জার্মানির ডায়রি-৩: প্রথম আলো

 

সেদিন সকালে একটি চিঠি পড়ে ছিল লেটার বক্সে, ব্যাংক থেকে পাঠানো। সেই চিঠি আবার জার্মান ভাষায়! ক্লাসে যাবার পথে ট্রামে (স্ট্রাসেন-বান) বসে খুললাম চিঠিটা। বুঝতে পারছিলাম না একবিন্দু। ইদানিং কেমন যেন অনিশ্চয়তায় ভুগি সবসময়। জার্মানিতে এসে ভুল করলাম কি না এরকম অপরাধবোধ ঘিরে ধরছে চারদিক থেকে। লেটার বক্সে জার্মান ভাষায় চিঠি-ফিঠি পেলেই কেমন বুক ধড়ফড় করতে থাকে, এই বুঝি কিছু একটা ঝামেলায় পড়লাম! মাঝখানে একটি চিঠি পেয়েছিলাম, ঘরে টিভি রেডিও থাকলে নাকি মাসে ১৮ ইউরো করে দিতে হবে। সেলার থেকে কুড়িয়ে আনা ২০ বছরের পুরোনো টিভিটা এরপর আবার সেলারেই ফিরে গেছে। এইবার আবার কি আছে কপালে কে জানে!

প্রথম আলো

পরের স্টপে ট্রাম থামতে আমাদের ক্লাসে পড়া একটি জর্ডানি মেয়ে উঠল। মেয়েটি দেখতে অ্যারাবিয়ান নাইটসের নায়িকাদের মত সুন্দরী, তার মধ্যে খুব সংক্ষিপ্ত কাপড় চোপড় পড়ে। রাইমুন্ড প্রথমদিন চোখ টিপে বলেছিল, খোদ জার্মানদের মধ্যেও নাকি সে খুব হট।

ক্লাসে আবার সে খুব চটপটে, ভড়ভড় করে জার্মান বলে। আসার আগে জর্ডান থেকে দুই বছর ভাষা শিখে এসেছে। নিজ থেকে পরিচয় হবার সাহস এখনো পাইনি, চিঠিটা হাতে নিয়ে যা হবার হবে এমন বেপরোয়া ভঙ্গীতে ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে পাশের সিটে বসলাম। মুখ দিয়ে হাই-হ্যালো কিছু বের হল না।

ঢোক গিলে হাসার চেষ্টা করছি। মেয়েটি তার ভুবন ভোলানো হাসি দিয়ে বলল, “গুটেন মরগেন (শুভ সকাল), আদনান! তুমি বাংলাদেশ থেকে না? সেদিন কিন্তু তুমি ফ্রিকোয়েন্সি মডুলেশনের সমীকরন বোর্ডে চমৎকার ব্যাখ্যা করলে।”

আমার পিলে চমকে যাবার দশা, নামও দেখি জানে!

কয়েকটা অস্বস্তিকর মুহূর্ত কেটে গেল। আবার ঢোক গিলে কাঁপা হাতে চিঠিটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিলাম। দানিয়া চিঠি পড়ছে আর আমি পাশে বসে ঘামছি। চিঠির বিষয়বস্তু ভেবে আর পাশ থেকে ভেসে আসা তীব্র পারফিউমের গন্ধে।

প্রফেসর ফেটভাইস, ড্রেসডেন ইউনিভার্সিটি

প্রথম ক্লাস প্রফেসর ফিঙ্গারের। ওর ক্লাস আর করবো না – এই প্রতিজ্ঞা এখনো বহাল আছে। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে চলে গেলাম ইউনিভার্সিটির স্থানীয় একটি কার্যালয়ে। ওখানে অফ-ক্যাম্পাস কাজের খবর পাওয়া যায়। আগেও কয়েকবার গিয়েছি, জার্মান না জানা থাকায় সুবিধে হয়নি। দুই সপ্তাহ আগে শেষবার যখন গিয়েছি, আমার বিজাতীও জার্মান শুনে ওরা বিরক্ত হয়ে বলেছিল, পরের বার আবার কাজ খুঁজতে আসার আগে কমপক্ষে ছয় মাস জার্মান শিখে আসবে।

আমার ধারণা, জার্মান না জানাতে ওদের যত না মাথা ব্যাথা, তার চেয়ে ওদের আসল সমস্যা ইংরেজিতে উত্তর দিতে হবে – এই ভয়। এই ইউনিভার্সিটিতে বিদেশী ছাত্রছাত্রীর কোন অভাব নেই। অনেকে ইংরেজিতে মাস্টার্স করে, একটু ইংরেজি শিখে নিলেই তো পারে! যতো দোষ আমি নন্দঘোষের!

আরও এক ঘন্টা পরের কথা। মোবাইল কম্যুনিকেশন ক্লাসে প্রফেসর ফেটভাইসের লেকচার শুনছি। এই ক্লাসটা আমার প্রিয়, কারণ মূলত লেকচার ইংরেজিতে বলে নয় বরং প্রফেসর ফেটভাইসকে দেখার জন্য, তাঁর কথা শোনার জন্য। প্রফেসর ফেটভাইস শুধু টিইউ ড্রেসডেন বা জার্মানিতে নন, সারা পৃথিবীতে মোবাইল কম্যুনিকেশনের বিখ্যাত কয়েকজন প্রফেসরদের একজন। তাঁর অধীনে পিএইচডি ছাত্র-ছাত্রী ৩৫ জন। তাঁর চেয়ার এই অনুষদে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম। জার্মানিতে পূর্ণ বেতনে পিএইচডি করা মানে বছরে প্রায় ৪০ হাজার ইউরো। আমেরিকায় পাড়ি দেওয়া বন্ধুদের কাছে শুনেছি, ওরা নাকি খুব বেশি হলে ২০-২৫ হাজার ডলার পায়।

দানিয়া একদম সামনের সারিতে বসে লেকচার শুনছে। ওকে দেখে আবার সব মনে পড়ে গেল। ট্রামে বসে চিঠি পড়ে দানিয়া বলেছে, আমার ব্যাংকের একাউন্ট শুন্য। বাসা ভাড়ার আগাম ১৮০ ইউরো বুক করতে পারেনি বলে শোকজ নোটিশ পাঠিয়েছে ব্যাংক। এক সপ্তাহের নোটিশ, এর মধ্যে টাকা না দিলে হয়ত হোস্টেল থেকেও নোটিশ আসতে পারে, বাসা ছেড়ে দেবার।

গত এক মাসে একাউন্ট চেক করে দেখা হয়নি। মাসে ১৮০ ইউরো রুমভাড়া, ৫২ ইউরো স্বাস্থ্যবীমা, এখানে হাত দেবার উপায় নেই। আধ ভাঙ্গা বাসমতি চাল পাওয়া যায় ৬০সেন্ট কেজিতে, যদি একসাথে ২০ কেজি বহন করে আনা যায় অনেক দূরের ভারতীয় দোকান থেকে। কোন দোকানে দুধ ২ সেন্ট কমে পাওয়া যায়, কোন কোন দিন ডিমের বিশেষ ছাড় চলে – এইসব গবেষণা করে মাসে ৫০ ইউরোর মধ্যে খাবার খরচ। মাঝে মাঝে পুরনো জিনিসের মার্কেট (ফ্লোহ-মার্কেট) থেকে দুই এক ইউরো দিয়ে কাপড়-চোপড় কেনা, ব্যাস। তারপরও তিন মাসের মাথায় ১৪০০ ইউরো শেষ! দানিয়াকে একদম সুন্দরী লাগছে না চিঠি পড়ে দেওয়ার পর থেকে।

একটু আগে স্টুডেন্ট জব অফিস থেকে প্রায় জোর করে বের করে দেওয়া হয়েছে আমাকে। ওখানের ডেস্কে বসা ভদ্রমহিলা আজকে আর কষ্ট করে ইংরেজি বলার ধার ধারেননি। কড়া জার্মানে কিছু একটা বললেন, শুনে পাশে বসা হেডফোন কানে ভাবলেশহীন চেহারার জার্মান একটি ছেলে পর্যন্ত মাথা তুলে তাকাল।

মোবাইল কম্যুনিকেশনের মত সহজ বিষয় শেখানোর জন্য ফেটভাইস সাহেব কখন থেকে বকবক করছেন। একটি কাজ না পেলে এই লেকচার শোনার জন্য আমাকে আর জার্মানিতে থাকতে হবে না, সেটা কি তিনি কখনো কল্পনাতেও ভাববেন!

ক্লাস শেষ হতে প্রফেসর সাহেব বেরিয়ে পড়তেই দৌড়ে তাঁর কাছে গেলাম। ব্যস্ততার ভঙ্গিতে হাঁটা না থামিয়ে প্রফেসর ফেটভাইস প্রশ্নসূচক ভঙ্গিতে তাকালেন। পাশে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে তাঁর সাথে পা মিলিয়ে বললাম, “আমার একটা কাজ দরকার, আমি কি তোমার জন্য কিছু করতে পারি?”

তিনি একটু মুচকি হেসে বললেন, “এই মুহূর্তে তো কিছু দরকার নেই, পড়লে তোমাকে জানাবো।”

আমি তখন বেপরোয়া। কিছু না ভেবে বললাম, “তুমি কম্যুনিকেশনর লেকচার দাও ইংরেজিতে। কিন্তু তোমার লেকচার শীট জার্মান ভাষায়, এটা কি ভাল দেখায়? আমি ইংরেজিতে ভালো, কম্যুনিকেশনের ধারণাও পরিষ্কার। তুমি চাইলে লেকচার শিটটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিতে পারি।”

আমরা তখন হেঁটে প্রফেসরের অফিসের কাছে চলে এসেছি। প্রফেসর ফেটভাইস আমার কথার কোন উত্তর না দিয়ে পাশে দাঁড়ানো পিএইচডি ছাত্র ডেনিসকে ডেকে বললেন, “তোমাকে অনেকদিন থেকে বলছিলাম, আমার লেকচার ইংরেজিতে অনুবাদ করতে। এই ছেলে আমার লেকচার শীট ইংরেজি করে দিতে চায়। ওকে কাজের কন্ট্রাক্ট দিয়ে দাও, এখুনি।”

একবার আমার দিকে ফিরে চুজ (বিদায়) বলেই উনি অফিসে ঢুকে গেলেন। ব্যাপারটা ঠিক কি হলো তখনো বুঝে উঠতে পারিনি। একটু পরে খেয়াল করলাম, ভদ্রলোককে একটা ধন্যবাদও দেয়া হয়নি।

ডেনিস দশ মিনিটের মধ্যে আমাকে চুক্তিপত্র তৈরী করে এনে দিল। প্রথমে ছয় মাসের চুক্তি, প্রয়োজন হলে বাড়ানো হবে। চুক্তি স্বাক্ষর করার সময় ডেনিস আমাকে পাশে ডেকে নিল।

“তোমার জার্মান তো বেশি ভাল না, তুমি কি নিশ্চিত ৩০০ পাতার লেকচার অনুবাদ করতে পারবে? আমি ছয় বছর ধরে জার্মানিতে। এই বিষয় নিয়ে পিএইচডি করছি, তারপরও নিজে এই কাজে হাত দিতে সাহস পাইনি।”

আমি কোন উত্তর না দিয়ে শক্ত মুখে খসখস করে স্বাক্ষর করলাম। খালি ব্যাংক একাউন্ট, প্রতিক্ষায় থাকা প্রিয়জন, আর এলবে নদীর পাড়ে বসে নরম আলোয় আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখা – এইসব তুচ্ছ গল্প ডক্টর ডেনিসের না জানলেও কি আসে যায়।

 

আদনান সাদেক, ২০১৩

অন্যান্য পর্ব

Print Friendly, PDF & Email
Adnan Sadeque
Follow me

Adnan Sadeque

লেখকের কথাঃ
http://bsaagweb.de/germany-diary-adnan-sadeque

লেখক পরিচয়ঃ
http://bsaagweb.de/adnan-sadeque
Adnan Sadeque
Follow me