• Home »
  • Featured »
  • জার্মানির ডায়েরিঃ১৫ “স্বপ্ন”

জার্মানির ডায়েরিঃ১৫ “স্বপ্ন”

 

জার্মানিতে পা দেবার দুইদিন পর প্রথম যে বাংলাদেশি ছেলেটার সাথে দেখা হল, তার নাম সজল খালেদ। সজলকে আগে থেকেই চিনতাম। অন্যদের থেকে একটু ভিন্ন চিন্তাভাবনার। পেটানো শরীর, ছোট বেলা থেকে মার্শাল আর্ট করে ব্ল্যাক বেল্ট পাওয়া। সজলের পড়াশোনায় তেমন মন নেই, সে বড় স্বপ্ন দেখে। তার সখ পাহাড়ে ওঠা। বাংলাদেশে থাকতে সে কিওকারাডং জয় করে এসেছে। উচ্চশিক্ষাতে জার্মানিতে এসে তখন সে প্ল্যান করছে ইউরোপের আল্পস থেকে শুরু করে দুর্গম সব চূড়ায় ওঠার।

প্রথম সেমিস্টার শেষ, সজল বেশিরভাগ পরীক্ষা দেয় নাই। সে ব্যস্ত তার পাহাড়ে ওঠার ট্রেনিং নিয়ে। একদিন বললাম, এইসব বাদ দে, পড়াটা নষ্ট করিস না। কয়জন এমন বাইরের ভাল ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসার সুযোগ পায়। সজলের ভ্রূক্ষেপ নেই। তার ইচ্ছে সে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করবে। সজল বলত, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটি পাওয়া যায় পর্বত চূড়ায়। চারদিক মেঘে ঢাকা, দৃষ্টির সীমাহীন স্বাধীনতা, বিজয়ের আনন্দ নিয়ে স্বর্গের এত কাছাকাছি যাওয়া কোনদিন সম্ভব নয়। এর জন্য তো কিছু বিসর্জন দিতেই হবে।

রাইমুন্ড আমার প্রথম জার্মান বন্ধু। তার সখ ছিল সাইকেল চালানো। একবার ড্রেসডেন শহর থেকে অনেকটা দূরে ঘুরতে গেছি বন্ধুদের সাথে, প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে। হঠাৎ দেখি রাইমুন্ড সেখানে তার পাহাড়ে চলার উপযোগী সাইকেল নিয়ে (মাউন্টেইন বাইক)। সে নাকি ৫০ কিলোমিটার সাইকেল পাড়ি দিয়ে এসেছে, জাস্ট বিকেলে একটু ঘুরতে বের হবে- এই মনে করে। আমাদের বিদায় দিয়ে সে আবার ৫০ কিলোমিটার ফেরত পথে চলে গেল। আর সেই পথ কিন্তু মসৃণ বা সমতল নয়। একটু পর পরই উঁচু নিচু পথ। নিজে একবার চালিয়ে দেখেছি, দুইবার পাহাড়ে উঠলে তিনবার থেমে পানি খেতে হয়।

রাইমুন্ডের ইচ্ছে সে একবার আমেরিকার গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের গিরিখাতের পাশ দিয়ে সাইকেল চালাবে। সেখানের দুর্গম পথে পিঠে শুধু শুকনো খাবার নিয়ে অনেকদিনের জন্য বেরিয়ে পড়বে। পাহাড়ের গুহায় রাত কাটানো, স্বচ্ছ নীল পাহাড়ি নদীতে স্নান করতে করতে চারদিকের প্রকৃতিতে মিশে যাবে।
আমি সামান্য ছাপোষা বাংলাদেশের নিম্ন মধ্যবিত্ত ছেলে। বাবার পয়সা নেই, কিন্তু বিদেশ যাবার ইচ্ছে ছিল। বুয়েটে থাকতে সব সময় অনেকগুলো টিউশনি করতাম। অনেক মানে অনেক, এক সাথে দশটাও করেছি একসময়। জার্মানিতে এসেছিলাম পকেটে টিউশনির করে জমানো ১৪০০ ইউরো (বাংলাদেশি টাকায় ১ লক্ষের একটু বেশি) আর বাবার দেয়া একটা ১০০ ডলারের নোট নিয়ে। পাস করে মনে হয়েছিল, আমার মতন হত দরিদ্র ছেলে যদি এখানে দাঁড়ায়ে যেতে পারে, তাহলে দেশের আরও অনেক ছেলেরও এই সম্ভাবনা আছে। তাদের শুধু একবার সুযোগটা দিতে হবে।

অন্যান্য পর্ব ও লেখকের কথা

গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন বা মাউন্ট এভারেস্টের মতন বড় স্বপ্ন আমার ছিল না। শুধু চেয়েছিলাম জার্মানিতে আসার জন্য দেশের ছেলেমেয়েদের স্বপ্ন দেখাতে। যে প্রতিকূলতা নিজে পেয়েছি, তা যেন অন্যদের ইচ্ছে পূরণের অন্তরায় না হয়, সেই পথটা খুলে দিতে। সেই সামান্য স্বপ্নের নাম বিসাগ।

রাইমুন্ড তার অনেক বছরের টাকা জমিয়ে ঠিক ঠিক একবার চলে গেল গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে। শুধু নতুন সাইকেলের দামই নাকি তিন হাজার ইউরো, টাকায় তিন লক্ষের মত। দুর্গম পাহাড়ের খাদে পড়ে গিয়ে তার সাইকেল নষ্ট হয়ে গেল, সাথে পায়ে ব্যথা পেল। প্রিয় সাইকেলটা রেখে যাওয়া যাবে না। সাইকেল কাঁধে বয়ে নিয়ে সে দুইদিন পর্যন্ত হাঁটল। নিকটস্থ লোকালয়ে পৌঁছুতে তখনও আরও দুইদিনের পথ বাকি। সাইকেল কাঁধে নেওয়াতে হাটার গতি কমে গেছে। শরীরে শক্তি শেষ হয়ে আসায় শেষ পর্যন্ত সে সাইকেলটা ফেলে দিল। ফিরে আসার পর তার গল্প শুনে আমি শিউড়ে উঠি, কিন্তু রাইমুন্ডের মুখ উজ্জ্বল। সে তার স্বপ্ন পূরণ করেছে। স্বপ্ন পূরণে একটা প্রিয় জিনিস হারিয়ে যেতেই পারে।

সজল জার্মানিতে তার পড়া শেষ না করলেও তার স্বপ্ন ঠিক পূরণ করল। মাউন্ট এভারেস্ট সে জয় করে ছাড়ল। এভারেস্টে উঠে সে তার স্বপ্নের পৃথিবীর মুখ দেখল। মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত চূড়ায় দাঁড়ানো। অনেক গুলো বছরের কঠোর পরিশ্রম, অনেক বছরের অপেক্ষা। হিম শীতল, লঘু অক্সিজেনের দেশ থেকে সজল তার প্রিয়জনকে ফোন দিল। এভারেস্ট জয় করেছি, ফিরে এসে সব গল্প বলব!

অবশ্য সজলের আর ফেরা হল না। অজ্ঞাত কারণে দুর্গম আবহাওয়ার মধ্যে অসুস্থ অবস্থায় দল ছুট হয়ে গেল সে ফেরার পথে। সজলের লাশ আজকে পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। স্বপ্ন জয়ে কিছু মানুষ মৃত্যুকে জয় করে, সজল তাদের একজন।

বিসাগ আজকে বাংলাদেশে একটি পরিচিত নাম। অন্তত এক হাজার ছেলেমেয়ে এই ফোরামের সাহায্য নিয়ে জার্মানিতে এসেছে। সামান্য আবেদনের ফি ছাড়া তাদের একটি বাড়তি পয়সা খরচ হয় নি। তিন বছর আগের তুলনায় জার্মানিতে বাংলাদেশীদের আসার সংখ্যা প্রায় কয়েক গুন বেড়েছে। আমার ক্ষুদ্র স্বপ্নও সত্যি হয়েছে। এখন অনেক ছেলেমেয়ে বাংলাদেশে বসে জার্মানিতে আসার কথা কল্পনা করে, এলবে নদীর পাড়ে বসে নতুন করে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখে।

আজকে নিজের হাত গড়া বিসাগ ফোরামে আমি নেই। নেই বললে ভুল হবে, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে বের করে দেয়া হয়েছে। গত কয়েক বছর কন্টিনেন্টালের হাইব্রিড গাড়ির প্রোজেক্ট ম্যানেজারের কাজ করেছি ফ্রিল্যান্সার হিসেবে। সেখানে খুব কাছের মানুষ হিসেবে বাংলাদেশি একটা ছেলের জন্য রিকমেন্ডেশন পাঠালাম। বছর পেরিয়ে সেই ছেলেটি আজকে সেখানে মাস্টার্স থিসিস করার সুযোগ পেয়েছে। তার হাতে বিসাগের গ্রুপ পেইজ সবকিছুর এডমিন ক্ষমতা দেয়া ছিল। আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে, সম্প্রতি সেই ছেলেটি নিজেই রাজা হতে হবে – এই অভিসন্ধিতে আমার গড়া গ্রুপ, পেজ থেকে আমাকেই বের করে দিল। শুধু তাই করে সে ক্ষান্ত হয়নি, এখন আমাকে জড়িয়ে সে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বেড়াচ্ছে। আমাকে ক্ষুদ্র প্রমাণ করে যদি সে বড় হতে পারে!

ক্ষমতা, বিত্ত, খ্যাতি এইসব আমাদের সবাইকেই প্রভাবিত করে। আমাদের বেঁচে থাকার জগতে এইসব পার্থিব জিনিসের পাশেও রাইমুন্ড, সজলের মতন মানুষেরা শিখিয়েছে শুধু স্বপ্নের জন্য বেঁচে থাকতে। তারা দেখিয়েছে, প্রতিটি স্বপ্নের পথে বাঁধা অবধারিত। সত্যিকারের স্বপ্ন এমন এক জিনিস যার জন্য জীবন পর্যন্ত তুচ্ছ করা যায়।

আমাকে ছাড়াও বিসাগের স্বপ্ন বেঁচে থাকুক। যারা আমাকে পেছনে ছুঁড়ে দিয়ে নিজের সামনে এগিয়ে যেতে চাইছে, তাদের স্বপ্নও সফল হোক।

নাহ, আমি ভেঙে পড়িনি। মানুষ বাঁচে তার স্বপ্নের জন্যই।

আদনান সাদেক, ২০১৪

রেফারেন্সঃ সজলের নাম পাওয়া যাবে একমাত্র বাংলাদেশি এভারেস্ট আরোহী হিসেবে মৃত্যুবরন কারীর তালিকায়।

http://en.wikipedia.org/wiki/List_of_people_who_died_climbing_Mount_Everest

#BSAAG_Articles

#BSAAG_Diary_of_Germany

Print Friendly, PDF & Email