গা ল্যাপটপ এত্ত কষ্ট করে নিয়ে এসেছি…বিশ্বাস করেন, আমার কষ্ট সার্থক।

মোবাইল আর পেন ড্রাইভ এগুলিও দেশ থেকেই আনতে পারেন যদি টাকা খরচ করার ইচ্ছা না থাকে শুরুতেই…পরে লাগলে কিনে নিবেন…আমার আইনল নভো যখন এত্ত ভালো সার্ভিস দিচ্ছে, তখন দুনিয়ার যেকোনো ফোনই দিবে…কাজেই নিজের হাত এর ফোনটাও নিয়ে আইসেন…কারণ ওটাতে আপনি আপনার প্রিয় সব মানুষের কন্টাক্ট নম্বর পাবেন যেগুলি ফোন না নিয়ে আসলে পরে আর মনে নাও থাকতে পারে কাজের চাপে…এটা অবশ্য লিখেও আনতে পারেন…১টার বেশি ফোন না আনাই ভালো।
প্রয়োজনীয় সব অসুধ নিয়ে আসবেন….স্টুডেন্ট ভিসাতে যারা আসে তাদের সেভাবে চেকও করে না কিছু …তাই কারো মামনির যদি শুটকি কিম্বা আমের আচার এসব খাবার দাবার দেয়ার ইচ্ছা থাকে নির্দ্বিধায় নিয়ে আসবেন..আমার মত বোকামি করবেন না আশা করি….বেশি কিন্তু আনবেন না আবার।
আর জামা কাপড় যা লাগবে নিজে বুঝে আনবেন…অহেতুক জামা কাপড় নিয়ে ব্যাগ বিশাল করার মানে হয় না আবার প্রয়োজনীয় জামা কাপড় ফেলে আসারও মানে নাই. …জুতা দেশ থেকে একটু শক্ত পোক্ত দেখে বুঝে কিনে নিলেই হবে….এখানে নিয়ে আসলেই যে সব জুতা নষ্ট হয়ে যাবে এগুলা ভুয়া কথা….দেশের জিনিসের যে কি মর্ম আর দেশী জিনিস যে কত্ত কত্ত ভালো তা এখানে আসলে টের পাবেন.. আমার পলয়েল এর জ্যাকেট আর জুতা এখনও সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে কোনো ঝামেলা ছাড়াই…..জামা কাপড় বেশি ধুবেন না কারণ নষ্ট হয়ে যাবে….টর্চ/ল্যাম্প যা পারেন নিয়ে আসবেন, কফি, গুড়া দুধ এগুলাও আনতে পারেন…আমি এই ২০ দিন সেরকম কোনো টাকা খরচ করি নাই কারণ আমার মা বাবার চেষ্টায় মোটামুটি সব্কিসুই ব্যাগ এ পাইসি….আর আল্লাহ পাকের দয়াতে ভাইয়ার বাসায় থাকার জন্য কিছু টাকা বেঁচে গেসে যেটা আবার ভবিষ্যতে যার আমানত তাকে ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করব….টাকা বাঁচলে আপনি অনেক অপশন পাবেন একটা হোটেল কিম্বা বাসা ভাড়া করে থাকার….নাহলে বিপদে পরবেন কারণ এখানে থাকাটা হয়েই যাবে কিন্তু আপনার ঠিকানা হবে না বাসা ছাড়া, তো তখন আপনার ভার্সিটিতে ভর্তি, হেলথ ইন্সুরেন্স, ব্যান্ক এগুলাতে অসুবিধা হবে যদি না কেউ আপনাকে দয়াপরবশ তার ঠিকানা ব্যবহারের অনুমতি দেন….আর টাকা হাতে থাকলে সাহস পাবেন…লাগলে যেকোনো বেশি ভাড়ার বাসাতেও উঠে যাইতে পারবেন অন্তত কিছুদিনের জন্য…আর সবশেষে এটাই বলব যে যেখানেই থাকেন, যত প্লান প্রোগ্রামই করেন, যত ব্যস্ত আর বিরক্ত কিম্বা আনন্দেই থাকেন …প্রিয় মানুষ গুলার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করবেন না….সেজন্য যদি পকেটের ইউরো সব যায় তাও যাক….মনে রাখবেন আপনি আসবেন তাদের প্রতিনিধি, দেশের প্রতিনিধি হয়ে…কাজেই এখানে এসে এমন কিছু করবেন না কিম্বা বলবেন না যা আপনার, আপনার পরিবারের আর আপনার দেশের জন্য লজ্জাজনক…আর স্রষ্টার উপর সবসময় দৃঢ় বিশ্বাস রাখবেন…অনেক সময় হয়ত অনেক কিছু অনেক কষ্টের হবে, অনেক কিছু সামাল দিতে পারবেন না, অনেক কিছু বুঝতে কষ্ট হবে কিম্বা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাবেন, তখন শুধু মা-বাবা, ভাই-বোন আর সব প্রিয় মানুষ গুলোর কথা মনে করবেন আর মনে মনে স্রষ্টার কাছে সাহায্য চাইবেন…দেখবেন সবকিছু সহজ হয়ে যাবে… মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করবেন, যে যেমনি হোক না কেন…কোনকিছু না বুঝলে সহায্য নিতে লজ্জা করবেন না…দেশ থেকে আসার সময় নিজের সাথে নিজে শপথ করে আসবেন যে উদারতা আর বন্ধুত্বপূর্ণতা দিয়ে যেন সবাইকে জয় করতে পারেন।

আর বিসাগকে সবসময় নিজের গাইডবুক হিসেবে মেনে চলবেন…এখানে সবাই মোটামুটি সব প্রসেসিং এর ব্যাপারেই লিখেছেন… সেইসব আর্টিকেলগুলো ভালো করে পড়বেন, আমার লেখাটা আমার নিজের কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ারিং ছাড়া আর কিছুই না কারণ আমি সেভাবে কখনই লিখতে পারব না যেভাবে বিসাগের বড় ভাইয়া/আপুরা লিখেছেন। জিনিসটা শুধু একটা গল্প হিসেবে পড়লেই বেশি খুশি হব….ও হ্যা (উফ, চন্দ্রবিন্দু দেয়া যাইতেসে না আবার) তুর্কিশ এয়ার এর খাবার খাইতে ভালোই কিন্তু খাওয়ার পর বমি হওয়ার সম্ভাবনাও মাথায় রাইখেন…আমি যে প্লেন এ আসছি সেটা বাঙালিদের বমিতে ভরপুর ছিল….ব্যাগ থাকলেও অনেকেই ব্যাগ খুঁজেই পান নাই মনে হইল…টিকিট এর দাম ৬০ হাজার রাখসিলো আমার ট্রাভেল এজেন্সী “হলিডে টুরিজ্যম” …পুরান পল্টন এ এটা….এখানের রাকিব সাহেব খুবই ভদ্রলোক…১৪ তারিখ সব এয়ার এর টিকিট এর দাম বেশি থাকায় ৬০ হাজার দেয়া লাগসে … তাই টিকিটের দাম এবং আপনার সম্ভাব্য যাত্রার তারিখ মাথায় রাখবেন।
এখানে স্টুডেন্ট কার্ডটা ব্যান্ক কার্ড এর মতই…টাকা রিচার্জ করে নিলে ক্যাফেতে ডিসকাউন্ট এ খতে পারবেন, প্রিন্টিং আর কপিইং এর জন্য টাকা ভরতে পারবেন…আমার ইউনিভার্সিটিতে প্রিন্ট আর কপি করতে পার পেজ ৪ সেন্ট করে দিতে হয়…কিন্তু স্ক্যানিং আবার ফ্রি…..বাকি ইউনিভার্সিটিগুলার কথা জানি না…এই কার্ড আপনার বাস আর ট্রেন এর টিকিট হিসেবেও কাজ করবে, লাইব্রেরি কার্ড ও এটাই..কাজেই এটাকে যত্ন করে সংরক্ষণ করবেন….সেমেস্টার শেষ হয়ে গেলে নির্দিষ্ট সময়ে এটার ডেট চেঞ্জ করে নতুন সেমেস্টার এর ডেট এনলিস্ট করে নিবেন।
আর কিছু লিখব না ….কারণ বাবা স্কাইপ এ ফোন দিচ্ছেন…..সবাই ভালো থাকবেন, খুব খুব ভালো….আর আমার জন্য দোয়া করবেন।
কৃতজ্ঞতা: আদনান ভাইয়া, আরেফিন ভাইয়া আর আসাদ ভাইয়া…আর বিসাগের বাকি সব ভাইয়া-আপু।

Print Friendly, PDF & Email