• Home »
  • Featured »
  • জার্মানির ডায়েরিঃ১৯ “বিশ্বাস”

জার্মানির ডায়েরিঃ১৯ “বিশ্বাস”

 

বিদেশ বিভুয়ে দেশের যেকোনো কিছু চোখে পড়লে মনটা অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়। পথে ঘাটে দেশের মানুষ, বাংলায় লেখা যেকোনো দ্রব্য সামগ্রী, অথবা বাংলাদেশের সাথে সরাসরি সম্পর্ক আছে এমন যেকোনো কিছু আবিষ্কার করলে ভেতরটা আর্দ্র হয়ে আসে। যারা বাংলাদেশে থাকে তারা প্রবাসীদের এই আবেগের মূল্য বুঝতে পারবে না, তারা ভাববে এটা লোক দেখানো আদিখ্যেতা! এই আবেগ বুঝতে হলে মাটি থেকে শেকড় উপড়ে ফেলে দেশ থেকে বাইরে পা দিতে হবে।

দূর থেকে দেখে বাংলাদেশের পতাকা মনে হল।

গত এক যুগে পথে ঘাটে অনেক বিদঘুটে জায়গায় অনেক রকম অদ্ভুত ভাবে অনেকের সাথে পরিচয় হয়েছে, অপরিচিত জনের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আপনজনের মত গল্প হয়েছে, অনেকবার অনেক দোকানে গিয়ে মেইড ইন বাংলাদেশ লেখা দেখে অজান্তেই অদরকারী কাপড়ে হাত বুলিয়েছি। তবে একটা জিনিস কখনো চোখে পড়েনি, সেটা হল বাংলাদেশের পতাকা। যদিও নিজের গাড়িতে সবসময় একটা বাংলাদেশের পতাকা ঝুলে, কিন্তু পথে ঘাটে অসংখ্য পতাকার মাঝে নিজের দেশের পতাকা হঠাত করে দুলতে দেখার আনন্দটাই অন্যরকম।

আজকে পথের মাঝে হঠাত করে শর্মি গাড়ি থেকে না দেখিয়ে দিলে খেয়ালই করতাম না জিনিসটা। জার্মানির একদম দক্ষিণ সীমান্তে যেখানে আমরা সবাই মিলে ছুটি কাটাতে এসেছি, যেখান থেকে আরও দক্ষিণ দিকে তাকালে মেঘের গাঁ ঘেঁষে সারি সারি আল্পস পর্বতমালার অপার্থিব সব দৃশ্য চোখে পড়ে, সেই কনস্ট্যান্স লেকের পাড়ে অচেনা ক্ষুদে একটা গ্রামের প্রধান সড়কের পাশে সবুজের মাঝে লাল সূর্যের একটা বাংলাদেশের পতাকা। নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস হয় না। পথের পাশে হুশ করে গাড়ি থামিয়ে একবার কাছ থেকে না দেখার লোভটা সামলাতে পারলাম না!

পথের পাশে দোকানিবিহীন ফলের দোকান।

হতাশ হয়ে দেখলাম এটা কোন পতাকা নয়, বরং একটি বিজ্ঞাপন। এখানে আপেল এবং অন্য কিছু ফলমূল বিক্রি করা হচ্ছে। সবুজের মাঝে মাঝখানে একটা গোলাকার লাল আপেল দূর থেকে দেখে বাংলাদেশের পতাকা বলে ভ্রান্তি হয়। তবে সেই বিজ্ঞাপনের মধ্যে একটা চমক ছিল, আর মনে পড়ে গেল ছেলেবেলার একটা ঘটনা।

ছোটবেলায় আমাদের পাড়ায় একজন অন্ধ ভিক্ষুক রাস্তার পাশে ছালা বিছিয়ে একটা থালা নিয়ে ভিক্ষা করতে বসতেন। তার সামনে রাখা টিনের থালায় একটা পয়সা পড়লে টুংটাং করে একধরণের শব্দ হতো। সেই শব্দ শুনলে তিনি সুমধুর সুরে আল্লাহ নবীজির নাম নিয়ে কয়েকটা লাইন সূরা পড়তেন। তাঁর গলা এতো সুন্দর ছিল যে, শুধু তাঁর গলার স্বর শোনার জন্য আমি কয়েকবার পাঁচ পয়সা থালায় ছুঁড়ে দিয়েছি। ভিক্ষার পরিমাণ পাঁচ পয়সা হোক আর আটআনা হোক, অন্ধ ভিক্ষুক প্রতিবারই ভিক্ষা পেলে সুরেলা কণ্ঠে সম্পূর্ণ সূরা পড়ে শেষ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন।

জার্মান ভাষায় ফলের দাম লেখা। সামনের খোলা ড্রয়ারে টাকা রাখার অনুরোধ।

পাড়ায় অবশ্য সবাই সূরা শুনে মুগ্ধ হতেন না। যেমন আমাদের বদ একটা পাড়াতো বন্ধু। সে টিনের থালায় দশ পয়সা ছুঁড়ে দিয়ে ভাংতি নেবার ছল করে পঞ্চাশ পয়সা নিয়ে আসতো। অন্ধ ফকির অবশ্য সেটা টের পেতেন না। তিনি সরল বিশ্বাসে গলা খুলে বদ ছেলেটার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন। এই ঘটনায় অনেকে মজা পেলেও আমার কেমন একটা কষ্ট হোতো। একসময় বড় হয়ে গেলেও সেই কষ্টের কথা ভুলতে পারিনি। বিভিন্ন সময়ে খেয়াল করেছি মানুষের সরল মনের বিশ্বাসকে প্রায় সময়েই দুষ্টলোক অপব্যবহার করে।

আজকের আপেল বিক্রির লাল সবুজ রঙচঙা দোকানের বিশেষত্ব হল, এখানে কোন দোকানদার নেই, ক্যাশবক্সে কোন তালা নেই। টেবিলের উপর ক্ষেত থেকে আনা আপেলসহ অন্যান্য ফল সারি করে প্যাকেট করে রাখা আছে। পথের পাশ দিয়ে গাড়ি করে বা হেঁটে যাচ্ছে এমন যেকোনো পথিক সেখানে খোলা ড্রয়ারে দুই ইউরো দিয়ে একটা আপেলের প্যাকেট নিয়ে যেতে পারবেন। মালিক প্রতিদিন সকালে এসে নতুন করে আপেল রেখে যাবার পাশাপাশি ড্রয়ার থেকে আগের দিনের দাম সংগ্রহ করে বাড়ি ফিরবেন।

পতাকা দেখতে না পারার হতাশা ভুলে কেন যেন মনে হল, আমরা যদি শুধু আমাদের আশেপাশের মানুষগুলোকে বিশ্বাস করতে পারতাম, আর আমাদেরকে বিশ্বাস করা মানুষগুলোর বিশ্বাসটুকু ফিরিয়ে দিতে পারতাম, তাহলে আজকে এতো বছর ধরে মনের অজান্তে বিদেশ বিভুয়ে এক টুকরো লাল সবুজ খুঁজে বেড়াতে হতো না।

‪#‎আদনান_সাদেক‬

আদনান সাদেক, ১৮ই আগস্ট, ২০১৫।

জার্মানির ডায়রির সবগুলো পর্ব এখানে

#BSAAG_Articles

#BSAAG_Diary_of_Germany

Print Friendly, PDF & Email