জার্মানির ডায়েরিঃ২৩ “কুকুর, ভয় এবং পুলিস”

 

বাসায় ফিরে দেখি এহার চোখ ছলছলে। এই মেয়েটা দশ বছরেই দারুণ স্মার্ট। প্রাইমারি স্কুল পার করে আর দুইদিন পরে হাই স্কুলে যাচ্ছে। তার চোখে সাধারণত পানি দেখা যায় না। বরং সে বাবার সাথে চটাং চটাং করে কথা বলে। যেমন সেদিন অফিস থেকে ফিরে কি একটা নিয়ে মেজাজ খারাপ হল। গলার স্বর উচ্চ স্কেলে চলে গেল।

এহা কড়া গলায় বলল, তুমি কাজের ফ্রাসট্রেশন অফিসে রেখে আসবে। কেন ঘরে আমাদের উপরে সেটার জন্য রাগ দেখাও!

ঘটনা আংশিক সত্যি। এটা বউ বললে গলার স্কেল আরও চড়ে যেতো। মেয়ের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেলাম।

এহা গত বছর স্কুলে ফাটাফাটি ফলাফল করেছে। আমি রেজাল্ট শিট দেখে আবেগের বশে বললাম, কি চাও মা, যা চাও তাই পাবে!
এহা বলল, সামনের বছর ডিসেম্বরে সবাই মিলে বাংলাদেশে যেতে চাই!

নানু এহার প্রিয় মানুষ। এই কারণে সে বাংলাদেশ যেতে চায়। নেট ঘেঁটে দেখলাম প্লেনের টিকেটের দাম পানির দরে চলছে। উদার ভঙ্গীতে বলেছি, যা চাও তাই পাবে। জুলাই আগস্টে কিছু টাকা হাতে জমবে, তখন টিকেট কেটে ফেলব।

দুই সপ্তাহ আগে দেখি সেই সস্তা এয়ারলাইনের স্পেশাল ফেয়ারের টিকেট সব শেষ। এখন শুধু দামী টিকেটগুলো পাওয়া যাচ্ছে। আরও ছয় মাস আগেই টিকেট কেটে ফেলা উচিত ছিল!

মিউ মিউ করে এহাকে বললাম, টিকেটের দাম এখন প্রায় ডাবল। সব মিলে আমাদের পাঁচজনের টিকেটের দাম ২৫০০ ইউরো মতন বেশি আসবে। তার চেয়ে নানুকেই জার্মানিতে নিয়ে আসলে কেমন হয়!
এহা গম্ভীর হয়ে বলল, ২৫০০ ইউরো অনেক টাকা। তবে তার চেয়ে কথার দাম বেশি।

সেই এহার চোখে পানি!

ঘটনাটা মোটামুটি এইরকম। এহা সাইকেল চালিয়ে বাসায় ফিরছিল। এদেশে একা রাস্তায় সাইকেল চালাতে লাইসেন্স লাগে। সেটা পুলিশের উপস্থিতিতে পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে হয়। এই লাইসেন্স সে পেয়েছে এই মাসেই। ইদানীং সাইকেল চালানোর সময় আমাকে পেছন থেকে কড়া গলায় বলে, বাবা, তুমি বামে যাবার সময় হাত দিয়ে সাইন দিলে না কেন!

আমি নিশ্চিত দুইদিন পরে আর শান্তিতে গাড়ি চালানো যাবে না। এই মেয়ে আমাকে বলবে, হলুদ বাতি দেখেও তুমি কেন সিগন্যাল পার হলে। আরেকটু হলেই তো লাল হয়ে যাচ্ছিল!

বাড়ি ফেরার পথে রাস্তায় এক মহিলা তার কুকুর নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এহা সেটা দেখে গতি কমিয়েছে। শেষ মুহূর্তে সে আবিষ্কার করল রাস্তার অন্য পাশে দ্বিতীয় কুকুরটা বাথরুম সারছে। সেই কুকুরের গলায় চিকন দড়ি বাঁধা। সেই দড়ি মহিলা রঙ সাইডে দাঁড়িয়ে ধরে আছে। তারমানে সাইকেলের রাস্তা বরাবর। শেষ মুহূর্তে সে কড়া ব্রেক করে থামল। এই সময়ে কুকুরটা ভয়ে দৌড় দিল। মহিলা যেহেতু রঙ সাইডে দাঁড়ানো, এবং কুকুরটা দড়িতে বাঁধা, তাই কুকুরকে সাইকেলের দিকেই দৌড়াতে হল। তবে কুকুরের কিছু হয় নি। জার্মান ভদ্রমহিলা এই ঘটনা নিয়ে তুলকালাম করলেন। এবং কড়া ভাষায়, আরেকটু হলে কুকুরছানাটি মারা যেতে পারতো, চোখ কি আকাশে থাকে – জাতীয় কথা শোনানোর পাশাপাশি এক পর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে এহাকে পেছন থেকে ঘাড়ে বাড়ি মেরে বসেছেন।

দেখলাম এহা তেমন ব্যথা পায় নি। এবং মারার পরে নাকি মহিলা আবার নরম স্বরে তাকে সরি বলেছে। এহার মন খারাপ অন্য কারণে। তার বক্তব্য অনুসারে সে কোন ভুল করে নি। ভদ্র মহিলা রঙ সাইডে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারপরেও সে কড়া ব্রেক করেছে। তাকে কেন দোষারোপ করা হল। আমার স্ত্রী এই ধরণের যেকোনো ঘটনায় মুখে একটা বিশেষ ভান তৈরি করে। সেই মুখ বলে, মিঃ জার্মান ফ্যান, ঠ্যালা সামলাও। কালো চামড়াকে এরা মানুষই মনে করে না!

আমি ব্যাপক জার্মান ফ্যান, কথা সত্য। কথায় কথায় এই দেশের জিনিস ভাল, মানুষ ভদ্র জাতীয় যুক্তি দেই। একবার ইকবাল মামা (ডঃ জাফর ইকবাল) এসেছেন আমাদের কাছে বেড়াতে। উনি জিজ্ঞেস করলেন, জার্মানি কেমন লাগে আদনান? উত্তর দিলাম, এই দেশের ভাষা বললে মানুষ অনেক আপন ব্যবহার করে। প্রতিটা জিনিসের অনেক নিয়ম কানুন, আবার মানুষ সেটা মানেও। অন্যকে বিরক্ত না করলে আমি এখানে যা ইচ্ছে তাই করতে পারি। বাক স্বাধীনতা, মানবাধিকার সব মিলিয়ে সন্তুষ্ট। নিজের দেশের মতনই মনে হয়। দেশে থাকলে নিজের কোম্পানি চালাতে বা নিজস্ব স্পোর্টস ক্লাব চালাতে গিয়ে অনেক ধরণের সামাজিক রাজনৈতিক প্যাঁচে পড়তে হতো। এই দেশে এমন কিছু টেরই পাইনা।

উনি অবাক হয়ে বললেন, খুব অল্প সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশী বিদেশ নিয়ে নিজের দেশের মানুষের কাছে ভাল কথা বলে। বেশিরভাগ সময়ে বিদেশ আসলে যে কত খারাপ এটা নিয়ে আলোচনা হয়। তোমাকে ব্যতিক্রম পেলাম।

সেই থেকে আমার বউ আমাকে ডাকে মিঃ জার্মান ফ্যান। এবং আমি যে ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছি, সেটা সময়ে অসময়ে প্রমাণের চেষ্টা চালায়।

অনেক সময়ে অনেক বিষয়ে কারণে অকারণে মাথা গরম হয়। সব সময়ে মাথা ঠাণ্ডা করে কাজ করার চেষ্টা করি। মেয়ের চোখের জল দেখে মাথা ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করলাম না। বললাম, তুমি রেডি হয়ে নাও। আমরা ঐ রাস্তায় যাব। এখনই।

আমার বউ বলল, থাক এখন যেতে হবে না, রাত হয়ে আসছে। মেয়ের ঘুমানোর সময় হয়ে যাচ্ছে।

তার কথা উপেক্ষা করলাম।

ঘটনাস্থলে গিয়ে এহাকে দিয়ে পুরো ব্যাপারটা বিস্তারিত অভিনয় করে দেখাতে বললাম। আমার মেয়ে কোনদিন মিথ্যে বলে না। অল্প কিছুদিন আগে সে হোয়াটসএপ ব্যবহার করার অনুমতি পেয়েছে। দেশের অনেক নিকট আত্মীয়দের সাথে এবং স্কুলের বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখা সহজ এই যুক্তিতে। একবার আমি তিনদিনের জন্য লন্ডনে গিয়েছি। এহার স্কুলের বাড়ির কাজে একটা অংক বুঝতে সমস্যা হচ্ছে। সে আমাকে হোয়াটসএপ ব্যবহার করে তার অংকের সমস্যার স্ক্রিনশট পাঠাল। গাড়ি চালাতে চালাতে তাকে অংক বোঝালাম। দেখলাম, হোয়াটসএপ জিনিসটা খারাপ না।

এইবার স্কুলের বন্ধুদের হোয়াটসএপ গ্রুপে কিছু উল্টো পালটা ছবি পাঠিয়েছে কেউ একজন। এই নিয়ে স্কুলে তোলপাড় হল। টিন পর্নোগ্রাফি এই দেশে কড়া হাতে সামলানো হয়। স্কুলে পুলিশ এলো। তারা ভদ্র ভাষায় অপরাধীদেরকে অনুরোধ করল এমন কিছু যেন ভবিষ্যতে করা না হয়। আমরা অভিভাবকরা বিস্তারিত চিঠি পেলাম। সোশ্যাল মিডিয়া বাচ্চাদের হাতে সাবধানে দেয়া উচিত। এহা বাসায় এসে ঘোষণা দিল, এখন থেকে সে আর হোয়াটসএপ ব্যবহার করবে না। কারণ কোথায় যেন লেখা আছে ১৪ বছরের আগে বাচ্চাদের এটা ব্যবহার করা অনুচিত।

এহার বর্ণনা থেকে নিশ্চিত হলাম এখানে তার কোন দোষ ছিল না। শুধু মহিলা কেমন দেখতে সেটা নিয়ে তেমন কিছু বলতে পারল না। এই দেশে প্রায় সবাই কুকুর নিয়ে হাঁটে। এই বিবরণ থেকে কাউকে সনাক্ত করা অসম্ভব।

রাস্তাটা এহার স্কুল থেকে ফেরার পথে পরে। খেয়াল করলাম তার ভেতরে একটু ভয় কাজ করছে। সেই মহিলা এহাকে ছেড়ে দেবার সময় আবার যদি কখনো এই জাতীয় কিছু হয়, তাহলে খবর আছে টাইপ বলে বিদায় নিয়েছে।

এহা বলল, তাহলে আমি এখন থেকে হেঁটেই স্কুলে যাব।

তাকে বোঝাতে চেষ্টা করি, তোমার দোষ না থাকলে তোমার ভয় পাবার কিছু নেই। আর এখানে কেউ তোমাকে গায়ে হাত দেবার অধিকার রাখে না। এটা অপরাধ হয়েছে। তুমি তোমার সাইকেলে করেই যাবে।
এহা খুব বেশি ভরসা পেল বলে মনে হল না। বললাম, গাড়িতে উঠে বস। আমরা একটা জায়গায় যাব।

সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায় আমরা শহরের স্থানীয় পুলিশ দপ্তরে হাজির হলাম। পুলিশের গাড়ির বহর দেখে এহার মুখ শুকিয়ে গেল। ছোটবেলায় আমরা বাচ্চারা কথা না শুনলে কদাচিৎ পুলিশের ভয় দেখিয়েছি। স্কুলে পুলিশ আসায় সে ভয় পায় নি। কিন্তু পুলিশের দপ্তরে উপরে ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় দরজা, গ্লাসের ভেতর থেকে পেটানো শরীরের পুলিশ অফিসার ভাবলেশহীন মুখ দেখে হকচকিয়ে গেল। আমাদের কি সমস্যা শুনে পুলিশের অফিসার প্রথমেই বললেন, তোমার মেয়েকে কি ডাক্তারের কাছে নিয়েছ? কোন ধরণের আঘাতের দাগ আছে ঘাড়ে? সেক্ষেত্রে তুমি কেস করতে পার, আমরা অপরাধীকে খুঁজে বের করব।

আমি একটু সংকুচিত হয়ে বললাম, এটা এমন ভয়াবহ কোন বিষয় নয়। আমার মেয়ে ভয় পেয়েছে এবং অপমানিত বোধ করেছে। এটা ঠিক করার উপায় আমার জানা নেই। তার জানা দরকার যে, সে কোন অপরাধ করে নি এবং এই নিয়ে তার ভবিষ্যতে ভয় পাবার কিছু নেই।

পুলিশ ভদ্রলোক বললেন, একটু বসতে হবে। এই মুহূর্তে কিছু বড় অপরাধী নিয়ে কাজ চলছে। সেখানে অনেকগুলো অফিসার ব্যস্ত। আমরা একটু পরেই তোমাদের কথা বিস্তারিত শুনব।

আমরা অপেক্ষা করে আছি। হাতকড়া পড়ানো বেশ কিছু ভয়াবহ চেহারার লোকজনকে আমাদের সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। আধঘণ্টা অপেক্ষার পর আমাদেরকে ডাকা হল। এরমধ্যে এহার পুলিশ ভয় কিছুটা কমে এসেছে।

অফিসার আমাদের কাছে দুইবার ক্ষমা চাইলেন দেরির জন্য। এহার সব কথা মন দিয়ে শুনলেন। আমাদের পাসপোর্ট আইডির কপি করলেন। ঘটনার বিস্তারিত তার কম্পিউটারে টাইপ করলেন। মহিলার গায়ের রঙ, মাথায় কি টুপি, কুকুরের সাইজ, রাস্তার ঠিকানা সব কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ নোট হল। পুরো ব্যাপারটাতে আধ ঘণ্টা সময় লাগল।Image result for polizeiamt leonberg

অনেক উৎসাহ নিয়ে পুলিশের কাছে এসেছিলাম। পুরো ফর্মালিটি দেখে আমি নিজেই হাত তুলতে আরম্ভ করলাম। অফিসার টাইপ করার সময় শুধু তিনটা আঙুল ব্যবহার না করে সবগুলো আঙুল ব্যবহার করলে টাইপিং স্পিড আরও বেশি হতো। সেখানে ৩০ মিনিটের জায়গায় কত মিনিট সময় বাঁচানো যেতো, এটা মনে মনে হিসেব কষতে লাগলাম।

নোট করা শেষে অফিসার বলল, তুমি যেহেতু চাইছ না, তাই কোন কেস হচ্ছে না। তবে এটার রেকর্ড থাকছে। এবং এমন কিছুর পুনরাবৃত্তি হলে আমরা সাথে সাথে ব্যবস্থা নেব।

তারপরে তিনি এহার দিকে ফিরে বললেন, তুমি এই দেশের নাগরিক। তোমার এখানে স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার আছে। এখানে তুমি নিয়ম মেনে সাইকেল নিয়ে স্কুলে যাবে, ফিরে আসবে। অন্য কেউ অন্যায় করেছে বলে তুমি ভয় পাবে না। তুমি যদি ভয় পাও এবং এই ঘটনা চেপে যাও, তাহলে তোমার নিজের অধিকার এবং স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। অপরাধী এতে আরও বড় অপরাধ করার উৎসাহ পাবে। হয়তো সে আরেকটা স্কুলের বাচ্চার সাথে আবার খারাপ কিছু করবে।

এহা বলল, এখন যদি আমি তাকে আবার দেখি তাহলে কি বলব?
অফিসার বললেন, তুমি তাকে গিয়ে বলবে তুমি কোন ভুল করনি। এবং তাকে বলবে রাস্তায় যেন সাবধানে কুকুর নিয়ে হাঁটে। এই দেশে কুকুর গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটা মানুষের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তুমি তাকে এটাও বলতে পার যে, তুমি পুলিশকে সব জানিয়েছ।

এহা বলল, আমি কুংফু শিখি। আমাকে কেউ যদি রাস্তায় মারে, আমি কি তাকে ফেরত মারতে পারি?
পুলিশ অফিসার হেসে বললেন, নিজেকে আত্মরক্ষার প্রয়োজনে তুমি অবশ্যই তাকে একটা পাঞ্চ ফেরত দিতে পার! এই অধিকার তোমার আছে।

বাড়ি ফেরার পথে দেখলাম এহার চোখে ভয়ের ছায়াটা নেই। এইটুকুই দরকার ছিল। স্বাধীনতার মানে ভয়হীন বেঁচে থাকা।

সামনের রাস্তায় গাড়ি পার্ক করে মোটামুটি শান্ত মনে বাসার দিকে পা দিলাম। এই সময়ে এহা বলল, বাবা তুমি পার্কিং ঠিক মতন করনি। পার্কিঙের জন্য সাদা দাগ দেয়া আছে। তোমার গাড়ির পেছনটা সাদা দাগ থেকে প্রায় দশ সেন্টিমিটার বাইরে বের হয়ে আছে।

ব্যাপক বিরক্তি নিয়ে আবার গাড়িতে উঠে বসলাম। একটা মেয়ে বড় হয়েছে, তাও মাত্র বয়স দশ। ছোট দুইটা বড় হতে হতে আরও কত জ্বালাতন আছে সামনে কে জানে!

 

 

আদনান সাদেক, ২৭শে জুলাই, ২০১৭।

জার্মানির ডায়রির সবগুলো পর্ব এখানে

#BSAAG_Articles

#BSAAG_Diary_of_Germany

‪#‎আদনান_সাদেক‬
#এহা_আদনান
#BSAAG_Life_in_Germany

Print Friendly, PDF & Email

ফেসবুক মন্তব্যঃ

Leave a Reply