জার্মানির ডায়রি-৭: স্বাধীনতা

 

আগের পর্বঃ

জার্মানির ডায়রি ১:অপমান541359_10151511971629555_1383708461_n[1]

জার্মানির ডায়রি-২: স্বপ্ন-ভেঙে বাস্তবে

জার্মানির ডায়রি-৩: প্রথম আলো

জার্মানির ডায়রি-৪: প্রথম প্রেম

জার্মানির ডায়রি-৫: স্পোর্টস কার

জার্মানির ডায়রি-৬: মুক্তির রঙ

জার্মানির ডায়রি-৭: স্বাধীনতা

মার্চ মাসের শেষে এত তুষারপাত একদম স্বাভাবিক নয়, সকালে ঘর থেকে বের হয়েই মেজাজটা বিগড়ে গেল। এপ্রিল মাসের ২১ তারিখ আমাদের স্টুটগারট ক্রিকেট ঈগলসের বুন্দেসলিগা ২০১৩ র প্রথম খেলা, এখনো পর্যন্ত একটাও প্র্যাকটিস সেশন কল করা যায়নি। খুব আশা ছিল এই উইক-এন্ডে প্রথম সেশন শুরু হবে, যেই হারে বরফ পড়ছে, মনে হচ্ছে কোন প্র্যাকটিস ছাড়াই লিগের প্রথম খেলায় নামতে হবে । একদম যা তা অবস্থা। শুধু এহা আর রিহার মুখ-ভর্তি হাসি। তারা আজকেও আবার কিন্ডারগার্টেন যাবার পথে তাদের মার নিষেধ অমান্য করে একগাদা বরফ মুখে দিতে দিতে যাবে।

সকালে অফিসের জন্য বের হবার সময় গাড়ির উইন্ড-শিল্ড থেকে ৫ ইঞ্চি বরফ পরিষ্কার করতে হল বিশ মিনিট ধরে, একটা মিটিং ছিল, সেটার দেরি হয়ে যাচ্ছে। পাশের বাড়ির আনুমানিক ৭০ বছরের রিটায়ার্ড ভদ্রমহিলাকে দেখলাম (তাঁর বয়স অবশ্য আরও বেশী হলেও আমি অবাক হব না, এখানে ৮০ বছরের বুড়োকেও দেখেছি জগিং করতে যায় প্রতিদিন) তাঁর বাসার দরজার সামনের বরফ পরিষ্কার করছিলেন, তাকেও খুব আনন্দিত মনে হল না। গাড়ির কাঁচ পরিষ্কার করতে করতে মাঝে মাঝে তাঁর তুষারের স্তূপ সরানোর ব্যাপারটা খেয়াল করলাম। সামান্য বরফ পরিষ্কার করার কাজের মধ্যেও তাঁর একটা দক্ষ পরিকল্পনার ছাপ আছে। প্রথমে তিনি রাস্তার উপরের বাইরের দিককার বরফগুলি কুড়িয়ে নিলেন, বাড়ির একটা কোনায় যেখানে কারো প্রবেশাধিকার নেই এমন জায়গায় স্তূপ আকারে জমালেন। সারারাত ধরে তুষারপাত হলে নিচের দিকের প্রথম স্তরটা একটা সময় জমে শক্ত হয়ে যায়। উপরের তুলোর স্তূপের মতন স্তরটা সরানোর পর নিচের জমে থাকা বরফকে খুঁড়ে আঁচড়ে ভেঙে দেয়া হল। একেবারে শেষ অংশের আগেই আমি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম, জানি এরপর বুড়ি কি করবে। সব পরিষ্কার হলে পরে উপরে বরফ গলে যাবার এক ধরনের স্পেশাল লবণ ছিটিয়ে দেবেন। সকাল ৮ টা বাজার আগেই ঘরের দরজার সামনের বরফ পরিষ্কার করা শেষ হবে।554545_10151511849319555_1796943110_n[1]

এই দেশে শীতকালে সময় সময় এত বরফ পড়ে, প্রতিটা রাস্তা, গাড়ী, বাড়ী, ফুটবল খেলার মাঠ থেকে শুরু করে সমস্ত দেশটা সাদা একটা চাদরে ঢেকে যায়। হলফ করে বলতে পারি এর থেকে চোখ ঝলসানো সুন্দর দৃশ্য আমি আর দেখিনি। তবে এই সৌন্দর্যের ব্যবহারিক একটা বড় সমস্যা আছে। এই বিপুল পরিমাণ বরফের স্তূপ সরাতে না পারলে গাড়ী চালানো তো দূরের কথা, আছাড় না খেয়ে রাস্তায় ঠিকমতো হাটাও অসাধ্য। তবে মজার কথা হল, এই প্রতিকূল শীতকালের পিচ্ছিল ফুটপাতে হাঁটা আমাদের দেশের প্রধান সড়কে হাঁটার চেয়েও সহজ। এই অসাধ্য সম্ভব হল সামান্য একটা আইনের দ্বারা। কারো বাসার সামনে যদি কেউ হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়, তাঁর যাবতীয় ক্ষয়ক্ষতির দায়ভার থাকবে সেই বাড়ির মালিক এবং যারা সেখানে বসবাস করে তাদের। যেসব রাস্তা প্রাইভেট বাসার সামনে পড়ছে না, সেইসব রাস্তা আর ফুটপাত পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব সরকারের। এবং এই দেশের মানুষ খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে আলসেমি না করে প্রথমেই বাসার সামনের রাস্তা পরিষ্কার করে রাখে, কেউ সেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার আগেই।

রাস্তায় একটু জাম ছিল, অফিস আওয়ারে এটা স্বাভাবিক। এখানে অবশ্য পাঁচ মিনিট ট্র্যাফিক থাকলেও সবাই সেটা নিয়ে খাবার টেবিলে আলোচনা করে। শেষমেশ একটু দেরি করেই মিটিং–এ ঢুকলাম। ঘণ্টা দুয়েকের মিটিংটা শেষ করে ক্যান্টিনে চলে গেলাম একটা রুটি কিনতে। পেটটা চোঁ চোঁ করছে, সকালের নাস্তা করার সময় হয়নি এখনো। মার্সিডিজ বেঞ্জের বিশালতম এই ডিজাইন ও রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের ভেতরে প্রায় হাজার-খানেক বসার বন্দোবস্তসহ বেশ বড়সড় একটা ক্যান্টিন, সেখানে নাস্তার সময় কয়েক হাজার ইঞ্জিনিয়ার খেতে আসে। এখানে সবার নিজের নাস্তা নিজেকেই তুলে নিতে হয়, কফিটা ঢেলে নিয়ে চিনি দুধ মিশিয়ে নিতে হয়। প্রায় সব দিনকার মতনই দাম দিতে গিয়ে একটা লাইনে পড়লাম, আমার সামনে আরও ১০ জন অপেক্ষায়। ক্যাশের সামনে লাইনের প্রথমজন দাম দিতে গিয়ে মানিব্যাগ খুঁজে পাচ্ছেন না, সবগুলো পকেট হাতড়ে শেষ করে এখন কাঁধের ব্যাগটা আবার ভালো করে দেখছেন। সব মিলিয়ে ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ডের একটা দেরি হল, মানিব্যাগটা খুঁজে পেয়েই দাম দিতে দিতে সে পেছনে ফিরে অপেক্ষারত সবার কাছে একবার দুঃখ প্রকাশ করল। এই পুরো সময়টার মধ্যে লাইনে দাঁড়ানো ১০ জনের একজনকেও দেখলাম না একটু বিরক্তি প্রকাশ করতে। এই লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন নামকরা ইঞ্জিনিয়ার যারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গাড়ীর ডিজাইন করেন, কিংবা প্রজেক্ট ম্যানেজার যারা দিনে মিলিয়ন ইউরোর নিচে কোন হিসেব কষেন না। এরা সবাই অনেক ব্যস্ত মানুষজন, তাদের কয়েক সেকেন্ডেরও মূল্য আছে, কিন্তু এতটুকু সামান্য ভদ্রতা তাদের রক্তে মিশে আছে।

এই ব্যাপারগুলো অনেক বছর এই দেশে থেকে গা সওয়া হয়ে গেছে, তারপরও আজকে ২৬শে মার্চের কথা ভেবে আবার কেন যেন অন্যভাবে খেয়াল করলাম। আজকে আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এই দিনে অনেক শত বছরের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শোষণ শেষ করে, পাকিস্তানীদের অবহেলা এবং অবমাননার সমাপ্তি টেনে আমরা ঘোষণা দিয়েছি স্বাধীনতার। সেদিন আমার জার্মান কলিগকে শাহবাগের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলছিলাম মাত্র নয় মাসের মধ্যে ৩০ লক্ষ মানুষের প্রাণ নেবার ইতিহাস, প্রায় কয়েকশো হাজার শিশু থেকে শুরু করে মা-বোনদের ধর্ষণ করার ইতিহাস এই পৃথিবীতে আর কখনো ঘটেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারও এত অল্প সময়ে এত মানুষ হত্যা করতে পারে নি। এই অবিশ্বাস্য পাশবিক গণহত্যার পর যে স্বাধীনতা আমরা আজ পেয়েছি, তাঁর মূল্য কি আমরা আসলে দিতে জানি?

সকালবেলা মিটিঙের এক ফাঁকে ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম আমরা আসলে স্বাধীনতার মানে কি বুঝি, সবাইকে অনুরোধ করেছি তাদের মতামতটা দিতে তাদের কাছে স্বাধীনতা দিবসের কি মানে, আর কি চাওয়া তাঁর একটা ফিরিস্তি দিতে – একটা লাইন হলেও। যেমনটি আশা করেছিলাম, লাইকের সংখ্যা ৩০ টি, কমেন্ট ২টি। এত সময় কোথায় আবার স্বাধীনতা ফাধিনতা নিয়ে মন্তব্য দেবার বা একটা লেখা দেবার। ২৬শে মার্চ বছরের অন্যান্য আর অনেক সাধারণ দিনের মতনই শুধুমাত্রই একটা দিন। সবাই আমরা এইদিনে একবার ফেইসবুকে প্রোফাইল পিকচার কাল করব, তারপর একবার লাল টকটকে পতাকার ছবি দিব। দিন শেষে গুনব – কে কতটা লাইক পেলাম।

ফেইসবুকে বুয়েটের একটা গ্রুপে আছে, সেখানে ছাত্র শিক্ষক সহ ৬৫০০ সদস্য। সাধারণ ছাত্র ছাত্রীদের উদ্যোগে মুক্তির রঙ নামে মুক্তিযুদ্ধের উপরে চেতনামূলক একটা আলপনার প্রজেক্ট নেয়া হল কয়েকদিন আগে, সেখানে মাত্র কয়েক লক্ষ টাকার বাজেট। শেষ মুহূর্তে ইভেন্ট পেজে দেখলাম টাকা উঠেছে মাত্র ৪০ হাজার। বুয়েটের নাম ভাঙ্গিয়ে যেসব টিচাররা সারাদিন অন্য প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ে থাকেন, লক্ষ লক্ষ বেআইনি টাকা গুনেন মাস শেষে তাঁরাও দেখলাম এই ব্যপারে সবাই চুপ। একজন দেখলাম লিখেছে এইসব আলপনা দিয়ে নাকি কিচ্ছু হবে না, যতোসব সময় নষ্ট! সম্প্রতি বুয়েটে দেখলাম ইবনে-সিনাসহ জামাতে ইসলামির মালিকাধীনদের সাথে কি সব চুক্তিপত্র হয়েছে, সেই পোস্টে আবার অনেক লাইক।  এইসব নব্য রাজাকাররা পাকিস্তানে না গিয়ে মেধাবী ছাত্রের নাম ভেঙে বুয়েটে বাংলাদেশ সরকারের পয়সায় বিনেমুল্যে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে আর অসুখে পড়লে ইবনে সিনায় গিয়ে রাজাকারের পয়সায় হাত পেতে সুবিধা নেয়। কি লজ্জা, কি লজ্জা!

Muktir Gan alpona

মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের স্বাধীনতা অনেক দ্রুত পাওয়া হয়ে গেছে, এত দ্রুত এত বেশী মানুষের প্রাণ দেওয়া, এত মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর ঘটনা, আমাদের বুঝে ওঠার সময়টুকু পর্যন্ত দেয়নি, স্বাধীনতা আসলে কত বড় প্রাপ্তি। পৃথিবীর অনেক জাতি স্বাধীনতার জন্য অনেক অনেক বছর ধরে সংগ্রাম করেছে, তারা বিপ্লবের আগুনে জ্বলে পুড়ে খাঁটি হয়ে শিখেছে স্বাধীনতা মানে আসলে দায়িত্ববোধ নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া। স্বাধীনতা মানে শুধু কয়েকটি লাইক আর প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জ করা নয়, স্বাধীনতা মানে প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে নিজের বাড়ির সামনের জঞ্জাল নিজহাতে পরিষ্কার করা, স্বাধীনতা মানে অন্যকে তাঁর মতামত দেবার সুযোগ দেয়া, স্বাধীনতা মানে কাউকে অন্যায়ভাবে দাবিয়ে রাখা হলে তার প্রতিবাদ জানান, প্রতিদিন ঘুমাতে যাবার আগে আয়নার সামনে নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজকে প্রশ্ন করা “আজকে সারাদিনে আমি শুধুমাত্র দেশের জন্য কতগুলো মুহূর্ত ব্যয় করলাম? যেই মানুষগুলো আমাকে স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ করে দিল, মুক্ত চিন্তার অধিকার আদায় করে দিল তাদের জীবন তুচ্ছ করে, সেই অধিকার ও তাঁর চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখতে,  আমি, আজ সারাটা দিনে, ঠিক কি কি করলাম?”

২৬শে মার্চ, ২০১৩।
আদনান সাদেক, ২০১৩

ছবিঃ মুক্তির রঙ

চলবে…

অন্যান্য পর্ব ও লেখকের কথা 

Print Friendly, PDF & Email