জার্মানির ডায়রি-৫ স্পোর্টস কার

 

সাইকেলটা চালিয়ে এলবে নদীর পার ধরে চলে এসেছিলাম অনেকটা দূরে। ড্রেসডেন শহর আর দেখা যাচ্ছে না, দুই পাশে পাহাড় আর মাঝ দিয়ে বয়ে চলা এলবে, সাইকেলের জন্য আলাদা করে নদী ঘেঁষে করা পিচ ঢালা রাস্তা। আসে পাশের প্রকৃতি দেখতে মগ্ন ছিলাম, এমন সময় টায়ার ফাটার একটা তীব্র শব্দে চমকে উঠলাম। না, অন্য কিছু নয়? আমারই সবেধন নীলমণি ২০ ইউরোর সাইকেল থেকেই এসেছে শব্দটা। সস্তার তিন অবস্থা যাকে বলে আর কি। পেছনের চাকার টায়ার ফেটে একাকার, বাসা থেকে কম হলেও কুড়ি কিলোমিটার দূরে আমি তখন! প্রকৃতি প্রেম মাথায় উঠলো, এখন বাসায় ফিরি কি করে? এই পাহাড়ের মাঝে আমার সাইকেল কে ঠিক করবে!

পরবর্তী কয়েক মিনিট সাইকেল নিয়ে নদীর পাড়ে বসে ভাবছি আমার ভাঙ্গা জার্মান দিয়ে পাশ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাওয়া কাউকে থামিয়ে কিভাবে ব্যাখ্যা করব ব্যাপারটা। কেউ নিশ্চয়ই সাইকেল ঠিক করার যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘুরছে না, শেষমেশ ২০ কিলোমিটার হেঁটে বাড়ি ফিরতে হয় কিনা। প্রথম একদল মেয়েকে দেখে গম্ভীর হয়ে হাত উঁচিয়ে থামার ইশারা দিলাম, আমার হাত নাড়া দেখে তারা কি বুঝল কে জানে, খিলখিল হাসি দিয়ে সাঁ সাঁ করে পাশ কাটিয়ে চলে গেল, একজন আবার একটা ফ্লায়িং কিস ছুড়ে দিল। পরবর্তী ১৫ মিনিটে শেষ পর্যন্ত তিনজনকে থামালাম, আমার জার্মান শুনে একজন ভাঙ্গা ইংরেজিতে বলল, “ সরি, আমি চেক ভাষা বুঝতে পারি না”। (বলাই বাহুল্য চেকস্লাভাকিয়ার সীমান্ত সেখান থেকে আর মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে!)। আমার সমস্যা বুঝতে পেরে অবশ্য বলল তাদের কাছে টায়ার পাঙ্কচার ঠিক করার জিনিস নেই, আমাকে দোকান পর্যন্ত যেতে হবে। অগত্যা হাঁটা ধরলাম, পা চালিয়ে সন্ধ্যা হবার আগেই বাসায় পৌঁছাতে হবে।

যেখানে ভয় সেখানেই রাত নামে। এমনিতেই অনেকদূর সাইকেল চালিয়ে টায়ার্ড হয়ে ছিলাম, ফাটা টায়ারের সাইকেল টেনে হাঁটতে হাঁটতে খবর হয়ে গেল ঘন্টাখানেকের মধ্যে। এর মধ্যে সন্ধে হয়ে এলো, সূর্যের উত্তাপ চলে গেলেই এখানে ঠাণ্ডা পড়ে যায়। সাথে গরম জামাকাপড় নিয়ে আসা হয়নি। অনেকদূরে তখন দেখতে পাচ্ছি ড্রেসডেনের আলো, অতদুর পর্যন্ত যেতে পারব কিনা ভাবছিলাম। তখনও ট্রামে বাসে করে কোথায় কি করে যাওয়া যায়, এসব ভালো করে বুঝি না। অনেককে দেখেছি বাসে সাইকেল নিয়ে যায়, আমি এখনও ট্রাই করে দেখি নি। একসময় দূরে একটা বাস চোখে পড়ল, হেঁটে বাসায় যেতে পারব না, এর মধ্যে শীত শীত লাগছে। একটা বাসে উঠে পড়লে একটা না একটা উপায় নিশ্চয়ই হবে।

বাসে উঠে বসে আছি ২০ মিনিট হল, এখনো ছাড়ার কোন লক্ষণ নেই। রবিবার সন্ধ্যায় যা হয় আরকি, বাসগুলি ঘণ্টায় মাত্র একবার চলে। ড্রাইভার বেটা কি এক পত্রিকা পড়ছে মন দিয়ে, অস্বস্তিভরে খেয়াল করলাম সেখানে নগ্ন মেয়েদের ছবি। খুব ক্লান্তি সারা শরীরে, তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরা দরকার, কালকে আবার একটা এসাইনমেন্ট আছে।

কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল করি নি। একটা ঝাঁকুনি খেয়ে দেখলাম ড্রাইভার লোকটা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে কি যেন বলছে। বাসে আমি একা, এটাই কি শেষ স্টপ? ঘড়িতে খেয়াল করলাম রাত প্রায় সাড়ে নটা বাজে, তারমানে প্রায় দুই ঘণ্টা ঘুমিয়েছিলাম?
রবিবার রাতগুলিতে এখানে রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়, বাসস্টপের সাইন দেখে চিনতে পারলাম না কিছুই কোথায় আছি। মরিয়া হয়ে ড্রাইভারকেই আবার জানতে চাইলাম এই জায়গাটা কোথায়, এইবার যেন আর চেক থেকে এসেছি কিনা এই প্রশ্ন না করে এইজন্য ইংরেজিতেই জানতে চাইলাম। তাঁর কাছ থেকে ভাঙা ইংরেজিতে বুঝতে পারলাম আমি ড্রেসডেনের পাশের একটা শহর মাইসেনে চলে এসেছি, প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে, এবং আজকে রাতে আর কোন বাস নেই ড্রেসডেনে ফিরে যাবার।

রাত সাড়ে দশটার মতন বাজে। বাংলাদেশি পরিচিত ছেলেটির ফোন বন্ধ করা, নিশ্চয়ই রাতের শিফটে কাজে গেছে। আশেপাশে মানুষজন বলতে পাশে বসে একটা মাতাল গান গাইছিল, কিছুক্ষণ আগে খেয়াল করলাম সেই মাতালও নেই। এরমধ্যে একবার সাহস করে একটু দূরে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে গিয়ে ঠিকানা দিয়ে জানতে চাইলাম কত ভাড়া লাগতে পারে। ৫০ ইউরো ভাড়া শুনে পিলকি চমকে গেল, বলে কি! আমার সারা মাসের বাজার খরচই তো ৫০ ইউরো। ভোর সাড়ে পাঁচটায় দিনের প্রথম বাস, মন শক্ত করে বাসস্টপের বেঞ্চিতে বসে আছি ঘন্টাখানেক হল। দুই মুঠোয় শক্ত করে ফোনটা চেপে ধরে আছি, যদি কলব্যাক করে পরিচিত ছেলেটা!

তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমে আসছে, গায়ের টি-শার্ট দিয়ে আর শীত মানছে না। দুপুরে যখন সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছিলাম, তখন প্রায় পঁচিশ ডিগ্রী টেম্পারেচার ছিল, সাথে গরম কাপড় নিয়ে বের হব এটা মাথায়ই আসেনি। এখন মনে হচ্ছে তাপমাত্রা দশ বারতে কাছে নেমে এসেছে। পা দুটো গুটিয়ে বুকের কাছে এনে পাশ ফিরে বেঞ্চের উপর শুয়ে পড়লাম। কত সময় শুয়ে আছি কে জানে। যেন মনে পড়ল মা একবার বলেছিল, যদি কখনো বিপদে পড়িস, তাহলে আল্লাহ্‌কে স্মরণ করবি, দেখবি ঠিক বিপদ কেটে যাবে। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করি, মনে হল যেন অনেক দূরে মাকে দেখলাম।

“তুমি কোথায় এখন মা? আমাকে একটু জড়িয়ে ধর, আমার বড় ঠাণ্ডা লাগছে যে!”

একটা সময় মনে হল, আর ঠাণ্ডা লাগছে না, আমার গায়ে কে যেন একটা মোটা কাপড় জড়িয়ে দিয়েছে। অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, বাবা আমার পাশে।

মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “তুই যে এত বোকা সেটা আমি ভাবিনি, এই বিদেশ বিভুয়ে এমন শীতের রাতে কেউ বাস-স্টপে ঘুমায়? চল, এখুনি তোকে বাসায় দিয়ে আসি।”

“তুমি তো আমার বাসার ঠিকানা জান না, আমাকে পৌঁছে দেবে কি করে?”

বাবা আমার পকেটে লিখে রাখা কাগজটা বের করে দেখালেন। আমি কি একটা ঘোরের মধ্যে আছি? বাবাকে জার্মানদের মতন এত সাদা লাগছে কেন, বাবা জার্মানিতে কবে আসলেন সেটাও মনে করতে পারলাম না।

“এখন কয়টা বাজে বাবা?”

“রাত দুইটা!”

“সকাল সাড়ে পাঁচটার আগে তো কোন বাস নেই।”

বাবাকে সেটা শুনে একটুও চিন্তিত মনে হল না, বরং মুখে মৃদু একটা হাসি। আমাকে পাশে দাঁড়ানো গাড়িটা দেখিয়ে বললেন, “তাড়াতাড়ি চল, তোকে বাসায় দিয়ে আসি।”

“তুমি গাড়ি কিনলে কবে বাবা? তাও দেখে মনে হচ্ছে খুব দামি একটা গাড়ী, কেমন যেন স্পোর্টস কার স্পোর্টস কার ভাব!”

বাবা কোন কথা না বলে আমাকে অবলীলায় কাঁধে তুলে নিয়ে গাড়ীতে বসিয়ে দিলেন। গাড়ী স্টার্ট নিতে নিতে ইংরেজিতে ফিসফিস করে বললেন, ” আমার নাম ম্যাথিয়াস, আমি তোমার বাবা নই”।

অল্প কিছুদিন পরের কথা, ম্যাথিয়াসের স্পোর্টস কারে এবার সজ্ঞানে চড়ার অভিজ্ঞতা হল। ম্যাথিয়াস ভাল ইংরেজি বলে, মাইসেনে তাঁর একটা নিজের ছোট খাটো কোম্পানি আছে, গাড়ীর কি একটা পার্টস সাপ্লাই দেয়। দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ানো তাঁর নেশা, এখন পর্যন্ত অনেকগুলো দেশ তাঁর ঘুরে দেখা হয়েছে, সামনেও আরও অন্য দেশে যাবে এমন প্ল্যান। আমাদের দেশ নিয়ে ওঁর অনেক প্রশ্ন। যখন বললাম মায়ামির পরে পৃথিবীর সবচে দীর্ঘ বিচটি আমাদের দেশের কক্সবাজার, ও তখন খুব অবাক হয়। ও বলে, জার্মানরা খুব ভ্রমণ প্রিয় জাতি। বাংলাদেশ নিয়ে জার্মান মিডিয়ায় সে দেখেছে সেখানে প্রায়ই বন্যা হয়; অনেক গরীব মানুষ আর তাদের অসহায় অবস্থা দেখে একবার সে নিজেও রেডক্রসের মাধ্যমে সাহায্য দিয়েছে। কিন্তু সেই দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে কখনো কিছু তাঁর চোখে পড়ে নি। আমি ওঁকে বলি, তুমি অবশ্যই একবার বাংলাদেশে যাবে। দেখবে ছবির মতন সুন্দর একটা দেশ। আর আমাদের দেশের সবচে বড় সম্পদ মানুষের আতিথেয়তা আর আন্তরিকতা। সেখানে যদি তুমি কখনো বিপদে পড়, দেখবে মানুষ কেমন আপনজনের মতন তোমাকে সাহায্য করবে। ম্যাথিয়াস আমার কথা শুনে হাসে। আমি মনে মনে বলি, ঠিক তোমার মতন ভাল মানুষ।

জার্মানিতে আসার পর খেয়াল করেছি চুল কাটার অনেক খরচ, বেশিরভাগ ছেলে পেলে খরচ বাঁচানোর জন্য বড় বড় চুল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আমিও খরচ বাঁচানোর পাশাপাশি আপাতত চুল বড় রাখছি, ম্যাথিয়াসের দেখা দেখি। ওঁ খুব ব্যস্ত মানুষ – কালে ভদ্রে আমাদের দেখা হয়েছে। আমি প্রতিবার সুতীব্র আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করি কবে আবার ওঁর সাথে দেখা হবে। ওঁর বাজ পাখির মতন দেখতে গাড়ীটা যখন গুমগুম শব্দ করে রাজপথে চলে, আশপাশ থেকে অনেকগুলো চকচকে ঈর্ষান্বিত দৃষ্টি অনুভব করি। কোন কোন গাড়ীর যে উপরের ছাদটাও খুলে দেওয়া যায়, এটা ম্যাথিয়াসের গাড়ীতে না চড়ার আগে কোনদিন জানতাম না। ওঁ যখন ছাদ খুলে দিয়ে গাড়ী চালায়, মাঝে মাঝে আড়চোখে ওঁর দিকে তাকাই। দুরন্ত বাতাসে ম্যাথিয়াসের লম্বা সোনালী চুলগুলি উড়তে থাকে, গাঢ় কাল রঙের সানগ্লাসের পেছনে একজোড়া আনন্দময় চোখ। ম্যাথিয়াস আশে পাশের শোঁ শোঁ ছুটে যাওয়া গাড়ীর শব্দ উপেক্ষা করে হাই ভলিউমে চলা ব্রায়ান এডামসের Heaven গানটার সাথে হেঁড়ে গলায় সুর মেলায়। আমার মনে হতে থাকে হলিউডের ছবির কোন নায়কের পাশে বসে আছি। ছোট বেলায় কেউ যদি জানতে চাইত বড় হয়ে কি হবে? সেই উত্তরে বাবার শেখানো কথায় বলতাম, পাইলট হব। ইদানীং ভাবি আবার যদি কেউ জানতে চাইত, নির্দ্বিধায় বলতাম – বড় হয়ে ম্যাথিয়াসের মতন একটা ছাদ-খোলা স্পোর্টস কার কিনব। আমার লম্বা চুলগুলো তখন প্রবল বাতাসে চোখে মুখে আছড়ে পড়তে থাকবে। ব্রায়ান অ্যাডামসের গানে সুর মিলিয়ে গাইতাম – “And love is all that I need, And I found it there in your heart, It isn’t too hard to see‌ – We’re in heaven“।

২০০৩ এর শেষের দিকের কথা। সাহস করে একবার ড্রেসডেন শহরে গাড়ীর দোকানে ঢুকে গেলাম। রিসেপশনে বসা কড়া মেকআপ দেয়া সুন্দরীকে বললাম, একটা ছাদ-খোলা গাড়ী কিনতে চাই – যেটা অন্তত দুইশ কিলোমিটার স্পিডে চলতে পারে। আমার বেশভূষা আর পায়ে পুরনো জুতা দেখে সেলস-গার্লটা খুব অবজ্ঞার চোখে তাকাল। আমি নাছোড় বান্দার মতন দাঁড়িয়ে থাকলাম। ওঁ আমাকে খুব অবহেলার সাথে এক কোনায় রাখা একটা গাড়ী দেখিয়ে দিল (এখন জানি কেউ গাড়ীর দোকানে গেলে সেলসের লোকজন কেমন ঝাঁপিয়ে পড়ে একটা গাড়ী বিক্রির জন্য!)। গাড়ীটা দেখে দূর থেকেই পছন্দ হল, আমি ভয়ে ভয়ে সামনে গিয়ে দামটা খোঁজার চেষ্টা করলাম। অনুভব করলাম পেছন থেকে সুন্দর চোখের একজোড়া বক্রদৃষ্টি আমার দিকে ছোবল দিচ্ছে। গাড়ীর সামনে লাগানো পাঁচ অঙ্কের একটা সংখ্যা দেখে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। এত দামও গাড়ীর হয়, সেইগুলি আবার আমাদের মতন মানুষরাই কেনে! দুই দিকে মাথা নেড়ে গাড়ী পছন্দ হয়নি এমন একটা ভাব করে সেলস গার্লের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে পালালাম কোনমতে।

২০১৩। অনেকদিন ধরে টাকা জমিয়ে সাহস করে একটা ছাদ-খোলা স্পোর্টস কার কিনে ফেলেছি। ইদানীং মাথার চুল কমে গেছে, টাক পড়তে আর বেশি বাকি নেই। খোলা ছাদে গাড়ী জোরে চালিয়েও চুলের শেষ প্রজন্মকে নড়ানো যাচ্ছে না। তবে জোরে ভলিউম দিয়ে গান শুনতে এখনো ভাল লাগে। ব্রায়ান অ্যাডামসের বদলে তাহসানের সাথে মাঝে মাঝে গলা মেলাই।

অর্থ বিত্ত ও প্রাচুর্য, যশ খ্যাতি ওরা, দিতে পারে কি সুখ তোমায়, বড় নিষ্ঠুর ওরা।

সুখ আছে তোমার, খুব কাছে, চারিপাশে, চোখটা মেলে দেখনা – সব হারাবার আগে।

মায়ের দোয়া, বাবার আদর, প্রেমের স্মৃতি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা।

নিজের মাঝে সাফল্যের চাবিকাঠি, এতটুকু শুধু চাই, সুখে থাকার মন্ত্র জানি।

সবার চোখে তুমি বড় হতে চাও, সবাই কি চায় বোঝ না।

যদি নিজের চোখে তুমি নিজেকে গড়, পাবে প্রকৃত ঠিকানা।

যাদের কথা ভেবে এই লেখার অনুপ্রেরণা: সম্প্রতি জার্মানির দক্ষিণ সীমান্তে অবস্থিত সুইজারল্যান্ডের ঠিক পাশে ফ্রাইবুরগে গিয়েছিলাম। সেখানে অনেক বাংলাদেশী ছেলে এসেছে ভাষা শিখতে। এদের সবাই বাংলাদেশ থেকে এজেন্সির মাধ্যমে পাঠানো। এরা সবাই পাঁচ থেকে দশ লক্ষ টাকার উপর খরচ করে জার্মানিতে এসেছে। অনেকেই দেশে জমি জমা বিক্রি করে এসেছে, কেউ বাবার পেনশন ভেঙ্গে, মায়ের শেষ গহনা বিক্রি করে। সর্বস্ব ত্যাগ করে এদের আত্মীয় পরিজনরা আশায় বুক বেঁধে আছে, ছেলে কবে বিদেশে গিয়ে আবার সংসারের হাল ধরবে। হায় আমার দেশ, হায় তোমার স্বপ্ন! এজেন্সিরা এদেরকে স্বপ্ন দেখিয়েছে জার্মানিতে আসলেই জীবনের সব আশা পূরণ হয়ে যাবে। অনেক টাকা উড়ছে এই দেশের বাতাসে, শুধু এসে ধরার অপেক্ষা। প্রথমদিন ইউরোপের মাটিতে পা দিয়েই এরা বুঝতে পেরেছে কোন বিপদে এরা পড়েছে। দেশে টাকা পাঠানো তো দুরের কথা, উচ্চ জীবনযাত্রার মানের সাথে তাল মিলিয়ে মাস চালাতেই এরা হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। জার্মানি সম্পর্কে মিথ্যাচার করে এজেন্সি এদের সব টাকা আগেই হাতিয়ে রেখেছে। এদের বেশিরভাগের বয়স মাত্র ২০-২৫, কিন্তু এদের চোখ দেখে মনে হল এরা এখন আর ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার স্বপ্ন দেখতেও ভুলে গেছে। এদের দৃষ্টি এখন ভাবলেশহীন, প্রতিদিন বাবা মাকে সাজিয়ে কথা বলতে বলতে এরা এখন নিজের কাছে অপরাধ-বোধে ভুগছে। ওদের পেছনে শুধুই আবেগহীন প্রতারণার বাস্তবতা, আর সামনে শুধুই অন্ধকার আর ভয়। আমি বিশ্বাস করি এই ছেলেগুলি একদিন জার্মানির মাটিতে স্পোর্টস কার কিনবে। সাধারণ জার্মানরা এদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলবে – কি যুগ আসল, আমরা সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করেও এই গাড়ীটা কিনতে পারলাম না, আর এই বাদামি চামড়ার নিরীহ চেহারার ছেলেগুলি…

আদনান সাদেক, ২০১৩

অন্যান্য পর্ব ও লেখকের কথা

Print Friendly