• Home »
  • Featured »
  • জার্মানির ডায়েরিঃ২৪ “ফিহা এবং কিছু সমীকরণ”

জার্মানির ডায়েরিঃ২৪ “ফিহা এবং কিছু সমীকরণ”

 

প্রথম সমীকরণ

আমাদের বড় মেয়ে এহার মায়ের গর্ভে আসার ঘটনা যখন জানা গেল, সেদিন আমি কি একটি কাজে অন্য শহরে। সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে প্রথম বাবা হতে যাবার খবরটি পেলাম। প্রথম বার বলে বোধকরি, এই খবরটি শুনে কিছুই অনুভব করতে পারলাম না। কোথাও অনেক মানুষের ভিড় ভেঙে যখন সবাই হঠাৎ একসাথে পালাতে চায়, তখন কেউই বের হতে পারে না। হুড়োহুড়িতে জটলা লেগে যায়। বাবা হতে যাবার প্রথমবারের খবরটি অনেকটা এরকম ছিল। কয়েক হাজার অনুভূতি একসাথে মাথার ভেতরে জট পেকে গেল।

খবরটি ফোনে দিলেন মিসেস নয়েফেল্ড। আমাদের নিকট আত্মীয়ের মতো কাছের একজন জার্মান ভদ্রমহিলা। চুপ করে আছি দেখে উনি কিছুটা উৎকণ্ঠার স্বরে জানতে চাইলেন, “আদনান, বাবা হতে যাচ্ছ, তুমি খুশী তো খবর শুনে?”

রিহার জন্মের খবরটার সময় মোটামুটি মানসিক প্রস্তুতি নেয়া ছিল। এইবার হাসিমুখে খবরটা জানাল আমার স্ত্রী নিজে। খবর শুনে কোন জট লাগল না। আনন্দ উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি বাস্তবতাগুলো এক এক করে ভাবনা হয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। বিদেশ বিভুয়ে বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করা কঠিনতম কাজ। এই কাজ শর্মি প্রথম মেয়েকে নিয়ে প্রায় অসাধারণ কৃতিত্বে এক হাতে সামলে নিয়েছে। সেই তুলনায় বাবা হওয়াটা ছিল সহজ কাজ। অফিস থেকে ফিরলে মেয়ে বাবা বাবা বলে ছুটে আসে। সারা সন্ধ্যে আশে পাশে ঘুরঘুর করে। এই সময়ে দু’একবার ডাইপার বদল বা সামান্য একবার খাওয়ানো ছাড়া তেমন কোন গুরুদায়িত্ব নেই। আমার কাজ বলতে খেলা করা বা বাইরে পার্কে নিয়ে যাওয়া। ঘুম পাড়ানো থেকে শুরু করে খাওয়ানো বা সবদিকে সর্বক্ষণ খেয়াল রাখার ব্যাপারগুলো মা’র কাজ। এই কাজ সপ্তাহের ছুটির দিনে একবার করতে গেলে আমার ভ্রু কুঁচকে আসে। সেখানে মা প্রতিদিনের প্রতিটি ক্ষণ সাথে সাথে থাকেন। দ্বিতীয় বাচ্চা হবার খবরটাতে আনন্দের সাথে অনেকটুকু উৎকণ্ঠা ছিল। এহার মাত্র তিন বছর বয়স, এরমধ্যে দ্বিতীয় সন্তান আসছে। সামনে দ্বিগুণ কাজ বাড়বে।

রিহা হবার পরে আমরা বুঝলাম, কাজ আসলে দ্বিগুণ নয়, অনেকগুণ বাড়ল। শূন্য এবং তিন বছরের দু’টি শিশু আমাদের ব্যতিব্যস্ত করে রাখল। বাবা মা দু’জন ঘরে থাকলেও দেখা যেতো কাউকে না কাউকে বাচ্চাদের কাজে সময় দিতে হচ্ছে। অফিসে থাকলে দিনের বেলা শর্মি এক মুহূর্ত ফুসরত পায় না। ঘরের নিত্যদিনের কাজ অফিস থেকে কখন ফিরব, সেই অপেক্ষায় থাকত। সারাদিন কাজ করে ঘরে ফিরে মনে হতো, আসল কাজ মাত্র যেন শুরু হল।

শর্মির দিকে তাকানো যায় না। নিজের প্রতি যত্ন নেয়ার তার সময় নেই। মাঝে মাঝে অনুযোগ করতাম, ভালবাসার বিয়ে, জামাইকেও একটু সময় দেয়া উচিত। সেই চেষ্টা শর্মি করতো। হয়তো বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে উইকেন্ডে দু’জন একসাথে সিনেমা দেখতে বসেছি। ছবি বাছাই করার সময় নেই। হাতের কাছে যা আছে তাই দিয়ে শুরু। সিনেমা শুরুর দশ মিনিট পরই পাশের ঘর থেকে শিশুর আর্ত চিৎকার ভেসে আসে।

বাচ্চাদের প্রকৃতি আলাদা করে ভয়াবহ স্বরে কাঁদার ক্ষমতা দিয়েছে। বিশেষ করে দুধের শিশুরা ঘুমের মধ্যে পাশে মা না থাকলে চট করে ধরে ফেলে এবং প্রকৃতির দেয়া উচ্চমার্গের কান্নার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে। আমার ধারণা, মানব শিশুর কান্নার তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে টারজানকে গরিলারা আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছিল। অন্যথায় মানব শিশুর জন্য পশুকুলের এত মায়া হবার কোন কারণ নেই।

শর্মি সিনেমা থামিয়ে রাখতে বলে, দশ মিনিটের মধ্যে আসবে বলে ছুটে যায়। সেই দশ মিনিট আর শেষ হয় না। দুই বাচ্চা বড় করতে গিয়ে আমাদের নিজেদের সময় বলে আর কিছু রইল না। এক সময়ে দিন-রাত কাজ করে সবকিছু সামলাতে না পেরে, মাঝে মাঝেই এর ওর দোষ ধরা শুরু করলাম। কেন অফিস থেকে এত দেরী বা দু’টি বাচ্চা রেখেও কেন খেলতে যেতে হবে। একইসাথে পাশের বাসায় জার্মান বউ দুই বাচ্চা সামলে জামাইকে সময় দেয় বা ঘর পরিষ্কার রাখে ইত্যাদি খুঁটিনাটি বিষয়ে আমরা ঝগড়াঝাটি শুরু করলাম।

দ্বিতীয় সন্তান হবার পরের দু’বছর, ২০০৯-১০ সালের সময়টা আমাদের খুব কঠিন যেতে থাকল।

একবার আমার স্ত্রী গভীর রাতে ঘুম ভাঙিয়ে তার বড় মামাকে ফোন দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করল। বলা বাহুল্য, ভয়াবহ ধরণের বিপদে পড়লে শর্মি তার বড় মামার সাথে যোগাযোগ করে। ছোটবেলায় শর্মি তাঁর কোলে-কাঁধে বড় হয়েছে। যেকোনো বিপদে উনি শর্মিকে আগলে রাখেন। ভদ্রলোক দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে নিজের পরিবার থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। আমাদের বিয়ের পরে শর্মির সাথে ওঁনার তেমন যোগাযোগ নেই।

শর্মি বড় মামাকে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “এই ছেলের সাথে আর থাকতে পারছি না। আমাকে বাংলাদেশে নিয়ে যাবার জন্য টিকিট পাঠাও মামা। সাথে দুই মেয়েকে নিয়ে আসবো।”

বড় মামা অন্য পাশ থেকে শান্ত গলায় বললেন, “আচ্ছা, আমি দেখছি শর্মি। তুমি কোন চিন্তা করো না।”

শর্মি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, “মামা, বাংলাদেশে কি বাচ্চাদের ভাল ডাইপার পাওয়া যায়? না হলে তো খুব সমস্যা।”

 

দ্বিতীয় সমীকরণ

প্রথম যেবার শর্মি ওঁনাকে ফোন দিয়েছিল, ২০০১ সালের ঘটনা। আমাদের বিয়ের আগের বছর। শর্মি শুধু বাড়ির বড় মেয়ে নয়, পুরো পরিবারের বড় মেয়ে। তাদের ঘরে ঘরে মেয়েদের রাজত্ব। মামা-খালাদের ঘরভর্তি মেয়ে। শর্মিকে বিয়ে না দিলে অন্যদের বিয়ের কথা আগানো যাচ্ছে না।

তখন বুয়েটে মাত্র চতুর্থ বর্ষে পড়ছি। শর্মি এই সময়ে উপায়ান্তর না দেখে বাসায় আমাদের সম্পর্কের কথা জানালো। শর্মির বাবা সমবয়সী প্রেমিকের কথা হেসে উড়িয়ে দিলেন। চালচুলা নেই, পড়াশোনা শেষ হয়নি – এমন ছেলের সাথে কিভাবে বিয়ের কথা হয়! তাও আবার পরিবারের বড় মেয়ে।

মা ছাড়া পরিবারের ভেতর থেকে শর্মি তেমন কোন সমর্থন পেল না। ছেলে পাশ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে অনেক সময় লাগবে। ছেলের বাবার আর্থিক অবস্থা ভাল নয় যে বিয়ের পরে কিছু না করলেও ভরণ-পোষণ যোগাতে পারবে। ঘটনা সত্য। আমার পরিবারের অনুমতি নিয়ে বিয়েটা কিছুতেই সম্ভব নয়।

এমন দুঃসময়ে শর্মি তার বড় মামাকে ফোন দিল। মামা, এই ছেলেকে ছাড়া অন্য কাউকে আমার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব নয়। দরকার হলে …, ইত্যাদি।

বড় মামা জানতে চাইলেন, “এই ছেলের মধ্যে বিশেষ কি গুণ আছে? একে ছাড়া অন্য কাউকে দিয়ে চলবে না কেন?”

শর্মি বলল, “এই ছেলে ভাল চিঠি লিখতে পারে। তোমার লেখা বই ধরে যেমন মানুষ শেষ না করে উঠতে পারে না, এই ছেলের চিঠি তেমনি শক্তিশালী। তুমি একবার ছেলেটির সাথে কথা বলো। তারপরে তুমি সিদ্ধান্ত দাও, এই ছেলেকে বিয়ে করব কি না।”

বড় মামা আমার সাথে দেখা করার অনুরোধ ফেলতে পারলেন না। দুরুদুরু বুকে ভদ্রলোকের সাথে দেখা করতে গেলাম দখিন হাওয়ায়। মিসির আলি এবং হিমুর স্রষ্টার সামনে মাটিতে বসে আমরা কথা বললাম। নামাজের কায়দায় দুই পায়ের উপর আঁটসাঁট হয়ে বসেছি। উনি আমাকে আরাম করে পা মেলে বসতে বললেন। বাঁ পায়ের মোজাতে একটা ফুটো। সেটা এড়ানোর জন্য উৎকট ভাবে বসে থাকলাম। ঘড়ি ধরে তের মিনিট আমার জেরা চলল।

– বুয়েটে পড়ো?

– জ্বী!

– পড়া শেষ কবে?

– সামনের বছর মার্চে।

– এরপরে কি করবে ভেবেছো কিছু?

– জ্বী, জার্মানিতে যাব মাস্টার্স করতে।

– যাবে মানে, সব ঠিকঠাক?

– জ্বী না। মাত্র আবেদন করা শুরু করেছি। আশা করি সমস্যা হবে না।

– জার্মান ভাষা পারো?

– জ্বী না। তবে শেখা শুরু করেছি।

– তোমার কি জার্মানি সম্পর্কে কোন ধারণা আছে? তুমি কি জানো সেখানে ইংরেজি তেমন চলে না?

– জ্বী না, আমি জানতাম ওরা ইংরেজি ব্যবহার করে।

– পড়ার খরচ, টিউশন ফি কিভাবে চালাবে? বাবা স্বচ্ছল?

– বাবা রিটায়ার করেছেন। তেমন কিছু জমানো নেই। তবে আমার কিছু জমানো টাকা আছে। অনেকগুলো টিউশনি করি।

– কত টাকা জমিয়েছো?

– এক লক্ষ ছেচল্লিশ হাজার। সামনের ছয় মাসে আরও কিছু জমবে।

– তোমার ধারণা দেড়-দুই লক্ষ টাকা দিয়ে তুমি বিয়ে করে আবার বিদেশও চলে যেতে পারবে?

– জ্বী, মনে হচ্ছে পারবো। তবে বিয়ের অনুষ্ঠান করার খরচ এখন দেয়া সম্ভব নয়। আর তাছাড়া…

– তাছাড়া কি?

– দুই বোনের বিয়ে বাকি। বাসা থেকে আমার বিয়েতে কেউ রাজি না।

– মেয়ের বাসাও রাজি নয়, ছেলের বাসাও রাজি নয়, তাহলে তুমি কেন এসেছো? তোমার কি ধারণা আমি সবাইকে রাজি করিয়ে দেব!

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলাম। মিনমিন করে বললাম, “আমাদের বিয়েটা আসলে হয়ে গেছে গত বছর। সাক্ষী ছিল বুয়েটের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এই ঘটনা কেউ জানে না। আমার সাথে কাবিননামা আছে, আপনি চাইলে দেখাতে পারি।”

– কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করাটা জরুরী ছিল কেন?

– আমাদের পরিচয় ১৯৯৩ সাল থেকে। ৯৬ সালে শর্মিকে কথা দিয়েছিলাম, নতুন সহস্রকের প্রথম দিনের মধ্যে আমাদের বিয়ে হবে। তখন ভেবেছিলাম পাশ করে বের হয়ে যাব এর আগে। সেশন জটের কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। তবে আমি আমার কথা রেখেছি। ২০০০ সালের পহেলা জানুয়ারি আমাদের বিয়ে হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদ সাহেব কাবিননামা দেখতে চাওয়ার কোন আগ্রহ দেখালেন না। পাশের ঘর থেকে একজনকে ডেকে নিচু গলায় কি সব বুঝিয়ে দিলেন এবং তের মিনিট পরে ‘তোমার সাথে এই ভদ্রলোক যোগাযোগ করবেন’ – বলে আমাকে বিদায় দিলেন।

এই তের মিনিটে উনি একবারও হাসলেন না। এই মানুষটির লেখা পড়ে কত তরুণ-তরুণী চোখের জল ফেলে। অথচ তিনি কেমন রোবট টাইপ মানুষ, যদি তারা জানতো!

চালচুলো ছাড়া সম্ভ্রান্ত পরিবারের বড় মেয়েকে বিয়ে করার মতো অপরাধ করেছি এবং আমাদের গোপন বিয়ের কথা তাঁকে বলে ফেলেছি। তাঁর না হাসারই কথা। উনিক্ষমতাবান মানুষ। হয়ত ঐ লোককে বলেছেন, এই ছেলেকে উপযুক্ত শিক্ষা দেয়ার জন্য। বিয়ের কথা আবার কোনদিন যেন মুখেও না আনে।

পকেটে ওঁনাকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখে এনেছিলাম। দেবার সাহস হলো না। চিঠি পকেটে নিয়ে অমঙ্গলজনক তের মিনিট কথা বলে ফিরে এলাম।Image may contain: 1 person, smiling, riding a bicycle, sitting, child, outdoor and nature

 

তৃতীয় সমীকরণ

২০১৩’র শুরুর দিকের কথা। রিহা মোটামুটি বড় হয়ে গেছে। বুকের দুধ খাওয়ানো বা ডাইপার বদলানোর দিন শেষ। এহা ঘরের কাজে মাকে আগলে রাখে। শর্মি ভাবছে ড্রাইভিং শেখা শুরু করবে। সকালে বাচ্চারা স্কুলে গেলে নিজের একটি বাংলাদেশি খাবারের রেস্টুরেন্ট দেবে।

নতুন উদ্যমে ক্রিকেট খেলা শুরু করেছি। ২০১২ সালে আমাদের ক্রিকেট ক্লাবে জোয়ার বয়ে গেল। খেলার পাশাপাশি প্রাদেশিক বোর্ড থেকে শুরু করে জার্মান ক্রিকেট বোর্ডে নানাবিধ গুরু দায়িত্বে জড়াতে শুরু করলাম। কথায় বলে, যখন বিপদ আসে তখন নাকি সবদিক থেকে আসে। আমার বেলায় উল্টোটা হল।

চারদিকে অসাধারণ ভাল সব ঘটনা ঘটতে লাগল এবং একইসাথে। ঘরে আমাদের নিজেদের মধ্যকার বোঝাপড়ার সম্পর্কে উন্নতি হল। বাচ্চাগুলো চমৎকার বড় হয়ে যাচ্ছিল। মার্সিডিজ বেঞ্জ থেকে প্রায় এক মিলিয়ন ইউরো মূল্যের পাঁচ বছরের একটি কাজ পেলাম। এবার নিজেদের বাড়ি কেনা হবে। বাচ্চারা নিজেদের জন্য বাগান পাবে। দুই মেয়েকে নিয়ে সুখী পরিবার, খেলাধুলো, কর্মক্ষেত্র সবকিছু মিলিয়ে ভাল একটি সময় যাচ্ছিল। এমন সময়ে ঘটল অঘটনটা।

ডাক্তার আমাদেরকে খবরটা দেয়ার সময়ে বললেন, “আমার ত্রিশ বছরের ডাক্তারি জীবনে তৃতীয় বার এই ঘটনা ঘটল। শতকরা দশমিক শূন্য শূন্য একভাগের ক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিটা কাজ নাও করতে পারে। তোমরা সেই অসম্ভব ঘটনা সম্ভব করে ফেলেছো। আমি বুঝতে পারছি, এটা তোমাদের পরিকল্পনায় ছিল না। দুশ্চিন্তার কিছু নেই, ভ্রুণ এখনও একদম প্রাথমিক পর্যায়ে। আমরা দুই সপ্তাহের মধ্যে খুব সহজ এবং নিরাপদ পদ্ধতিতে এটাকে বের করে ফেলতে পারবো। তোমরা দুই সপ্তাহ চিন্তা করে আমাকে জানাও।”

শর্মির দিকে অসহায়ভাবে তাকাই। বাচ্চা বড় করার সব কষ্ট মায়ের। দুই বাচ্চা নিয়ে আমাদের অনেক ধকল গেছে। এখন সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে এসেছি। হঠাৎ অপরিকল্পিতভাবে দশমিকের পরে শূন্য শূন্য এক শতাংশের সম্ভাবনা মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু এলোমেলো করে দিলো।

শর্মি একটু দ্বিধা করে বলল, “আমাদের দুই সপ্তাহ সময়ের দরকার নেই। এই বাচ্চাটি আমি রাখতে পারবো না। আমাদের সুন্দর দু’টি সুস্থ বাচ্চা আছে। এই দেশে আমাদের বাবা-মা বা আত্মীয়স্বজন নেই। আমার স্বামী নিজস্ব কোম্পানির কাজে প্রায়ই বাইরে যাওয়া আসার মধ্যে থাকে। এই বাচ্চাটিকে বড় করতে গিয়ে আমি অন্য দু’জনকে সময় দিতে পারবো না। সংসারে সময় দিতে পারবো না। নিজের কথা তো বাদই দিলাম। আপনি আমাদেরকে সময় দিন, কবে আমরা কাজটা শেষ করতে পারবো।”

ডাক্তার সাহেব আমাদেরকে বুঝিয়ে বললেন, “এই দেশে বাচ্চা নষ্ট করে ফেলতে চাইলে বিশেষ অধিদপ্তরের কাছে গিয়ে কারণ দর্শীয়ে অনুমতি নিতে হবে। এটি জটিল কিছু নয়। এই যে ঠিকানা। তোমরা ফোন করে সাক্ষাতের সময় চেয়ে নিতে পার।”

বিশেষ অধিদপ্তরের সাক্ষাতের সময় পরদিনই পাওয়া গেল। অত্যন্ত অমায়িক এবং আন্তরিক একজন ভদ্রমহিলা প্রায় ঘন্টা খানেক সময় নিয়ে আমাদের সাথে কথা বললেন। এরমধ্যে আবার আমাকে বেশ কিছুটা সময় বাইরে একা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হলো।

অনেক সময় স্বামীর চাপে পড়ে মা’রা বাচ্চা রক্ষা করতে পারে না। সেই আলাপটা আমাকে ছাড়া হলো। এই দেশে বাচ্চাকাচ্চা বড় করা শুধু একটি দায়িত্ব নয়, বড় ধরণের খরচের ব্যাপার। তৃতীয় বাচ্চা নিতে গিয়ে আমাদের কি টাকা পয়সার সমস্যা হচ্ছে? প্রয়োজন পড়লে সরকার থেকে বাচ্চাকে সব ধরণের আর্থিক সাহায্য দেয়া হবে। এই দেশে জন্মহার ঋণাত্মক, একটি বাচ্চাকে বাঁচানোর জন্য সরকারের বিশেষ অধিদপ্তর সবকিছু করতে প্রস্তুত।

সবকিছু ব্যাখ্যা করার পরও ভদ্রমহিলা হাল ছাড়লেন না। উনি বললেন, “তোমরা কয়েকটি রাত এই ভাবনা নিয়ে ঘুমাও। সামনের সপ্তাহে আমরা আবার কথা বলব। তোমাদের মত পরিবর্তন না হলে ডাক্তারের কাছে গিয়ে অপারেশন করিয়ে নিও।”

 

ফিহা সমীকরণ

এই নামে ছোটবেলায় একটি উপন্যাস পড়েছিলাম। একবার নয়, একাধিক বার। লেখকের নাম আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই। ফিহা একজন মহাবিজ্ঞানী। তিনি মহাজ্ঞানী, তারপরও তাঁর মধ্যে অসীম ভালবাসা আছে। বিশ্বব্রহ্মান্ডের সব রহস্য মাত্র একটি গাণিতিক সমীকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব, এমন মহাসমীকরণ খোঁজার কাজে তিনি ব্যস্ত। সেই রহস্য উন্মোচিত করে মানবজাতিকে রক্ষা করার সমাধান হিসেবে তিনি নিজের জীবন দান করে গেলেন। তাঁর আত্মত্যাগে সমগ্র মানবজাতি রক্ষা পেলো।

বইটিকে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী হিসেবে কতটুকু সফল বলা যায়, এই নিয়ে সমালোচকদের মধ্যে দ্বিমত আছে। তবে এখানে একজন মানুষের গল্প বলা হয়েছে, যিনি মানুষ হিসেবে নিজেকে ছাড়িয়ে চিন্তা করতে পারেন। আমাদের নিজেদের স্বত্বার বাইরেও আমাদের দায়বোধ আছে। একজন মানুষ যখন নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, তখনই মানুষ হিসেবে তাঁর জন্মের সার্থকতা। এই অসামান্য চরিত্র অনুসারে আমাদের তৃতীয় সন্তানের নাম রাখা হল ফিহা।

ফিহার জন্ম নিয়ে শর্মি নিজের সাথে কয়েকটি সপ্তাহ বড় ধরণের লড়াই করল। এই সময়ে সে বারবার বলল, একবার যদি বড় মামাকে ফোন করা যেতো। এই সঙ্কটে উনি উচিত একটি সমাধান দিতে পারতেন। শর্মির মতো অসংখ্য আপনজন এবং একটি দেশকে কাঁদিয়ে উনি তার ঠিক আগের বছর, ২০১২ সালে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন। শর্মির দ্বিতীয় ফোনের পর উনি কথা দিয়েছিলেন, ফ্রাঙ্কফুর্টে বইমেলায় আসবেন, তখন নিশ্চয়ই এহা-রিহাকে দেখে যাবেন। সেই সৌভাগ্য থেকে আমরা বঞ্চিত হলাম। মহামানবরাও জীবনের সব সমীকরণের সঠিক সমাধান খুঁজে পান না। তাঁরাও অতৃপ্তি নিয়ে অসময়ে বিদায় নেন।

ফিহাকে রেখে দেয়াতে শর্মিকে রাজি করানোর কৃতিত্ব বাবা হিসেবে নিজেই নিচ্ছি। শর্মিকে রাজি করানোর শর্ত হিসেবে ফিহার জন্মের পরপরই মার্সিডিজের চুক্তি ছেড়ে দিলাম। নতুন বাড়ি কেনার স্বপ্ন দূরে সরিয়ে একটি বছর বাসায় বসে শুধু বাচ্চাদের দেখাশোনার সিদ্ধান্ত নিলাম। জার্মান লীগে খেলা বন্ধ করার পাশাপাশি ক্রিকেট বোর্ডের দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিলাম।

তিন মেয়েকে আমরা সাধ্যমত সময় দিলাম। এক বছর পরে জমানো টাকা ফুরিয়ে এলো। ততদিনে ফিহা আমাদের সবার চোখের মণি। রিহা বলে, ফিহা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বাচ্চা। এহার ভাষায় পৃথিবীর সুন্দরতম হাসিটা ফিহার। বাচ্চা নিতে গররাজি মা ফিহা হবার আগে বলেছিল, “এই মেয়েকে শক্ত করে বড় করা হবে। কান্নাকাটি করলেও সহজে কোলে নেয়া হবে না। একদম জার্মান স্টাইলে জন্মের পর আলাদা বিছানায় ঘুমাতে দেয়া হবে।”

জন্মের পরে দেখা গেলো সবকিছু উল্টো হচ্ছে। চতুর্থ জন্মদিবসের সময়েও ফিহা মায়ের বিছানায় ঘুমাচ্ছে। এই নিয়ে উচ্চবাচ্য করলে বরং শুনতে হয়, “তুমিই জোর করে এই মেয়ে চেয়েছিলে, মনে নেই?”

আমিই চেয়েছিলাম। কথা সত্য। জীবনের সমীকরণ মেলাতে গিয়ে কত ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কতবার মনে হয়েছে, এই বুঝি তীরে এসে তরী ডুবে গেলো। হুমায়ূন আহমেদ সাহেব ২০০১ সালে আমাকে নিজে স্বাক্ষর করে একটি লিখিত সনদপত্র দিলেন। এই ছেলেকে নুহাশ চলচ্চিত্রের পক্ষ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশীপ দেয়া হয়েছে এবং জার্মানিতে পড়াশোনাকালীন তার সকল দায়দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের।

এই নিশ্চয়তা না পেলে হয়ত অনেক বছরের বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন অধরা থেকে যেত। তাঁর সম্মতি না পেলে সেই দুর্দিনে পারিবারিক ভাবে আমাদের বিয়েটাই হতো না। জীবনের সব সমীকরণের সমাধান আমরা জানি না। সমাধান না জেনেও আমাদেরকে কঠিন সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ফিহাকে এই পৃথিবীতে ধরে রাখার সিদ্ধান্তটা ছিল আমার জীবনের সেরা এবং সঠিকতম সিদ্ধান্ত।

ফিহাকে নিয়ে এটি আমার প্রথম লেখা। এই লেখাটি লিখতে তার জন্মের পর চার বছর সময় নিলাম। প্রতিবার ফিহার জন্মদিনের সময় ভাবি, আজকেই লিখে ফেলি। কিছুদূর লেখার পরে মনে হয়, এই ঘটনার মধ্যে যে আবেগ, অনুভূতি – তার কিছুমাত্র প্রকাশ করা হলো না। জীবন এবং মৃত্যু আমাদের নিয়ে প্রতিনিয়ত যে খেলা খেলছে, তার রহস্য ভেদ করা হলো না।

হুমায়ূন আহমেদের মতো মহামানবেরা আমাদেরকে গভীর মায়ায় ছুঁয়ে দিয়ে গেছেন। তিনি মিসির আলি, হিমু বা ফিহার মত দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। সবাই মহামানব হবে – এমন কোন কথা নেই। কিন্তু আমরাও নিজেদের ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টায় সেই পথে হাঁটবো না, তা কেমন করে হয়!

Image may contain: 1 person, smiling

ও, একটি ঘটনা বলতে ভুলে গেছি। আমার বড় দুই মেয়ে প্রথম কথা শিখল ‘মা’ ডাক দিয়ে। এটাই স্বাভাবিক। পৃথিবীর সব শিশু কথা বলতে শেখার অনেক আগে মা ডাক শেখে। সমস্যা হলো, মা ডাক শেখার পরে আমার মেয়েরা মা-মা, লা-লা, কা-কা অনেক কিছু বলা শিখলো। কিছুতেই তাদের দিয়ে বাবা বলানো শিখাতে পারি না। বলাই বাহুল্য, তাদের জীবনে মায়ের ভূমিকা অনেক বেশি। তারপরও এই নিয়ে দুঃখ ছিল।

ফিহা কথা বলতে শেখার এবং মা ডাক শেখার অনেক আগে, এক বছরের মাথায় স্পষ্ট ভাষায় প্রথম শব্দ উচ্চারণ করল, ‘বাবা’।

২৯শে নভেম্বর, ২০১৭। আজ ফিহার চতুর্থ জন্মদিবস!

 

 

আদনান সাদেক, ২৯শে নভেম্বর, ২০১৭।

জার্মানির ডায়রির সবগুলো পর্ব এখানে

#BSAAG_Articles

#BSAAG_Diary_of_Germany

‪#‎আদনান_সাদেক‬
#এহা_আদনান
#BSAAG_Life_in_Germany

Print Friendly, PDF & Email