জার্মানির ডায়েরিঃ১৮ “প্রাচুর্য”

 

জার্মানিতে প্রথম আসার পর যা দেখতাম তাতেই মুগ্ধ হতাম। বাড়িঘর থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, দোকানপাট, ছবির মতন গাছপালা দিয়ে সাজানো পার্ক, ঝকঝকে ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস এই সবকিছুই হাঁ করে দেখতাম। সবচেয়ে বেশি লোভ হতো চকচকে সিনেমার স্ক্রিনে দেখা গাড়িগুলো চোখের সামনে অবহেলায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে। আমার ধারণা হতে থাকে যে এই রঙিন প্রাচুর্যের দৃশ্যগুলোর মানেই বিদেশ।

অনেকদিন বিদেশে থাকলে অবশ্য ধীরে ধীরে এই প্রাচুর্যের রঙিন চশমা সাদা হয়ে আসতে থাকে। আমাদের বাড়ীর নিচের পার্কিং-এ প্রায়শই বিএমডব্লিও, অডি বা পোর্শের জিপ পার্ক করা থাকে। ঘরের ময়লা ফেলতে নিচে নামি, আবার উপরে উঠে আসি। পার্কিং এর দামী গাড়ী আলাদা করে চোখেই পড়ে না।

 

বিদেশের প্রাচুর্যময় জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়ে মাঝে মাঝে অত্যন্ত ক্ষুদ্র কিছু দৃশ্য মনে গভীর ভাবে দাগ কাটে। এতটাই গভীর যে ছবি তুলে অন্যদেরকে সেটা জানাতে ইচ্ছে করে। নিচের ছবিটা ভালভাবে দেখলে ব্যাপারটা খেয়াল করা যেতে পারে।

 

গাড়ির প্রতিটি চাকার উপরেই আলগা একটা খোলস বা কাভার থাকে (radkappen/wheel cover)। এটা শুধুমাত্র সৌন্দর্য বর্ধনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, আলাদা তেমন কোন কার্যকারিতা এর নেই। অনেক সময় গাড়ি চলাকালীন চাকার এই খোলসটা আলগা হয়ে নিজে থেকেই খুলে পড়ে যায়। চালক বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা টের পায় একেবারে বাড়ি ফিরে গাড়ি থেকে নামার পর। একবার বাড়ি ফিরে দেখি আমার নিজের গাড়ির সামনের চাকার একটা খোলস পথে কোথাও পড়ে গেছে। এই সামান্য জিনিসটার অভাবে গাড়িটা দেখতে হঠাত করে কেমন যেন কদাকার হয়ে গেল।

 

পরের দিন কাজে যাবার পথে দেখি পথের পাশে খোলসটা পড়ে আছে। কেউ একজন যত্ন করে ফুটপাতের পাশে তুলে রেখেছে যেন অন্য গাড়ীর নিচে না পড়ে এবং সহজে খুঁজে পাওয়া যায়। ব্যাপারটা যে শুধু আমার ক্ষেত্রেই হয়েছে এমন না। এখন গাড়ী চালানোর সময় আশেপাশে খেয়াল করলে মাঝে মাঝেই পথের পাশে যত্ন করে উঠিয়ে রাখা এমন খোলস চোখে পড়ে। খুব সামান্য একটা জিনিস, তারপরেও খুব নাড়া দেয় ভেতরে। মনে হয় যেন, সব প্রাচুর্য টাকা দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না।

 

 

পুনশ্চঃ ছবিতে দেখা যাচ্ছে কারও হারানো চাকার খোলস যত্ন করে একজন একটা পোলের মধ্যে মোটা টেপ দিয়ে লাগিয়ে রেখেছে। ছবিটা গত রবিবার আমাদের বাসার পরের গলির রাস্তা থেকে তোলা।

আদনান সাদেক, ২৩.০৬.২০১৫

#BSAAG_Articles

#BSAAG_Diary_of_Germany

Print Friendly, PDF & Email

ফেসবুক মন্তব্যঃ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.