• Home »
  • Featured »
  • জার্মানির ডায়েরিঃ১৭ “ল্যাপটপকাব্য”

জার্মানির ডায়েরিঃ১৭ “ল্যাপটপকাব্য”

 

জার্মানিতে পা দেবার দুইদিন পর প্রথম অনেক কষ্টের টিউশনি করে জমানো অল্প কিছু টাকা নিয়ে জার্মানিতে পা দিয়েছি। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য একটা কম্পিউটার না থাকলেই নয়। জার্মানিতে এসে আবার অনেক দাম দিয়ে কম্পিউটার কিনতে হতে পারে বিধায় বাংলাদেশের পুরনো পিসিটাকেই ভাগযোগ করে সুটকেসে ভরে নিয়ে এসেছি। কেসিং তো আর নেওয়া সম্ভব নয়। তাই শুধু পাওয়ার সাপ্লাইটা খুলে সাথে নিয়েছি। এখন আর কোন অন করার সুইচ নেই, একটা স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে সরাসরি মাদারবোর্ডে প্লাস মাইনাস এক করে দিয়ে পিসি অন করতে হয়।

হোস্টেলের এপার্টমেন্টটা একজন ইন্দোনেশিয়ান পিএইচডি স্টুডেন্টের সাথে শেয়ার করি। দুইজনের আলাদা ঘর, শুধু রান্নাঘর আর বাথরুম একটা করে। তার ঘরে একদিন দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি টেবিলের উপর চকচকে একটা ল্যাপটপ। তখনও ল্যাপটপের খুব বেশি প্রচলন হয়নি। বাংলাদেশে তো নয়ই, জার্মানিতেও এটা সাধারণ ছাত্রদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ইন্দোনেশিয়ান ছেলেটাকে বলে কয়ে সেই ল্যাপটপ ছুঁয়ে দেখলাম। কাজের দিক থেকে আমার কেসিং বিহীন কম্পিউটারের সাথে ল্যাপটপের বিন্দুমাত্র কোন পার্থক্য নেই। তারপরও সেই বস্তুটি ধরে আমার মনে হল, কি সুন্দর গন্ধ। শুধু কিবোর্ড ছুঁলেই সব কাজ নিমেষের মধ্যে হয়ে যাবে।

ব্যাংকে টাকা নেই, কিন্তু সেইদিন থেকে কবে একটা ল্যাপটপ কিনব – এই চিন্তায় রাতে ঘুমোতে পারি না। ড্রেসডেন শহরে নতুন কম্পিউটারের একটা দোকান আছে। সেখানে গিয়ে কাঁচের শোকেজে সাজানো থরে থরে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থাকি। একবার দোকানদার আমাকে দেখে বিরক্ত হয়ে বলল, পছন্দ হয়েছে? আমি মাথা নেড়ে না বলে চলে আসি। পরের দিন আবার যাই। দোকানদার আমাকে দেখে একটু সতর্ক হয়। সে জানে আমি কিছু কিনব না, তারপরও এত ঘন ঘন কেন আসা?

উইনার কম্পিউটার, ড্রেসডেন

একদিন দোকানি আমাকে ঠিক ধরে বসল।
– গত দুইমাস ধরে প্রায় প্রতিদিন তুমি এই দোকানে আস। ল্যাপটপ দেখে দেখে চলে যাও। কারণটা বলবে কি?
– একটা ল্যাপটপ কিনব। সেটা দেখি।
– এতদিনেও পছন্দ হয় নি একটাও?
– হয়েছে।
– কোনটা পছন্দ হয়েছে?
আমি হাত তুলে দেখালাম। এসারের নতুন একটা মডেল। দাম ১০০০ ইউরোর মতন।
– তাহলে কিনছ না কেন?
– টাকা নেই। টাকা জমাচ্ছি, জমানো হলে কিনব।
– কত টাকা জমেছে এই দুই মাসে?
– ৫০ ইউরো।
– তারমানে এইটা কিনতে তোমার প্রায় দুই বছর লাগবে?
– বেশিও লাগতে পারে। পার্ট টাইম চাকরি না থাকলে টাকা জমবে না।
– তুমি তারমানে আগামী দুই বছর ধরে এখানে আসতে থাকবে?
– তুমি না চাইলে আর আসব না।
– তুমি আমার সাথে ভেতরে আস।
– তুমি কি পুলিশ ডাকবে? আমি তো কোন অপরাধ করি নি।
– পুলিশ ডাকব না, তোমাকে একটা জিনিস দেখাব।

ভয়ে ভয়ে তার সাথে ভেতরের গোডাউন টাইপের ঘরে গেলাম। সেখানে নতুন পুরাতন মিলিয়ে হাজার হাজার নোটবুক সারি সারি করে রাখা। ভদ্রলোক একটা মলিন বাক্স বের করে আমার হাতে দিলেন।
– এখানে দুই বছর আগের এসারের একটা মডেল আছে। কোন গ্যারান্টি নেই। ৫০ ইউরো দাম।

– এত কম দাম, তুমি নিশ্চিত তো?
– কিনতে না চাইলে জোর করে কিনতে হবে না।
আমি কাঁপা কাঁপা হাতে ৫০ ইউরো বাড়িয়ে দেই।
– আর একটা শর্ত আছে। এই ঘটনা ইউনিভার্সিটিতে বা বন্ধুদের অন্য কাউকে বলা যাবে না, ঠিক আছে?
– ঠিক আছে, বলব না।

কিছু কিছু প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে ফেলা যায়। এটাও এমন একটা সামান্য ঘটনা।

আদনান সাদেক, ২০১৪

 

পুনশ্চঃ গত তিন বছর ধরে প্রায় পঞ্চাশের বেশি ছেলেমেয়ে বিসাগের দেয়া অনুদান নিয়ে ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, স্মার্টফোন ইত্যাদি কিনেছে। এই সামান্য অনুদানের বীজ বপিত হয়েছিল অনেক বছর আগে এই অসামান্য ঘটনার মাধ্যমে। যারা ২০১৪ সালে নতুন এসেছ এবং ল্যাপটপ কেনার জন্য বাজেট পুরোপুরি যোগাড় করতে পার নি, তারা চাইলে এই লিঙ্কে ক্লিক করে বিসাগ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পার

#BSAAG_Articles

#BSAAG_Diary_of_Germany

Print Friendly, PDF & Email