• Home »
  • Featured »
  • জার্মানির ডায়েরিঃ২০ “ড্রাগন”

জার্মানির ডায়েরিঃ২০ “ড্রাগন”

 

– বাবা, ড্রাগন কি সত্যি সত্যিই আছে?

এই প্রশ্নের উত্তর রিহাকে একাধিক বার দেয়া হয়েছে। ড্রাগন বলে আসলে কিছু নেই। এটা শুধু কল্পনা। ড্রাগন নিয়ে ছোটদের একটা সিনেমা হয়েছে সম্প্রতি। মেয়েদেরকে নিয়ে আমরা সপ্তাহে একটা সিনেমা দেখি। এইজন্য প্রজেক্টর দিয়ে দেয়াল জুড়ে বিশাল একটা বড় স্ক্রিন বসানো হয়। শুরু হবার আগে সব জানালার পর্দা টেনে ঘর অন্ধকার করে ফেলা হয়। তিন বছরের ফিহা মুখে আঙুল দিয়ে শ-শ শব্দ করে সবাইকে চুপ হতে বলে।

এহা এখন বড় হয়ে গেছে। প্রায় সময়েই সে বাচ্চাদের সিনেমা বলে দেখতে চায় না। বাচ্চাদের সিনেমা দেখাটা আমার জন্যও একটু বোরিং। রিহা আর মাত্র দুইদিনের মধ্যে ৭ বছর হয়ে যাবে। এখন তাকে আর কোলে নেয়া যায় না। কোলে নিতে গেলে সে গম্ভীর হয়ে বলে, আমি কি ফিহার মতন বেবি? কথা সত্যি। রিহা এই বছর থেকে কাঁধে ভারী ব্যাগ ঝুলিয়ে একা একা স্কুলে যায়।
 
আজকের (১৯শে নভেম্বর, ২০১৬) ছবিতে ড্রাগন আছে। ড্রাগন শুধু দেখতেই বিশাল নয়, তার মুখ দিয়ে আগুন বের হয়। সিনেমায় ভয়ের কিছু থাকলে রিহা ফিহার সাথে মারামারি করে বাবার কোল ঘেঁষে বসতে চায়। এই সময়ে কেউ কোলে নেয়া নিয়ে কোন অনুযোগ শোনা যায় না। শুধু এই কারণে বাচ্চাদের সাথে শিশুতোষ সিনেমা দেখার সময়টা আমার অসাধারণ কাটে।
পিটস ড্রাগন দেখতে দেখতে একটু পর পর রিহা উত্তেজিত হয়। সিনেমার পিট তার বয়েসি একটা ছেলে। সে একা একা বনে একটা ড্রাগনের কোলে ঘুমায়। দিনের বেলায় ড্রাগনের পিঠে চড়ে বেড়ায়। খেলার ছলে পাহাড়ের খাদ থেকে নিচে লাফ দিয়ে পড়ে যায়। এবং ড্রাগন তার চেয়েও দ্রুতগতিতে খাদে ঝাঁপ দিয়ে মাটিতে পড়ে যাবার আগেই পিটকে ধরে ফেলে।disney-petes
 
পিট এবং তার সেই ড্রাগনকে কিছু মানুষ ধরে ফেলল। রিহার চোখে পানিতে ছলছল। ড্রাগন সর্বশক্তিমান। তাকে লোহার শেকলে বেঁধে রাখা হয়েছে, হয়তো মেরে ফেলাও হতে পারে। সে এটা মানতে পারছে না।
 
সিনেমা শেষ হবার পর থেকে রিহা সারাক্ষণ ঘ্যান ঘ্যান করছে। তাকে বোঝানো হয়েছে যে ড্রাগন নেই। তবে ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপে কমোডো ড্রাগন নামে বিশাল এক ধরণের গিরগিটি আছে। তাদের অস্তিত্ব জানতে পেরেছে মানুষ মাত্র একশ বছর আগে। এরা আস্ত ছাগল বা হরিণ খেয়ে ফেলে। এদের মুখের ভেতরে কমলা রঙের সরু জিহ্বা থাকে। গন্ধ নেবার জন্য তারা কমলা জিহ্বা অত্যন্ত দ্রুত বের করে আবার মুখে ঢুকিয়ে নেয়। এই কারণে প্রথম দিকে মানুষ ভাবতো তাদের মুখ থেকে আগুনের ফুলকি বের হচ্ছে।
রিহা তারপরেও জিজ্ঞেস করে, ড্রাগন আসলে নেই, তাই না বাবা?
– না, নেই।
– হয়তো থাকতে পারে কিন্তু আমরা জানি না?
– হয়তো আছে। হয়তো তুমি একদিন খুঁজে পাবে। তখন তুমিও ড্রাগনের সাথে বনে গিয়ে থাকতে পারবে। চাও থাকতে?
– না, চাই না। ড্রাগন আসলে নেই।
– তাহলে ঘুমাতে যাও এখন।
– আসলেই তো নেই, তাই না বাবা?
 
আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেল বলি, এখন রাত হয়েছে, তোমাকে ঘুমাতে যেতে হবে।
গভীর রাতে তিনটার দিকে দোতালার প্যাসেজে খুটখাট শব্দ শুনে আমাদের ঘুম ভাঙল। কেউ একজন হাঁটছে। কে বলে ডাকতেই রিহা আমাদের ঘরে উঁকি দিয়ে বলল, ঘুমাতে পারছি না।
 
অনেকদিন আগে থেকেই রিহার আর বাবা মার সাথে ঘুমানোর অনুমতি নেই। তবে দুইদিন পর তার জন্মদিন এবং রাত তিনটে পর্যন্ত সে জেগে বসে আছে বলে তাকে অনুমতি দেয়া হল।
 
সকালের নাস্তার টেবিলে রিহা দাবী করল আমাদের বিছানায় সে বাকি রাতও ঘুমায় নি। কারণ বিছানাটা বেশী দুলছিল, এবং খুব সম্ভবত কেউ একজন সেটা দোলা দিচ্ছিল।
 
আমরা সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। বিছানা দোলার ব্যাপারটা অবশ্য পুরোপুরি কল্পনা না। জল বিছানায় একটু নড়াচড়া করলে নৌকায় দোলার মতন একটা অনুভব হয়। তবে রিহা ড্রাগন নিয়ে বেশি ভাবছে, এটা সবার কাছে পরিষ্কার। হয়তো সে রাতেও ঘুমিয়েছে, এবং স্বপ্নে দেখেছে ড্রাগন তার বিছানার পাশে বসে পাহারা দিচ্ছে।
 
সাত বছর হবে হবে এই সময়টাই এইরকম। এই বয়সে শিশুসুলভ ব্যাপারগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে থাকে। শিশুরা এইসময় কিশোরীতে রূপান্তর হতে থাকে। সব শিশুসুলভ জিনিস আবার চলে যায় না। এই বয়সে তারা অবিশ্বাস নিয়ে ড্রাগনের মতন প্রাণী কল্পনা করে। এই ড্রাগনরা তাদের ঘুমের ঘোরে তাদের শিয়রে এসে পাহারা দেয়। তারা ভয় পেলে ড্রাগন পালক মেলে তাদেরকে কোলে আশ্রয় দেয়। যেকোনো বিপদে পড়লে ড্রাগন আগ্রাসী হয়ে তাদের শত্রুর দিকে আগুন ছুঁড়ে দেয়। খেলার সময় হলে ড্রাগন তাদেরকে পিঠে নিয়ে আকাশের সবচেয়ে উঁচু মেঘের দেশে উড়ে যায়। ছয় থেকে সাতে পা দেবার সময়টাতে রিহার কল্পনার রাজ্য পাহারা দেয় ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রাগনরা।
 
এই গল্প লিখতে লিখতে বসার আগেই ২০শে নভেম্বর রিহার শরীর কাঁপিয়ে প্রচণ্ড জ্বর এসেছে। সে যে সত্যি সত্যি সারারাত ঘুমায় নি সেটা প্রমাণ করে সারাদিন ঘুমিয়ে কাটালো। রাতের বেলাতেও জ্বর কমেনি। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই বলল, তাকে স্কুলে যেতেই হবে। পরেরদিন তার জন্মদিন, সেটা ঘটা করে স্কুলে পালন হবার কথা।
 
এই কথা বলেই সে আবার বিছানায় এলিয়ে পড়ল। তার জ্বর কমেনি। স্কুলে যাবার বদলে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হল। রিহার ভাইরাল জ্বর, সাথে হজমের সমস্যা। ডাক্তার পরামর্শ দিলেন, এইসময় স্কুলে না গিয়ে দুই তিনদিন বাসায় বিশ্রাম করার। রিহা কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরল। পরেরদিন সে যেকোনো মূল্যে স্কুলে যেতে চায়।
 

জন্ম মূহুর্তে বাবার কোলে রিহা।

তার মা বলল, জন্মদিন পরের সপ্তাহে পালন হবে স্কুলে। রিহা কিছুতেই সেটা মানতে পারে না।
 

আজ ২২শে নভেম্নর। আমার আদরের মেয়েটার জন্মদিন। রিহার জন্ম মুহুর্তে নার্স প্রথমেই রিহাকে আমার কোলে তুলে দিল। জন্মদাত্রী তখনো প্রবল বেদনায় আচ্ছন্ন। নবজাতকে কোলে নেবার শক্তিটূকু নেই। নার্সের কথামতো আমি আমার শার্ট খুলে ফেললাম। রিহাকে আমার বুকে নিলাম। আমার শরীরের উষ্ণতা দিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরলাম।

রিহা -৭

রিহা -৭

 
রিহাকে বলা হয়নি যে পৃথিবীতে আসলেই সত্যিকার ড্রাগন আছে।এই ড্রাগনরা জন্মলগ্ন থেকে রিহাদের আগলে রাখে। তাদের অসুখ বিসুখে রাত জেগে পাহারা দেয়। বিপদের দিনে তাদের সাহস দেয়। আকাশ ছাড়িয়ে বড় হবার স্বপ্ন দেখায়। প্রতিটি জন্মদিনের সময় অবাক হয়ে ভাবে, এতো বড় হয়ে গেল মেয়েটা!
 
এই ড্রাগনদের কাঁধে চড়ে রিহা দুর্বল শরীর নিয়েই আজকে স্কুলে গেছে। ক্লাসে ঢুকতে ক্লাস টিচার জিজ্ঞেস করলেন, রিহা, তুমি একদিনেই ভাল হয়ে গেছ? রিহা হাসিমুখে মাথা নাড়ল।চারদিক থেকে ক্লাসের অনেকগুলো বাচ্চা এসে রিহাকে জড়িয়ে ধরল।
 

দূর থেকে রিহার আনন্দময় মুখ দেখে আমি বিড়বিড় করে বললাম, শুভ জন্মদিন মাগো!

আদনান সাদেক, ২২শে নভেম্বর, ২০১৬।

জার্মানির ডায়রির সবগুলো পর্ব এখানে

#BSAAG_Articles

#BSAAG_Diary_of_Germany

‪#‎আদনান_সাদেক‬

Print Friendly, PDF & Email