জার্মানির ডায়েরিঃ২২ “অংক ও কিছু আনন্দ”

 

„বাবা, আমি একটা অংক পরীক্ষায় তৃতীয় হয়েছি!“

„ও, আচ্ছা। তাই নাকি!“

কাজ থেকে ফিরে কিছুটা ক্লান্ত থাকি। এই সময়ে ঘরে ফিরলে তিন মেয়ে তাদের দিনের নানাবিধ কর্মকাণ্ড নিয়ে আমাকে ঘিরে ধরে। এই সময়টাতে একজনকে বেশি উৎসাহ দেখালে অন্যজন তার দিকে দৃষ্টি ফেরাতে ব্যস্ত হয়।

বড় বোনের উৎসাহ দেখে রিহা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, আমিও অংকে ভাল। আমার ক্লাস টিচার বলেছে।

এহা বলল, „আমি খুশি, তুমি খুশি হও নি, বাবা?“

এইবার ছোটটার পালা। আমাকে কিছু বলতে না দিয়ে সে একটা ছেঁড়া পাতা নিয়ে সেখানে আঁকিবুঁকি করে গম্ভীর স্বরে বলল, „বাবা, দেখ আমি অংক করছি।“

আমাকে বলতে হয়, বাহ ফিহা, তুমি তো অনেক ভাল অংক পার! রিহাকে বলতে হয়, তুমি অনেক ভাল অংকে! রিহা এই কথায় খুশি হয়ে স্কুলে কবে সব অংক ঠিকমতন করে ফেলেছে, তার একটা লিস্টি দিতে থাকে। একইসাথে চলতে থাকে ফিহার আঁকিবুঁকির হিজিবিজি অংক।

এহা একটু বড় হয়ে গেছে। দশ বছর বয়সে সে লম্বায় তার মাকে ছুঁয়ে ফেলেছে। আমার স্ত্রীর ইদানীং শপিং করা বেড়েছে। প্রশ্ন করলে, এই জামা শুধু সেই পরবে এমনটা নয়, পাশাপাশি এহাও পরতে পারবে।

এহা তার দরকারি কথাটা বলে চুপ থাকে। ছোট বোনদের জন্য অপেক্ষা করে। বাবার দৃষ্টি আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় সে অংশ নেয় না।

আমি কথার ফাঁকে এহাকে জিজ্ঞেস করলাম, „তৃতীয় হয়েছ কেন, প্রথম হলেই পারতে।“

এহা কিছু না বলে নিজের ঘরে চলে গেল। তার এখনো সম্ভবত স্কুলের বাড়ির কাজ বাকি আছে। একদম ছোটবেলা থেকে সে স্বাবলম্বী। এই দেশে বেশীরভাগ বাচ্চাকাচ্চা স্কুল থেকে হোম ওয়ার্ক করে বেলা করে বাসায় ফিরে। এহার বেলায় সেটা সম্ভব ছিল না। ফিহা হবার পরে বাড়ি ফিরে সে নিজের কাজ করার পাশাপাশি মেজ মেয়েটাকেও দেখে রাখে। পিঠাপিঠি ভাইবোনদের মধ্যে সাধারণত খুনসুটি লেগে থাকে। এহা এখানে ব্যতিক্রম। রিহার অনেক অন্যায় আবদার সে মেনে নেয়।

এহা ব্যতিক্রম – এই কথাটা আমাদের না, এটা তাদের শ্রেণী শিক্ষিকার কথা। ভদ্রমহিলা প্রায় ত্রিশ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন। তার ভাষায় তার এতো বছরের দেখা হাতে গোনা কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে এহা একজন। এদেশে প্রাইভেট পড়া বলে কিছু নেই। শিক্ষকরা খুশি রাখার জন্য ছাত্রছাত্রীদের প্রশংসা করে না। বরং কেন এহাকে বিশেষ মনে করছেন, এই নিয়ে তিনি আমাদের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিলেন। স্কুলে সবচেয়ে ভাল গ্রেড সে পাচ্ছে, তবে মেধাটা শুধু গ্রেড দিয়ে যাচাই করার নয়। জার্মান স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীতে এহা জার্মানে জার্মান বাচ্চাদের পেছনে সবচেয়ে ভাল গ্রেড পাচ্ছে, এই ব্যাপারটা দারুণ। দশ বছর বয়সে সে তার নানার একটা ছোটদের বই (হুমায়ূন আহমেদের নীল হাতি) বাংলা থেকে জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে ফেলেছে। সেই পাণ্ডুলিপি অতি আগ্রহ নিয়ে দেখে দিয়েছেন ভদ্রমহিলা নিজে। শিক্ষিকার ভাষায়, এহা একইসাথে গণিত, ভাষা এবং সঙ্গীতে ভাল। এই সবগুলো মিশ্রণ সাধারণত বাচ্চাদের মধ্যে দেখা যায় না। এই মেয়ে বড় হয়ে একইসাথে বিজ্ঞানী, ভাষাবিদ এবং সংগীতজ্ঞ হতে পারে। এহার শ্রেণী শিক্ষিকার উৎসাহে আমরাও মোটামুটি অভিভূত।

সুতরাং এহার অংক পরীক্ষায় তৃতীয় হবার ঘটনায় আমি বিস্মিত হই না। বরং কেন প্রথম হল না, সেই জন্য কিঞ্চিৎ ভাবনায় পড়লাম।

পরের বার এহার শিক্ষিকার সাথে দেখা হবার সময়ও শিক্ষিকা আমাকে দেখেই এহার প্রশংসায় মুখর হলেন। এই বাচ্চাকে নিয়ে যেন আমরা কোন চিন্তা না করি, সে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এই জাতীয় কথাবার্তা বাংলাদেশে বললে মানায়। জার্মানরা সাধারণত কোন বিষয় নিয়েই এতটা উচ্ছ্বসিত হয় না। এরা কঠিন মুখে বলবে, তোমার মেয়ের হাতের লেখা ভাল, কিন্তু খাতা বেশি পরিষ্কার রাখে না। শুধু গ্রেড ভাল হলে হবে না, পরিচ্ছন্নতার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

আমি আমতা আমতা করে এহার অংকে কেন প্রথম হল না এই ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করে ফেললাম।

ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তুমি সম্ভবত আসল ব্যাপারটা ধরতে পার নি। এই পরীক্ষাটা সারা জার্মানির একই শ্রেণীর বাচ্চাদের নিয়ে হয়। সেখানে ২০১৭ সালে প্রায় দেড় লক্ষ ছেলেমেয়ে চতুর্থ শ্রেণী থেকে টেস্টটা দিয়েছে। আমাদের স্কুলের ইতিহাসে থেকে গত তিন বছর পরে মেধাতালিকায় একটি মেয়ে জায়গা পেয়েছে। সেটা হল তোমার মেয়ে!

ছোটবেলায় আমার বাবা মা-র ধারণা ছিল আমি অত্যন্ত দুষ্ট প্রকৃতির এবং পড়াশোনায় একদমই মন নেই। যে কারো সাথে কথা হলেই ছেলেটা ভালই ছিল, কিন্তু পড়ালেখায় একদম মন নেই। সারাদিন শুধু বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ায় বা খেলাধুলা করে – এই জাতীয় অভিযোগ। এসএসসির ফলাফলে একটুর জন্য মেধাতালিকায় সুযোগ পেলাম না। তারপরেও আমাদের এলাকায় আমার ফলাফল ছিল সবচেয়ে ভাল হল। আমি ভীষণ খুশী। তার চেয়ে অনেকগুণ খুশী আমার বাবা। যেখানে যার সাথে দেখা হচ্ছে, তাকেই ইনিয়ে বিনিয়ে বলছেন, বুঝলেন তো, নামি স্কুলে না পড়লে যা হয় আরকি। ছয় নম্বরের জন্য মেধাতালিকায় সুযোগ পায় নি। ইসলামিয়াতে ইচ্ছে করে কম নম্বর দিয়েছে। যে ছেলে দুই অংকতেই একশতে নিরানব্বই পায়, সে কি ইসলামিয়াতে একাশি পেতে পারে! আপনিই বলেন!

এতো সামান্য বিষয়ে বাবা-মা-কে খুশী করা যায়, এই ব্যাপারটাই আমার আগে কখনো জানা ছিল না। স্কুল জীবন শেষ করে উপলব্ধি করলাম, এই তথ্যটা আগে থেকে জানলে জীবনে কোনদিন স্কুলের পরীক্ষায় দ্বিতীয় হতাম না।

আমার বড় মেয়েটা আমার মতন হয় নি। সে তার সামান্য বয়স থেকেই বাবা মা-কে অসামান্য আনন্দে ভাসিয়ে দিয়েই যাচ্ছে। মাত্র দশ বছরে এসেই মনে হচ্ছে, এই আনন্দ ধারণ করার ক্ষমতা আমার নেই।

আদনান সাদেক, ২৪শে মে, ২০১৭।

জার্মানির ডায়রির সবগুলো পর্ব এখানে

#BSAAG_Articles

#BSAAG_Diary_of_Germany

‪#‎আদনান_সাদেক‬
#এহা_আদনান

Print Friendly, PDF & Email

ফেসবুক মন্তব্যঃ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.